৭ এপ্রিল ২০২৩, শুক্রবার, ৭:৫০

প্রবৃদ্ধি নিয়ে কার কথা সত্য

সরকার বলছে প্রবৃদ্ধি হবে সাড়ে ৬ শতাংশ, বিশ্বব্যাংক ৫.২, আইএমএফ ৫.৫ এবং এডিবির হিসাবে ৫.৩ শতাংশ

চলমান সংকটের ধাক্কা জিডিপিতে। ছবি: যুগান্তর
চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের ধাক্কা লেগেছে জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন)। এ কারণে চলতি অর্থবছরে শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি কত অর্জিত হবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে একধরনের বিতর্ক। সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো যে যার মতো করে পূর্বাভাস দিচ্ছে। সরকার বলছে, তাদের (উন্নয়ন সহযোগী) হিসাবে আমাদের কিছু যায় আসে না।

অপরদিকে উন্নয়ন সহযোগীরা তথ্য-উপাত্ত এবং যুক্তি দেখিয়ে বলছে, এ অর্থবছরে কাক্সিক্ষত অর্জন সম্ভব হবে না। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পূর্বাভাস। এ অবস্থায় কার কথা সত্য হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। এমনটিই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। পরে সেটি কমিয়ে ধরা হয় সাড়ে ৬ শতাংশ। কিন্তু বিশ্বব্যাংক বলছে, চলতি অর্থবছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। আইএমএফ বলেছে ৫ দশমিক ৫ এবং এডিবি মনে করে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। এক্ষেত্রে সরকারের মতোই সংস্থাগুলোও তাদের আগে দেওয়া পূর্বাভাস কমিয়ে এনেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব নেই। তাদের হিসাবে আমাদের কিছু আসে যায় না। তারা তাদের মতো বলবে, আমরা আমাদের মতো বাস্তবতার ভিত্তিতে হিসাব করব, এটাই স্বাভাবিক। আমরা সারা দেশের পরিস্থিতি হিসাব করে তারপর প্রক্ষেপণ তৈরি করি। আর বিশ্বব্যাংকসহ অন্যরা তাদের মতো করে স্যাম্পলের ভিত্তিতে অথবা পরিস্থিতি বিবেচনা করে পূর্বাভাস দেয়। তবে এখন পর্যন্ত যেসব সংস্থা চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, তাদের চেয়ে অবশ্যই বেশি আমরা অর্জন করতে পারব। তবে এ কথা সত্য, সাড়ে সাত বা আট শতাংশ হয়তো হবে না। কিন্তু তাদের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশিই হবে।’

সূত্র জানায়, ৪ এপ্রিল ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট-২০২৩’ প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। সেখানে আগের দেওয়া পূর্বাভাস কমিয়ে সংস্থাটি বলেছে চলতি অর্থবছর প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। এর আগে গত বছরের অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। জুনে আরও একটু বাড়িয়ে পূর্বাভাস দেয় ৬ দশমিক ৭ শতাংশের। সর্বশেষ দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রভাব ফেলেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ক্রমবর্ধমান সুদহার ও গতি হারানো বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির আঁচ বাংলাদেশের গায়েও লাগছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতে নানা ধরনের কড়াকড়ি ও আমদানি নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার চলতি অর্থবছরে নেমে আসবে। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তাও আছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, চলতি অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি গত অর্থবছরের চেয়েও কমবে। মূলত বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এছাড়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটাও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যেমন: সরকার আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে এতে মূলধনি যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল প্রভৃতি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আইএমএফ জানুয়ারিতে জানায়, চলতি অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হবে। এর আগে সংস্থাটি বলেছিল জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশ। কিন্তু পরে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে আনে।

এদিকে ৪ এপ্রিল ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক-২০২৩’ প্রকাশ করেছে এডিবি। সেখানে বলা হয়, বৈশ্বিক সংকটেও বাংলাদেশের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক। কেননা রপ্তানি গ্রোথ দিনদিন কমে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটও প্রভাব ফেলেছে। প্রবৃদ্ধির হার ধীরগতির অন্যতম কারণ ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ। ফলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার মধ্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ গত বছর ছিল মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশ, সেখান থেকে ২০২৩ সালে বেড়ে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হবে। দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেও। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, স্থানীয় ভোগ-চাহিদা হ্রাস ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতিতে পণ্য রপ্তানি কমে যাওয়ায় জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমবে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম উন্নয়ন সহযোগীদের এসব পূর্বাভাস বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই প্রবৃদ্ধির হিসাব করে থাকে। আমরা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে লক্ষ্যমাত্রা ধরে থাকি। উন্নয়ন সহযোগীরা তাদের নিজেদের মতো হিসাব বের করে পূর্বাভাস দেয়। তারা সব সময়ই কম হিসাব দেয়। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক প্রতিবছরই কম প্রবৃদ্ধি ধরে। এতে আমাদের কিছু যায় আসে না। অর্থবছর শেষে যখন বিবিএস-এর হিসাব প্রকাশ করা হয়, তখন তারা আর কোনো সমালোচনা করে না। চুপচাপ সেটিই মেনে নেয়।’

https://www.jugantor.com/todays-paper/last-page/662897