বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও টেন্ডারবাজি বন্ধ করতে চব্বিশের ৫ আগস্টের মতো আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আরেকটি বিপ্লব ঘটাতে হবে। তিনি বলেন, চব্বিশের বিপ্লবটি ছিল বুলেটের বিরুদ্ধে। এবার দেশে ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া, আধিপত্যবাদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করা এবং বস্তাপচা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক ব্যবস্থাকে তছনছ করার জন্য ব্যালটের মাধ্যমে বিপ্লব করতে হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আজ সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, চুয়াডাঙ্গা টাউন ফুটবল মাঠে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন।
চুয়াডাঙ্গা জেলা আমীর এবং চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে সংসদ সদস্যপ্রার্থী অ্যাডভোকেট রুহুল আমিনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য জনাব মোবারক হোসাইন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা প্রমুখ।
আমীরে জামায়াত আরও বলেন, হ্যাঁ মানে আজাদি, না মানে গোলামি। ভোটের দিন বুথে ঢুকে প্রথম ভোটটি শক্ত করে মারতে হবে ‘হ্যাঁ’-তে। হ্যাঁ জিতে গেলে বাংলাদেশ জিতে যাবে, ফ্যাসিবাদ আর ফিরে আসবে না, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজদের কবর রচিত হবে। আর হ্যাঁ হেরে গেলে বাংলাদেশ হেরে যাবে। দ্বিতীয় ভোটটি হবে পরিবর্তনের বাংলাদেশের পক্ষে। আগামী ১২ তারিখ দুটি ভোট হবে—একটি সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট, আরেকটি পরিবর্তনের বাংলাদেশের ভোট।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আগামী নির্বাচনের জন্য ১১ দল ২২টি হাত একত্রিত হয়েছে। দেশের আপামর জনগণ একত্রিত হয়েছে। আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য হলো—দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, দখলবাজ, মায়েদের ইজ্জত লুণ্ঠনকারী, শিশু ও বৃদ্ধদের অবহেলাকারী এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে চিরতরে লালকার্ড।
তিনি বলেন, দেশের কিছু কিছু এলাকায় পরাজিত হবে জেনে কেউ কেউ ১১ দলের পক্ষে কাজ করা মা-বোনদের হয়রানি করছে, অভদ্র আচরণ করছে। জামায়াতের ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়ার কিছু নেই। বেয়াদবি করলে আগুনের ফুলকি দেখতে পাবে বলেও তাদের সতর্ক করেন এবং নতুন করে উত্তেজনা না ছড়িয়ে যুক্তি ও কর্মসূচি নিয়ে নির্বাচনী মাঠে কাজ করার আহ্বান জানান।
ডা. শফিকুর রহমান সতর্ক করে বলেন, কাউকে আমরা ছেড়ে কথা বলব না। কেউ ফ্যাসিবাদী চেহারা নিয়ে এলে, চব্বিশের আন্দোলনে যেভাবে যুবসমাজ ও জনগণ ফ্যাসিবাদকে লালকার্ড দেখিয়েছে, ১২ তারিখও সেই লালকার্ড দেখানো হবে। যুবসমাজ আর বস্তাপচা রাজনীতি দেখতে চায় না।
তিনি বলেন, ৫৪ বছর ধরে যে রাজনীতি বাংলাদেশকে অন্ধকার গলিতে ঠেলে দিয়েছে, কোনো কোনো রাষ্ট্রের তাবেদারে পরিণত করেছে—আমাদের যুবসমাজ আর সেই বাংলাদেশ দেখতে চায় না। আবু সাঈদ ও আবরার ফাহাদ এজন্য নিজের জীবন দিয়েছে। তাদের রক্ত দেশবাসীর কাছে আমানত, তাদের লাশ দেশবাসীর ঘাড়ে।
আমীরে জামায়াত আরও বলেন, পুরোনো ও নতুন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আজ যুবকরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এর প্রমাণ দেশের পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন। বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও নির্বাচন হলে একই চিত্র দেখা যাবে।
তিনি বলেন, আজ কেউ কেউ দিশেহারা হয়ে নানা কথা বলছেন। একসঙ্গে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছি। তাদের অন্যায় ও অসত্য কথার জবাব দেওয়ার সময় আমাদের নেই। আমরা দেশবাসীকে নিয়ে কী স্বপ্ন দেখছি, সেটাই বলতে এসেছি। তারা জনগণের সম্পত্তি লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে, বেগমপাড়া বানিয়েছে, নিজেদের জন্য সিঙ্গাপুর ও কানাডা বানিয়ে বাংলাদেশকে সমুদ্রের তলদেশে ঠেলে দিয়েছে।
আমীরে জামায়াত বলেন, আমরা সমুদ্রের তলদেশ থেকে বাংলাদেশকে টেনে তুলতে চাই। আমরা আশাবাদী—ইনশাআল্লাহ পারব। যুবকরা ও আপামর জনগণ পাশে থাকলে আমরা পারব। দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে নিজেদের মালিক বলব না, দেশের সেবক হব।
দলের পক্ষ থেকে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, আমাদের কোনো জনপ্রতিনিধির সম্পদ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে না এবং বাড়তে দেওয়া হবে না। যারা নিজেরটা উজাড় করে দেশবাসীর সেবা করার সাহস রাখে—তারাই আসবে, অন্য কারও দরকার নেই। জনপ্রতিনিধিরা প্রতি বছর নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব জনগণের সামনে দিতে বাধ্য থাকবে। উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত জনগণের সম্পদের হিসাব জনগণকে জানাতে হবে। উন্নয়ন কীভাবে হবে তা জনগণের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করতে হবে; উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
দেশবাসী ও যুবসমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, যুবকদের হাতে আমরা বেকারভাতা তুলে দিতে চাই না। বরং তাদের দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে গড়ে তুলে সম্মানের তাজ পরাতে চাই। তারা যেন গর্বের সঙ্গে বলতে পারে—আমি এ দেশের একজন গর্বিত নাগরিক ও দেশ গড়ার কারিগর। এই কারিগর তৈরির শিক্ষা ছাত্রসমাজের হাতে তুলে দেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ সরকারি খরচে দেওয়া হবে। যুবসমাজকে বেকার নয়, কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে চাই। প্রয়োজন অনুযায়ী ৩ মাস, ৬ মাস, ৯ মাস ও এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, মেয়েদের উচ্চতর লেখাপড়া পর্যন্ত ব্যয়ভার সরকার বহন করবে। মায়েদের সম্মান, ইজ্জত ও নিরাপত্তা ঘরে, বাইরে ও কর্মস্থলে নিশ্চিত করা হবে—ইনশাআল্লাহ।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, রাজনীতি হলো নীতির খেলা। প্রত্যেকে তার নীতি নিয়ে আসবে, সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ। জনগণ যাকে গ্রহণ করবে তাকে সম্মান দেখাতে হবে। আমরা দেশবাসীর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখি।
আমীরে জামায়াত বলেন, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা সব শিল্প-কারখানা চালু করা হবে। চুরি-চামারি ও লুটপাট বন্ধ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কলকারখানা সচল হবে। অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দেশ উৎপাদনে এগিয়ে যাবে। নতুন নতুন কারখানা গড়ে উঠবে। বেকারভাতা নয়, কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশকে সমৃদ্ধশালী করতে চাই।
তিনি বলেন, তিনটি বিষয় যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে চাই—প্রথমত, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। দ্বিতীয়ত, গরিব-ধনী, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা, নারী-পুরুষ, শিশু, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য ন্যায়বিচার। তৃতীয়ত, জনগণের চাওয়া অনুযায়ী বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। দেশ বদলের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে। কোনো অন্যায়ের কাছে মাথানত করব না—বলেন আমীরে জামায়াত।
