Thursday, 21st January, 2021
Choose Language:

সর্বশেষ
সংবাদ
খালাস চেয়ে রিভিউ আবেদন মীর কাসেম আলীর
২০ জুন ২০১৬, সোমবার,
জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলী খালাস চেয়ে আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ (পুনর্বিবেচনার) আবেদন করেছেন। এতে বলা হয়েছে ১১ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদন্ডের দেয়ার রায় ত্রুটিপূর্ণ। গতকাল রোববার দুপুর ১২টার দিকে আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় তার পক্ষে এই রিভিউ আবেদন করা হয়। আবেদনে আপিলের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া সাতটি (২, ৩, ৭, ৯, ১০, ১১ এবং ১৪) অভিযোগ থেকে খালাস চেয়েছেন তিনি। আসামীর খালাসের পক্ষে ৮৬ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে মোট ১৪টি যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। এসব যুক্তিতে বলা হয়েছে মীর কাসেম আলী নির্দোষ এবং ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই। 
রিভিউতে বলা হয়েছে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের রায়ে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে। কেননা এটা সম্পূর্ণরূপে সন্দেহ ও অনুমানভিত্তিক এবং স্ববিরোধী রায়। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলাটি রিভিউ হওয়া উচিত। গত ৬ জুন মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে এ রায় প্রকাশিত হয়। পরে রায় ট্রাইব্যুনালে গেলে নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়। সেখান থেকে রায় কেন্দ্রীয় কারাগার হয়ে কাশিপুর কারাগারে যায়। কারা কর্তৃপক্ষ তাকে রায় পড়ে শোনায়। তিনি রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ  করার নির্দেশ দেন আইনজীবীদের। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে এ রিভিউ করতে হয়। সে হিসেবে নির্ধারিত সময়ের আগে তার পক্ষে রিভিউ আবেদন দাখিল করা হলো। 
১১ নং অভিযোগ ত্রুটিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুদন্ড বহাল  
আপিল বিভাগের মতে ১১ নম্বর অভিযোগের সাথে মীর কাসেম আলীর জড়িত থাকা বিষয়ে চার্জগঠন ছিল  ত্রুটিপূর্ণ। ১১ নম্বর অভিযোগের বিরুদ্ধে আসামী নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আসামী নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে সক্ষম ছিলেন কিন্তু  প্রসিকিউশনের ২৪ জন সাক্ষীর বিরুদ্ধে আসামী পক্ষে মাত্র ৩ জন সাক্ষী হাজির নির্ধারণ করে দেয় ট্রাইব্যুনাল-২। ট্রাইব্যুনালের বিচারের প্রত্যেকটি ধাপে আসামীর অধিকার খর্ব করা হয়েছে বিধায় তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ বিষয়টি বিবেচনায় আনতে ব্যর্থ হয়েছেন আপিল বিভাগ। 
কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নেই এবং আসামীর ভাই অভিযোগ সমর্থন করেননি  
১১ নম্বর অভিযোগ জসিম উদ্দিন হত্যা বিষয়ে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদ- বহাল রাখা হয়েছে যদিও কেউ মীর কাসেম আলী কর্তৃক জসিমকে অপহরণ নির্যাতন করতে বা তাকে অপহরণ ও নির্যাতন করে হত্যার নির্দেশ দিতে দেখেনি। এমনকি জসিমের ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. রাজীব হুমায়ুনকে তদন্তকালীন জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের অভিযোগ স্বীকার করেন নি। আপিল বিভাগ এ বিষয়টি বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ছাড়া প্রসিকিউশনের ২ ও  ১৭ নং সাক্ষীর পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্যও বিবেচনায় নেয়া হয়নি। যেমন জসিমকে যখন রুমে আনা হয় তখন সাক্ষী এডভোকেট সাইফুল আলমের চোখ বাঁধা ছিল। ফলে তার পক্ষে তখন মীর কাসেম আলীকে চেনার কথা নয়। 
নেতৃত্বের দায় বিষয়ে কোনো প্রমাণ বা ‘কার্যকর নিয়ন্ত্রণ’ সম্পর্কিত বাস্তবভিত্তি নেই 
১১ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে নেতৃত্বের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। অথচ ক্যাম্প পরিচালনা বিষয়ে মীর কাসেম আলীর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, নেতৃত্বের অবস্থান বিষয়ে বাস্তবিক তথ্য প্রমাণ নেই এবং তিনি এ ধরনের অপরাধ বন্ধে ভূমিকা নিতে পারতেন সে মর্মেও কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি রায়ে। 
মীর কাসেম আলীকে আইসিটিএ সেকশন ৪ (১) মোতাবেক ইন্ডিভিজুয়াল দোষী সাব্যস্ত করা ও সেকশন ৪ (২) মোতাবেক নেতৃত্বের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা উভয় ক্ষেত্রেই আপিল বিভাগ ভুল করেছে রায়ে। ১৬৪ পৃষ্ঠায় মীর কাসেম আলীকে হত্যা ঘটনা সংগঠন বিষয়ে পরিকল্পনাকারী, উদ্যোক্তা, ফিলোসফার এবং আর্কিটেক্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই। আপিল বিভাগ অপর যে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হয়েছেন তা হলো চার্জ গঠনের ক্ষেত্রে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে নেতৃত্ব বা উর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় আনার জন্য কোনো বাস্তবভিত্তিক তথ্য প্রমাণ হাজিরের কোনো উদ্যোগই নেয়নি প্রসিকিউশন থেকে। কাজেই আপিল বিভাগ কর্তৃক আসামীকে নেতৃত্ব বা উর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা একটি ন্যায়ভ্রষ্ট ঘটনা। 
প্রসিকিউশনের ডকুমেন্টেই অ্যালিবাই প্রমাণিত
ঘটনার সময় আসামী যে ঘটনাস্থলে ছিলেন না এ বিষয়ে আসামী পক্ষের ১, ২ , ৩ ও প্রসিকিউশন পক্ষের ৮ নম্বর সাক্ষী এবং তাদের জমা দেয়া ডকুমেন্ট অবিশ্বাস করে আপিল বিভাগ ভুল করেছে। প্রসিকিউশন পক্ষের জমা দেয়া-দৈনিক ইত্তেফাক ৮/১১/১৯৭১, দৈনিক পাকিস্তান ৮/১১/১৯৭১, প্রসিকিউশনের প্রদর্শনী সিরিজ-৩, দৈনিক সংগ্রাম ১১/১১/১৯৭১, দৈনিক আজাদ ২৪/১১/১৯৭১, দৈনিক আজাদ ১১/১২/১৯৭১, দৈনিক আজাদী ১/৮/১৯৭১, দৈনিক আজাদী ১৪/৮/১৯৭১ এবং একই পত্রিকার ২ সেপ্টেম্বর, ৮ সেপ্টেম্বর, ৭ নবেম্বর, ও ১২ ডিসেম্বর এর ডকুমেমেন্টেই দেখা যায় মীর কাসেম আলী মুক্তিযুদ্ধকালে ১৯৭১ সালের ৭ নবেম্বর থেকে মার্চ ১৯৭২ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ছিলেন না। 
পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব পালনের জন্য  মীর কাসেম আলী এসময় ঢাকায় ছিলেন। তখন তিনি আগামসী লেনে তার বোনের বাসায় বসবাস করতেন। কাজেই এসময় চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলে সংঘটিত অপরাধের সাথে মীর কাসেম আলীর কোনো সম্পর্ক নেই। 
ডালিম হোটেলের মালিকের ছেলেকে হাজির করা হয়নি 
ডালিম হোটেলের মালিকের ছেলে বাবুল কান্তি নাথ প্রসিকিউশনের তালিকাভুক্ত আসামী কিন্তু তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়নি। অথচ সে-ই হতে পারত ডালিম হোটেল কেন্দ্রিক অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। তাকে হাজির করা হলেই প্রমাণিত হত যে, ডালিম হোটেল কেন্দ্রিক মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ হাস্যকর। 
প্রদর্শিত ডকুমেন্টে দেখা যায় মতিউর রহমান ওরফে মইত্যা গু-া, ফেনীর নাসির এবং সন্দ্বীপের ফয়জুল্লাহ ডালিম হোটেল নিয়ন্ত্রণ করত। আপিল বিভাগের উচিত ছিল এ নামগুলো বিবেচনায় নেয়া। 
প্রসিকিউশন আসামীর বিরুদ্ধে সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে এবং আপিল বিভাগ স্ট্যান্ডার্ড অব প্রুভ কমিয়ে মারাত্মক ভুল করেছে। তাই মামলাটি রিভিউ হওয়া দরকার এবং আসামীকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া উচিত। 
গত ৮ মার্চ মীর কাসেম আলীর আপিল আংশিক মঞ্জুর করে তিনটি অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি এবং সাতটি অভিযোগে সাজা বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্ট। এরমধ্যে ১১ নম্বর অভিযোগে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন হত্যার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ-ের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। 
আপিলের সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়, আসামীপক্ষের আপিল আংশিক মঞ্জুর করা হলো। প্রসিকিউশন করা অভিযোগের মধ্যে ৪, ৬ ও ১২ নম্বর অভিযোগ থেকে মীর কাসেম আলীকে খালাস এবং  ২, ৩, ৭, ৯, ১০, ১১ ও ১৪ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে ট্রাইব্যুনালে দেয়া দ- বহাল রাখা হলো। এরমধ্যে ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। ১২ নম্বর অভিযোগ থেকে আপিল বিভাগ খালাস দিলেও ১১ নম্বর অভিযোগে তার মৃত্যুদ- বহাল রাখা হয়েছে।
২০১৪ সালের ২ নবেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে দু’সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-ের রায় প্রদান করেন। প্রসিকিউশনের আনীত ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে মুক্তিযোদ্ধা জসিম ও জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে হত্যার অভিযোগে তাকে এই দ- দেয় ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ১২ নম্বর অভিযোগে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে রায় প্রদান করা হয়। এ ছাড়া ২ নম্বর অভিযোগে ২০ বছর, ৩, ৪, ৬, ৭, ৯ ও ১০ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে ৭ বছর করে এবং ১৪ নম্বর অভিযোগে ১০ বছর কারাদন্ডের আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। অপরদিকে ১, ৫, ৮ ও ১৩ নম্বর অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় তাকে। ওইদিন মোট ৩৫১ পৃষ্ঠার রায়ের মধ্যে ১১ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত রায় পড়ে শোনায় ট্রাইব্যুনাল। 
একই বছরের ৩০ নবেম্বর ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদন্ডের রায় থেকে খালাস চেয়ে আপিল করেন মীর কাসেম আলী। তার পক্ষে আইনজীবীরা আপিলটি দাখিল করেন। আপিলটি পাঁচটি ভলিউমে ১৭৫০ পৃষ্ঠার। ১৫০ পৃষ্ঠার আপিলে ১৮১টি যুক্তিতে খালাস চাওয়া হয়েছিল। 
২০১২ সালের ১৭ জুন মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে ওই দিনই তাকে গ্রেফতার করে বিকেল সোয়া চারটার দিকে ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
http://goo.gl/dKZpJC