১৬ আগস্ট ২০১৭, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
এমপি লিটন হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কে কী বলেছিলেন
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার,
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ আসনের এমপি আওয়ামী লীগ নেতা মনজুরুল ইসলাম লিটনকে পরিকল্পনা করে অর্থ দিয়ে খুন করিয়েছেন একই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ডা: কাদের খান। তিনি এক বছর ধরে পরিকল্পনা করে এবং কিলারদের ছয় মাস ধরে প্রশিক্ষণ দিয়ে এ খুন করিয়েছেন। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে এমন মোটিভ উন্মোচনের তথ্য রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুখ গণমাধ্যমকে প্রেসব্রিফিংয়ের মাধ্যমে জানানোর পর এ হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দেয়া বক্তব্য নিয়ে রংপুর অঞ্চলে চলছে নানামুখী আলোচনা। 
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পর সুন্দরগঞ্জ থানায় মামলা করেন তার ছোট বোন ফাহমিদা বুলবুল কাকলী (নং১/তারিখ ০১-০১-১৭) মামলার এজহারে জামায়াত-শিবির ও স্বার্থান্বেষী মহল বলা হলেও এ হত্যাকাণ্ডটি নিয়ে স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয়ভাবে আওয়ামী লীগ নেতারা জামায়াত-শিবিরকেই দায়ী করে আসছিলেন। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও কেউ কেউ একই কথা বলছিলেন। 
হত্যাকাণ্ডের দিন ৩১ ডিসেম্বর আইজিপি বলেছিলেন, এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটন বাসায় ফেরার পর টহল পুলিশকে বিদায় করে দেন। এরপর এ খুনের ঘটনাটি ঘটেছে। এলাকাটি জামায়াত অধ্যুষিত। হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের অল্পসময়ের মধ্যে গ্রেফতার করা হবে। ওই দিন আইজিপি আরো বলেছিলেন, এলাকার সাধারণ লোক ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছেন, খুনের সাথে জামায়াত-শিবির জড়িত থাকতে পারে। সংসদ সদস্য লিটন জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। 
১ জানুয়ারি রংপুর পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে নামাজে জানাজা-পূর্ব এবং মেডিক্যাল কলেজের মর্গের সামনে বক্তব্যে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছিলেন, এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন সব সময় সুন্দরগঞ্জে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। সে কারণে তিনি সব সময় জামায়াত-শিবিরের থ্রেটের মুখে থাকতেন। তারাই এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, জামায়াত-শিবির আবারো দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে তাণ্ডব চালাচ্ছে। এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে জামায়াত-শিবির এখনো তৎপর। তাদের রুখে দিতে হবে। 
ওই দিন ওই মাঠে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাম্মেল হক এমপি বলেছিলেন, চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত। তাকে তারাই হত্যা করেছে যারা ’৭১-এ এ দেশে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। ধর্মের নামে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়েছে, তারা এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে। তিনি সুন্দরগঞ্জে এ অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সে কারণে তিনি তাদের টার্গেটে ছিলেন। তারাই তাকে হত্যা করেছে। 
একই দিনে হরতাল চলাকালে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা সুন্দরগঞ্জের বঙ্গবন্ধু চত্বরে প্রতিবাদ সভায় বলেছিলেন, জামায়াত-শিবিরের লোকজনই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তারা বহুবার তাকে আক্রমণ করেছিল। তিনি এ ঘটনার জন্য পুলিশকে দায়ী করে বলেন, জামায়াত-শিবিরের কাছ থেকে এমপির জীবনের থ্রেট থাকলেও পুলিশ তাকে সেভাবে প্রটোকল দেয়নি। তিনি সুন্দরগঞ্জ থানার ওসিকে জামায়াত-শিবিরের দোষর বলেও মন্তব্য করেন। 
২ জানুয়ারি নামাজে জানাজার আগে এমপি লিটনের বাড়ির উঠানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুখ বলেছিলেন, এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের দিকে ইঙ্গিত করেই মামলা করেছে পরিবার। ওই বিষয় নিয়ে তদন্তকার্যক্রম এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি আরো কিছু বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 
৩ জানুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আয়োজিত বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উদযাপন প্রস্তুতিসভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম বছরের প্রথম সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার। সংসদ সদস্যকে কারা হত্যা করেছে, তা সারা দেশের মানুষের জানা হয়ে গেছে। এ হত্যা জনগণের ভোটে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের বিপে পুরনো ষড়যন্ত্রেরই আরেক রূপ। জনগণের ভোটে আওয়ামী লীগকে আর পরাজিত করা যাবে না। তাই আজ ষড়যন্ত্রকারীরা চক্রান্তের চোরাগলিতে এসে গিয়েছে। গাইবান্ধায় সংসদ সদস্যকে মেরে টেস্ট কেস নিয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা। 
একই দিনে দুপুরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হাছান মাহমুদ বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, সাম্প্রদায়িক শক্তি ও জামায়াত এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আর এ অপশক্তির পৃষ্ঠপোষক বিএনপি।
এই দিন সুন্দরগঞ্জের বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল চত্বরে প্রতিবাদ সভায় সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছিলেন, খুনি যেই হোক সাত দিনের মধ্যে তাদের গ্রেফতার করতে হবে। নইলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। খুনিদের গ্রেফতার করুন। আমাদের আইন হাতে তুলে নিতে বাধ্য করবেন না। এ সময় পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আহসানুল করিম চাঁদ বলেছিলেন, জামায়াত-শিবিরের লোক পুলিশ হত্যা মামলায় জামিনে এসে মোটরসাইকেলে ঘুরে বেরিয়ে আবারো এমপি লিটনকে হত্যা করেছে। পুলিশ ২৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় টাকার বাণিজ্য করেছে। এমপি হত্যার ঘটনায় কোনো বাণিজ্য করতে দেয়া হবে না। পুলিশ ব্যর্থ হলে আমরা আওয়ামী লীগের লোকজন এমপির খুনি জামায়াত-শিবিরদের চিহ্নিত করব। 
একই সমাবেশে উপজেলা ছাত্রলীগ আহ্বায়ক ছামিউল ইসলাম ছামু বলেছিলেন, সংসদ সদস্য লিটনের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করে যদি পুলিশ খুনি জামায়াত-শিবিরকে বের করতে না পারে, তাহলে আমাদের ওপর ছেড়ে দেয়া হোক। আমরা সেই খুনি জামায়াত-শিবিরদের বের করে দেবো। 
৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদ ও উপদেষ্টা পরিষদের যৌথসভার সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মনজুরুল ইসলাম লিটনের ওপর জামায়াতের ােভ ছিল। তিনি সব সময় জামায়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। গাইবান্ধায় গোলাম আযমের সমাবেশ করতে বাধা দিয়েছিলেন। সেটাই কি তার হত্যার কারণ? স্বাধীনতার পশক্তির পে থাকার কারণেই তাকে জীবন দিতে হয়েছে। লিটনের ওপর বারবার হামলা হয়েছে। মাঝে একটা ঘটনা ঘটার পর তার কাছ থেকে লাইসেন্সকৃত অস্ত্র নিয়ে নেয়া হয়। তার পর থেকে তিনি আতঙ্কে থাকতেন সবসময় কখন তার ওপর হামলা হয়। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো, তাকে হত্যা করা হলো। 
ওই দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছিলেন, এমপিদের সরাসরি এভাবে হত্যা গত সাত-আট বছরে এটাই প্রথম। আমরা সবাই অত্যন্ত দুঃখিত। সন্দেহের তালিকা থেকে কোনো কিছুই বাদ দেয়া হচ্ছে না। সব কিছুই অ্যানালাইসিস করা হচ্ছে। এ ঘটনায় বেশ কিছুজনকে সন্দেহজনকভাবে ধরা হয়েছে। তার (লিটনের) টেলিফোন ও আশপাশের যে তথ্য আদান-প্রদান হয়েছে, সেগুলো এনে আমরা তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা করছি। এ ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক অচিরেই তাদের শনাক্ত করা হবে। সে জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে। 
ওই দিন গাইবান্ধা আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ সামুছুল ইসলাম হিরু বলেছেন, এ ঘটনাটি উগ্রবাদীরাই ঘটিয়েছে। এর আগেও ঢাকায় তার ধানমন্ডির বাসায় উগ্রবাদীরা তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। 
৯ জানুয়ারি এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের মামলার অগ্রগতিবিষয়ক প্রশ্নে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুখ তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা কিছু কু অলরেডি পেয়েছি। সবগুলো বিষয় একত্র করে কাজ করছি। এমপি লিটন সুন্দরগঞ্জে জামায়াত-শিবিরেরর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন। জামায়াত-শিবিরের বিষয়টা আমরা মাথায় রেখেছি। এ অঞ্চলে উগ্রবাদীদের একটা উৎপাত ছিল। উগ্রবাদীর বিষয়টিও মাথায় রেখেছি। এর বাইরেও ইন্টারন্যাল কিছু বিষয় আছে কি না সেগুলোও মাথায় রাখছি। বিষয়গুলো মাথায় নিয়েই তদন্তকার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। 
১০ জানুয়ারি লিটন হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক রংপুর পুলিশ হলের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, অতীতে আমাদের যে সাফল্য সেই আলোকে আমি আশাবাদী। সময় নিলেও আমরা খুনিদের শনাক্ত করতে পারব। আমরা সম্পূর্ণ নিরপে ও পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করছি। যেসব যেসব তথ্য আমাদের সামনে আসছে সব আমলে নিয়ে আমরা কাজ করছি। 
১১ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রংপুরে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, হঠাৎ করে সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত যত হত্যাকাণ্ড হয়েছে সঠিক ক্রিমিনালকে আমরা শনাক্ত করেছি। ধরেছি। লিটন হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও আমাদের গোয়েন্দারা কাজ করছেন। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীরা কাজ করেছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকজন সিনিয়র অফিসার বেশ কয়েক দিন ধরে এখানেই অবস্থান করছেন। আমরা মনে করি এটা কারা করেছে, কেন করেছে, সব কিছু উদঘাটন করে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারব। 
ওই দিন র্যা ব-১-এর অধিনায়ক তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ প্রেসব্রিফিং করে বলেছিলেন, ঢাকার বাড্ডা এলাকা থেকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমির (পশ্চিম) হাজী ইউনুসের ছেলে আশরাফুল ও তার সহযোগী জহিরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। তারা সংসদ সদস্য লিটন হত্যার ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন। তবে ঘটনার দুই দিন পর লিটনের বাড়িতে লিটনের বড় বোন আফরোজা বারী বলেছিলেন, ঘটনার সূত্র বের করতে হলে তো সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। সন্দেহ করা তো স্বাভাবিক। ‘জামায়াত’, ‘জামায়াত’ করলে তো হবে না। যদি জামায়াত হয় তাহলে তাই, আওয়ামী লীগ হলে তা-ও খুঁজে বের করতে হবে। এ ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে কি না, তা-ও খুঁজে দেখতে হবে। যদি আমি হই, আমি। এনি বডি। আমরা তার পানিশমেন্ট চাই। আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই। তিনি বলেন, প্রথমে স্মৃতির বড় ভাইকে মামলার বাদি করার কথা বলা হয়েছিল। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা বোনেরা বাদি হবো না, হলে স্মৃতি হবে। কিন্তু পরে কাকলী হলো। একবারে বাড়ি এসে মেরে যাওয়া। এটা সহ্যও করতে পাচ্ছি না। আবার কিছুটা ভয়ও পাচ্ছি। আবার ও (কাকলী) বাদি হয়েছে। ওকে আবার টার্গট করবে কি না? 
এমপির বোন ও মামলার বাদি ফাহমিদা কাকলী বলেন, আমার ভাইয়ের হত্যাকারী কে, কারা করল, সেটা আমি জানতে চাই এবং তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। এভাবে গ্রামের মধ্যে এসে হত্যা করে যাওয়া এবং সেই সুযোগটা পাওয়া সব মিলিয়ে সব অ্যাঙ্গেল থেকে পুলিশ তদন্ত করে দেখুক। প্রত্যেকটা অ্যাঙ্গেলে তারা সার্চ করুক। আসলে কী ঘটনাটা। লিটন আমার ভাই। হত্যাকারীর বিচার তো আমি চাইতেই পারি। যত দিন বেঁচে আছি। যত দিন বিচার না হয়, তত দিন বিচার চাইব।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/198100