১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
তিন বছরে ৩ শতাধিক ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত, তদন্ত হচ্ছে আন্দাজের ওপর
২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
সিলেট-আখাউড়া রেললাইনের কুলাউড়ার ভাটেরা রেলস্টেশনে গত সপ্তাহে মালবাহী ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হওয়ার পর সিলেটের সাথে সারা দেশের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এতে হাজার হাজার যাত্রী বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে। হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ অনেক যাত্রী ট্রেনের ভেতরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় কুলাউড়া জংশন থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে বগিটি সরানোর প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা পর সারা দেশের সাথে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। 
এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। গত তিন বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন শতাধিক ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ২৯২টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। তবে এসব দুর্ঘটনায় কতজন যাত্রী হতাহত হয়েছে, সে পরিসংখ্যান বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানাতে পারেনি। আর এসব দুর্ঘটনা ও বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। 
প্রত্যক্ষদর্শী ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অকপটে স্বীকার করে বলছেন, এযাবৎ রেল দুর্ঘটনা ও বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা তদন্তে গঠিত বেশির ভাগ কমিটির প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে অনেকটা আন্দাজের ওপর। কারণ উন্নত বিশ্বের মতো আধুনিক কোনো ল্যাব বা প্রযুক্তি এখনো বাংলাদেশ রেলওয়েতে নাকি যুক্ত হয়নি। তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করে এ প্রতিবেদককে বলেন, আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি রেলওয়েতে যুক্ত হয়ে যাবে। তখনই রেলওয়েতে আসবে আধুনিকতার ছোঁয়া। 
গত সপ্তাহে সিলেট কুলাউড়া ও ভৈরব এলাকায় দু’টি মালবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির কাজের অগ্রগতি জানতে তিন দিন ধরেই বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) আরিফুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তিনি টেলিফোন ধরেননি। যার কারণে তার কোনো বক্তব্য দেয়া সম্ভব হয়নি। 
তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সিলেটের কুলাউড়ায় মালবাহী ট্রেনের চাকা লাইনচ্যুত হয়। এর এক দিন আগে ভৈরব স্টেশনের অদূরে জগন্নাথপুর এলাকায় চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী মালবাহী ট্রেনের একটি বগির চারটি চাকা লাইনচ্যুত হয়। এতে ঢাকাগামী আপলাইনে প্রায় ৪ ঘণ্টা সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। ফলে ভোগান্তির শিকার হয় হাজার হাজার যাত্রী। 
বাংলাদেশ রেলওয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটি ১০ দিন পর্যন্ত সময় পায়। এ সময়ের মধ্যে তারা তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে ঢাকার বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের কাছে হস্তান্তর করেন।
গত সোমবার বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগের পরিচালক ও একই সাথে জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সৈয়দ জহুরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করে তিন বছরে কতগুলো ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়েছে জানতে চাইলে তিনি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যান তুলে ধরে এ প্রতিবেদককে বলেন, এ সময়ের মধ্যে মোট ৩১২টি ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়ে। এ সময় চাকা লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ২৯২টি। তবে তিনি ২০১৫-১৬ অর্থবছর ও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশে কয়টি ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়েছে তা জানাতে পারেননি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার জানা মতে ট্রেনের চাকা লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো যাত্রী মারা যায়নি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অপর এক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত তিন বছরে তিন শতাধিক ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। আর এসব ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি যেসব প্রতিবেদন বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছে, তার মধ্যে অনুমাননির্ভর প্রতিবেদন বেশি বলে মতামত ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম না জানিয়ে বলেন, দুর্ঘটনা ও চাকা লাইনচ্যুত হওয়ার সব প্রতিবেদন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে রয়েছে। তা ছাড়া প্রতি মাসেই অবস্থার একটি চিত্র পাঠানো হয়। 
তিন বছরে তিন শতাধিক ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়া এবং এ থেকে উত্তরণে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো: আমজাদ হোসেনের দফতরে গেলে তার পিএস সদরুল এ প্রতিবেদককে জানান, স্যার এখন ব্যস্ত। দুই দিন পর আসেন। পরে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলামের সাথে দেখা করে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনিও পরিচালক সৈয়দ জহুরুল ইসলামের সাথে দেখা করার অনুরোধ জানান।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে তার দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, আসলে বিভিন্ন কারণে বগি লাইনচ্যুত হতে পারে। লাইনচ্যুত হওয়ার অনেক ধরন আছে। কিন্তু এসব ঘটনা তদন্তে উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশে ল্যাবরেটরি টেস্ট বা এজাতীয় কিছু নেই। পুলিশ যেমন ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশের সুরতহাল করে, ঠিক আমরাও তেমনি একটা সুরতহাল বানাই। যেমনÑ কোথায় চাকা পড়ছে, কোথায় বইস্যা গেছে, কয়টা নাটবল্টু খুলছে, কয়টা চাকা পড়ছে, চাকার মাপ কী, রেলের মাপ কী এমন বিভিন্ন ধরনের বস্তু আলামত হিসেবে নেয়া হয়। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরে সবাই বসেন। এরপর তারা আলোচনা করে বের করার চেষ্টা করেন, কী জন্য দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সংশ্লিষ্ট অফিসার যারা থাকেন, তারা আন্দাজের ওপর মাপজোখ নিয়ে তারপর একটা মন্তব্য করেন যে, এর জন্যই দুর্ঘটনা বা বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। উন্নত বিশ্বে ট্রেন দুর্ঘটনার তদন্ত যেভাবে হচ্ছে সেটা এখানে হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের সব ট্র্যাক থাকে আন্ডার সেফটি এবং ট্রেন কন্ট্রোলিং সিস্টেম থাকে। এক স্টেশনে ট্রেন থাকলে তার তিন স্টেশন আগ পর্যন্ত কেন্দ্রীয়ভাবে সিগন্যালিং সিস্টেম সেটআপ থাকে এবং তারা যদি মনে করে, যে ট্রেনটা চলে যাচ্ছে সে বিপজ্জনক তাহলে সেই অপারেটর কন্ট্রোলরুমে বসেই জিপিএস সিস্টেমে বাটন টিপে ওই ইঞ্জিন অফ করে দিতে পারে। এটা হলো হাইলি ডিজিটালাইজড। আর আমাদের দেশে আন্দাজের ওপর দেইখ্যা ওই চাকার মাপজোখ নিয়া মেনুয়ালি সেটা করা হয়। কেন ট্রেনের চাকা লাইনচ্যুত হলো, সেটা জানার জন্য আসলে আমাদের কোনো ল্যাবরেটরি টেস্টিং বা প্রযুক্তি নেই। হয়তো সামনে হবে। কারণ রেল এখন সম্প্রসারিত হচ্ছে। দ্রুতগামী কোচ আসছে, ভবিষ্যতে দ্রুতগামী ইঞ্জিনও আসবে। এখন রেলওয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত চলাচল ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। 
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ল্যাবরেটরি থাকলে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ পাওয়া যেত। কিন্তু এখানে পাওয়া যায় মেনুয়ালি মাপজোখ। উপায় না থাকায় সেটা দিয়েই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, রেলের সব তদন্ত করে থাকে সরকারি নিরাপত্তা অফিসারÑ জিআইবিআর, অর্থাৎ গভর্নমেন্ট ইন্সপেক্টর অব বাংলাদেশ রেলওয়ে। সরকারের পক্ষে তিনি সব এলাকার রেললাইন, বোলিং স্টক, ক্যারেজ, ওয়াগন, সব ইঞ্জিন, সিগন্যালিং সিস্টেমসহ যা কিছু আছে সব কিছুর সেফটি সার্টিফাইড করেন। এর জন্য তার কাছে আবেদন করতে হয়। আবেদন করলে তিনি ইন্সপেকশন করে অনুমোদন দেন। সেটিও মাপজোখ করে মেনুয়ালি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এখন কিছু কিছু জায়গায় কম্পিউটার-ভিত্তিক ইন্টারলক সিস্টেম বসানো হয়েছে। সেখানে আউটার সিগন্যালে যখন একটি ট্রেন ঢোকে তখন সেটার টাইম রেকর্ড হয়ে যায়। এখন স্টেশন এরিয়াতে এক্সিডেন্ট হলে কত গতিতে ওই ট্রেনটি গেছে, সেটা আমরা পরিমাপ করতে পারি। 
আন্দাজের ওপর দুর্ঘটনার তদন্ত হচ্ছেÑ এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গতকাল বিকেলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/197867