২০ অক্টোবর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
পানির জন্য হাহাকার
২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
 নদীমাতৃক বাংলাদেশে ফাল্গুনের শুরুতেই পানির জন্য হাহাকার পড়েছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভারত অভিন্ন নদীগুলোর পানি অন্যায়ভাবে প্রত্যাহার করে নেয়ায় দেশের নদ-নদীগুলো হয়ে গেছে পানিশূন্য। চৈত্র না আসতেই দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ হেক্টর কৃষি জমি ফেটে চৌচির। খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষক সেচের পানির জন্য চোখের পানি ফেলছে। পানির অভাবে এবার মুহুরী সেচ প্রকল্প, মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প, জিকে সেচ প্রকল্প, রাজশাহী সেচ প্রকল্প, তিস্তা সেচ প্রকল্পের সিংহভাগ জমি সেচের আওতায় নেয়া সম্ভব হয়নি। যা দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাধ্য হয়েই কিছু সেচ প্রকল্পে রেশনিং করে পানি দেয়া হচ্ছে। সর্বত্রই পানির জন্য চলছে কৃষকদের হাহাকার। নদীর পানি ভাগ-বাটোয়ারার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঠিত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক বন্ধ ৭ বছর। ড. মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঢাকায় তিস্তা চুক্তি করার জন্য এলেও এখনো ঝুলে আছে সে চুক্তি। জেআরসির বৈঠকের অনাগ্রহের কৌশলে ভারত পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-তিস্তার উজানে পানি উঠিয়ে নিচ্ছে। উজানে নদ-নদীর পানি তুলে নেয়ায় ৩০ বছরের গঙ্গা চুক্তি কার্যত কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়াটা বাংলাদেশের অধিকার। আর ফারাক্কার পানির ন্যায্য হিস্যা না দেয়াটা ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
পরিবেশগত কারণে চৈত্র মাসে দেশের নদ-নদী, খাল-বিল সবকিছুই শুকিয়ে যায়। ফাল্গুনের শুরুতেই যে ভয়াবহ অবস্থা তাতে বৃষ্টির দেখা না মিললে এবার বোরো আবাদ মার খাবে। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা হারাবে, যা দেশের অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, কৃষক জমিতে ঠিকমতো সেচের পানি না পেলে চলতি বোরো মৌসুমে ফসলের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, চৈত্রের প্রচন্ড তাপদাহে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই শঙ্কা জানানো হয়েছে কৃষি অধিদফতর থেকেও। আর যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) থেকে বলা হচ্ছে- বৃষ্টিপাত না হলে পানি নিয়ে ভোগান্তি কমবে না। বরং অনেকাংশে বাড়বে। 
এদিকে, ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তি মোতাবেক যে পরিমাণ পানি বাংলাদেশকে দেয়া হচ্ছে সেখানেও শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান। ২০ বছর আগে প্রখ্যাত বামনেতা জ্যোতি বসুর মধ্যস্থতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এস ডি দেবগৌড়া ৩০ বছরের গঙ্গা চুক্তি করেন। চুক্তির পর থেকেই বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার মতে, চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা থাকলেও পানি মাপার পদ্ধতি এবং যেসব স্থানে পানি মাপা হয় সেখানে এদেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিত না থাকাটা পানির প্রকৃত পরিমাপকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। চলতি শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকেই পানির পরিমাপ নিয়ে আবারও বিতর্ক শুরু হয়েছে। এছাড়াও গঙ্গা চুক্তির ইন্ডিকেটিভ সিডিউল অনুযায়ী বাংলাদেশকে যে পরিমাণ পানি দেয়ার কথা সে পরিমাণ পানিও দেয়া হচ্ছে না। দেশে পানি বিশেষজ্ঞরা একে চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলেই মনে করছেন।
এদিকে, তিস্তায় পানির প্রবাহ এই শুষ্ক মৌসুমে এতটাই কমে গেছে যে, গতকাল সোমবার পানির সর্বনিম্ন প্রবাহ ছিল ৪শ’ কিউসেক। এই প্রবাহ আরো কমে যেতে পারে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়ায় কর্মরত নির্বাহী প্রকৌশলী জানান। তার মতে, তিস্তা সেচ প্রকল্পে পানির অভাবে আবাদি জমির পরিমাণ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। সরকার তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে ভারতের সাথে সব ধরনের আলোচনাই চালিয়ে গেছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কারণে এই তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি। স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে, ডালিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী পানির যে চিত্র তুলে ধরেছেন বাস্তবে পানির পরিমাণ আরো কম। পদ্মার হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে অসংখ্য চর পড়েছে। যমুনা ব্রিজের আশপাশে চর এবং তিস্তার কাউনিয়া ব্রিজের নিচে নদী দিয়ে হেঁটে মানুষ যাতায়াত করছে। পানির অভাবে কৃষক দিশেহারা, কৃষকের কান্না শোনার যেন কেউ নেই!
এ ব্যাপারে ইতঃপূর্বে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী বলেছেন, তিস্তা চুক্তি সই নিয়ে খসড়া তৈরি করেছে বাংলাদেশ সরকার। তাই এ বিষয়ে নতুন করে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বসতে আগ্রহী নয় বাংলাদেশ। তিনি আরো বলেন, তিস্তা চুক্তি সই নিয়ে বল এখন ভারতের কোর্টে। তিনি বলেন, ওই খসড়ার ভিত্তিতেই দ্রুত চুক্তি সই হবে বলে আমরা আশা করছি।
এদিকে বছরের পর বছর পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে দেশের নদ-নদীগুলো। বিশেষ করে, শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের দুই শতাধিক নদী, শাখা-নদী, উপ-নদী ও সহস্রাধিক বিল ভরাট হয়ে আবাদি জমিতে পরিণত হচ্ছে। এতে নদী-বিলনির্ভর প্রায় পাঁচ লাখ হেক্টর বোরোর জমিতে সেচ সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বিল-নদী শুকিয়ে যাওয়ায় বিলুপ্তির পথে এ অঞ্চলের দেশীয় প্রজাতির মাছ। 
মৎস্য বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের এক সময়ের খড়¯্রােতা নন্দকুজা, ভদ্রাবতী, সরস্বতী, ইছামতি, গুমানী, আত্রাই, গুড়নদী, করতোয়া, ফুলঝোর, তুলসী, চেঁচুয়া, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গা, ঝরঝরিয়া, কাকন, কানেশ্বরী, মুক্তাহার, কাকেশ্বরী, সুতিখালি, গোহালা, গাড়াদহ, স্বতী, ভেটেশ্বর, ধরলা, দুধকুমার, সানিয়াজান, তিস্তা, ঘাঘট, ছোটযমুনা, নীলকুমার, বাঙ্গালী, বড়াই, মানস, কুমলাই, সোনাভরা, হলহলিয়া, জিঞ্জিরাম, বুড়িতিস্তা, যমুনেশ্বরী, মহানন্দা, টাঙ্গান, কুমারী, রতœাই, পুনর্ভবা, ত্রিমোহনী, তালমা, ঢেপা, কুরুম, কুলফি, বালাম, ভেরসা, ঘোড়ামারা, মালদহ, চারালকাঁটা, পিছলাসহ দুই শতাধিক নদী, শাখা-নদী ও উপ-নদী ন্যব্য হারিয়ে মরা নদীতে রূপান্তরিত হয়েছে।
আর পানির অভাবে এক সময়ের প্রমত্তা খরস্রোতা যমুনা নদী এখন তার নাব্য হারিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। যমুনার শাখা-নদী ধলেশ্বরী এখন মানুষ হেঁটে হেঁটেই পার হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমের শুরু থেকেই কচ্ছপের পিঠের মতো অসংখ্য ছোট-বড় ডুবোচর জেগে উঠেছে। বহুমুখী বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর ১০ নম্বর পিলার থেকে ২০ নম্বর পিলার পর্যন্ত পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। সেখানে ইরি-বোরো চাষ করছে কৃষকেরা। আবার গোড়ালি পরিমাণ পানিতে নতুন চর জেগে ওঠার সাথে সাথেই হালচাষ ছাড়াই কৃষকেরা পিঁয়াজ, মিষ্টি আলুসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি রোপণ করছে। অতিরিক্ত পলি জমায় সেচ ও সার ছাড়াই অধিক ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। 
অপরদিকে পানিশূন্য হয়ে পড়ায় যমুনা নদীর জেলেরা বিপাকে পড়েছে। জেলে পরিবার কর্মশূন্য হওয়ায় বর্তমানে তাদের দুর্দিন চলছে। যমুনা শাখা নদীতে নৌকা না চলায় সংশ্লিষ্ট মাঝি-মাল্লারা হাপিত্যেশ করছে। সিরাজগঞ্জ, জগন্নাথগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ-টাঙ্গাইল, ভূয়াপুর, টাঙ্গাইল-বেলকুচি নৌপথে পানিবাহী যান চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও কোথাও নৌ-রুট বন্ধ হয়ে গেছে। আবার কোথাও অনেক পথ ঘুরে চর পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে নৌযান। সিরাজগঞ্জের যমুনার কাছে অভ্যন্তরীণ শাখা নদীগুলোর পারাপার বন্ধ হয়ে গেছে। 
চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা কেন পাচ্ছে না- বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় লিখিতভাবে দিল্লির কাছে জানতেও চেয়েছে। কিন্তু এর কোনো জবাব মেলেনি। বরং চলতি শুষ্ক মৌসুমে পর্যায়ক্রমে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে আরো অধিক হারে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ। এই দুরবস্থা নিরসনে পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জেআরসির মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। কিন্তু এই বৈঠক কবে অনুষ্ঠিত হতে পারে তার দিনক্ষণ তিনি জানেন না। 
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে ভারতের ইচ্ছার ওপর। এই কর্মকর্তার মতে, ভারতকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তবে তারা বলছেন, ফারাক্কা পয়েন্টে পানি কম পাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি শুরু হলে পানি বাড়বে। এই কর্মকর্তার মতে, গঙ্গা চুক্তির ধারায় বলা আছে- ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ কমে গেলে উভয় দেশ মিলে পানির প্রবাহ বাড়ানোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কিন্তু ভারত এ বিষয়টি সব সময়ই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। 
এ ব্যাপারে দেশের পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় ৭ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে জেআরসির মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক। মূলত এই বৈঠকের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে অভিন্ন নদীর পানি সমস্যা সমাধানের বিষয়টি। বিশেষ করে জেআরসি’র বৈঠক না বসার অর্থ তিস্তা চুক্তি নিয়ে কালক্ষেপণ করা। এই চুক্তি না থাকার কারণে তিস্তার নাব্য সঙ্কট মারাত্মক রূপ নিয়েছে। তাদের বক্তব্য, ভারত কৌশলে জেআরসি বৈঠক না করে ইচ্ছামতো পানি তুলে নিচ্ছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে দু’দেশের পানি সমস্যার সমাধান না হলে সমুদ্র মামলার মতো অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার সময় এসেছে। কারণ আন্তর্জাতিক নদীর পানির ভাগ-বাটোয়ারা আইন রয়েছে। আইনের আশ্রয় না নেয়ায় পানি সমস্যার সমাধান সম্পূর্ণ নির্ভর করছে ভারতের ইচ্ছার ওপর। ভারতের ইচ্ছার ওপর বাংলাদেশ নির্ভরশীল হতে পারে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষির পর্যাপ্ত পানি সমস্যার সমাধান করতে না পারলে শুধু পরিবেশ বিপর্যয় নয়; অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশ। জেআরসির মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে পানি সঙ্কটের সুরাহা না হলে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়া ছাড়া বাংলাদেশের গতন্তর নেই।
- See more at: http://www.dailyinqilab.com/article/65641/%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0#sthash.oy3xaiWV.dpuf