১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
নিরপেক্ষদের দলীয় ভাবা ঠিক নয় , সুশাসন
২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
ইকতেদার আহমেদ :
 
প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে সাংবিধানিক পদধারীসহ অসামরিক ও সামরিক ব্যক্তিরা রয়েছেন। সাংবিধানিক পদধারীদের একটি বড় অংশ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত, আবার একটি অংশ প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত প্রতিটি ব্যক্তির বেতন, ভাতা ও সুযোগ-সুবিধাদি জনগণ দেয় কর থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সংরক্ষিত অর্থের মাধ্যমে নির্বাহ করা হয়। 
প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত সাংবিধানিক পদধারীদের মধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যতীত অন্য সবাই শপথের অধীন। শপথধারী এসব ব্যক্তিকে শপথ গ্রহণকালীন অপরাপর বিষয়ের পাশাপাশি বলতে হয়Ñ ‘তারা সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করবেন এবং ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সকলের প্রতি আইনানুযায়ী যথাবিহীত আচরণ করবেন অথবা তাদের কর্তব্য পালনকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হতে দিবেন না অথবা তাদের সরকারি কার্য ও সরকারি সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হতে দিবেন না।’ 
প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত প্রতিটি ব্যক্তিসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সংবিধান ও আইন মেনে চলা আবশ্যিক কর্তব্য। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত প্রতিটি ব্যক্তির জন্য জনগণের নিঃস্বার্থ সেবাদান কর্তব্য। নিঃস্বার্থ সেবার সাথে সততা, বিশ্বস্ততা ও আন্তরিকতা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কোনো কার্য সমাধা করলে তা সম্পূর্ণরূপে নিঃস্বার্থ সেবার পরিপন্থী। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত অনেককে প্রায়ই দেখা যায় স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিজ আত্মীয় অথবা নিজ দলীয় ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ, পদোন্নতি বা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন। আবার এমনও দেখা যায়, অর্থ বা দ্রব্যসামগ্রী দ্বারা বশীভূত হয়ে নির্ধারিত যোগ্যতাকে উপেক্ষা ও অবজ্ঞাপূর্বক নিয়োগ, পদোন্নতি বা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন।
স্বজনপ্রীতি দুর্নীতির সমার্থক। স্বজনপ্রীতিতে লিপ্ত ব্যক্তির পক্ষে যেমন নিঃস্বার্থ সেবা দেয়া সম্ভব নয় অনুরূপ দুর্নীতিতে নিমগ্ন ব্যক্তির পক্ষেও নিঃস্বার্থ সেবা দেয়া সম্ভব নয়। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় নিয়োগ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদধারী কর্তৃক অনুরুদ্ধ হয়ে নিয়মনীতির ব্যত্যয়ে উচ্চ পদলাভের আশায় নিয়োগ ও পদোন্নতির কার্য সমাধা করে থাকেন। 
প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত নির্বাচিত সাংবিধানিক পদধারীদের জন্য নির্বাচন-পরবর্তী কে তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করল এবং কে তাদের ভোট দেয়নি সেটি গৌণ, মুখ্য হলো নির্বাচন-পরবর্তী তারা সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার সব জনগণের প্রতিনিধি। সাংবিধানিক পদধারী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ তার মন্ত্রিবর্গ পদে আসীন পরবর্তী দেশের সব জনগণের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী। এরূপ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের কাছ থেকে দেশের সাধারণ জনমানুষ সবসময় নিঃস্বার্থ সেবা প্রত্যাশা করে। 
সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের দাফতরিক কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিরা পদভেদে যোগ্যতানুযায়ী নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণের মাধ্যমে কর্মে প্রবেশ করেন। এসব পদধারীর পদোন্নতির ক্ষেত্রে একমাত্র বিবেচ্য হলো জ্যেষ্ঠতা, সততা, যোগ্যতা ও দক্ষতা। প্রজাতন্ত্রের সামরিক কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও অন্যথা হওয়ার কথা নয়। 
বিগত প্রায় দুই দশক ধরে দেখা যাচ্ছে জ্যেষ্ঠতা, সততা, যোগ্যতা ও দক্ষতার চেয়ে বিশেষ বিবেচনায় নিয়োগ, পদোন্নতি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কার্য সমাধা করা হচ্ছে। এ বিশেষ বিবেচনার মধ্যে যে বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে তা হলো, দলীয় সুবিধাভোগী ও দলীয় মতাদর্শী। অনেকের মনে প্রশ্ন দলীয় সুবিধাভোগী অথবা দলীয় মতাদর্শী কারা? এ বিষয়ে বিজ্ঞজনের সুচিন্তিত অভিমতÑ সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে দলীয় সুবিধাভোগী হিসেবে তারা অভিহিত যাদের অবসর-পরবর্তী বিশেষ বিবেচনায় সমমর্যাদাসম্পন্ন পদে অথবা কোনো মেয়াদি পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। আর দলীয় মতাদর্শী হলো তারা, যারা জ্যেষ্ঠ না হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিবেচনায় উচ্চ ও গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। তা ছাড়া দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি সত্ত্বেও যেসব কর্মকর্তা শুধু রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে অবাধে দুর্নীতি করার পরও পদপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনো বাধার সম্মুখীন হন না, এরাও দলীয় মতাদর্শীর অন্তর্ভুক্ত।
মেয়াদি পদের মধ্যে কিছু সাংবিধানিক এবং সংবিধিবদ্ধ সংস্থার পদ অন্তর্ভুক্ত। সাংবিধানিক মেয়াদি পদসমূহের মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার, মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং সরকারি কর্ম কমিশনের সভাপতি ও সদস্য। সংবিধিবদ্ধ সংস্থার মেয়াদি পদের মধ্যে অন্যতম হলো জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রভৃতি। উপরি উক্ত মেয়াদি পদগুলোতে সচরাচর অসামরিক ও সামরিক পদ থেকে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে দেখা যায়। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য নিরপেক্ষতা, সততা, দক্ষতা ও যোগ্যতা হলেও যে কোনো কারণেই হোক, দেখা যায় এগুলোকে পাশ কাটিয়ে দলীয় সুবিধাভোগী অথবা দলীয় মতাদর্শী অথবা দুর্নীতিগ্রস্তদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। 
পৃথিবীর সর্বত্র রাজনীতি বিভাজিত হলেও সরকারের অসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা এবং পেশাজীবীরা বিভাজিত নয়। বিগত কয়েক বছর যাবৎ অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ করা যাচ্ছে আমাদের প্রজাতন্ত্রের সব শ্রেণীর আমলা ও সাংবিধানিক পদধারীদের অনেকে এবং পেশাজীবীদের একটি বড় অংশ দলীয় মতাদর্শী। এসব দলীয় মতাদর্শী যখন যে সরকার ক্ষমতায় সে সরকারের আনুকূল্যে দেখা যায় কাক্সিক্ষত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও জ্যেষ্ঠদের বঞ্চিত করে পদ বাগিয়ে নিচ্ছেন।
এদের মধ্যে যেসব কর্মকর্তা এবং পেশাজীবীদের মধ্যে যারা দলীয় মতাদর্শী নয় তারা বাস্তব অর্থেই নিরপেক্ষ। অসামরিক ও সামরিক এবং পেশাজীবীদের মধ্যে নিরপেক্ষরা খুব কমই দলীয় সরকার কর্তৃক মূল্যায়িত হয়। এদের মূল্যায়িত না হওয়ার পেছনে যে কারণ তার মূলে রয়েছে এদের দ্বারা দলীয় সরকারের স্বার্থসিদ্ধি সম্ভব নয়। নিরপেক্ষরা সচরাচর দেখা যায়, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও আদর্শবানের পাশাপাশি সততা ও নীতিনৈতিকতার বলে বলীয়ান। শত প্রতিকূলতা অথবা প্রলোভনের মাঝেও এদের স্বীয় আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে দেখা যায় না। 
বিভিন্ন সাংবিধানিক ও মেয়াদি পদে যখনই নিয়োগের প্রশ্ন দেখা দেয় তখন দেখা যায় দলীয় সুবিধাভোগী অথবা দলীয় মতাদর্শী অথবা দুর্নীতিগ্রস্তরা বিভিন্ন অযোগ্যতার কালিমায় আবৃত থাকা সত্ত্বেও দলীয় সরকার অথবা দলীয় সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিসমষ্টি কর্তৃক দেশবাসীর চোখে ধুলো দেয়ার মানসে প্রকৃত অর্থেই যারা নিরপেক্ষ তাদের ওপর দলীয় আবরণ লেপনে নিয়োগ দেয়া হতে নিষ্কৃতির প্রয়াস নেন। আর এতে করে অবশ্যম্ভাবীভাবে যাদের নিয়োগ লাভ ঘটে, তাদের আর যা হোক নিরপেক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস কখনো জনমানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। 
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান ও 
রাজনীতি বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/197535