১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
যেভাবে বেওয়ারিশ হচ্ছে লাশ
২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, সোমবার,
একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ ঘর থেকে বের হলেন। যাবেন কোনো কাজের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা খুনের শিকার হয়ে মৃত্যু হলো তার। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায়ই পেলেন না উদ্ধারকারীরা। মরদেহ গেল সরকারি হাসপাতাল মর্গে। লাশের সুরতহাল করলো পুলিশ। করা হলো ময়নাতদন্তও। পুলিশ নানাভাবে পরিচিতি জানার চেষ্টা করলো। থানায় টানানো হলো ছবি। পাঠানো হলো অন্য থানায়ও। মর্গে কয়েকদিন ধরে রাখা হলো লাশ। তারপরও এলো না কোনো স্বজন। হলো না শনাক্ত। অজানাই রয়ে গেল পরিচয়। এমন অবস্থায় মরদেহকে ঘোষণা করা হয় বেওয়ারিশ। অর্থাৎ যার কোনো ওয়ারিশ নেই। এরপর লাশ তুলে দেয়া হয় আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের হাতে। প্রিয়জনদের অজ্ঞাতে দাফন হলো লাশ। এ লাশের বর্ণনা ও ছবি প্রকাশ করা হয় পুলিশের ওয়েবসাইটে (সিডিএমএস-ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম)। ওই লাশের ছবি ও বর্ণনা দিয়ে তিন মাস পর পর সিআইডি গেজেটও প্রকাশ করে। কিন্তু তাতেও অধিকাংশ বেওয়ারিশ লাশের
পরিচয় শনাক্ত হয় না।   এভাবে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো স্থানে একাধিক বেওয়ারিশ লাশের দাফন হচ্ছে। সেই সঙ্গে মাটি চাপা পড়ছে মৃত্যুর রহস্যও। প্রিয়জনরা জানতেও পারছে না তাদের নিখোঁজ স্বজন বেঁচে আছে না মারা গেছে? ফলে স্বজন হারানোর শূন্যতার হাহাকার নিয়েই তারা পার করছে দিনের পর দিন। বছরের পর বছর।
ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, আসলে নিজ থেকে যোগাযোগ করতে না পারলে আমরা এক প্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। আর কেউ অপরিচিত কোনো স্থানে মারা গেলে তো কথাই নেই। কোনো সূত্র পাওয়া না গেলে স্বজনরা শনাক্ত না করা পর্যন্ত লাশ বেওয়ারিশ রয়ে যায়। তাই সবার নিজের ছবি, পরিচিতি, ঠিকানা বা মোবাইল নম্বর লিখে নিজের পকেটে রাখা উচিত। আর পুলিশ বেওয়ারিশ লাশ পেলে তার বর্ণনা ওয়াকিটকিতে ঘোষণা দেয়, ছবি তুলে বিভিন্ন থানায় পাঠানো হয়, একই সঙ্গে ওয়েবসাইট ও গেজেটে প্রকাশের পাশাপাশি লাশ শনাক্ত করার জন্য মর্গে তিন দিন রাখা হয়। তারপর আঞ্জুমানে দেয়া হয়।
দ্রুত লাশের পরিচয় শনাক্তে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের তথ্য ভাণ্ডারে সংরক্ষিত জাতীয় পরিচয়পত্রের ফিঙ্গার প্রিন্ট পুলিশ ব্যবহার করতে পারলে এ ক্ষেত্রে সাফল্য পাওয়া যাবে। পুলিশ এই সুবিধা পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। তবে লাশের পরিচয় শনাক্তে অবহেলা নেই। যা যা করা প্রয়োজন পুলিশ তা করছে।
একইভাবে প্রতিবছর সারা দেশে সহস্রাধিক লাশের দাফন হচ্ছে বেওয়ারিশ হিসেবে। গত ২৬শে আগস্ট সকাল। রাজধানীর শাপলা চত্বর এলাকা। গুরুতর আহত অবস্থায় আনুমানিক ৩৫ বছরের এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করে র্যাব-৩। নিয়ে যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ৫ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। এর আগে নিজের পরিচয়ও জানাতে পারেন নি সেই হতভাগা। পরে শাহবাগ থানা পুলিশ সুরতহাল করে। ঢামেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা করেন ময়নাতদন্ত। পুলিশ যথারীতি পরিচয় জানার চেষ্টা করে। প্রায় একমাস হিমঘরে রাখা হয় লাশ। অবশেষে বেওয়ারিশ হিসেবে লাশের দাফন করে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম। এভাবে প্রতি বছর কেবল ঢামেক হাসপাতালেই শনাক্ত হচ্ছে না শতাধিক লাশের পরিচয়। এর আগে গত ১৩ই সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় আনুমানিক ২৬ বছরের এক যুবক। তার পরিচয় ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে জানা সম্ভব ছিল। কিন্তু তা ছাড়াই শাহবাগ থানা পুলিশের সুরতহাল ও ফরেনসিক বিভাগের ময়নাতদন্তের পর দাফন হয়েছে বেওয়ারিশ হিসেবে। গত ৪ঠা ও ১০ই সেপ্টেম্বর আনুমানিক ৩০ ও ৩৫ বছরের দু’পুরুষ লাশের সুরতহাল করলেও পরিচয় শনাক্ত হয়নি। গত ২৫শে সেপ্টেম্বর আনুমানিক ৩০ ও ৪০ বছরের আরো দু’পুরুষ ও মহিলার সুরতহালের পর পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি একই থানা পুলিশ। গত সেপ্টেম্বরে ঢামেক হাসপাতাল মর্গে আসা এক নারীসহ ১২ লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ, ছুরিকাঘাত ও মাথায় আঘাতে খুনের শিকার হয়েছে এক নারীসহ ৩ জন। ৫ জন নিহত হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। একজন বিষপানে। দু’জনের মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে আনার আগে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ঢামেক হাসপাতালে আসা ও সেখান থেকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া লাশের সংখ্যা ১০৮। এরমধ্যে জানুয়ারিতে ১৬, ফেব্রুয়ারিতে ৭, মার্চে ১১, এপ্রিলে ৯, মে’তে ১৩, জুনে ১৮, জুলাইয়ে ১১, আগস্টে ১৮ ও সেপ্টেম্বরে ১২ লাশের পরিচয় জানা যায়নি। ওই ১০৮ বেওয়ারিশ লাশের মধ্যে ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। গুলিবিদ্ধ ও ছুরিকাহত হয়ে ২ জন করে ৪ জন এবং মাথায়সহ শরীরে আঘাতে হত্যা করা হয়েছে আরো ৭ জনকে। বিষপানে মারা গেছে ১৫ জন। হাসপাতালে আনার আগেই মৃত্যুবরণ করেছে ২১ জন। এছাড়া ট্রেন দুর্ঘটনায় ১ জনসহ কয়েকটি কারণে অপর ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। খুনের শিকার হওয়া অন্তত ৯ জনের পরিচয় জানা না যাওয়ায় উদ্ঘাটন হয়নি হত্যা রহস্যও।
এদিকে রাজধানীর শাহবাগ থানার হিসাবে দেখা গেছে, গত বছরের আগস্টে এক নারীসহ ৯ লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এরমধ্যে বিষক্রিয়ায় ৩ ও সড়ক দুর্ঘটনায় দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৫শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ নারীসহ আরো ৫ জনের পরিচয় শনাক্তেও ব্যর্থ হয়েছে একই থানা। বেওয়ারিশ হিসেবে থানা পুলিশ সুরতহাল সম্পন্ন করে। ময়নাতদন্ত করে ফরেনসিক বিভাগ। তারপর আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়। কেবল ঢামেক হাসপাতাল বা রাজধানীর শাহবাগ থানা নয়। সারা দেশের সব হাসপাতাল ও থানার চিত্র প্রায় অভিন্ন। পরিচয় শনাক্তে ফিঙ্গার প্রিন্টসহ যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে গতানুগতিক ও দায়সারাভাবে সারছে এই স্পর্শকাতর গুরুত্বপূর্ণ কাজটি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা হাসপাতাল মর্গেও ঘটছে একই অবহেলা। দেশের ৬৪ জেলার প্রায় সব থানায় একই কারণে পরিচয় শনাক্ত ছাড়াই দাফন হচ্ছে লাশ। আবার বেওয়ারিশ লাশের মধ্য থেকে অক্ষত বেশকিছু লাশ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। লাশ বা কংকাল দু’ভাবেই বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে ঠাঁই মিলছে।
এদিকে গত ২৬শে জুলাই রাজধানীর কল্যাণপুরে পুলিশি হামলায় ৯ জঙ্গি নিহত হয়েছিল। তখন সবার পরিচয়ই অজ্ঞাত ছিল। বেওয়ারিশ লাশগুলো নেয়া হয়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে। ওই দিনই নিহতদের ফিঙ্গার প্রিন্ট নির্বাচন কমিশনের তথ্য ভাণ্ডারে সংরক্ষিত জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে মিলানো হয়। তাৎক্ষণাৎ বেরিয়ে আসে ৭ জঙ্গির পরিচয়। পরে আরো একজনের পরিচয়। স্বল্প সময়ের মধ্যে এই সমস্যার কিনারা করতে সমর্থ হয় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ বেওয়ারিশ লাশের ছবি তোলে বোর্ডে টানায়। সুরতহাল করে। নিজেদের প্রচলিত ব্যবস্থায় থানায় থানায় প্রচারও করে। কিন্তু পুলিশের বর্তমান প্রচলিত ব্যবস্থায় অধিকাংশ বেওয়ারিশ লাশের পরিচয় জানা যাচ্ছে না। গত বছর কল্যাণপুরের ৭ জঙ্গির লাশ ফিঙ্গার প্রিন্ট মিলিয়ে শনাক্ত হয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির এই সুবিধাটি কাজে লাগানো হলে অন্তত ৭০ ভাগ বেওয়ারিশ লাশের পরিচয় জানা সম্ভব। তবে বিকৃত লাশের পরিচয় এভাবে জানা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন ডিএনএ টেস্ট। টেস্টের পর সংরক্ষিত লাশের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে স্বজনদের ডিএনএ মিলিয়ে দেখে বহু বছর পরও পরিচয় জানা যাবে। স্বজনরা জানতে পারবে লাশ কোথায় দাফন হয়েছে। এ দুই উপায়ে অন্তত ৮০ ভাগ বেওয়ারিশ লাশের পরিচয় বেরিয়ে আসতে পারে।
সিআইডির ক্রিমিনাল ইন্টিলিজেন্স ব্যুরোর (সিআইবি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, লাশের পরিচয় শনাক্তে পুলিশের বর্তমান গতানুগতিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ফিঙ্গার প্রিন্ট মেলানো ও জনসম্পৃক্ত প্রচারণায় এ সমস্যা দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব।
http://www.mzamin.com/article.php?mzamin=54342