২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
মিয়ানমারে তাণ্ডব অব্যাহত: খাদ্য ও চিকিৎসা সংকটে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল
২ ডিসেম্বর ২০১৬, শুক্রবার,
মিয়ানমারের হাতিপাড়ায় সেনা তাণ্ডবকালে বসতবাড়ি ছেড়ে পালায় শিশু-নারী-পুরুষ। ছবি : সংগৃহীত
মিয়ানমারের রাখাইনে (আরাকান) সেনাবাহিনীর তাণ্ডব থামছে না। সেনা বর্বরতার শিকার হয়ে মরছে রোহিঙ্গারা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাদ্য সংকট। ধর্ষিতা ও আহতরা পাচ্ছে না চিকিৎসা ও ওষুধ। বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে মানুষগুলো। সব মিলিয়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত জনপদ বিশেষ করে মংডু যেন একখণ্ড নরকে পরিণত হয়েছে। সেনা সদস্যদের গুলিতে একের পর এক মৃত্যুর পাশাপাশি পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে ঘরবাড়ি। ঘরপোড়া আশ্রয়হীন নারী-শিশুরা খোলা আকাশের নিচে কোনোমতে জীবন ধারণ করে আছে। আর রাতের অন্ধকারে শিশুদের কোলে নিয়ে মায়েরা লুকিয়ে থাকছেন জঙ্গলে।
সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে হোয়াইক্যংয়ের খোয়াংখালী এলাকার একটি পাড়ায় সেনারা আক্রমণ চালায়। তারা পুরুষদের না পেয়ে নারীদের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। পরে নারীদের ঘরের বাইরে নিয়ে এক স্থানে জড়ো করে বিবস্ত্র করে বসিয়ে রাখে। আর যাওয়ার সময় পরেরবার এসে পুরুষদের না পেলে ওই সব নারীর ওপর অত্যাচার চালানোর হুমকি দিয়ে যায়।
এদিকে সেনাবাহিনীর এই নৃশংসতা-বর্বরতার খবর বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার বিষয়টিকে ভালোভাবে দেখছে না মিয়ানমার সরকার। সেনা তাণ্ডবের খবর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এপারে আসছে ধারণা করে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে বিদ্যুত্ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া শুরু করেছে সেনা সদস্যরা। উদ্দেশ্য, নির্যাতিতরা মোবাইল ফোনসেটের ব্যাটারি যেন চার্জ দিতে না পারে।
মংডুতে অবস্থানরত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বেশ কয়েকজন কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্যের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদক গত সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত ওপারের রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বিশেষ ব্যবস্থায় নিবিড় যোগাযোগ রাখেন। পাশাপাশি এপারে অনুপ্রবেশকারীদের কাছ থেকেও অভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তারা প্রায় অভিন্ন সুরে ‘নরকের’ লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়।
মিয়ানমারে অবস্থানরত একটি এনজিওর ভিন্ন দেশের কর্মী কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘১০ বছর ধরে মংডুতে বেসরকারি সংস্থায় (এনজিও) কাজ করছি। এমন হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা অতীতে দেখিনি। ওখানে মিয়ানমার সরকারের বাহিনী রীতিমতো গণহত্যা চালাচ্ছে। আর সেখানে এনজিও কর্মীদের কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। তাদের মংডু থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।’
স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করা এই এনজিওকর্মী বলেন, ‘মংডুতে এখন স্বাস্থ্যসেবা বলে কিছু নেই। সরকারি চিকিৎসকরা রোহিঙ্গাদের ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা দেন না। স্থানীয় চিকিৎসকরাও সরঞ্জামের অভাবে চিকিৎসাসেবা দিতে পারছেন না।’ এনজিও সংস্থাটির স্থানীয় প্রতিনিধির বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘সেনারা রোহিঙ্গাদের ঘর পোড়ানোর পাশাপাশি খাদ্য নষ্ট কিংবা লুট করে নিচ্ছে। ফলে ঝোপ-জঙ্গলে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়ে জীবন রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে। ওখানে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। গুলিতে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট। দ্রুত চিকিৎসা ও খাদ্যের জোগান দেওয়া না গেলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা অনাহার ও বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে।’
মংডুর আরেক বাসিন্দা ‘নরকের’ বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমার চোখের সামনে হাতিপাড়ার ঘরগুলোতে আগুন দেওয়া হলো। আমি কিছু দূরে গিয়ে প্রাণে রক্ষা পেয়েছি। পুরুষদের মধ্যে যাদের ধরতে পেরেছে তাদের অনেককে হত্যা করা হয়েছে, অনেককে বেঁধে নিয়ে গেছে। যুবতীদের ধরে প্রকাশ্যে গণধর্ষণ করেছে। মা-মেয়ে বাছবিচার নেই। একের পর এক গ্রাম ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। ধর্ষিতার রক্তের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ, ছুরিকাহত কিংবা মৃত বাবা-ভাইয়ের রক্ত একই ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। মংডু একখণ্ড নরক। এই নরকের বর্ণনা বলে বোঝানো অসম্ভব।’
ভিডিও ফুটেজে নরকের চিত্র : কালের কণ্ঠ’র কাছে থাকা কয়েকটি ভিডিও ফুটেজে মংডুসহ কয়েকটি এলাকায় সেনা তাণ্ডবের নারকীয় দৃশ্য দেখা গেছে। একটি ফুটেজে দেখা যায়, পুড়িয়ে দেওয়া একটি ঘরে পড়ে আছে পাঁচটি দগ্ধ মরদেহ। পাশেই পাঁচ-ছয়টি গরু দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের চারপাশের গাছের  পাতাগুলোও পুড়ে গেছে। অন্য একটি ঘরে পোড়া সাইকেলসহ বিভিন্ন সরঞ্জামের স্তূপ। ভিন্ন একটি ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, তিনটি পোড়া কংকালের মধ্যে একটি কংকালের মাথার অংশ ছুঁয়ে কান্না করছেন এক বৃদ্ধা।
সোমবার রাতে ধারণ করা একটি ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, জঙ্গলে অনেক নারী-শিশু লুকিয়ে আছে। অনেক নারীর কোলে অবুঝ শিশুরা কান্না করছে। সেখানকার বাসিন্দারা বলছে, রাতের অন্ধকারে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পাড়া আক্রমণ করে। তারপর পুরুষদের হত্যা এবং নারীদের নির্যাতন করে। এই ভয়ে তারা জঙ্গলে লুকিয়ে আছে।
মংডুর এক গৃহবধূ জানান, সেনারা ঘরে প্রবেশ করে নারীদের ধর্ষণ করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যে ঘরে সুন্দরী তরুণী আছে সেই ঘরেই সেনারা প্রবেশ করছে। একজনের পর একজন সেনা তরুণীর ঘরে যাচ্ছে। আর ঘর থেকে ভেসে আসছে ধর্ষিতার কান্না।
অন্য একটি ভিডিও ফুটেজে এক বৃদ্ধাকে বলতে শোনা যায়, তাঁর এক মেয়ের নাম সুন্দরবাশি। সেনারা ওই নারীকে হাত বেঁধে ‘জুলুম’ করেছে। পাড়ার সবাইকে ঘিরে রেখে আগুন দিয়েছে। আহত সুন্দরবাশিকে তিনি টেনেহিঁচড়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মিলিটারি (সেনাবাহিনী) তাড়ানোর কারণে তা আর সম্ভব হয়নি।
বুধবার রাতে মংডুর এক তরুণী জানান, তিনি একাধিক সেনা সদস্য দ্বারা পাশবিকতার শিকার হয়েছেন। তাঁদের পাড়ায় সেনারা হানা দেওয়ার পর তাঁকে ঘরের একটি কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। চিকিৎসার প্রয়োজনে তিনি এখন বাংলাদেশে পার হওয়ার চেষ্টা করছেন।
মংডু থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী এক মা গত বুধবার কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে জানান, তাঁর চার মেয়ে ও তিন ছেলেসন্তান। স্বামী আগেই মারা গেছেন। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তাদের সংসারে নাতি আছে। সেনারা তাঁর এক সন্তান ও মেয়ে জামাইকে গুলি করে হত্যা করেছে এবং দুই মেয়েকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করেছে।
টেকনাফের লেদা অনিবন্ধিত ক্যাম্পের চেয়ারম্যান দুদু মিয়া জানান, সেনা নৃশংসতায় গত সোমবার থেকে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। নারীদের এক স্থানে জড়ো করে বিবস্ত্র অবস্থায় বসিয়ে রাখা হচ্ছে। চলছে প্রকাশ্য ধর্ষণ। এমন নারকীয়তায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গারা। সবশেষে তিনি বলেন, ‘মংডু এখন নরক। সেই নরকের দৃশ্য বিশ্ববিবেক দেখছে না। লাশের গন্ধ আর ধর্ষিতার আর্তনাদ বিশ্ববিবেকের কাছে পৌঁছে না।’
http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2016/12/02/436071