১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
প্রাণ যায় সেন্টমার্টিনের
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, রবিবার,
সেন্টমার্টিন পেঁৗছে দ্বীপের দক্ষিণপাড়ে ঘুরতে গিয়ে চোখে পড়ল একটি কাছিমকে ঘিরে অনেক মানুষের জটলা। সেখানে একটি বড় কাছিম মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। কাছিমটির শরীরে আঘাতের চিহ্ন। আরেকটু সামনে এগোতেই দেখা যায়, মৃত তিনটি কাছিমকে নিয়ে টানাটানি করছে কুকুর। স্থানীয় ব্যবসায়ী ফরিদ উদ্দিন বলেন, \'পাড়ে ডিম পাড়তে এসে কুকুরের আক্রমণে প্রতিদিন পাঁচ-ছয়টি কাছিম মারা যাচ্ছে। কুকুর কাছিমের ডিম এবং বাচ্চাও খেয়ে ফেলছে।\' তিনি বলেন, \'রাতে হোটেল, মোটেল ও দোকানের আলো এবং পর্যটকের জ্বালানো আগুন সামুদ্রিক কাছিমের আগমনে বাধা সৃষ্টি করে।\'
 
স্থানীয় বাসিন্দা আমির হোসেন বলেন, \'তিন শতাধিক জেলে নৌকার জালে প্রতিদিন একটি করে কাছিম আটকা পড়লেও এর সংখ্যা দাঁড়ায় দৈনিক অন্তত তিনশ\'। জালে আটকেপড়া কাছিম জেলেরা পিটিয়ে মেরে ফেলছে।\'
 
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের
 
সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবিব বলেন, সেন্টমার্টিনে পাঁচ ধরনের কাছিম আছে। কাছিম সমুদ্রের ময়লা-আবর্জনা খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। কাছিম হত্যা বন্ধ না হলে সামুদ্রিক পরিবেশ বিপন্ন হবে। 
 
দ্বীপের গলাচিপা গ্রামে ২০০৬ সালে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং গবেষণার জন্য ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মেরিন পার্ক বাস্তবায়ন করে পরিবেশ অধিদপ্তর। চারদিকে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আবদ্ধ পার্কের সাইনবোর্ডে লেখা \'সামুদ্রিক কাছিম সংরক্ষণ কার্যক্রম (পর্যবেক্ষণ ও হ্যাচারি)\'। ভেতরে গিয়ে দেখা যায় কাছিম ভরে রাখার বহু ঝুড়িও, নেই শুধু কাছিম। ২০১০ সাল পর্যন্ত পার্কটির যথেষ্ট তদারকিও থাকলেও এখন করুণ দশা। চুরি হয়ে যাচ্ছ পার্কের মূল্যবান সামগ্রী। 
 
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, সেন্টমার্টিন সাগরে ১০৩টি প্রজাতির অনেকগুলোই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পর্যটকের অবাধ চলাচলের কারণে কাঁকড়ার প্রজনন কমে গেছে। অপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন এবং যত্রতত্র আবর্জনা ফেলে পানি ও মাটিদূষণের কারণে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে প্রবাল আহরণ নিষিদ্ধ। কিন্তু কে শোনে কার কথা, অবাধে প্রবাল আহরণ চলছেই। নিষিদ্ধ প্রবাল এখন দ্বীপবাসীর হাতে হাতে, ফেরি করে বিক্রিও হচ্ছে।
 
দ্বীপের উত্তর পাশে এখানকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বশির আহমেদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি হতাশ কণ্ঠে বলেন, \'কয়েক বছর আগেও এই দ্বীপ কেয়া বাগান, নারিকেল বাগান, নিশিন্দা বাগানসহ অন্যান্য গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ ছিল। ঘন জঙ্গলে ছিল বিচিত্র সব প্রাণী। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় সব হারিয়ে যাচ্ছে। দ্বীপ নিয়েই চলছে এক ধরনের ব্যবসা। দ্বীপের প্রাণ এখন যায় যায় করছে।\'
 
সেন্টমার্টিন ঘুরে বশির আহমেদের কথার প্রমাণ পাওয়া গেল। প্রায় আড়াইশ\' বছর আগের ঐতিহ্যের এ দ্বীপের পদে পদে ক্ষতচিহ্ন। পুরো দ্বীপ হুমকি হয়ে উঠেছে পর্যটকের অতিরিক্ত চাপে। কখনও যা দাঁড়ায় ধারণক্ষমতার দ্বিগুণে। ফলে ভারসাম্য হারাচ্ছে এখানকার পরিবেশ। স্থানীয় হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, অব্যবস্থাপনা, অসতর্কতা, অসচেতনতা এবং নীতিমালা না থাকায় বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে দ্বীপের নিরেট সৌন্দর্য।
 
স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এ দ্বীপে ১০ হাজার মানুষের বাস। তার ওপর পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার পর্যটক দ্বীপে যাচ্ছেন। যত না মানুষ তার চেয়ে বেশি রিসোর্ট। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হেঁটে পুরো সেন্টমার্টিন প্রদক্ষিণ করে মুহূর্তে মুহূর্তে চোখে পড়ছে বাড়িঘরের আধিক্য আর ব্যাঙের ছাতার মতো শতাধিক রিসোর্ট, হোটেল ও কটেজ। দ্বীপের ভারসাম্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখেই অপরিকল্পিতভাবে ইট-পাথরের দালান গড়ে উঠেছে। উঁচু ভবন নির্মাণের জন্য প্রবাল খুঁড়ে মাটি বের করা হচ্ছে। অবাধে আহরণ হচ্ছে শামুক-ঝিনুক-পাথর। সৈকতসংলগ্ন এলাকায় হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট ও দোকান নির্মাণের জন্য কেয়াবন ও ঝোপঝাড় ধ্বংস করা হচ্ছে। হোটেলে চলা জেনারেটরের আওয়াজে দ্বীপে চলছে শব্দদূষণ। পরিবেশ সুরক্ষায় জেটি এলাকায় দু-একটি প্রচারণামূলক বিলবোর্ড থাকলেও নেই কোনো কার্যকর তদারকি। যে যেভাবে পারছেন, দ্বীপে ঘুরছেন। পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণহীন। মানুষের অতিরিক্ত চাপে পানি ও পরিবেশদূষণে হুমকিতে দ্বীপের প্রায় ৬৮ প্রজাতির প্রবাল।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, সেন্টমার্টিনে এভাবে মানুষ-বসতি আর পর্যটক বাড়তে থাকলে হারিয়ে যাবে সেন্টমার্টিন।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদুল হাসান বলেন, \'পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে কত সংখ্যক পর্যটক একটি এলাকায় গ্রহণ করা যায়, সেই পরিমাপ পদ্ধতিতে (ট্যুরিজম ক্যারিং ক্যাপাসিটি_টিসিসি) হিসাব করলে সেন্টমার্টিন এখন ঝুঁকিতে আছে। দিনে কত লোক সেন্টমার্টিন যাবেন, এটা হিসাব করার সময় এসেছে। খুব বেশি হলে দিনে আড়াই হাজার ট্যুরিস্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।
 
পর্যটন করপোরেশনের ন্যাশনাল হোটেল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ পারভেজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ভুটান যেভাবে সংরক্ষিত (রেস্ট্রিকটেড ট্যুরিজম) নিয়মে পর্যটন করে, আমাদেরও সংরক্ষণ নিয়ম অনুসরণ করা উচিত। ম্যাস ট্যুরিজম (সবার জন্য উন্মুক্ত) সেন্টমার্টিনের বড় ক্ষতিসাধন করছে বলে মত দেন তিনি।
 
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, পর্যটকের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে দ্বীপটির পানির স্তর ক্রমান্বয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ৭০ শতাংশ নলকূপের পানি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। দ্বীপের পশ্চিম ও উত্তর দিকে বেড়িবাঁধের মতো বালুর উঁচু টিলাগুলো এখন একটিও নেই। গত এক বছরের মধ্যে সামুদ্রিক জোয়ারের পানিতে এসব টিলা মিশে গেছে। দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ সৈকতে পাথর আহরণ করে তৈরি হচ্ছে হোটেল, মোটেলসহ নানা অবকাঠামো। স্থলভাগের জমি খুঁড়েও তোলা হচ্ছে পাথর। 
 
পর্যটকের প্রধান আকর্ষণ বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি \'সমুদ্রবিলাস\'। সে বাড়ির সামনে গড়ে উঠেছে চা-পান, ডাব, শামুক-ঝিনুক আর শুঁটকির দোকান। এতে পর্যটক বিব্রত এবং হতাশ হচ্ছেন। 
 
মানুষের ক্রমাগত তৎপরতার ফলে প্রকৃতি এখন যেন \'প্রতিশোধ\' নিতে শুরু করেছে। সেন্টমার্টিনের দক্ষিণাংশ ও উত্তরাংশ সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে দ্বীপের আয়তন। বর্ষা এলেই ভাঙনের ভয়ে দ্বীপের মানুষ আতঙ্কে থাকেন। সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর আহমদ বলেন, \'ইট, সিমেন্ট, লোহাসহ সব ভারী বস্তু ওঠায় দ্রুতই সেন্টমার্টিন কংক্রিটের দ্বীপে পরিণত হচ্ছে।\'
 
দ্বীপের সুরক্ষায় প্রতিবেশগত সীমানার অন্তর্ভুক্ত এলাকাটি সুরক্ষিত করার ওপর জোর দেন সেভ আওয়ার সি ও সেন্টমার্টিনের প্রতিবেশগত সীমানা নির্ধারণী গবেষণা দলের প্রধান গবেষক আলিফা বিনতে হক। তিনি বলেন, \'বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে পর্যটন এলাকা, জাহাজ চলাচলের সীমানা, স্থানীয় অধিবাসীদের ব্যবহার ও মাছ ধরার অঞ্চলগুলো সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া উচিত।\'
 
চারপাশে সেন্টমার্টিনকে ঘিরে রাখা সাগরেও চলছে নানা দূষণ। দ্বীপে যাওয়ার পথে যাত্রীবাহী জাহাজের চারপাশে উড়তে থাকা অসংখ্য পাখি নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। এসব পাখিকে চিপসজাতীয় খাবার ছুড়তে থাকেন পর্যটকরা। এসব খাবার পাখির জন্য কতটুকু উপযুক্ত? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজেদা বেগম বলেন, এসব খাবার পাখির স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ ধরনের খাবার ভক্ষণের কারণে পাখির স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হয় এবং তাদের পাকস্থলীতে পচন ধরে।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/02/19/271342#sthash.eL8vgDJw.dpuf