১৯ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
দাম কমছে না কমছে সেবা
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শনিবার,
ব্যান্ডউইথের দাম কমলেও গ্রাহক পর্যায়ে কমছে না ইন্টারনেটের দাম। সেবার মানও দিনের পর দিন নিম্নমুখী হচ্ছে। ধাপে ধাপে মধ্যস্বত্বভোগী ও উচ্চ করকেই গ্রাহক পর্যায়ে কম মূল্যে ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বিদ্যমান ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক মানসম্মত না হওয়ার কারণেও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হচ্ছে। থ্রিজি সেবায় বেতার তরঙ্গ ব্যবহারে প্রযুক্তি নিরপেক্ষ নীতি না থাকায় মোবাইল ইন্টারনেটেও মানসম্পন্ন সেবা মিলছে না। মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছেন না।
 
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র ফেলো আবু সাঈদ খান সমকালকে বলেন, সুলভ মূল্যে ইন্টারনেট সেবা দিতে সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগ নেই। সার্বিক ট্রান্সমিশন অবকাঠামো দুর্বল হওয়ায় সেবা মানসম্পন্ন হচ্ছে না। আবার ট্রান্সমিশন সেবার বিভিন্ন পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগী তৈরি ও উচ্চ করের কারণে গ্রাহকরা বেশি দাম দিয়েও ভালো মানের সেবা পাচ্ছেন না। অবস্থার উত্তরণে বিটিসিএলের পরিবর্তে সাবমেরিন কেবল কোম্পানির অধীনেই সারাদেশে ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক থাকা উচিত। 
 
বিটিআরসির সচিব ও মুখপাত্র সারওয়ার আলম বলেন, ইন্টারনেটের দাম কমাতে কস্প মডেলিং করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক টেলিকম ইউনিয়নের একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শও নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বেতার তরঙ্গ ব্যবহারে প্রযুক্তি নিরপেক্ষ নীতি বাস্তবায়নের বিষয়েও বিটিআরসি পরিকল্পনা নিয়েছে। সার্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 
 
\'অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ\' :বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহিদ স্মার্টফোনে হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে তার এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলেন। বাসে করে বনানী থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে তিনবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর পুনঃসংযোগ করতে হলো। কথা বলার সময় বারবার এ ধরনের বাধায় তিনি প্রচণ্ড বিরক্ত। এক পর্যায়ে \'ফালতু
 
সার্ভিস\' বলে উচ্চস্বরেই চিৎকার করে উঠলেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, \'গত তিন মাসে তিন অপারেটরের ইন্টারনেট প্যাকেজ ব্যবহার করেছি। সবগুলোর ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ।\' বাসায় ওয়াইম্যাক্স মডেম ব্যবহার করেন খিলক্ষেত এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী ওমর ফারুক। তিনি বলেন, নেটওয়ার্কের চিহ্ন পূর্ণ সমক্ষতার দেখালেও বাস্তবে ব্রাউজিংয়ের ক্ষেত্রে একটি পাতা খুলতে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সময় লাগছে। গতি ধীর হওয়ায় এমনটি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ঝামেলা হচ্ছে আপলোডের ক্ষেত্রে। এক মেগাবাইটের ফাইল মেইলে আপলোড করতে পাঁচ থেকে ছয়বার চেষ্টা করতে হয়। ওয়াইম্যাক্সের হেলপলাইনে ফোন করেও সমাধান পাওয়া যায় না। শুধু নাহিদ কিংবা ওমর ফারুকেরই নয়; ইন্টারনেট ব্যবহারে এমন খারাপ অভিজ্ঞতা অধিকাংশ গ্রাহকেরই। কমবেশি সব গ্রাহকের প্রশ্ন-থ্রিজি সেবা চালুর এতদিন পরও ঢাকা শহরে মোবাইল ইন্টারনেট সেবার মান এত খারাপ কেন। 
 
এ বিষয়ে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব টিআই এম নুরুল কবীর বলেন, প্রযুক্তিনিরপেক্ষ নীতিতে বেতার তরঙ্গ ব্যবহারের সুযোগ না পেলে অপারেটররা থ্রিজি সেবার মান উন্নত করতে পারবে না। কারণ থ্রিজির জন্য নির্ধারিত ২১০০ মেগাহার্টজে বেতার তরঙ্গের যে সীমবদ্ধতা রয়েছে, তা টুজির জন্য নির্ধারিত ১৮০০ কিংবা ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে সমন্বয় করে ব্যবহারের সুযোগ নেই। সমন্বয়ের সুযোগ থাকলে থ্রিজি সেবার মান উন্নত করা যাবে। ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির সভাপতি আব্দুল হাকিম বলেন, এনটিটিএন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি সেবার মান যথাযথ নয়। এ কারণে সেবার মানও ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বিটিসিএলের ফাইবার অপটিক কেবল কাটা পড়লে তা ঠিক করতে অনেক সময় নেওয়া হয়। সাপ্তাহিক কিংবা অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে জরুরি প্রয়োজনেও বিটিসিএলের কোনো সেবা পাওয়া যায় না। 
 
ব্যান্ডউইথের দামে শুভঙ্করের ফাঁকি :অনুসন্ধানে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের শুরু থেকে প্রতি এমবিপিএস ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম ধাপে ধাপে প্রায় এক লাখ টাকা থেকে মাত্র ৬২৫ টাকায় নেমে এসেছে। পাইকারি বাজারে ব্যান্ডউইথের দাম নগণ্য হলেও সাধারণ গ্রাহকরা এর কোনো সুফল পাননি। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, ৬২৫ টাকা প্রতি এমবিপিএস মূল্য শুধু দশ হাজার এমবিপিএস বা দশ জিবিপিএস স্তরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ১০০ এমবিপিএস থেকে ৯৯৯ এমবিপিএস স্তর পর্যন্ত প্যাকেজ মূল্য প্রতি এমবিপিএস ৯০০ টাকা, ১০০০ এমবিপিএস থেকে দুই হাজার ৪৯৯ এমবিপিএস পর্যন্ত প্রাত এমবিপিএসের মূল্য ৮২৫ টাকা, দুই হাজার ৫০০ এমবিপিএস থেকে ৪ হাজার ৯৯৯ এমবিপিএস পর্যন্ত মূল্য ৭৫৫ টাকা এবং পাঁচ হাজার এমবিপিএস থেকে ৯ হাজার ৯৯৯ এমবিপিএস পর্যন্ত মূল্য ৬৮০ টাকা। দেখা যায়, দশ জিবিপিএস বা তার বেশি পরিমাণ ব্যান্ডউইথ দেশীয় কোনো ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান কিনছে না। তারা কিনছে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের প্যাকেজ। ফলে ৬২৫ টাকার সুবিধা বাস্তবে ব্যান্ডউইথ আমদানির ক্ষেত্রে ভারত পাচ্ছে। কারণ একমাত্র ভারতই বিএসসিসিএলেও কাছ থেকে দশ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ কিনছে। 
 
এ বিষয়ে আইএসপিএবির সভাপতি আব্দুল হাকিম জানান, বিএসসিসিএলের কাছ থেকে প্রতি ব্যান্ডউইথ কেনার পর এক দফা কর যোগ হয়। এরপর এনটিটিএন অপারেটরদের প্রতি এমবিপিএসে ৭০০ টাকা হারে দিতে হয়; এ পর্যায়েও কর যোগ হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য পরিচালনা ব্যয় যোগ হয়ে গ্রাহক পর্যন্ত প্রতি এমবিপিএসের মূল্য দুই হাজার টাকা বা তার বেশি পড়ছে। 
 
প্যাকেজ মূল্যেও ফাঁকি :আইএসপি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ব্রডব্যান্ডের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারে একজন গ্রাহকের খরচ পড়ে এখন গড়ে এক হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকা। প্রতি এমবিপিএসের দাম যখন ২০ হাজার টাকার ওপরে ছিল, তখন সাধারণ গ্রাহকের ক্ষেত্রে ওই মূল্য ছিল দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা। অন্যদিকে ২০১০ সালের দিকে মোবাইল ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে এক জিবি ডাটার মূল্য ছিল গড়ে ৩৭৫ থেকে চারশ\' টাকা। এখন বেসরকারি মোবাইল অপারেটরদের ক্ষেত্রে তা ২০৯ থেকে ২২৪ টাকায় নেমে এসেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি টেলিটক ১৮০ টাকায় এক জিবি ডাটার নতুন প্যাকেজ চালু করেছে। তবে তাও মূল্যের প্রকৃত চিত্র নয়। কারণ এ সময়ে মোবাইল ইন্টারনেট সেবায় সরকারের করের হার বেড়েছে। আগে যেখানে ১৫ শতাংশ ছিল, এখন আরও একাধিক ধরনের কর বাড়িয়ে তা হয়েছে ২১ শতাংশ। ফলে গ্রাহক এক জিবি ডাটা কিনতে ব্যয় করছেন ২৫৩ টাকা। 
 
গ্রাহকরা জানান, অপারেটরদের বিভিন্ন মেগাবাইটেরও প্যাকেজ আছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যয় হয় আরও বেশি। একটি মোবাইল অপারেটরের ৬০ মেগাবাইট প্যাকেজের দাম ২২ টাকা। প্যাকেজটির মেয়াদ মাত্র তিন দিন। গ্রাহক যদি তিন দিন অন্তর প্যাকেজটি এক মাসে ১০ বার নেন, তাহলে তার দাম পড়বে করসহ ২৬৬ টাকা ২০ পয়সা। অর্থাৎ কম ডাটার প্যাকেজ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে কৌশলে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। বিটিআরসির হিসাবে, বর্তমানে প্রায় ছয় কোটি ৭০ লাখ ইন্টারনেট গ্রাহকের মধ্যে ছয় কোটি ৩০ লাখই মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক। 
 
অ্যামটবের মহাসচিব নুরুল কবীর বলেন, গ্রাহক খোলা চোখে দেখছেন-মোবাইল অপারেটররা ইন্টারনেটের দাম কমাচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবে একটি অপারেটরকে আইআইজি কিংবা আইএসপি অপারেটরের কাছ থেকে ব্যান্ডউইথ কিনে গ্রাহকের কাছে পেঁৗছে দিতে আরও চার-পাঁচ ধাপে বাড়তি মূল্য ও কর দিতে হচ্ছে। তাদের এনটিটিএন অপারেটরকে মূল্য দিতে হয়, ব্যাকহোলের জন্য মূল্য দিতে হয়। প্রতিটি ধাপে কর যুক্ত হয়ে মূল্য আরও বেড়ে যায়। আবার গ্রাহক যখন প্যাকেজ কিনছেন তাকেও কর দিতে হচ্ছে। ফলে অপারেটররা চাইলেই দাম কমাতে পারছে না। গ্রাহক পর্যায়ে কর কমাতে একাধিকবার অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিবছরই নতুন নতুন খাতে কর যোগ হচ্ছে। করের বোঝা কমলে ইন্টারনেট ব্যবহারও বাড়বে।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/02/18/271031#sthash.dLGHXVE2.dpuf