২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ড: ল্যাপটপের খোঁজে পাঁচ বছর পার; ‘ছিঁচকে চোর’ আসামি হলে চার্জশিট মানবে না নিহতের পরিবার * ১৫৭টি ধার্য তারিখ পার হলেও প্রতিবেদন দেয়নি র্যাব
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শনিবার,
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যা মামলার তদন্ত কাজ ৫ বছরেও শেষ করতে পারেনি আইনশৃংখলা বাহিনী। পুলিশ, গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের (ডিবি) পর বর্তমানে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) তদন্তেও তেমন কোনো ফল মেলেনি। মামলার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এ পর্যন্ত আদালতের ১৫৭টি ধার্য তারিখ পার হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার এ মামলার প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। এদিনও র্যাব তা দাখিল করতে না পারায় আদালত ২১ মার্চ তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ‘তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন’ দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। আলামত, স্বজন ও সন্দেহভাজনদের ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট যুক্তরাষ্ট্র থেকে র্যাবের হাতে এলেও উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। এখন শুধু নিহতের খোয়া যাওয়া মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ চালু করা হলেই গ্রেফতার হতে পারে খুনিরা। দীর্ঘদিনেও এ মামলার তদন্ত সম্পন্ন না হওয়ায় নিহতের পরিবার এবং গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা ও সিনিয়র কর্মকর্তাদের পরামর্শের পর মামলার ‘প্রতিবেদন’ দাখিলের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। তবে ‘ছিঁচকে চোর, ডাকাত কিংবা ছিনতাইকারীকে’ আসামি করে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেয়া হলে তা গ্রহণ করবে না বলে জানিয়েছে নিহতের পরিবার।
জানতে চাইলে সাগরের মা সালেহা মনির যুগান্তরকে বলেন, ‘এ মামলার তদন্ত তো হয়েই গেছে। ঘটনার পরপরই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতারের কথা বলেছিলেন। মূলত ওই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তদন্ত শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এটা (তদন্ত প্রতিবেদন) কেন প্রকাশ করছে না, কোথায় গিট্টু লেগে আছে- আমি তা বুঝতে পারছি না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি স্পষ্ট করে আমি জানিয়ে দিতে চাই। কখনও যদি এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। আর সেখানে যদি ‘ছিঁচকে চোর, ডাকাত কিংবা ছিনতাইকারীকে’ আসামি করা হয়। তাহলে আমি কখনও ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করব না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা কোনো চুরি না, ডাকাতিও না। চুরি হলে তারা নির্বিঘেœ পালিয়ে যেত। আর চোর-ডাকাত হলে তারা অস্ত্র নিয়ে আসত। রাজনৈতিক ব্যাপার হলে তারাও অস্ত্র নিয়ে আসত। আর সাগর-রুনীকে মারার যদি ইচ্ছাই থাকত তাহলে রাস্তাঘাটেই মারতে পারত। কিন্তু ঘরে কেন? যতই মহড়া দেয়া হোক না কেন, এত ছোট জায়গা দিয়ে গ্রিল কেটে চোর ঢুকবে- তা আমি বিশ্বাস করি না। এটা সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।’ সাগরের মা আরও বলেন, ‘সাগরের খুনিকে না দেখে আমি সাগরের কবর জিয়ারত করতে যাব না। গত ৫ বছরেও আমি সাগরের কবর জিয়ারত করতে যাইনি। ইনশাআল্লাহ, আমি সাগর-রুনীর খুনিকে দেখব তারপর আমার সাগরের কবর জিয়ারত করব।’
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক গোলাম মোস্তফা সারোয়ার ওরফে সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন নাহার রুনা ওরফে মেহেরুন রুনী দম্পতি। ঘটনার পরের দিন রুনীর ভাই নওশের আলম রোমান রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. জহুরুল ইসলাম এ মামলার তদন্ত শুরু করেন। ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ডিবি উত্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. রবিউল আলম এ মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন। এরপর সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের এক রিট পিটিশনে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল এ মামলার তদন্তভার র্যাবের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়। ১৯ এপ্রিল র্যাব সদর দফতরের সিনিয়র পুলিশ সুপার মো. জাফর উল্লাহ মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন। র্যাবের এ কর্মকর্তা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ায় ২০১৪ সালের ১২ মার্চ এ মামলার তদন্তভার পান র্যাব সদর দফতরের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. ওয়ারেছ আলী মিয়া। নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি এ কর্মকর্তা মামলার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাগর-রুনীর ছেলে মাহির সরোয়ার মেঘকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার জবানবন্দি ১৬১ ধারায় লিপিবদ্ধ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসামি ও সন্দেহভাজনদের ডিএনএ পরীক্ষা করে এনে ওই প্রতিবেদন বিস্তারিত পর্যালোচনা করে তদন্ত করেন। এরপর ২০১৫ সালের মাঝামাঝি র্যাব সদর দফতরের সহকারী পরিচালক সহকারী পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন আহম্মদ এ মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন। তিনি আগের সাক্ষীদের পর্যালোচনা করে তদন্ত অব্যাহত রাখেন। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডে তদন্তের দায়িত্বে থাকা র্যাব এ পর্যন্ত আটজনকে গ্রেফতার করেছে। এদের মধ্যে ছয়জন কারাগারে ও দু’জন জামিনে আছেন।
আদালত সূত্র জানায়, তদন্তের ৫ বছর সময়ে র্যাব এ মামলার চারটি তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেছে। প্রথমে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর, এরপর ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ও ৭ জুন এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর আদালতে তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। দাখিল করা তদন্ত অগ্রগতি সংক্রান্ত প্রতিটি প্রতিবেদনে প্রায় একই ধরনের তথ্য লেখা রয়েছে।
সর্বশেষ দাখিল করা তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঘটনাস্থল থেকে চুরি যাওয়া ল্যাপটপ বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে কিনা- এ ব্যাপারে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি দেয়া হয়েছে। বর্তমানে ল্যাপটপ ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। চুরি করা ল্যাপটপ কখনও ব্যবহার করা হলে তার তথ্য পাওয়া যেতে পারে।’
তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘মামলার ভিকটিম (সাগর-রুনী) মিডিয়াকর্মী হওয়ায় তদন্তকালে ইলেকট্রুনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তদন্ত করা হচ্ছে।’
এদিকে সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত অগ্রগতি সম্পর্কে জানা নেই বলে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র্যাব সদর দফতরের সহকারী পরিচালক সহকারী পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিএনএ পরীক্ষার সব রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এসব ব্যাপারে কিছু নির্দেশনা আছে- সে অনুসারে তদন্ত চলছে। বিভিন্ন গ্রিলকাটা চোরদের তথ্য সংগ্রহ ও তা পর্যালোচনাও করা হচ্ছে। এছাড়া খোয়া যাওয়া ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন যদি কখনও অন করা হয় তাহলে আমরা তার লোকেশন জানতে পারব এবং খুনিদের ধরতে সক্ষম হব। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই গ্রহণ করা হয়েছে।’ কবে নাগাদ এ মামলার প্রতিবেদন দাখিল করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আদালত ইতিমধ্যেই তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ নিয়েছেন। ২১ মার্চ এ মামলার অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’ ওই দিনই মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হবে কিনা জানতে চাইলে র্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘তদন্ত একদম চূড়ান্ত হয়েছে তা বলা যাচ্ছে না। বিভিন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা ও সিনিয়রদের পরামর্শের পর এ বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।’
http://www.jugantor.com/last-page/2017/02/11/100073/%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%9F%E0%A6%AA%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%96%E0%A7%87%E0%A6%BE%E0%A6%81%E0%A6%9C%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%81%E0%A6%9A-%E0%A6%AC%E0%A6%9B%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0