২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
বিনিয়োগ স্থবিরতায় পাঁচ বছরে আমানতের সুদ হার কমেছে ৯ শতাংশের বেশি!
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শনিবার,
বিনিয়োগ স্থবিরতায় আমানতের সুদ হার কমছে। এতে করে আমানতকারীরা ভোগ বিলাস আর অনুৎপাদনশীল কাজে টাকা বেশি ব্যয় করছে। ব্যাংকগুলোতে পড়ে আছে অলস টাকা। ঋণের সুদ হার কমিয়ে কোনো কাজ হয়নি। যেখানে ২০১২ সালে আমানতের সুদ হার ছিল ১৪ শতাংশ সেখানে বর্তমানে তা ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এ হিসেবে গত ৫ বছরে আমানতের সুদ হার কমেছে ৯ শতাংশেরও বেশি। এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারল্য সংকট না থাকাতে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে আমানতের সুদ হার কামাচ্ছেন। যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করছে।
সাম্প্রতিক ভোগ বিলাস আর অনুৎপাদনশীল কাজে মানুষের ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গত মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানতের সুদ হার না কমাতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয়।
সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ‘সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, ব্যাংকগুলোর আমানতের ওপর সুদ/মুনাফার হার ঋণের সুদ/মুনাফার হারের চেয়ে দ্রততর হ্রাস পেয়ে অনেক ক্ষেত্রে তা ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
আমানতের ওপর সুদ/মুনাফার হার অত্যধিক হ্রাস সঞ্চয় প্রবণতাকে ক্ষতুœ করছে এবং সঞ্চয়ের বদলে অপচয়মূলক ভোগ ও অন্যান্য অনুৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের প্রবণতার ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে দায় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করে সুদের হার না কমানোর নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এর পরিপ্রেক্ষিতে আমানতের ওপর সুদ/মুনাফা হারের নিম্নগামী প্রবণতা রোধের বিষয়ে সক্রিয় থাকার পরামর্শ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঋণের সুদ/মুনাফার হার নিম্নগামী ধারায় রাখার জন্য ইন্টারমিডিয়েশন স্প্রেড সংকোচন করতে হবে খেলাপী ঋণ আদায়সহ ব্যবস্থাপনা দক্ষতার বিভিন্ন দিকে নজর রেখে, আমানতের সুদ/মুনাফার হার সংকোচন করে নয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংকগুলাতে গ্রাহকদের আমানতের সুদের হার কমতে কমতে বর্তমানে ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। কোনো কোনো ব্যাংকে আমানতের সুদ হার ৫ শতাংশের নিচে। এ লভ্যাংশ থেকে আবার ভ্যাট কেটে রাখা হয়।
২০১২ সালে আমানতের উপর সুদ ছিল সাড়ে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৫ শতাংশের নিচে। এ হিসেবে গত পাঁচ বছরেই আমানতের সুদ হার কমেছে ৯ শতাংশের বেশি। আর এতে করে আমানতকারীরা ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু তার পরেও ব্যাংকগুলোতে অলস টাকার পাহাড়। 
২০১৩ সালে ছিল আমানতের গড় সুদের হার ছিল ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। বর্তমানের তার নেমে দাঁড়িয়েছে ৫ শতাংশের নিচে। আমানতে কমালেও ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে সুদ আগের চেয়ে বেশিই নিচ্ছে। সর্বনিম্ন সাড়ে ১১ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ হারে সুদ নিয়ে ঋণ দিচ্ছে তারা। 
 দেশের ব্যাংক খাতে এখন অতিরিক্ত তারল্য আছে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি। কয়েক বছর ধরে অলস টাকার এই পরিমাণ বেড়েই চলেছে।
আক্ষরিক অর্থেই টাকা নিয়ে বসে আছে ব্যাংক। কিন্তু ঋণ নিচ্ছেন না শিল্পোদ্যোক্তারা। বাড়ছে না বেসরকারি খাতের ঋণ নেয়ার হার। দেশে নতুন বিনিয়োগ তেমন হচ্ছে না। এর ফলে ব্যাংকে বাড়ছে অলস টাকার পরিমাণ। দেশে না করলেও উদ্যোক্তারা এখন বিনিয়োগের জন্য দেশের বাইরে যেতে চাচ্ছেন।
অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, অর্থনীতির গতি বাড়লে ব্যাংকের হাতে অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত তারল্য থাকে না। অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, দেশের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিয়েছে তা হয়তো বলা যাবে না, তবে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। গতি কমেছে অর্থনীতির। তারই প্রমাণ হচ্ছে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অলস অর্থ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে যদি বিনিয়োগ থাকতো তাহলে এত টাকা অলস পড়ে থাকতে পারে না। একইভাবে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদ হার কমাতে পারে না। চার বছর আগেও আমানতের সুদ হার ছিল ১২ শতাংশ। এখন তা নেমে এসেছে ৫ এর নিচে। এতে বুঝতে কষ্ট হয় না দেশে তেমন বিনিয়োগ নেই।
ব্যাংকগুলো মনে করে যদি দেশে বিনিয়োগ না থাকে তাহলে তারা সঞ্চয়/আমানত নিয়ে কি করবেন। আর আমানতকারীদের সুদ/লাভ কোথা থেকে দিবেন। আর এ কারণেই ব্যাংকগুলোতে আমানত রাখতে নিরুৎসাহিত করতেই সুদ হার কমানো হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশে মূলধনের অভাব নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহই সবচেয়ে বড় সমস্যা। আর উদ্যোক্তারা বলছেন, তারা বিনিয়োগ করতে চান। অর্থও আছে। কিন্তু দেশে বিনিয়োগের পরিবেশের ঘাটতি আছে। অবকাঠামোর সমস্যা তো ছিলই। নতুন করে গ্যাস পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই মনে করে, বিনিয়োগ না বাড়ার এখন সবচেয়ে বড় কারণ গ্যাস-সংকট। নতুন করে গ্যাসের সংযোগ আর সরকার দিচ্ছে না। আবার দাম বেশি দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ।
নিয়মানুযায়ী দেশের ব্যাংকগুলোকে নগদ ও বিধিবদ্ধ (সিআরআর ও এসএলআর) বিভিন্ন উপকরণে অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। সব মিলিয়ে এ জন্য রাখতে হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে আছে। এর বাইরে দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য রাখতে হয় আরও কিছু নগদ অর্থ। অথচ এখন আছে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ নগদ অর্থ বেশি আছে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় ব্যাংকগুলোর কাছে অতিরিক্ত তারল্য ছিল প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বিনিয়োগ স্থবিরতায় অলস টাকা তিনগুণ বেড়েছে বলেই ব্যাংকাররা জানান।
ব্যাংকে টাকা অলস থাকার বিষয়টি মূলত সরবরাহ-যোগানের ওপর নির্ভর করে। এখন অর্থের সরবরাহ ঠিক আছে। কিন্তু চাহিদা নেই। এমনিতেই বিনিয়োগ কম। তার ওপর দেশের উদ্যোক্তারা এখন বিদেশ থেকে কম সুদে ঋণ নিতে পারছে। ফলে ঋণের চাহিদা আরও কমে গেছে। 
 দেশের মধ্যে বিনিয়োগ পরিবেশ না থাকায় দেশের উদ্যোক্তারা এখন বিনিয়োগ করতে চান বিদেশে। দেশের বাইরে বিনিয়োগ করার মতো অর্থ দেশের উদ্যোক্তাদের হাতে আছে বলেও জানালেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে কয়েকজন উদ্যোক্তা বিদেশে বিনিয়োগ করার অনুমোদন চেয়েছেন। এর মধ্যে বস্ত্র ও পোশাক খাতের দুলাল ব্রাদার্স (ডিবিএল) ইথিওপিয়ায় কম্পোজিট টেক্সটাইল মিল করার অনুমোদন পেয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা এখন ইথিওপিয়া ছাড়াও হাইতিতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এরই মধ্যে হংকংয়ে বাংলাদেশের কয়েকজন ব্যবসায়ীকে দাওয়াত করে নেয়া হয়েছিল। সেখানে ইথিওপিয়াও বিনিয়োগে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের সুযোগ-সুবিধাগুলোর কথা বলেছে।
এ কে আজাদ জানান, হাইতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পতম সময়ে পণ্য পাঠানো যায়। সেখানে আছে জলবিদ্যুৎ, যার দাম অনেক কম। আর যে জমিতে শিল্প স্থাপন করা হবে, সেখানকার ভাড়া দিতে হবে না পাঁচ বছর। ইথিওপিয়ার সুযোগ-সুবিধা আরও ভালো। এসব কারণে দেশের উদ্যোক্তারা ওইসব দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন।
 মূলত, বর্তমান সরকার প্রথম থেকেই বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে সফল হয়নি। ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেয়ার সময় দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর এখন সেই বিনিয়োগ মাত্র দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২২ দশমিক ০৭ শতাংশ। বেসরকারি বিনিয়োগ মূলত বছরের পর বছর একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে না বলেই জিডিপির প্রবৃদ্ধির হারও ৬-৭ শতাংশের মধ্যেই আটকে আছে। স্বাধীনতার পর প্রতি দশকে বাংলাদেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ১ শতাংশ হারে। কিন্তু বিনিয়োগ স্থবিরতায় ১২ বছর ধরে দেশের গড় প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরেই। এটিকে এখন বলা হচ্ছে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ফাঁদ। কেবল বিনিয়োগের অভাবে এই ফাঁদ থেকে বের হতে পারছে না দেশ।
http://www.dailysangram.com/post/271306-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%8B%E0%A6%97-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%81%E0%A6%9A-%E0%A6%AC%E0%A6%9B%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%A6-%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A7%AF-%E0%A6%B6%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%BF