১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
নায়ারীয় তত্ত্ব এবং ইতিহাসের সত্যাসত্য
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শনিবার,
|| আশিকুল হামিদ || তথ্য-প্রযুক্তির ‘মহাসড়ক’ দিয়ে হেঁটে চলেছি বলেই কোনো তথ্য জানার জন্য ১৫/১৬ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলে অতি ধৈর্যশীল যে কাউকেও ক্লান্তি ও নৈরাশ্যের শিকার হতে হবে। বাস্তবে অন্তত আমার দশা সে রকমই হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে হঠাৎ শুনলে বিস্ময়কর মনে হতে পারে। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে পড়বে, গত সংখ্যার নিবন্ধে আমি একটি সংশোধনীর সংশোধনী দেখতে পাওয়ার অপেক্ষার কথা বলেছিলাম। কান্ডটি ঘটিয়েছে দেশের ‘প্রথম’ শ্রেণীর একটি নামকরা দৈনিক। দৈনিকটি গত ২৬ জানুয়ারি সংখ্যার সম্পাদকীয় পাতায় এক ‘সংশোধনী’তে বলেছিল, আগেরদিন ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার তার নিবন্ধে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ‘পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী’ লিখেছেন। কিন্তু ‘প্রকৃত অর্থে’ তিনি ছিলেন ‘অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী’। এ প্রসঙ্গে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্যটি হচ্ছে, ‘প্রকৃত অর্থে’ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন ‘প্রধানমন্ত্রী’, মুখ্যমন্ত্রী নামের কোনো পদই তখন- ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতে ছিল না। এর সৃষ্টি ও ব্যবহার শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট পাকিস্তান ও ভারতের স্বাধীনতার পর। তাছাড়া ‘অবিভক্ত বাংলা’ নামেও কোনো রাজ্য বা প্রদেশ ছিল না ব্রিটিশ ভারতে। যে প্রদেশটি প্রসঙ্গে কুলদীপ নায়ার লিখেছেন তার নাম ছিল বেঙ্গল বা বঙ্গ, কলকাতা ছিল এর রাজধানী। কিন্তু সব জেনেও ‘প্রথম’ শ্রেণীর দৈনিকটি তার ‘সংশোধনী’তে একের পর এক ভুল তথ্যই জানিয়েছে। 
ধারণা করা হয়েছিল, পাঠকদের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া পাওয়ার পর দৈনিকটি হয়তো ‘সংশোধনী’র ‘সংশোধনী’ প্রকাশ করবে। মান-সম্মানের কারণে ভুল স্বীকার না করলেও ‘অনিচ্ছাকৃত’ ধরনের শব্দ যুক্ত করে দুঃখ প্রকাশ করতে লজ্জা বোধ করবে না। কিন্তু সব আশার গুড়েই বালু ঢেলে দেয়া হয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির ‘মহাসড়কে’র যাত্রী হওয়া সত্ত্বেও ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সে রকম কোনো সংশোধনী ছাপায়নি দৈনিকটি। এর ফলে এমন ধারণার সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক যে, বেঙ্গল বা বঙ্গ প্রদেশকে পূর্ব বাংলা এবং প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো বিখ্যাত একজন রাজনীতিককে বর্তমান পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর্যায়ে নামিয়ে আনার পাশাপাশি মিস্টার নায়ার তার নিবন্ধে যে মূলকথাগুলো লিখেছেন দৈনিকটি সম্ভবত সেসবকে সত্য বলে মনে করে। একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, ভারতের ওই ‘বিখ্যাত’ সাংবাদিক ও ‘ঝানু’ কূটনীতিক কুলদীপ নায়ারের মতো দৈনিকটির সঙ্গে জড়িত লোকজন ও নীতিনির্ধারকরাও মুসলমান এবং বাংলাদেশ বিরোধী একই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব লালন করেন। এ ছাড়া সংশোধনী না ছাপানোর আর কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে বলে আমার মনে হয় না। 
এখানে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু তথ্য জানিয়ে রাখা দরকার, যার নামে ঢাকার ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যান’ হয়েছে। ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতিতে পন্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরুদের মতো প্রভাবশালী হিন্দু ও কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চলতে হয়েছে তাকে। ‘শেরে বাংলা’ আবুল কাশেম ফজলুল হকের পর বঙ্গ প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী শুধু নন, মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে পাকিস্তান রাষ্ট্রেরও প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি (সেপ্টেস্বর, ১৯৫৬)। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ হিসেবে সম্মানিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা জীবন থেকে তার রাজনৈতিক শিষ্য বা অনুসারী ছিলেন। সুতরাং অমন একজন নেতাকে নিয়ে তামাশা এবং মিথ্যাচার গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তেমন অপচেষ্টার বিরুদ্ধে অবশ্যই প্রতিবাদ জানানো উচিত।
এবার দেখা যাক, ‘প্রথম’ শ্রেণীর দৈনিকটিতে প্রকাশিত নিবন্ধে কুলদীপ নায়ার কি এমন লিখেছেন, যার জন্য এত কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে হচ্ছে। নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে গত ২৫ জানুয়ারি। ‘প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা ক্ষুণœ হয়েছে’ শিরোনামের এই নিবন্ধের শুরুতে মিস্টার নায়ার ভারতের জাতির পিতা এবং ‘মহাত্মা’ নামে পরিচিত নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর স্থলে চরকার পেছনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদীর ছবি ছাপানোর বিরোধিতা করেছেন। এটুকু পড়ার পর মনে হতে পারে যেন নিজেদের জাতির পিতা গান্ধীকে অসম্মানিত করার প্রতিবাদ জানানোই তার প্রধান উদ্দেশ্য। অন্যদিকে মাত্র কয়েক লাইনের মধ্যেই সম্পূর্ণ পাল্টে গেছেন মিস্টার নায়ার। বহু শত কিলোমিটার ঘুরে তিনি ব্রিটিশ ভারতের শোষিত-অবহেলিত মুসলমানদের ধোলাই করার কসরত করেছেন। মুসলমান বিরোধী চরম সাম্প্রদায়িক মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি কেবল ব্রিটিশ আমলের বেঙ্গল বা বঙ্গ প্রদেশকে পূর্ব বাংলা এবং এর প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে মুখ্যমন্ত্রী বানিয়ে ছাড়েননি, পাশাপাশি অন্যভাবেও মিথ্যাচার করেছেন। যেমন তিনি লিখেছেন, কংগ্রেসের সত্যাগ্রহ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী’ শহীদ সোহরাওয়ার্দী নাকি ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’র ডাক দিয়েছিলেন এবং সরকারের ‘পরোক্ষ সম্মতিতে’ হিন্দু ও শিখদের নাকি ‘কচুকাটা করা’ হয়েছিল! এর প্রতিশোধ নেয়া হয়েছিল বলেই নাকি কয়েক হাজার মুসলমানও জীবন হারিয়েছিলেন! 
অন্যদিকে সঠিক ইতিহাস কিন্তু তথ্যের আড়ালে কুলদীপ নায়ারের উপস্থাপিত দাবি, তথ্য, বক্তব্য ও ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে না। কারণ, ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট যে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ আহবান করার জন্য বঙ্গ প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ওপর তিনি দোষ চাপিয়েছেন সে কর্মসূচিটি ঘোষণা করেছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন দল অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল সে বিষয়ে জানার জন্য পাঠকরা শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি পড়ে দেখতে পারেন। শেখ মুজিবুর রহমান তার এ গ্রন্থে জানিয়েছেন (পৃষ্ঠাÑ৬৩), মুসলিম লীগের নেতা এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানের জাতির পিতা ও প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৬ সালের ২৯ জুলাই বোম্বেতে অনুষ্ঠিত দলের কাউন্সিল সভায় পাকিস্তানের দাবিতে সে বছরের ১৬ আগস্ট ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এক বিবৃতিতে মিস্টার জিন্নাহ যে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের আহবান জানিয়েছিলেন সে কথার উল্লেখ করে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে শেখ মুজিব লিখেছেন, ‘ব্রিটিশ সরকার ও ক্যাবিনেট মিশনকে তিনি (জিন্নাহ) দেখাতে চেয়েছিলেন যে, ভারতবর্ষের দশ কোটি মুসলমান পাকিস্তান দাবি আদায় করতে বদ্ধপরিকর। কোনো রকম বাধাই তারা মানবে না।’ শেখ মুজিব এ প্রসঙ্গে আরো লিখেছেন, “কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতারা এই ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ (ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে) তাদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয়েছে বলে বিবৃতি দিতে শুরু করলেন।” 
মিস্টার নায়ারের দাবি অনুযায়ী হিন্দু ও শিখদের নয়, গান্ধী-নেহরুর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের পাশাপাশি হিন্দু মহাসভার উস্কানি, সমর্থন ও সহযোগিতায় ‘কচুকাটা করা’ হয়েছিল আসলে মুসলমানদের। তাদের সংখ্যাও কয়েক হাজার মাত্র ছিল না। লাখেরও বেশি মুসলমানকে হত্যা করেছিল হিন্দু ও শিখরা। সে হত্যাকান্ডের অভিযান চলেছিল কয়েকদিন ধরে। দাঙ্গার আড়ালে মুসলিম হত্যাকান্ডের এ ঘটনাপ্রবাহই ইতিহাসে ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা ম্যাসাকার’ নামে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীকে সে সময় দাঙ্গা থামানোর এবং মুসলমানদের জীবন বাঁচানোর জন্য রাতদিন পরিশ্রম করতে হয়েছিল। মুসলিম লীগের সক্রিয় তরুণ কর্মি এবং প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর অতি বিশ্বস্তজন হিসেবে শেখ মুজিব নিজেও সে দিনগুলোতে দাঙ্গা ও মুসলিম হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন। 
এসব প্রসঙ্গে অনেক তথ্য ও ঘটনার বর্ণনা রয়েছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে। এখানে অতি সংক্ষেপে কয়েকটির উল্লেখ করা হলো:
১.    “আমরা গাড়িতে মাইক লাগিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হিন্দু মহল্লায় ও মুসলমান মহল্লায় সমানে প্রপাগান্ডা শুরু করলাম। অন্য কোন কথা নাই, ‘পাকিস্তান’ আমাদের দাবি। এই দাবি হিন্দুর বিরুদ্ধে নয়, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে। ফরোয়ার্ড ব্লকের কিছু নেতা আমাদের বক্তৃতা ও বিবৃতি শুনে মুসলিম লীগ অফিসে এলেন এবং এই দিনটা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে হিন্দু মুসলমান এক হয়ে পালন করা যায় তার প্রস্তাব দিলেন। আমরা রাজি হলাম। কিন্তু হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের প্রপাগান্ডার কাছে তারা টিকতে পারল না। হিন্দু সম্প্রদায়কে বুঝিয়ে দিল এটা হিন্দুদের বিরুদ্ধে।” (পৃষ্ঠা-৬৩)
২.    “সোহরাওয়ার্দী সাহেব তখন প্রধানমন্ত্রী। তিনিও বলে দিলেন, “শান্তিপূর্ণভাবে যেন দিনটি পালন করা হয়। কোন গোলমাল হলে মুসলিম লীগ সরকারের বদনাম হবে।” তিনি (প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী) ১৬ই আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা করলেন। এতে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা আরও ক্ষেপে গেল।” (পৃষ্ঠা-৬৩)
৩.    “১৬ আগস্ট কলকাতা গড়ের মাঠে সভা হবে। কলকাতার মুসলমান ছাত্ররা ইসলামিয়া কলেজে সকাল দশটায় জড়ো। আমার উপার ভার দেওয়া হল ইসলামিয়া কলেজে থাকতে। শুধু সকাল সাতটায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব মুসলিম লীগের পতাকা উত্তোলন করতে। আমি ও নূরুদ্দিন সাইকেলে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত হলাম। পতাকা উত্তোলন করলাম। কেউই আমাদের বাধা দিল না। আমরা চলে আসার পরে পতাকা নামিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিল শুনেছিলাম। আমরা কলেজ স্ট্রিট থেকে বউবাজার হয়ে আবার ইসলামিয়া কলেজে ফিরে এলাম। ...আর যদি আধা ঘণ্টা দেরি করে আমরা বউবাজার হয়ে আসতাম তাহলে আমার ও নূরুদ্দিনের লাশও আর কেউ খুঁজে পেত না।”
৪.    “আমাদের কাছে খবর এল, ওয়েলিংটন স্কোয়ারের মসজিদে আক্রমণ হয়েছে। ইসলামিয়া কলেজের দিকে হিন্দুরা এগিয়ে আসছে। ...আমরা চল্লিশ পঞ্চাশজন ছাত্র প্রায় খালি হাতেই ধর্মতলা মোড় পর্যন্ত গেলাম। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা কাকে বলে এ ধারণাও আমার ভালো ছিল না। দেখি শত শত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক মসজিদ আক্রমণ করেছে। মৌলভী সাহেব পালিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। তাঁর পিছে ছুটে আসছে একদল লোক লাঠি ও তলোয়ার হাতে।...এখন সমস্ত কলকাতায় হাতাহাতি মারামারি চলছে। মুসলমানরা মোটেই দাঙ্গার জন্য প্রস্তুত ছিল না একথা আমি বলতে পারি।” (পৃষ্ঠা: ৬৪-৬৫)
৫.    “কলকাতা শহরে শুধু মরা মানুষের লাশ বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। মহল্লার পর মহল্লা আগুনে পুড়ে গিয়েছে। এক ভয়াবহ দৃশ্য। মানুষ মানুষকে এইভাবে হত্য করতে পারে, চিন্তা করতেও ভয় হয়।” (পৃষ্ঠা-৬৬)
৬.    “কারফিউ জারি হয়েছে, রাতে কোথাও যাবার উপায় নাই। সন্ধ্যার পরে কোন লোক রাস্তায় বের হলে আর রক্ষা নাই। কোন কথা নাই, দেখা মাত্র গুলী। মিলিটারি গুলি করে মেরে ফেলে দেয়। এমনকি জানালা খোলা থাকলেও গুলি করে। ভোর বেলা দেখা যেত অনেক লোক রাস্তায় গুলী খেয়ে মরে পড়ে আছে। কোন কথা নাই, শুধু গুলি।...তারা ছায়া দেখলেও গুলী করে।” (পৃষ্ঠা- ৬৭) 
৭.    “শহীদ সাহেব সমস্ত রাতদিন পরিশ্রম করছেন শান্তি রক্ষার জন্য। কলকাতায় চৌদ্দ-পনের শত পুলিশ বাহিনীর মধ্যে মাত্র পঞ্চাশ-ষাটজন মুসলমান। অফিসারদের অবস্থাও প্রায় সেই রকম। শহীদ সাহেব লীগ সরকার চালাবেন কি করে? তিনি আরও এক হাজার মুসলমানকে পুলিশ বাহিনীতে ভর্তি করতে চাইলে তদানীন্তন ইংরেজ গভর্নর আপত্তি তুলেছিলেন। শহীদ সাহেব পদত্যাগের হুমকি দিলে তিনি রাজি হন। পাঞ্জাব থেকে যুদ্ধ ফেরত মিলিটারি লোকদের এনে ভর্তি করলেন। এতে ভীষণ হৈচৈ পড়ে গেল। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার কাগজগুলি হৈচৈ বেশি করল।” (পৃষ্ঠা- ৬৮)
৮.    “কলকাতার দাঙ্গা বন্ধ হতে না হতেই আবার দাঙ্গা শুরু হল নোয়াখালীতে। ...এর প্রতিক্রিয়ায় শুরু হল বিহারে ভয়াবহ দাঙ্গা। বিহার প্রদেশের বিভিন্ন জেলায় মুসলমানদের উপর প্ল্যান করে আক্রমণ হয়েছিল। এতে অনেক লোক মারা যায়, বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়।” (পৃষ্ঠা- ৬৮)
৯.     “আমাদের পক্ষে কলকাতা থাকা সম্ভবপর না, কারণ অনেককে গ্রেফতার করেছে।... শহীদ সাহেবের কাছে বিদায় নিতে গেলাম। তাকে রেখে চলে আসতে আমার মনে খুব কষ্ট হচ্ছিল।... কয়েকবার তার উপর আক্রমণ হয়েছে। তাকে হিন্দুরা মেরে ফেলতে চেষ্টা করছে। বিজ্ঞান কলেজের সামনে তার গাড়ির উপর বোমা ফেলে গাড়িটা পুড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি কোনমতে রক্ষা পেয়েছিলেন। শহীদ সাহেবকে বললাম, ‘চলুন স্যার পাকিস্তানে, এখানে থেকে কি করবেন ?’ (শহীদ সাহেব) বললেন, ...‘এই হতভাগা মুসলমানদের জন্য কিছু একটা না করে যাই কি করে? দেখ না, সমস্ত ভারতবর্ষে কি অবস্থা হয়েছে। চারদিকে শুধু দাঙ্গা আর দাঙ্গা। ...আমি চলে গেলে এদের আর উপায় নাই। তোমরা একটা কাজ কর, দেশে গিয়ে সাম্প্রদায়িক গোলমাল যাতে না হয় তার চেষ্টা কর। পূর্ব বাংলায় গোলমাল হলে আর উপায় থাকবে না। চেষ্টা কর, যাতে হিন্দুরা চলে না আসে। ওরা এদিকে এলেই গোলমাল করবে, তাতে মুসলমানরা বাধ্য হয়ে পূর্ব বাংলায় ছুটবে। যদি পশ্চিম বাংলা, বিহার ও আসামের মুসলমান একবার পূর্ব বাংলার দিকে রওয়ানা হয়, তবে পাকিস্তান বিশেষ করে পূর্ব বাংলা রক্ষা করা কষ্টকর হবে।...“ (পৃষ্ঠা-৮২)
এভাবেই একের পর এক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান। প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দাঙ্গা বিরোধী কর্মকান্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন (পৃষ্ঠা-৮২), কংগ্রেস তথা হিন্দুদের নেতা মিস্টার গান্ধীকে সঙ্গে নিয়েও কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় জনসভা করেছিলেন সোহরাওয়ার্দী। এসব সভায় দাঙ্গা বন্ধ না করলে অনশনের হুমকি দিয়েছিলেন গান্ধী। শেখ মুজিব লিখেছেন, “মহল্লায় মহল্লায় বিশেষ করে হিন্দি ভাষাভাষী লোকেরা শোভাযাত্রা বের করে স্লোগান দিতে লাগল, ‘মুসলমানকো মাত মারো, বাপুজী অনশন করেগা।’...“ এই ‘বাপুজী’ ছিলেন গান্ধী এবং তিনি অনশনের হুমকি দিয়েছিলেন বলেই দাঙ্গা স্তিমিত হয়ে এসেছিল এবং কলকাতার মুসলমানরা সেবার ঈদের দিনটি শান্তিতে কাটাতে পেরেছিল। এ তথ্যটির মধ্য দিয়েও প্রমাণিত হয়, কারা আসলে কাদের ‘কচুকাটা’ করেছিল। 
পাঠকরা কষ্ট করে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি পড়লেও জানতে পারবেন, কতটা নিষ্ঠুরতার সঙ্গে মুসলমানদের ‘কচুকাটা’ করা হয়েছিল। এসব বিষয়ে জানার জন্য হিন্দিভাষী ও অবাঙ্গালী সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষের কাছে শেখ মুজিব নিঃসন্দেহে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি। ইতিহাসের সোর্স হিসেবেও তাকেই অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার। কারণ, তিনি নিজে ঘটনাপ্রবাহের একজন দর্শক ও অংশগ্রহণকারী। অন্যদিকে মিস্টার নায়ার শুনে তো লিখেছেনই, সেই সাথে রয়েছে তার নিজের সাম্প্রদায়িক ও মুসলিম বিরোধী চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশ ও জাতির জন্য লজ্জাকর হলেও এদেশের কিছু সংবাদপত্র বিশেষ করে ভারতীয়দের লেখা নিবন্ধ ছাপাতে পারলে ধন্য ও কৃতার্থ হয়ে যায়। এই সুযোগে ভারতীয়রাও বাংলাদেশের জনগণকে নিজেদের অভিমত এবং পরামর্শের ‘ট্যাবলেট’ গেলানোর চেষ্টা করেন। 
‘প্রবীণ সাংবাদিক ও ঝানু কূটনীতিক’ হিসেবে পরিচিত কুলদিপ নায়ারও তেমন একজন, যার সম্পর্কে সচেতন পাঠকদের জানা থাকার কথা। কারণ, উপলক্ষ পেলে তো বটেই, সুচিন্তিতভাবে উপলক্ষ সৃষ্টি করে হলেও বিভিন্ন সময়ে তাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে দেখা গেছে। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা নিয়ে লিখতে গিয়েও মিস্টার নায়ার একই অপরাধ করেছেন। কিছুটা রাখঢাক করার কৌশল অবলম্বন করলেও মুসলমান ও বাংলাদেশ বিরোধী ‘ট্যাবলেট’ গেলানোর চেষ্টা তিনি গোপন রাখতে পারেননি। আপত্তির কারণ হলো, ‘প্রথম’ শ্রেণীর দৈনিকটিও মিস্টার নায়ারের বক্তব্য ও চিন্তাধারাকে তথা ভারতীয়দের সুচিন্তিত ‘ট্যাবলেট’কেই বাংলাদেশের জনগণের সামনে হাজির করেছে!
http://www.dailysangram.com/post/271315-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%80%E0%A7%9F-%E0%A6%A4%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AC-%E0%A6%8F%E0%A6%AC%E0%A6%82-%E0%A6%87%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF