২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
ফারাক্কা পয়েন্টে পানি না আসায় প্রবাহ নেই পদ্মায়
৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার,
রাজশাহী : শুকনো মওসুম শুরু হতে না হতেই পদ্মার বুকে চরের পর চর পড়ে চলেছে। গতকাল বুধবার রাজশাহীর দৃশ্য -ছবি : সোহরাব হোসেন সৌরভ
ফারাক্কা পয়েন্টে পানি না থাকায় বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ বাড়তে পারছে না। এ কারণে গত জানুয়ারির পুরো মাস ভারতের পক্ষ থেকে পানি বঞ্চিত করা হয়েছে বাংলাদেশকে। এদিকে শুকনো মওসুম শুরু হতে না হতেই পদ্মার বুকে চরের পর চর পড়ে চলেছে। গত অর্ধশতাব্দীতে বাংলাদেশের অন্তত ৬শ’ নদ-নদী প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
গতকাল বুধবার দেখা যায়, নদীর দু’পাড়জুড়ে অসংখ্য চরের বিস্তার। এই চরের দৈর্ঘ ও সংখ্যা প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে। এর প্রধান কারণ, প্রথম শুকনো মওসুমের শুরুতে গত জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশকে পাওনার চেয়ে কম পরিমাণ পানি দিয়েছে ভারত। সূত্র জানায়, জানুয়ারি মাসে তিন কিস্তিতে ২৮ হাজার ২৮৭ কিউসেক পানি কম পেয়েছে বাংলাদেশ। চুক্তির ইন্ডিকেটিভ শিডিউল অনুযায়ী ভারত এই পরিমাণ পানি কম দিয়েছে বাংলাদেশকে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি অনুযায়ী পানি বণ্টন কার্যক্রম শুরু হয় জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে। চুক্তির আওতায় এ বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দু’দেশের মধ্যে গঙ্গার পানি যে পরিমাণ পানি বণ্টিত হওয়ার কথা সে হিসেবে ইতোমধ্যে পানি কম দেয়া হয়েছে বাংলাদেশকে। সূত্রে প্রকাশ, জানুয়ারি মাসের ১ থেকে ১০ দিনে চুক্তির ইন্ডিকেটিভ শিডিউল অনুযায়ী বাংলাদেশ ফারাক্কা পয়েন্টে পাওয়ার কথা রয়েছে ৬৭,৫১৬ কিউসেক পানি। কিন্তু বাংলাদেশ পেয়েছে ৫৭,৭৬৬ কিউসেক পানি। হিসাব মতে, এই দশ দিনে ভারত ৯৭৫০ কিউসেক পানি কম দিয়েছে বাংলাদেশকে। অপরদিকে দ্বিতীয় দশ দিনে পানি আরো কমে গেছে। জানুয়ারির দ্বিতীয় দশ দিনে বাংলাদেশ পাওয়ার কথা ৫৭,৬৭৩ কিউসেক পানি। কিন্তু বাংলাদেশ ১২,৩৭৬ কিউসেক পানি কম পেয়েছে। আর জানুয়ারির শেষ দশ দিনে অর্থাৎ ২১ থেকে ৩০ পর্যন্ত পাওয়ার কথা ছিল ৫০,১৫৪ কিউসেক পানি। কিন্তু কম ৬,১৬৪ কিউসেক কম দেয়া হয়েছে। মাসের তিন কিস্তিতে ২৮,২৮৭ কিউসেক পানি কম পেয়েছে বাংলাদেশ। সামনে মূল শুকনো মওসুম পড়ে আছে। সেসময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর প্রধান কারণ ফারাক্কা পয়েন্টে যথেষ্ট পরিমাণ পানি পৌঁছাতে পারছে না। গঙ্গার উজানেই পানির মূল প্রবাহের বেশীর ভাগ সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। বহুসংখ্যক ক্যানেল, ব্যারেজ ও ড্যাম-এর মাধ্যমে এই পানি প্রত্যাহার ও আটকানোর প্রকল্প কার্যকর রয়েছে। ভারত তার বহুসংখ্যক সেচ ও পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মূল গঙ্গা এবং এর উপনদীগুলোর ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে নদীতে পানি প্রবাহিত হতে পারছে মাত্র ১০ ভাগ। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক এই নদীতে বাঁধের পর বাঁধ দিয়ে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার ফলে মূল গঙ্গা তার উৎসের কাছে হারিয়ে যেতে বসেছে। অর্ধশতাব্দীর মধ্যে গঙ্গা নদীর প্রবাহ ২০ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। সব মিলিয়ে ভারতের নানা উচ্চাভিলাষি কর্মপরিকল্পনার শিকার হয়ে ভাটির দেশ বাংলাদেশ এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, শুধু ফারাক্কা নয়- গঙ্গা-পদ্মাকেন্দ্রিক বাঁধ, জলাধার, ক্রসড্যাম, রেগুলেটরসহ কমপক্ষে ৩৩টি মূল অবকাঠামো নির্মাণ করছে ভারত। এরসঙ্গে রয়েছে আনুষঙ্গিক আরো অসংখ্য ছোট-বড় কাঠামো। নতুন করে উত্তরাখণ্ডের রাজ্য সরকার তাদের ৫৩টি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের আগে ও পরে থেকে ভারত নদীসদৃশ ৭টি ক্যানেল বা কৃত্রিম খাল প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার কিউসেক পানি গঙ্গা থেকে সরিয়ে নিয়ে কয়েক লাখ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করছে। তারা অনেক আগে থেকেই গঙ্গায় বৃহদাকার তিনটি খাল (ক্যানেল) প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, ‘আপারগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘নি¤œগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘পূর্ব গঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল ২য় পর্যায়’ এবং ‘সমান্তরাল নি¤œ গঙ্গা ক্যানেল’। এ ধরনের প্রকল্পের হাজার হাজার কিলোমিটার খালের মাধ্যমে গঙ্গার পানি সরিয়ে নিয়ে সেচ দেবার ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ‘আপার গঙ্গা ক্যানেল প্রকল্পের’ মাধ্যমে উত্তর প্রদেশের ২৫ লাখ একর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্যে ৬ হাজার কিলোমিটারের বেশী খাল কেটে পদ্মার পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’ নামের প্রকল্পে মূল ও শাখাসহ খননকৃত খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার। ‘নিম্নগঙ্গা সেচ প্রকল্পের’ জন্য ৬ হাজার কিলোমিটার খালের মাধ্যমে গঙ্গার পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এভাবে এসব উৎসের শতকরা ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ফলে নদীতে মাত্র ১০ ভাগ পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারছে। যে কারণে চুক্তি করেও তেমন লাভ হয়নি বাংলাদেশের। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর এই গঙ্গা চুক্তি সম্পাদিত হয়। দেখা গেছে, ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি সংলগ্নি-১-এর বণ্টন ফর্মূলা অনুযায়ী পানি নিশ্চিত করলেও ইন্ডিকেটিভ শিডিউল অনুযায়ী বাংলাদেশ পানি পাচ্ছে না। পানি বণ্টনের বেশির ভাগ সময়ই ভারত ইন্ডিকেটিভ শিডিউল অনুযায়ী পানি নিশ্চিত করেনি।
অর্ধ শতাব্দীতে ৬শ’ নদী উধাও : এদিকে, গত অর্ধশতাব্দীতে বাংলাদেশের অন্তত ৬শ’ নদ-নদী প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। এসব নদী নিয়মিত পানি-প্রবাহ না পাওয়ায় শুকিয়ে মরে গেছে গত ৪৫ বছরে। দেশে নদীর সংখ্যা ছিল ১৩শ’-র মতো। শুকিয়ে এখন তার সংখ্যা নেমে এসেছে ৭শ’-তে। গভীর উদ্বেগজনক এই তথ্য উঠে আসে বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের রিপোর্টে। গত শুক্রবার রাজধানী ঢাকার সেগুনবাগিচায় ‘নদ-নদী রক্ষায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন হয়। নদীনালার অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টিকারী প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয় এতে। প্রকৌশলী জাবের আহম্মেদ ও মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের যৌথ উপস্থাপনায় এই প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাধীনতার পর সাড়ে চার দশকে ১৩শ’ নদ-নদী থেকে এখন মাত্র ৭শ’-তে নেমে এসেছে তো বটেই, বেঁচে থাকা নদ-নদীর মধ্যেও প্রবহমান নদীর সংখ্যা অর্ধেক। আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মুহ. আতাহারুল ইসলাম, প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক হাফিজা খাতুন।
http://www.dailysangram.com/post/270997-%E0%A6%AB%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE-%E0%A6%AA%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF-%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%86%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B9-%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%87-%E0%A6%AA%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A7%9F