২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
মেরুদণ্ডহীনতার অভিযোগ নিয়ে রকীব কমিশনের বিদায়
৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার,
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনে (ইসি) দায়িত্ব পালনকালে সীমাহীন ব্যর্থতা, ইসিকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং এই প্রতিষ্ঠানের মানমর্যাদা ও স্বাধীন সত্তা বিকিয়ে দেয়ার অভিযোগ মাথায় নিয়ে গতকাল বুধবার বিদায় নিলো রকীব কমিশন। তবে বিদায়ের দিনেও সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার না করে উল্টো সফলতার জয়গান গাওয়ায় এই ইসিকে মেরুদণ্ডহীন বলেছেন রাজনীতিবিদসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্টজনেরা। সিইসি কাজী রকীবউদ্দিন বলেছেন, অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল আমরা তা মোকাবেলা করে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করতে সম হয়েছি।
কাজী রকীবউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) ২০১২ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বিভিন্ন নির্বাচনের আয়োজন করে। কিন্তু প্রতিবারই নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হয়। নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় নির্বাচনী এলাকায়। ভয়ভীতি ও বাধার কারণে মনোনয়নপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হন প্রার্থীরা। আবার জমা দিলেও মতাসীনদের চাপে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন। এর পরেও নির্বাচন কমিশন ছিল নির্লিপ্ত। রকীব কমিশন নির্বাচন প্রক্রিয়া ধ্বংসের আয়োজন করেছে বলে কড়া সমালোচনা করেছেন বিশ্লেষকেরা।
ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশনের পর ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ পান কাজী রকীবউদ্দিন আহমদসহ পাঁচ সদস্যের কমিশন। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি কমিশন নিয়োগে রাষ্ট্রপতির সংলাপে গেলেও নিয়োগের পরপরই কমিশনের বিরোধিতা করে।
কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর রংপুর, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, গাজীপুর ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আয়োজন করে। এই নির্বাচনগুলো অনেকটা শান্তিপূর্ণ ও নিরপে করার চেষ্টা করে ইসি। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে ইসির মতা কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় রকীব কমিশন। এতে দেশজুড়ে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে নির্বাচন কমিশন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে আসতে থাকে একের পর এক প্রতিবেদন। সেই সংশোধনী আর আনতে পারেনি রকীব কমিশন।
এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে চরমভাবে বিতর্কিত হয়ে পড়ে ইসি। এ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও কিছু বিরল ঘটনার জন্ম দেয় নির্বাচন কমিশন। ৫ জানুয়ারির সেই নির্বাচন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বর্জন করতে চাইলেও তাকে অসুস্থ বলে হাসপাতালে রাখা হয়। কমিশন কোনো পদপে নেয়নি। এরপর অনেক প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করলেও তার মনোনয়নপত্র জমা বলে ধরা হয়। এ ছাড়াও অনেক জায়গায় নির্বাচনের ফল প্রকাশ করা হয় অনেক দেরিতে। অভিযোগ ছিল রিটার্নিং কর্মকর্তারা অনেক জায়গায় ছয়-নয় করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে জয়ী করতে সহায়তা করেছেন। এর ফলস্বরূপ ১৫৩ আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। ফলে ভোটগ্রহণ হয় মাত্র ১৪৭ আসনে। আর এতে পাঁচ কোটির বেশি লোক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগই পায়নি। দেশের কোনো নির্বাচনে এত বেশি সংখ্যক প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ইতঃপূর্বে আর ঘটেনি। এ নির্বাচনের পর দেশ ও দেশের বাইরে বেশি মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলে রকীব কমিশন। এই নির্বাচনেই মূলত নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন সত্তা ভূলুণ্ঠিত হয়। পরিণত হয় দলীয় কমিশনে। ইসির বিরুদ্ধে সরকারের অনুগত কর্মী হিসেবে কাজ করার অভিযোগ করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।
জাতীয় নির্বাচনের অব্যবহিত পরে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও ব্যর্থতার পরিচয় দেয় কমিশন। খোদ ইসির তথ্যানুযায়ী ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম ধাপের নির্বাচনে ৬৪টি কেন্দ্র দখল, দখলের চেষ্টা, জাল ভোটের মতো অনিয়ম ঘটে। ২৭ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপে ৯৮টি কেন্দ্র দখল, দখলের চেষ্টা, জাল ভোট ইত্যাদি অনিয়ম ঘটে। এ দিন সহিংসতায় একজন নিহত হয়। ১৫ মার্চ তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে সহিংসতা আরো বাড়ে এবং তিনজন নিহত হয়। কেন্দ্র দখল, দখলের চেষ্টা, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জাল ভোটÑ এসব অনিয়ম ঘটে ১৭৫টি কেন্দ্রে। এরপর ২৩ মার্চ চতুর্থ দফা নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলা, জাল ভোটের উৎসবসহ রীতিমতো ভোট ডাকাতির ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি হামলা, সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে ২২০টি কেন্দ্রে। এ দিন সহিংসতায় নিহত হয় চারজন।
সর্বশেষ ধাপে ভোটগ্রহণের আগের রাতে একজন নিহত হয়। এ ধাপের বেশির ভাগ উপজেলায় ভোট শুরু হওয়ার আগেই কেন্দ্র দখল করে নেয়ার অভিযোগ ওঠে। সব মিলিয়ে এই ধাপে ৭৯ উপজেলায় ভোট ডাকাতির মাধ্যমে ফলাফল পাল্টে দেয়া হয়।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্যানুযায়ী, দেশের ৪৮৭টি উপজেলার মধ্যে পাঁচ ধাপে ৪৫৮টিতে নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্রোহীসহ আওয়ামী লীগ ২৩২, বিএনপি ১৬২, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৩৬, জনসংহতি সমিতি ৯, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট ইউপিডিএফ ৪, জাতীয় পার্টি জাপা ৩, জাতীয় পার্টি-জেপি ১, এলডিপি ১ ও স্বতন্ত্রসহ অন্যরা সাতটি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে জয় পায়।
ভাইস চেয়ারম্যান (সাধারণ ও নারী) পদেও আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা বেশি উপজেলায় বিজয়ী হন। এই দল থেকে ৩৪২ জন ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। অন্য দিকে এ পদে বিএনপির ২৯৮ জন ও জামায়াতের ১৫০ জন নির্বাচিত হন।
২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল তিন সিটিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে কারচুপি, জোরপূর্বক ভোটদান, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট ও সহিংসতা হয়। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে বিএনপি সমর্থিত ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রার্থী মির্জা আব্বাস উত্তর সিটি করপোরেশনে তাবিথ আউয়াল এবং চট্টগ্রাম সিটির প্রার্থী মনজুর আলম ভোট বর্জন করেন। এ নির্বাচনে বিএনপির দাবির মুখে ইসি সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত তা নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। প্রথমে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিলেও পরদিন তাদের ক্যান্টনমেন্টে রাখতে প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারকে চিঠি দেয় ইসি। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
সারা দেশে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয় পৌরসভা নির্বাচন। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দলীয় প্রতীক নিয়ে পৌর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ নির্বাচনেও ভোট ডাকাতি হয়। সহিংসতায় চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় একজন নিহত হয়। পাওয়া যায় জাল ভোটের অভিযোগ। অনিয়মের ফলে ৩৫টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। সংঘর্ষে আহত হয় কয়েক শ’ বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মী। মতাসীনদের সহযোগিতার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২৫ সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।
নির্বাচনের দিন অন্তত ১০০ এবং নির্বাচনের আগে ৫০টির বেশি লিখিত অভিযোগ করেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকেরা। অভিযুক্তরা বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী-এমপি ও দলীয় নেতাকর্মী। কিন্তু নির্বাচন কমিশন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
মাঠপর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে বিরোধী প্রার্থীরা শত শত অভিযোগ করলেও এসব অভিযোগের ভিত্তিতে যেসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
২৩৪টি কেন্দ্র থেকে তাদের পোলিং এজেন্টকে বের করে দেয়া হয় বলে অভিযোগ করে বিএনপি। দলটির নেতা রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেন, সহিংসতা এবং প্রশাসনের সহায়তায় আওয়ামী লীগের লোকজন প্রকাশ্যে নৌকা প্রতীকে সিল মেরেছে।
জাতীয় পার্টির প থেকে বলা হয়, দলের ১৭৪ জন পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। বিষয়টি ইসিকে জানানো হলেও কোনো পদপে নেয়া হয়নি।
এ দিকে প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিক প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করে নির্বাচন কমিশন। ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে হলে প্রিজাইডিং অফিসারের অনুমতি নেয়ার কথা বলা হয়। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রে বেশিক্ষণ এবং পাঁচজনের বেশি সাংবাদিক থাকতে পারবে না বলেও ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এ ছাড়াও চলতি বছর মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ছয় ধাপে অনুষ্ঠিত চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে ব্যর্থ হয় কমিশন। বিশেষ করে ইউপি নির্বাচনে কমিশনের ভাবমর্যাদা ভীষণভাবে ুণœ হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এই নির্বাচনকে ইতিহাসের সব থেকে খারাপ বলে আখ্যায়িত করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে প্রায় দেড় শ’ লোক নিহত হয়। আহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়ায়। প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিত হয় ৭১২টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। ৩৬টি জেলায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের ৩২টিতেই সহিংসতা ও অনিয়মের ঘটনা ঘটে। নির্বাচনের দিনেই বিভিন্ন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হয় ১১ জন এবং আহত হয় সহস্রাধিক। অনিয়মের কারণে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয় ৬৫টি কেন্দ্রে। ভোটগ্রহণ শেষে নির্বাচনের পরের দুই দিনে এবং নির্বাচনের দিনে আহত আরো তিনজনসহ সহিংসতায় নিহত হয় ছয়জন। তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের আগেই সারা দেশের অনেক এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হয় ১০ জন এবং আহত হয় দুই সহস্রাধিক। সব মিলিয়ে প্রথম ধাপে নিহতের সংখ্যা ২৭ এবং আহত সাড়ে তিন হাজারের বেশি।
গত ৩১ মার্চ দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে দেশের সাত উপজেলায় সহিংসতায় এক শিশু, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রসহ আটজন নিহত হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, প্রার্থীসহ আহত হন কয়েক শ’ মানুষ। ভোটকেন্দ্র দখল ও জাল ভোটকে কেন্দ্রে করে গুলি, বোমা বিস্ফোরণ ও সংঘর্ষে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে রয়েছে ঢাকার কেরানীগঞ্জের এক শিশু, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে তিনজন, মাদারীপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র, মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে এক নারী এবং নাটোরের লালপুর, যশোর সদর ও জামালপুরের মেলান্দহে একজন করে নিহত হয়।
গত ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়া তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে সহিংসতা ও ভোট জালিয়াতি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ৮১টি উপজেলায় ভোটগ্রহণকালে সহিংসতায় বাগেরহাট সদর ও শরীয়তপুরের নড়িয়ায় দুইজন নিহত হয়। বিভিন্ন এলাকায় ব্যালট ছিনতাই ও সংঘর্ষে আহত হয় দুই শতাধিক।
চতুর্থ ধাপের ইউপি নির্বাচনে পাঁচজন নিহত হয়। এর মধ্যে রাজশাহীর বাগমারায় দুইজনসহ নরসিংদী, কুমিল্লা ও ঠাকুরগাঁওয়ে একজন করে পাঁচজন নিহত হয়। এ ছাড়াও জামালপুরে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে নিজ গুলিতে একজন বিডিআর সদস্য নিহত হন। চতুর্থ ধাপ পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয় ৭৮ জন এবং আহতের সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি।
পঞ্চম ধাপের ভোটের সময়ও সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, জাল ভোটসহ ব্যাপক অনিয়মের ঘটনা ঘটে। এ ধাপে ভোটের সময় সারা দেশে অন্তত ১০ জন নিহত হয়। আহত হয় শতাধিক। সার্বিক বিবেচনায় আগের চার ধাপের চেয়ে পঞ্চম ধাপের ভোট বেশি ‘খারাপ’ হয়েছে বলে মনে করে খোদ কমিশন। এ সময় সহিংসতা অন্যবারের চেয়ে বেশি হওয়ার বিষয়টি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)ও স্বীকার করেন।
পুরো নির্বাচনে প্রায় দেড় শ’ জন নিহত হয়। এর মধ্যে নির্বাচনপূর্ব সংঘর্ষে ৪৫ জন, ভোটের দিন সংঘর্ষে ৪৬ জন এবং ভোটের পর সংঘর্ষে ২০ জন নিহত হয়। প্রাণহানিতে অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে আচরণবিধি ভঙ্গের বিরুদ্ধে কখনো নির্বাচন কমিশনকে কঠোর হতে দেখা যায়নি। এটাও সহিংসতা বৃদ্ধির বড় কারণ।
ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম প্রচলন শুরু করে। পরিকল্পনা ছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে এই মেশিনের পর্যাপ্ত ব্যবহার করে জনপ্রিয়তা অর্জনের পর, ২০১৯ সালের সংসদ নির্বাচনে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করার। কিন্তু রকীব কমিশন এটাকে জনপ্রিয়তা অর্জন তো দূরের কথা ২০১৩ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় নষ্ট হয়ে যাওয়া একটি ইভিএম মেরামত করতে পারেনি। ফলে তারা এই মেশিন বাদ দিয়ে নতুন ডিভিএম বা ডিজিটাল ভোটিং মেশিনের পরিকল্পনা রেখে গেছেন।
২০১১ সালে দেশের সব নাগরিকের হাতেথউন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্মার্টকার্ড তুলে দেয়ার জন্য আইডিইএ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয় বিগত কমিশন। কিন্তু রকীব কমিশন এসে সেই প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফায় বাড়িয়েও দেশের সব মানুষকে স্মার্টকার্ড দিতে পারেনি। ঢাকার ৫০ লাখ ভোটারের মধ্যে বর্তমানে সেই কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে। প্রতি মাসে ১০ লাখ কার্ড বিতরণ হচ্ছে। এ গতিতে কাজ চললে দেশের নয় কোটি ভোটারের হাতে স্মার্টকার্ড পৌঁছানোর কার্যক্রম শেষ করতে ৯০ মাস লাগবে। অর্থাৎ এ কাজ করতে সাত বছরের বেশি সময় লাগবে।
এ ছাড়াও জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের বিষয়টি এত কঠিন করা হয়েছে যে, সাধারণ ভুল ঠিক করতেও এখন মাসের পর মাস ঘুরতে হয় নাগরিকদের। অথচ পাসপোর্ট সংশোধন করতে কোনো ভোগান্তি নেই। শুধু তাই নয়, এনআইডি প্রকল্প এখন ভোগান্তির অপর নাম আর দুর্নীতির আখড়া হয়েছে- খোদ ইসি কর্মকর্তারাই একথা বলেন। রকীব কমিশন এনআইডি প্রকল্পে মানুষের কষ্ট লাঘব তো দূরের কথা উল্টো আরো ভোগান্তির ব্যবস্থা করেছে।
২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত আগারগাঁওয়ে স্থাপিত ইসির নিজস্ব ভবন প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে। এর কাজ এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু এরপরও কেবল নিজেরা বসবেন বলে তড়িঘড়ি করে কাজ অসমাপ্ত থাকতেই ভবন উদ্বোধন করে বর্তমান কমিশন। এখনো বেশির ভাগ কর্মকর্তার রুমে দাফতরিক কাজের উপকরণ সুবিধাগুলো সম্পন্ন করা হয়নি।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/194292