১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
জনপ্রতিনিধি মানেই জনবিরোধী হওয়ার স্বাধীনতা নয়
৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, সোমবার,
প্রতিনিধি, বিশেষ করে জনপ্রতিনিধি বলতে যা বোঝায় তার সঙ্গে একটি দেশের নাগরিকরা প্রায় প্রত্যেকে পরিচিত। এই জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্বের কারণে বিশেষ এলাকার জনগণের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেন, সেসব মানুষদের সার্বিক কল্যাণে নিজেদের নিযুক্ত রাখেন। জনগণের রায় প্রকাশের মাধ্যমে এরা প্রতিনিধি বিবেচিত হন বলেই জনস্বার্থ সংরক্ষণে এদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
 
 
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হন। আবার নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে অবসান ঘটে সেই প্রতিনিধিত্বের; বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য এরা নির্বাচিত হন- যেখানে অধিকাংশ দেশেই জনপ্রতিনিধিত্বের সর্বোচ্চ পর্যায় পার্লামেন্ট।
 
তাত্ত্বিকভাবে এই প্রক্রিয়াকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলা হয়েছে, গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল। বাস্তবে চিত্রটা ভিন্ন। রাজনৈতিক দল, আদর্শ ব্যবসায়ী সমাজ, বিভিন্ন পেশাজীবী সমাজ এখানে নির্বাচিত হন। জনগণের কথা বলা হলেও এসব নির্বাচনের মাধ্যমে জনজীবনে যে বৈচিত্র্য আছে- বিশ্বাস, অবস্থান ও পেশাসহ বিভিন্ন কারণে তার প্রতিফলন এখানে ঘটে না। এই ব্যতিক্রমের জন্য প্রতিষ্ঠান যত না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী ব্যক্তি। কারণ এসব জনগণের প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের সঙ্গে অর্থ ও ক্ষমতা দুই-ই জড়িত। এ কারণেই প্রতিষ্ঠান বলতে সাদামাটা অর্থে যা বোঝায়, জনপ্রতিনিধি বলতে তা বোঝায় না।
 
কিছু পদ্ধতির মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলেও সেই পদ্ধতি বা নিয়মকানুন জনপ্রতিনিধিকে আটকাতে পারে না। সংবিধান ও অন্যান্য আইনের দ্বারা জনপ্রতিনিধিদের আচরণ নিয়ন্ত্রিত হলেও তারা থোড়াই তার তোয়াক্কা করেন। নির্বাচনে জয়লাভের যুক্তিতে ক্ষমতা করায়ত্ত করেন, আত্ম-অহংকারে বলীয়ান হয়ে ওঠেন এবং আচরণ শুরু করেন সামন্ত প্রভুদের মতো।
 
বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের আচরণের সমস্যা সত্যই কঠিন। এমনিতে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিতদের অনেকেই নির্বাচনে জয়লাভ করাকে নিজের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হাতিয়ার মনে করেন। এদের কাছে জনসেবার চেয়ে আত্ম-স্বার্থ সেবা বড় হয়ে দেখা দেয়। এদের অনেকেই এমন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন যা ক্ষমার অযোগ্য।
 
গত কয়েকদিনে দু’জন জনপ্রতিনিধির দুটি ঘটনা জনচিত্তকে বিক্ষুব্ধ ও বেদনাহত করলেও এদের পৃষ্ঠপোষকদের মনকে নাড়া দিতে পারেনি। হাইমচর উপজেলার চেয়ারম্যান কোমলমতি ছাত্রদের নিজের শরীর দিয়ে তৈরি করা পদ্মা সেতুর ওপর জুতো পায়ে হেঁটে গিয়ে প্রবল উল্লাসে বীরত্ব জাহির করলেন। কিন্তু এ জন্য তার শাস্তির কী ব্যবস্থা আছে? ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক বললেন, এজন্য দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু এ শাস্তি কী যথার্থ? তার নিজের সন্তান যদি এমন আচরণের শিকার হতেন তাহলে তিনি কী করতেন? পদ্মা সেতু কী এমন নির্মমভাবে জন-চলাচলের ব্যবস্থা করবে? আরও দুঃখের বিষয় হচ্ছে, উপজেলা চেয়ারম্যানের এই দুষ্কর্মের সঙ্গী হয়েছেন স্কুলেরই প্রধান শিক্ষক, তিনি এর সাফাই গাইতেও ছাড়েননি। ধিক এই শিক্ষককে। কোনো শিক্ষক সমিতিই কিন্তু এই ব্যক্তির নিন্দায় এগিয়ে আসেননি, শিক্ষকতার পেশা যে ক্ষতিগ্রস্ত হল সেটাও তারা উপলব্ধি করেননি। অবশ্য শিক্ষকতায় নিযুক্তির ব্যাপারে যে অভিযোগ আছে তা আমলে নিলে শিক্ষককে অনেকেই ক্ষমা করে দিতে পারে। তবে কোনো কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ যে এমন কাজ করতে পারে তা ভাবা যায় না।
 
আরেকটি ঘটনার অভিযোগ উঠেছে শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র সাংবাদিককে গুলি করেছেন এবং ওই গুলিতে দৈনিক সমকালের স্থানীয় প্রতিনিধি নিহত হয়েছেন। পৌরসভার মেয়র যে গুলি চালিয়েছেন এ দাবি এলাকার এমপিও করেছেন। ক্ষমতাসীন দলের এই মেয়রের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন একজন সাবেক মন্ত্রী, তিনি বলেছেন এটা অনুপ্রবেশকারীদের কাণ্ড হতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারে ওই মেয়র কি দলে অনুপ্রবেশকারী? বর্তমান সরকারের আমলে দলীয় কোন্দলে সংঘর্ষ, হত্যা উল্লেখযোগ্য। হত্যার ঘটনাসহ সব কিছুর দায় চাপানো হয় অনুপ্রবেশকারী, জঙ্গি অথবা জামায়াত-শিবিরের ওপর। ঘটনা থিতিয়ে এলে অভিযোগের তীর ভোতা হয়ে যায়, কারণ তখন অন্য চিত্র সামনে চলে আসে। বিডিআর বিদ্রোহের সময় থেকেই দেশবাসী এ বিষয়টি প্রত্যক্ষ করে আসছে। ক’দিন আগে সুন্দরগঞ্জে এমপি নিহত হওয়ার পর বলা হয় এজন্য জামায়াত-শিবির দায়ী, অথচ ঘটনার এক মাসেরও বেশি সময় পরে যখন কোনো কূলকিনারা পাওয়া যাচ্ছে না, তখন প্রশ্ন দেখা দেয়াটাই স্বাভাবিক। এই জনপ্রতিনিধিও ক’দিন আগে এলাকার একজন নিরীহ শিশুর ওপর গুলি চালিয়েছিলেন। এখন বলা হচ্ছে, জনপ্রতিনিধির ওপর নিরীহ শিশুটি নাকি অ্যামবুশ করেছিল। এসব কর্মকাণ্ডের বিচার কোথায় শেষ হবে কেউ জানে না। আদৌ হবে কি না তারও নিশ্চয়তা নেই। তারা টিকে থাকবেন ক্ষমতাকে সম্বল করে।
 
মাদক ব্যবসায় সংসদ সদস্য জড়িত হওয়া, জনপ্রতিনিধিদের যাতায়াতের সময় স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের তপ্ত রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা, সরকারি কর্মচারীদের মারধর করা এসবই এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার। জনপ্রতিনিধিদের অনেকের জনবিরোধী আচরণ জনগণকে বিক্ষুব্ধ করেছে, কিন্তু তারা কিছু করতে পারছেন না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম না থাকলে এসব ঘটনা লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যেত। আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাক্ষ্য-প্রমাণ যে জনপ্রতিনিধিকে শেষ পর্যন্ত ছুঁতে পারে না, নারায়ণগঞ্জের ঘটনা তার প্রমাণ।
 
ক্ষমতায় আসীন হয়েই জনপ্রতিনিধিরা জনস্বার্থের কথা ভুলে যান। তারা মনে করতে শুরু করেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জনগণ তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। কিন্তু তারা ভুলে যান এই ম্যান্ডেট এক ব্যক্তির দৌরাত্ম্যরে জন্য নয়- বহু মত, পথ ও স্বার্থের সম্মিলনের জন্য।
 
বাংলাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ে বহু জনপ্রতিনিধির জনবিরোধী আচরণের জন্য বিস্তৃত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। নির্বাচন ছাড়া অথবা জালিয়াতির নির্বাচনে অনেকে নির্বাচিত হয়ে প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না, তাদের কাছে জনমতের কোনো গুরুত্ব নেই, কারণ জনমত তাদের ক্ষমতার মসনদে বসায়নি। এছাড়াও দেখা গেছে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে থাকলে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আচরণের স্বাধীনতার কোনো সীমানা থাকে না। স্বাধীনতা পরিণত হয় স্বৈরাচারে। বিদেশে জনপ্রতিনিধিরা নিয়মিত তাদের নির্বাচকমণ্ডলীর সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ রক্ষা করেন। তাদের কর্মকালীন নির্বাচকমণ্ডলী অনেক গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা ভোগ করেন।
 
কে ভালো জনপ্রতিনিধি- এটা অনেক সময় বিতর্কের জন্ম দেয়। কিন্তু এই জনপ্রতিনিধিরা বুঝতে পারেন না তাদের ভালো উপাধি অনেক কিছুর ওপর নির্ভরশীল, ব্যক্তি স্বার্থের ওপর নয়।
 
বাংলাদেশের যেসব জনপ্রতিনিধি জনবিরোধী আচরণের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা জাহির করতে চান- তারা এটা উপলব্ধি করতে পারেন না যে, ক্ষমতার চাকা উল্টো দিকেও ঘোরে, মানুষ মনের গভীরে প্রতিহিংসাকে লালন করে। তারা উপলব্ধি করতে পারেন না, বিরূপ জনমত তৈরিতে তাদের এসব কর্মকাণ্ড যথেষ্ট। তারা বুঝতে পারেন না, জনপ্রতিনিধি মানেই যা করার ইচ্ছা ও জনবিরোধী হওয়ার স্বাধীনতা নয়।
 
মাহফুজ উল্লাহ : সাংবাদিক
http://www.jugantor.com/window/2017/02/06/98858/%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%A7%E0%A6%BF-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%87-%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A7%E0%A7%80-%E0%A6%B9%E0%A6%93%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%80%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%A8%E0%A7%9F