১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
সাংবাদিক শিমুল হত্যা
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, রবিবার,
সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুল হত্যার প্রধান আসামি মেয়র হালিমুল হক মিরুর ফাঁসির দাবিতে শনিবার শাহজাদপুরে সাঁটানো হয়েছে এ রকম পোস্টার (বাঁয়ে), জানাজায় মানুষের ঢল- সমকাল
 
রাজীব নূর ও আমিনুল ইসলাম খান রানা, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) থেকে
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরুর কুকর্ম এবারই প্রথম নয়, বরং ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। কথায় কথায় অস্ত্র বের করা তার স্বভাব। একই কাজ করে মানুষকে তটস্থ রাখতেন তার দুই ছোট ভাই হাবিবুল হক পিন্টু ও হাসিবুল হক মিন্টু। ক্ষমতার দাপটে তিন ভাই ধরাকে সরাজ্ঞান মনে করতেন। সাধারণ মানুষ দূরের কথা, অত্যাচার থেকে রেহাই পেত না দলীয় নেতাকর্মীরাও। মেয়র মিরুর রয়েছে নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী। ওই বাহিনীর অন্যতম নিয়ন্ত্রক তার ভাই পিন্টু। মিরুর অত্যাচারে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী ভয়ে কথা বলতে সাহস পেতেন না। তবে গত বৃহস্পতিবার তার গুলিতে সমকালের শাহজাদপুর প্রতিনিধি, সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুল নিহত হওয়ার পর মুখ খুলতে শুরু করেছেন নেতাকর্মী ও স্থানীয়রা। একে একে বেরিয়ে আসছে তার অপকর্মের তথ্য। মেয়র মিরুর বিচার দাবিতে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে সাংবাদিক সমাজ। প্রতিবাদে গতকাল শাহজাদপুরে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালনের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে হয়েছে বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল ও মানববন্ধন। প্রতিটি কর্মসূচিতে বক্তব্যে স্লোগানে একটি দাবিই বারবার উচ্চারিত হয়েছে- \'ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই, মেয়র মিরুর ফাঁসি চাই\'। 
 
সমকালের অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত মিরুর শুরুটা হয়েছিল জাসদের রাজনীতি দিয়ে, ছিলেন গণবাহিনীর সদস্য। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯৬ সালে দলীয় প্রতীক নৌকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে ভোট করায় ও ২০০৪ সালে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের 
 
অভিযোগে তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। বর্তমানে মিরু জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য। আগে কুকর্ম করলেও বারবারই পার পেয়ে গেছেন মিরু। এবারের মতো অবস্থা কখনই হয়নি তার। এই প্রথমবার তাকে এলাকা ছেড়ে পালাতে হয়েছে। এমনকি মিরুর মোবাইল ফোনটিও বন্ধ রয়েছে। অবশ্য এরই মধ্যে গ্রেফতার হয়েছে তার দুই ভাই হাবিবুল হক পিন্টু ও হাসিবুল হক মিন্টু। তাকে গ্রেফতারে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশ ছেড়ে যাতে পালাতে না পারেন, সে জন্য দেশের সব বিমানবন্দর ও সীমান্তে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়েও আজ সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
 
স্থানীয়দের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, দুই ভাই মেয়র মিরুর কুকর্মে নতুন মাত্রা যোগ করে। তাদের হাতে শিমুল হত্যার প্রেক্ষাপটও তৈরি হয়। বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে উপজেলার মনিরামপুর কালীবাড়ী মোড় থেকে শাহজাদপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বিজয় মাহমুদকে মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যান মেয়রের ভাই পিন্টু। মেয়রের বাড়িতে নিয়ে তাকে মারধর করা হয়। ওই সময় সেখানে মেয়রের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা ছিল। তাদের অনেকের বাড়ি পাবনায়। বিজয়ের সঙ্গে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল বিগত পৌর নির্বাচনের সময় থেকে। সর্বশেষ বিজয়দের বাড়ির সামনের রাস্তা মেরামত ও সংস্কারকাজ অসমাপ্ত রাখা নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। ওই রাস্তার কাজটি পেয়েছেন পিন্টু ও মিন্টুর অনুগত ঠিকাদাররা। বিজয়ের দুলাভাই ভিপি আবদুর রহিম সর্বশেষ পৌর নির্বাচনে নির্বাচিত মেয়র মিরুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। বিজয়কে মারধরের ঘটনার জের ধরেই মেয়র বাড়ির সামনে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। 
 
সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর-এনায়েতপুর) আসনের সরকারদলীয় এমপি হাসিবুর রহমান স্বপন সমকালের সঙ্গে আলাপে জানান, আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে আবদুর রহিমকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন পান মিরু। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মেনে আমরা মিরুর পক্ষে নির্বাচন করি। রহিমকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে-শুনিয়ে ব্যর্থ হয়ে তাকে বহিষ্কার করি। ওই পৌর নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লড়েছিলেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি নজরুল ইসলাম। নজরুলের দাবি, ওই নির্বাচন ছিল শাহজাদপুরের ইতিহাসে সবচেয়ে সহিংস নির্বাচন। নির্বাচনের আগে থেকে অস্ত্রের মহড়া দেয় মিরুর সমর্থকরা। নির্বাচনের দিন পাবনা থেকে সন্ত্রাসীদের এনে জড়ো করা হয়েছিল শাহজাদপুরে।
 
শাহজাদপুরের চরাঞ্চল নলুয়া এলাকার ছেলে মেয়র মিরু। কিন্তু তার বিকাশ পাবনায়। শিক্ষাজীবনের শুরুও পাবনায়। পরে শাহজাদপুর কলেজে পড়তে আসেন। নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয়দানকারী এই মিরু কোথাও কোনো যুদ্ধ করেননি বলে দাবি করেন শাহজাদপুরের মুক্তিযোদ্ধা আজাদ শাহনেওয়াজ ভূঁইয়া। তিনি বলেন, মিরু কোথায় যুদ্ধ করেছেন, তা কেউ জানে না। তাকে শাহজাদপুরের মানুষ এক-আধটু চিনেছেই জাসদের রাজনীতিতে আসার পর। 
 
মিরুর পরিবারের সদস্যদের অনেকেই এখনও জাসদের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তার আলোচিত দুই ভাইয়ের একজন হাবিবুল হক মিন্টু এখনও পাবনা জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। মেয়র মিরুর ভাইয়েরা মূলত পাবনাতেই বসবাস করেন। তাদের নামে পাবনার একটি থানায় মাদকের মামলা রয়েছে। মিন্টুর ঘনিষ্ঠ সহচর মো. নিস্তার হোসেনের নামে হত্যাসহ ১৪টি মামলা রয়েছে। 
 
জানা যায়, শাহজাদপুরে আধিপত্য বিস্তারে এই নিস্তারকে ডেকে আনা হয়। বিগত পৌর নির্বাচনের সময় তার বাহিনী শাহজাদপুরে এসে তাণ্ডব করেছিল। তখন বিদ্রোহী প্রার্থী ও কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বিজয় মাহমুদের সঙ্গে বিরোধ হয়েছিল মিন্টুদের। এর ফলেই বৃহস্পতিবার তাকে ধরে নিয়ে মারধর করা হয়। ওই ঘটনার পর বিজয়ের গ্রামের লোকজন গিয়েছিল হামলা করতে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার পর অস্ত্র হাতে চড়াও হন স্বয়ং মেয়র মিরু। তার ছোড়া গুলিতেই সাংবাদিক শিমুল মারা যান। এরপর মেয়রের লাইসেন্স করা অস্ত্র জব্দ ও তার দুই ভাইকে গ্রেফতার করা হয়। মেয়র শুক্রবার সকালেও ছিলেন নিজের বাসায়। ছিল কড়া পুলিশি পাহারা। সকালে বাসায় বসে টেলিভিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মেয়র দাবি করেন, তিনি আত্মরক্ষার্থে একটি মাত্র গুলি করেছিলেন। পুলিশ স্পষ্টই তার সঙ্গে দ্বিমত করেছে। ঘটনার বিভিন্ন ফুটেজেও প্রতীয়মান হচ্ছে, টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন সাংবাদিক শিমুল। তবু পুলিশি পাহারা এড়িয়ে মেয়র মিরু পালালেন কেমন করে- এ প্রশ্ন এখন শাহজাদপুরের সবচেয়ে আলোচ্য বিষয়। 
 
এ আলোচনায় ঘৃতাহুতি দিয়েছেন শাহজাদপুর সার্কেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল হাসানাত। তিনি গতকাল শনিবার সকালে শাহজাদপুর পাইলট হাই স্কুল মাঠে শিমুলের জানাজাপূর্ব সমাবেশে বলেন, শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পুলিশ সেখানে যথাসময়ে উপস্থিত হয়েছিল। ঘটনার সময় আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। মেয়রকে বারবার বারণ করার পরও তিনি গুলি ছোড়েন। একাধিক গুলি করেন মেয়র। অন্য কোনো পক্ষ গুলি করেনি। তার ছোড়া গুলিই শিমুলের শরীরে বিদ্ধ হয়। পুলিশের উপস্থিতিতে গুলি করা হলেও কেন তাকে ধরা হলো না- এমন প্রশ্নের জবাবে পরে তিনি সমকালকে বলেন, \'এত বড় একজন লোক, যার বিরুদ্ধে কোনো মামলাও নেই। তাকে হঠাৎ করে ধরব কী করে?\' তবে পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ সমকালকে বলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কেন এ ধরনের বক্তব্য দিলেন, তা আমি অবগত নই। বিষয়টি জানতে হবে। তবে শিমুল হত্যা মামলার আসামিদের ধরতে আমাদের আন্তরিকতার অভাব নেই।
 
আপাতত গ্রেফতার এড়িয়ে গেলেও জানা যায় আজই দল থেকে বহিষ্কৃত হতে যাচ্ছেন মেয়র মিরু। সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন অবশ্য বললেল, বহিষ্কার নয়, উপজেলা আওয়ামী লীগ হয়তো মেয়রকে বহিষ্কারের সুপারিশ করবে। পুলিশ সুপারের মতোই এমপি অপরাধীদের গ্রেফতার করা হবে বলে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আমাদের দল কারোর ব্যক্তিগত অপকর্মের দায় নেবে না। দলের মাঠপর্যায় থেকে দলের শীর্ষ নেতারাও তা-ই বলছেন।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/02/05/268039#sthash.SECdjg3d.dpuf