২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
রাজনৈতিক সঙ্কট ও ঐকমত্য
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, রবিবার,
|| সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা ||
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,রবিবার, ০০:০০
 
নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন কমিশন গঠনের তোড়জোড় বেশ আগে থেকেই শুরু হয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতি গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর থেকে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ করেছেন। 
রাষ্ট্রপতির সাথে সংলাপের পর বিএনপির পক্ষ থেকে বেশ সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন করা খুব একটা কষ্টসাধ্য হবে না বলেও উচ্চাশা পোষণ করা হয়েছে বঙ্গভবনের পক্ষে। সংলাপ শেষে রাষ্ট্রপতিকেও বেশ প্রত্যয়ী মনে হয়েছে। কিন্তু এমন আশাবাদ কতখানি বাস্তবসম্মত তা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। 
তবে সংলাপ সমঝোতা নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। আমাদের দেশের কোনো রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান সংলাপের মাধ্যমে হওয়ার নজির পাওয়া যায় না। আমরা যে রাজনীতি চর্চায় অভ্যস্ত, তাতে আশাবাদী হওয়াটা কষ্টসাধ্য। দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। আমরা গণতন্ত্রমনা হয়ে উঠিনি। ক্ষমতাকেন্দ্রিক অতি উচ্চাভিলাষই আমাদের প্রচলিত রাজনীতির উদ্দেশ্যে রূপ নিয়েছে। 
গণতন্ত্র চর্চার নামে ‘ভরং ধরা’ রাজনীতি চলছে। যে রাজনীতিতে আত্মচর্চা ও ক্ষমতাচর্চা আছে; নেই গণমানুষের কল্যাণকামিতা। গণমানুষের স্বার্থই থাকে পুরোপুরি উপেক্ষিত। জনগণের ভোটাধিকারের নামে প্রহসনটাও সাম্প্রতিক সময়ে প্রকট হয়ে উঠেছে। দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ বাজিকরদের হাতে চলে গেছে। এমন মন্তব্য করেছিলেন একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি। আমরা তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণে আমাদের এ বৃত্ত থেকে সহসাই বেরিয়ে আসা উচিত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রাজনীতিকেরা পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। 
এমন দুরবস্থার জন্য ক্ষমতাসীনরা দায়ী হলেও অন্যরাও দায় এড়াতে পারেন না। কারণ ‘লঙ্কা গিয়ে রাবণ’ হওয়ার পুরনো অভ্যাসটা সবার।
বাস্তবতা হলো আমরা সঙ্কট সমাধানে আন্তরিক হলে এত ‘ঢাক গুড় গুড়’ খেলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি ও সংবিধানের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে। আন্তরিকতা থাকলে বিদ্যমান পদ্ধতিতেই এবং সার্চ কমিটি ছাড়াই আস্থাভাজন নির্বাচন কমিশন গঠন করে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের রেকর্ড আমাদের দেশেই আছে। 
আবার সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করে সবচেয়ে বাজে নির্বাচন অনুষ্ঠানের রেকর্ডটাও কিন্তু আমাদের ঝুলিতেই। রকিব কমিশন গঠনের আগে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ২৪টি রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ করে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিলেন। ‘পর্বতের মূষিক প্রসব’ই বলতে হবে। কারণ এ কমিশনের কোনো অর্জনই নেই, যা কিছু আগে থেকে ছিল তা-ও বিসর্জন দিয়েছে। আবারো রকীব মার্কা কমিশন জাতির ঘাড়ে বসুক তা কেউই প্রত্যাশা করে না।
সে কমিশন জাতিকে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নয়, রক্তাক্ত ও প্রাণঘাতী নির্বাচন উপহার দিয়েছে, যা দেশে-বিদেশে শুধু বিতর্কিতই হয়নি বরং বিশ্ব দরবারে আমাদের দাঙ্গাবাজ অসহিষ্ণু জাতি হিসেবে পরিচয় করে দিয়েছে। কমিশন এতই অথর্ব যে, আদালতের রায় বোঝার মতো যোগ্য লোক কমিশনে ছিলেন কি না সন্দেহ। এ অযোগ্যতার জন্য কমিশনকে দেশের উচ্চ আদালতে ক্ষমাও প্রার্থনা করতে হয়েছে। 
মনে হচ্ছে, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে চিন্তামুক্ত ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ইসি গঠন ও নির্বাচন নিয়ে দেয়া চার দফা এবং ১৪ দলের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে রাষ্ট্রপতিকে দেয়া প্রস্তাব আমলে না নিলেও কোনো আপত্তি থাকবে না বলে জানানো হয়েছে। 
আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের শীর্ষ নেতারা বলেছে, রাষ্ট্রপতি যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই তারা মেনে নেবেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমরা নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার জন্য দলের পক্ষ থেকে চার দফা প্রস্তাব দিয়েছি। রাষ্ট্রপতির প্রতি ক্ষমতাসীনদের অগাধ শ্রদ্ধার বিষয়টিও বেশ নজর কেড়েছে। বিরোধী দলগুলো রাষ্ট্রপতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেছে যা আমাদের দেশের নেতিবাচক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটুখানি সুবাতাসই বলা চলে। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের অতীত সুখকর নয়। 
ক্ষমতাসীনেরা প্রেসিডেন্টের প্রতি এখন যেভাবে শ্রদ্ধা দেখাচ্ছেন বিরোধী দলে থাকতে যদি তেমনটা করতেন তাহলে পুরো দেশটাই তো শান্তির নিকেতনে পরিণত হতো। তারা বিরোধী দলে থাকতে রাষ্ট্রপতিকে গালমন্দ করতেও কসুর করেননি। এমনকি বঙ্গভবনের অক্সিজেন বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছিল দলটির পক্ষে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর নিজেদের মনোনীত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে বেঈমান বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দেয়া হয়েছিল। 
নতুন করে নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির সাফল্য-ব্যর্থতা পুরোপুরি নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার ওপর। কারণ রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাহীন। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া সব কাজের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণে সাংবিধানিকভাবেই বাধ্য। তাই রাষ্ট্রপতির পক্ষে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে কোনো সমাধানে পৌঁছা সম্ভব নয়। আমাদের আত্মঘাতী ও হানাহানির রাজনীতি থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ জরুরি। 
সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ÔIn the exercise of all his functions, save only that of appointing the Prime Minister pursuant to clause (3) of article 36 and the Chief Justice pursuant to clause (1) of article 95, the President shall act in accordance with the advice of the Prime Minister : Provided that the question whether any, and if so what, advice has been tendered by the Prime Minister to the President shall not be enquired into any court.
অর্থাৎ সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোন পরামর্শ দান করিয়াছেন কি না এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোন আদালত সেই সম্পর্কে কোন প্রশ্নে তদন্ত করিতে পারিবেন না।
যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অপরাপর নির্বাচন কশিনার নিয়োগের ক্ষমতা সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে। কিন্তু এক ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের বাইরে যেতে পারবেন না। সংবিধানের ১১৮(১) অনুচেছদে বলা হয়েছে, ÔThere shall be an Election Commission for Bangladesh consisting [the Chief Election Commissioner and not more than four Election Commissioner] and the appointment of Chief Election Commissioner and other Election Commissioners ( if any) shall, subject to the provisions of any law made in that behalf, be made by the President.’
অর্থাৎ [প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনার লইয়া] বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।
সংলাপের শুরুতেই বঙ্গভবনের পক্ষে জানানো হয়েছিল, রাষ্ট্রপতির সাথে সংলাপে দলগুলোর মাঝে অনেক ক্ষেত্রেই ঐকমত্য পাওয়া গেছে। ফলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন করতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না। এমন বক্তব্য এবং সরকার ও বিরোধী দলের নমনীয় মনোভাবে আমরা বেশ আশ্বস্তই হয়েছিলাম। কিন্তু গত ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সাথে সংলাপে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য জনমনে সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি করেছে। 
তিনি সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘নিজেদের মধ্যে’ সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে এ কথা বলার অবকাশ থাকছে যে, সদ্যসমাপ্ত সংলাপে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্যের বিষয়টি উপলব্ধি করেই সংলাপের মাধ্যমে তাদের মনস্তাত্ত্বিক ব্যবধান কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। 
আমাদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। কিন্তু বাস্তবতা অত সহজ নয়। সবার আগে হানাহানি ও বিভেদের রাজনীতি থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া শুধু সংলাপের মাধ্যমেই কোনো সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। জনগণ রাজনীতিকদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণই আশা করে।
smmjoy@gmail.com
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/193149