১৪ নভেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
গতির পথে বিস্তর বাধা , চার লেনের দুই মহাসড়ক
৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শনিবার,
অবৈধ বাজার-টার্মিনাল এবং পার্কিংয়ের কারণে চার লেনে উন্নীত হলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে সুফল মিলছে না। বরং উল্টো পথে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চলাচলে মসৃণ মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়েছে। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই দুই মহাসড়ক নির্মাণের সময় লক্ষ্য ও আশা ছিল যানবাহন চলাচলে গতি আনা, যানজট দূর করা, যাত্রী ও পণ্য পরিবহন দুটিই ত্বরান্বিত করে ভোগান্তি কমানো। কিন্তু অনিয়মের কারণে চার লেনের সুফল মিলছে না।
 
গত বছরের ২ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রথম চার লেনের এ দুই মহাসড়কের উদ্বোধন করেন। তিন হাজার ৮১৭ কোটি টাকায় নির্মাণ করা হয় ১৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। ৬০ হাজার যান চলাচল সক্ষমতাসম্পন্ন এ সড়কে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার গাড়ি চলাচল করে। রফতানি পণ্যের প্রায় ৮০ ভাগ পরিবহন করা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অর্থনীতির \'লাইফ লাইন\' হিসেবে পরিচিত। 
 
এক হাজার ৮১৫ কোটি টাকায় নির্মাণ করা হয় ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। দুটি প্রকল্পেই এখনও ওভারপাস, ড্রেন, মিডিয়ান (সড়ক বিভাজক), সৌন্দর্যবর্ধনের মতো কিছু কাজ বাকি রয়েছে। তবে মূল সড়কের কাজ প্রায় শতভাগ শেষ হয়েছে। 
 
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নবনির্মিত চার লেন মহাসড়কের দখলবাজি নিয়ে। গত বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, \'চার লেনের রাস্তাগুলোও 
 
দখল হয়ে গেছে। বাজার আর পার্কিংয়ের স্থান হয়েছে। যানজট হচ্ছে। অসহনীয়, অসহ্য দুর্ভোগ যখন আমার সামনেই হয়, তখন কী করে 
 
নিজেকে সফল মন্ত্রী দাবি করি?\'
 
গত এক সপ্তাহে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ সরেজমিন ঘুরে দেখেন সংশ্লিষ্ট এলাকার সমকাল প্রতিনিধিরা। তারা জানান, কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত চার লেনে উন্নীত হওয়া ১৯২ কিলোমিটার মহাসড়কের কোনো অংশই ভাঙাচোরা নয়। রাস্তার মাঝ বরাবর সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত মিডিয়ান মহাসড়ককে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কিন্তু এসবের কিছুই কাজে লাগছে না দখল ও গাড়ি চলাচলে অনিয়মের কারণে। একই চিত্র ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও। শ্রীপুরের জাতীয় উদ্যান অংশ বাদে জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে ভালুকা পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশেই অবৈধ বাজার ও পার্কিং যান চলাচলকে বিঘি্নত করছে। দুটি মহাসড়কেই দাপিয়ে চলছে অটোরিকশা, ইজিবাইক, নছিমন ও ভটভটির মতো নিষিদ্ধ যানবাহন। 
 
সরেজমিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক :সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাড়কের গ্গ্ন্যাক্সো অ্যারোমা থেকে এক কিলোমিটার দূরে কালু শাহ সেতু পর্যন্ত দুই পাশেই গড়ে উঠেছে ট্রাকের অবৈধ পার্কিং এলাকা। যান চলাচলের জন্য অবশিষ্ট রয়েছে ৮০ ফুট প্রশস্ত মহাসড়কের মাত্র ৩০ ভাগ। বাকি অংশ দখল করে গড়ে উঠেছে \'পার্কিং এলাকা\'। এমনকি রাস্তার মিডিয়ানেও গাড়ি পার্ক করা হয়েছে। ফলে যানবাহন কাঙ্ক্ষিত গতিতে চলতে পারছে না। যানজট হচ্ছে। ইউটার্ন নিতে মাত্র এক কিলোমিটার বেশি পথ চলতে হয়, তাই উল্টো পথে দু-তিন কিলোমিটার যাচ্ছে কাভার্ডভ্যান ও প্রাইমমুভারের মতো বিশালাকারের গাড়ি। আর যেখানে-সেখানে টার্মিনাল বানিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো হয়ে উঠেছে নিত্যদিনের ঘটনা। 
 
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রকল্প পরিচালক আফতাব হোসাইন খান সমকালকে জানান, অবৈধ পার্কিং, বাজার ও উল্টো পথে গাড়ি বন্ধ করতে হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে কয়েকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয়নি। তিনি বলেন, \'মানুষ সচেতন না হলে জোর করে নিয়ম মানানো সম্ভব নয়। চালক, মালিক, যাত্রী সবাইকে বুঝতে হবে, মহাসড়ক তাদের মহাসম্পদ। এতে গাড়ি পার্ক করলে, উল্টো পথে চললে তাদেরই ক্ষতি।\'
 
গত নভেম্বরে মন্ত্রীর নির্দেশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এর কিছু দিন পর আবারও মহাসড়কে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা। এর আগের বছরও একযোগে সারাদেশে \'জোরদার\' উচ্ছেদ অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছিল সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। কয়েক দিন পর অভিযান গতি হারায়। সড়ক দখলদারদের কবলে থেকে যায়।
 
দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা :বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন সমকালকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ভ্রমণের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, \'চার লেনের কাজ শেষ হওয়ার পর আশাবাদী ছিলাম নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারব। কুমিল্লায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, গাড়িতে বসে প্রকৃতি দেখব, গান শুনব। কিন্তু রাস্তায় নেমে অবাক হয়েছি! উল্টো দিক থেকে হু হু করে গাড়ি আসছে। যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্ক করা হয়েছে। বিশাল সড়ক গলিতে পরিণত হয়েছে।\'
 
গত বুধবার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসা যাত্রী হামিদুর রহমান জানান, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসতে কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা লাগে। চার ঘণ্টায় আসার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে। 
 
সরেজমিন ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক :সরেজমিন দেখা যায়, ভালুকার সিড স্টোর থেকে ২৫ কিলোমিটার পথে বসেছে আটটি বাজার। এসব বাজারের কারণে চার লেন তিন লেনে পরিণত হয়েছে। জৈনা বাজারে চার লেনের দুই লেনই দখল হয়ে গেছে। মহাসড়কের পাঁচটি স্থানে যাত্রী ওঠানামার জন্য বিশাল বাস বে নির্মাণ করা হলেও মূল রাস্তার ওপর দাঁড়িয়েই যাত্রী ওঠানামা করা হচ্ছে। রাস্তায় বসেছে অবৈধ ট্রাক টার্মিনাল। সড়কের আশপাশের শিল্প-কারখানাগুলোর বিশাল গাড়িগুলো পার্ক করা হয়েছে সড়কের ওপর। যানবাহনের গতি কমিয়ে দিচ্ছে এ ধরনের বাজার ও পার্কিং। 
 
অভিমত :গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামছুল হক সমকালকে বলেন, \'শৃঙ্খলা না এলে মহাসড়ক আট লেনে উন্নীত করেও কোনো লাভ হবে না। অবৈধ পার্কিং, অবৈধ বাজার ও অবৈধ যান চলাচল বন্ধ না হলে চার লেনের সুফল কোনোভাবেই পাওয়া যাবে না। কয়েকদিন হয়তো ভালো যাবে। গাড়ি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অতীতের অসহনীয় সেই দুর্ভোগ আবারও ফিরে আসবে।\' 
 
ট্রাক-কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের বন্দরবিষয়ক সম্পাদক সহিদুর রহমান টিপু সমকালকে জানান, দীর্ঘ ১০ বছরের ভোগান্তি সহ্য করে পাওয়া চার লেনে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। দূরত্বের হিসাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে চার ঘণ্টা সময় লাগার কথা। এখনও ৬-৭ ঘণ্টা সময় লাগছে। 
 
এস আলম পরিবহনের চালক মুর্শেদ হোসেন জানান, রাস্তার দু\'পাশে গড়ে ওঠা পার্কিং আর উল্টো পথে আসা গাড়ির কারণে কাঙ্ক্ষিত গতিতে বাস চলতে পারছে না। কোথাও কোথাও রাস্তার মাঝ বরাবর পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যান ও প্রাইম মুভারের মতো বড় বড় গাড়িও পার্ক করা হচ্ছে।
 
চার লেন হলে দুর্ভোগ থাকবে না এ আশায় মহাসড়ক দুটির নির্মাণকাজ চলার সময় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের। ২০০৫ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২০০৬ সালে কাজ শুরু হয়। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১২ সালের জুনে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কাজ শেষ হওয়ার ছিল ২০১৩ সালের জুনে। মূল সড়কের অধিকাংশ কাজ শেষ হয় গত বছরের জুলাইয়ে। এখনও একটি অংশের কাজ চলছে।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/02/04/267762#sthash.Adv4H2my.dpuf