১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
আমাদের রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা : আত্মপক্ষ
৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শনিবার,
এবনে গোলাম সামাদ :
 
ভাষা ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে যেসব দার্শনিক বিশেষভাবে ভেবেছেন, তার মধ্যে জার্মান দার্শনিক Johann Gottlieb Fichte জোহান গটলিব ফিকট (১৭৬২-১৮১৪) বিশেষভাবে খ্যাত হয়ে আছেন। ফিকটের মতে, যেসব মানুষ এক ভাষায় কথা বলে, তারা হলো একজাতিভুক্ত। ভাষা স¤পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করে জাতীয় ভাব। তারা একত্রে সৃষ্টি করতে চায় একটি রাষ্ট্র। এভাবেই মানুষের রাষ্ট্রচেতনা ও ভাষাচেতনা একীভূত হয়ে পড়ে। ভাষা জাতি গঠনের ভিত্তিভূমি।’ কিন্তু ফিকটের এই কথাকে সর্বতোভাবে সমর্থন দেয়া চলে না। ভাষা জাতি গঠনের মূল্যবান উপাদান হলেও রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে আরো অনেক উপাদান থাকতে পারে। যেমন ধর্ম। অস্ট্রিয়ানরা জার্মান ভাষায় কথা বলেন। জার্মান ভাষা তাদের মাতৃভাষা। কিন্তু অস্ট্রিয়ানরা বর্তমান জার্মানির সঙ্গে একীভূত হয়ে এক রাষ্ট্র গড়তে চান না। এর একটি বড় কারণ হলো, ধর্মবিশ্বাস। অস্ট্রিয়ানরা হলেন ক্যাথলিক খ্রিষ্টান ধর্মে বিশ্বাসী। অন্য দিকে, বর্তমান জার্মানরা প্রধানত প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান। জার্মানভাষী অস্ট্রিয়ানরা তাই চাচ্ছেন না বর্তমান জার্মানির সাথে একীভূত হতে। এই না চাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্য ঐতিহাসিক কারণও আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরি মিলেছিল অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান রাষ্ট্র। অস্ট্রিয়া আগেও জার্মানির অংশ ছিল না। হিটলার ছিলেন অস্ট্রিয়ার লোক। তিনি জার্মানিতে ক্ষমতায় আসার পর জোর করে অস্ট্রিয়াকে জার্মানির সাথে যুক্ত হতে বাধ্য করেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রিয়া আবার পরিণত হয় একটা পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রে। রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে ধর্ম পালন করতে পারে বিশেষ ভূমিকা। সব বাংলাভাষী মানুষ মিলে একটি রাষ্ট্র গঠিত হতে পারেনি। এর মূলেও আছে ধর্মচেতনার পার্থক্য। এটা একটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা। ধর্মের সংজ্ঞা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। বিখ্যাত মার্কিন সমাজতাত্ত্বিক এল টি হবহাউজের মতে, ধর্ম হলো মানুষের আবেগজড়িত নীতিচেতনা Emotionalized Ethics। তার দেয়া এই সংজ্ঞাকে মেনে নিলে বলতে হয়, ধর্মকে বাদ দিয়ে রাজনীতি সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের একটি কাজ হলো, আইন তৈরি করা। আর আইন তৈরি করতে গেলে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের ধারণা না এসেই পারে না। ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দের ধারণা, আরেক কথায় হালাল হারামের ধারণা আমাদের ধর্মচেতনার ওপর নির্ভরশীল। তাই রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়তে চায় ধর্মবিশ্বাস। একে এড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি তাই শেষ পর্যন্ত হতে পারে না। মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। মানুষ এই সীমাবদ্ধতাকে পুষিয়ে নিতে চায় বিশ্বাসের দ্বারা। এ থেকে এসেছে ধর্মচেতনা। যাকে বলা হয় ভাবাদর্শ, তাকেই আবার কিছুটা অন্যভাবে বলা যায় মতাদর্শ। জার্মান দার্শনিক হেগেল বলেছিলেন, মানুষ ভূল করে। কারণ সে সামগ্রিকভাবে সবকিছুকে বিচার করতে চায় না। কিন্তু কাকে বলব ‘সমগ্র’ আর কাকে বলব ‘খণ্ড’, সেটা ঠিক করার কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই। সমগ্র জ্ঞান আর খণ্ড জ্ঞান হলো, শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসেরই ব্যাপার। মানুষ চিরদিন বাঁচে না। এটা একটা পরম সত্য। তথাপি প্রিয়জন মারা গেলে মানুষ থামাতে পারে না কান্না। এই যে কান্না, এটাও একটা পরম সত্য। মানুষের জীবন কেবল যুক্তি দিয়ে চলে না। তার জীবনে আবেগেরও স্থান আছে। রাজনীতিতে আবেগের প্রশ্ন আসে। আবেগ জড়িয়ে আছে ধর্মচেতনার সাথে। একটা ঢালু জায়গায় একটা মার্বেল গড়িয়ে দিলে তা গড়িয়ে আসতে চাইবে নিচের দিকে। এটা পদার্থ বিজ্ঞানের নিয়ম। কিন্তু ঢালু জায়গাটির ওপর দিকে কিছু খাদ্য রেখে একটা ইঁদুরকে ছেড়ে দিলে সে খাদ্যের আশায় ঢালু জায়গা বেয়ে উঠতে চায় ওপরের দিকে। এটা হলো প্রাণিবিজ্ঞানের নিয়ম। সব বিজ্ঞানের নিয়ম এক নয়। এটাও মনে রাখার বিষয়। গণিতের হিসাব বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মূল্যবান। কিন্তু গণিতের মাধ্যমে বিশ্বের সব কিছু যে বিচার করা যায়, সেটা সত্য নয়। একটা ঘরোয়া দৃষ্টান্ত নিয়ে বিষয়টিকে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। কোনো ব্যক্তি ২০ বছরে তিন হাত লম্বা হলে, ৪০ বছরে ছয় হাত লম্বা হয়ে যায় না। বাস্তব জগতের সব কিছু গণিতের ছকে চলে না। তার আছে নিজস্ব নিয়ম। মানুষ সত্য সৃষ্টি করতে পারে না। সে সত্যকে আবিষ্কার করতে পারে মাত্র। আর সেটা করতে গেলে বাস্তব জগতের ঘটনাগুলোকে বিশ্লেষণ করতে হয়। আমাদের দেশের মুক্তচিন্তাবিদেরা মুক্তচিন্তার গৌরব করছেন। কিন্তু মুক্তচিন্তা বাস্তব জগতের ঘটনাগুলোকে অস্বীকার করে অগ্রসর হতে পারে না। মুক্তচিন্তা বলে কিছু হতে পারে না। অন্য দিক থেকে বলা যায়, মানুষ কেবল সত্যের সাধক নয়, সে রূপকথারও রচক। তাই সে রচনা করে কল্পকাহিনী। মানুষের জীবনে কল্পকাহিনীরও প্রয়োজন আছে। কল্পকাহিনীর মাধ্যমে মানুষ তার জীবনের দুর্ভাবনাকে ঝেড়ে ফেলে বেঁচে থাকতে পারে। না হলে জীবন ভরে যেত শূন্যতায়।
এসব কথা মনে আসছে আমাদের দেশের মুক্তচিন্তাবিদদের কথাবার্তা শুনে। তার রব তুলেছেন, ছাত্রদের পাঠ্যবইয়ের ইসলামীকরণ করা হচ্ছে। কিন্তু এই ‘ইসলামীকরণ’ বলতে ঠিক কী বুঝতে হবে সেটা থাকছে অস্পষ্ট। ইসলামের ভিত্তি আল কুরআন। আল কুরআনে বলা হয়েছে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষকে আহার্য প্রদান করতে। ছেলেরা যদি এটা শেখে এবং ক্ষুধার্ত মানুষকে আহার্য প্রদানে উদ্বুদ্ধ হয়, সেটাকে কি বলা হবে কুশিক্ষা? হেফাজতে ইসলাম ঠিক কী চায়, সেটা জানি না। তবে ইসলাম একটা পথে ফেলে দেয়ার মতো ধর্ম নয়। এর নীতি-চেতনা যথেষ্ট উন্নত, যা হতে পারে আমাদের জাতির জন্য যথেষ্ট শিক্ষাপ্রদ।
ইসলামের ইতিহাসে দেখি, আব্বাসীয় খলিফা আল মামুন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বায়তুল-হিকমাহ। আরবিতে বায়েত মানে হলো, বাড়ি। আর হিকমাহ মানে হলো, জ্ঞান। বায়তুল-হিকমাহর একটা কাজ ছিল অন্য ভাষা থেকে বিশেষ করে গ্রিক ভাষা থেকে গ্রন্থের অনুবাদ। সংস্কৃত ভাষা থেকেও এখানে গ্রন্থ অনুবাদের ব্যবস্থা ছিল। এখানে অনূদিত হয় সৌর সিদ্ধান্ত নামক সংস্কৃত ভাষায় লিখিত জ্যোতির্বিজ্ঞানের গ্রন্থ। বায়তুল-হিকমাহর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল একটি মানমন্দির, যা ছিল সে সময়ে খুবই বিখ্যাত। বায়তুল-হিকমাহর ছিল বিরাট গ্রন্থাগার। এর গ্রন্থাগারিক ছিলেন বিখ্যাত গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর খারেযমী। ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস তাই খাটো করে দেখার মতো নয়। আমি মনে করি, এই ইতিহাসের বিশ্লষণ ও ব্যাখ্যা আমাদের দেশের ছাত্রদের জন্য হতে পারে খুবই শিক্ষাপ্রদ। কিন্তু আমাদের দেশে এর প্রচলন নেই। যদি এর প্রচলন হয় তবে সেটা নিশ্চয় আমাদের দেশের জন্য কোনো ক্ষতির কারণ হবে না। ইউরোপের মধ্যযুগ (৩৯৫-১৪৫৩ খ্রি:) আর এশিয়ার মধ্যযুগের চরিত্র এক নয়। কিন্তু আমাদের দেশের মুক্তচিন্তাবিদরা বলছেন, ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা অনুসরণ করলে আমরা নাকি হয়ে উঠব একটা মধ্যযুগীয় দেশ। এরা ইতিহাস পাঠ করতে চাচ্ছেন ইউরোপের ইতিহাসের ধারায়; প্রাচ্যের বা ওরিয়েন্টাল ইতিহাসের ধারায় নয়।
ধর্ম ভাষাকে প্রভাবিত করেছে। বিলাতের রাজা প্রথম জেমস (১৫৬৬-১৬২৫) করান বাইবেলের ইংরেজি অনুবাদ। বাইবেলের প্রাচীন কাণ্ড হিব্র“ ভাষায় রচিত। আর নবীন কাণ্ড রচিত গ্রিক ভাষায়। রাজা প্রথম জেমসের নির্দেশে ৪৭ জন পণ্ডিত তাদের সমবেত চেষ্টায় ইংরেজি ভাষায় বাইবেল অনুবাদ সম্পন্ন করেন। বাইবেলের ইংরেজি এরপর প্রভাবিত করে সাহিত্যের ইংরেজি গদ্যকে। ইংরেজি বাইবেল খুবই প্রসিদ্ধ হয়ে আছে ইংরেজি সাহিত্যে। ক’দিন আগে আমরা দেখলাম ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইংরেজি বাইবেল ছুঁয়ে শপথবাক্য পাঠ করতে। যুক্তরাষ্ট্র একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এখানে এ পর্যন্ত যতজন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, প্রায় সবাই ইংরেজি বাইবেল ছুঁয়ে পাঠ করেছেন শপথবাক্য। এমনকি বারাক হোসেন ওবামা, যার পিতা ছিলেন মুসলমান, তাকেও শপথ করতে হয়েছিল এই বাইবেল ছুঁয়ে। ধর্মের প্রভাব তাই আছে মার্কিন রাজনীতিতেও। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। কিন্তু এর ২৯টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ২১টিতে আইনত গরুর গোশত খাওয়া যায় না। কেননা গরুর গোশত খাওয়া হিন্দু ধর্মমতে নিষিদ্ধ। মানুষকে নিয়ে রাষ্ট্র। মানুষ ধর্মনিরপেক্ষ না হলে, রাষ্ট্র তাই ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে না। ধর্মের প্রভাব থেকেই যায়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট কেবল বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার রক্ষক নন, তিনি ইসলামেরও রক্ষক। কেননা, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। ছাত্রপাঠ্য বইয়ে এমন কিছু বিষয় ছিল, যা ইসলামের মূল বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই সেগুলো বাদ দেয়া হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের দাবির জন্য নয়। হতে পারে হেফাজত কিছু দাবি তুলেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলিম জনমত এই পরিবর্তনকে গ্রহণ করেছে। এটা কোনো বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর দাবির জন্য ঘটেনি।
‘মুসলিম মৌলবাদ’ কথাটা অর্থহীন। Fundamentalist শব্দটার উদ্ভব হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে। ফান্ডামেন্টালিস্ট, এর বাংলা করা যেতে পারে ‘মৌলবাদী’। মৌলবাদী বলতে বোঝায় এমন একদল খ্রিস্টানকে, যারা বাইবেলকে আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাস করেন। তারা জীব বিবর্তনবাদে বিশ্বাস করেন না। যুক্তরাষ্ট্রে এখনো যত দূর মনে পড়ছে, ১৪টি অঙ্গরাষ্ট্রে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রিক অনুদান গ্রহণ করে, সেখানে জীব বিবর্তনকে সত্য বলে পড়ানো চলে না। মুসলমানেরা আল কুরআনকে সত্য বলে মনে করেন। কিন্তু সেই সাথে আবার মনে করেন, কুরআনের বাণীকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। ইসলামে কুরআনের বাণীকে ব্যাখ্যা করার স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে। বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক ইমাম আল গাজ্জালীর মতে, আল কুরআনের সূরা নূরের ৩৫ নম্বর আয়াতের হতে পারে ৭০ হাজার রকম ব্যাখ্যা। ইসলামে তাই মৌলবাদ কথাটা খ্রিষ্টান ধর্মের মতো অর্থবহ নয়। ইসলামে দেয়া হয়েছে অনেক বেশি চিন্তার স্বাধীনতা।
আমাদের দেশে ইতিহাসকে এখন পড়ানো হচ্ছে খুবই ওলটপালট করে যেটা বন্ধ হওয়া দরকার। যেমন, আমরা এখন একুশে ফেব্র“য়ারিকে উদযাপন করছি ‘মাতৃভাষা’ দিবস হিসেবে। কিন্তু আমাদের ভাষা আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করা। আমরা উর্দুর সাথে চেয়েছিলাম বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করতে। আমরা উর্দুকে বাদ দিতে চাইনি। আমরা বাংলাকে চাপিয়ে দিতে চাইনি তদানীন্তন পাকিস্তানের আর চারটি প্রদেশের মানুষের ওপর। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আর মাতৃভাষার আন্দোলন সমার্থক নয়। জিন্নাহ সাহেব কখনোই বলেননি, বাংলাভাষী মুসলমানকে বাংলা ভাষা পরিত্যাগ করে হতে হবে উর্দুভাষী। খাজা নাজিমউদ্দিনের মাতৃভাষা বাংলা ছিল না। তাদের পরিবারে চলত উর্দু ভাষা। একইভাবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাতৃভাষা বাংলা ছিল না। সোহরাওয়ার্দীর পরিবারেও প্রচলিত ছিল উর্দু ভাষা। ১৯৫১ সালের ২৪ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত হয় জিন্নাহ আওয়ামী লীগ। ১৯৫২ সালের ২৪ ফেব্র“য়ারি সোহরাওয়ার্দী জিন্নাহ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের হায়দরাবাদে এক সভায় বলেন, যে আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তদনুসারে উর্দুই হতে হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, কিন্তু এখন বুঝানো হচ্ছে, কেবল খাজা নাজিমউদ্দিনই ছিলেন উর্দুর পক্ষে, যেটা সত্য নয়। এভাবে পুরো ইতিহাসকেই দেয়া হচ্ছে ওলটপালট করে। যে তিনজন একুশে ফেব্র“য়ারিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন, তারা কেউই করেছিলেন না ১৪৪ ধারা ভঙ্গ। এখন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এমনভাবে লেখা হচ্ছে। যা সঠিক ইতিহাসনির্ভর নয়। আমি তাদের মৃত্যু নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলছি না। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস যথাযথভাবে লিখিত হওয়া উচিত। একতরফাভাবে নয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আমাদের জাতির ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ব্যাপার। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বিফল আন্দোলন ছিল না। সাবেক পাকিস্তানে উর্দুর পাশে বাংলা ভাষাও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেয়েছিল মর্যাদা। কেবল তা-ই নয়, সাবেক পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক ঢাকায় স্থাপিত হয়েছিল কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড, যা থেকে প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষায় লিখিত নানা জ্ঞানপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন গ্রন্থ; এর আগে যা কখনো হয়নি। অথচ এখন কচিকাঁচা ছেলেদের বোঝানোর চেষ্টা চলেছে ’৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়াটা ছিল একটা ঐতিহাসিক ভুল। অথচ বাস্তবতা হলো, পাকিস্তান না হলে বর্তমান বাংলাদেশ হতো ভারতের অংশ। আর এই অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা হতো হিন্দি। ভাষা আন্দোলন কোনো ধর্মনির্ভর আন্দোলন ছিল না। এর চরিত্র ছিল বিশেষভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ। অবশ্য বাংলাভাষী মুসলমান চাননি ভারতীয় হয়ে যেতে। তাই ভাষা আন্দোলন ভারতীয় হওয়ার আন্দোলন ছিল না।
বাংলাভাষী মুসলমানের বাংলা ভাষাচর্চার ইতিহাস অনেক বিচিত্র। একসময় বাংলার মুসলমান সমাজে চলত মুসলমানি বাংলা। এই বাংলায় ব্যবহৃত হতো প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ। এই ভাষা লেখা হতো বাংলা অক্ষরে। কিন্তু এই বাংলা ভাষায় লিখিত বইয়ের প্রথম পাতা হতো বর্তমানের সাধারণ বাংলা ভাষার বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা। এই বাংলা ভাষায় প্রচুর বই ও পত্রপত্রিকা ছাপা হয়েছে। এর প্রসার এত দূর ছিল যে, খ্রিষ্টান মিশনারিরা এই দেশে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের জন্য এই বাংলা ভাষায় করেন বাইবেলের অনুবাদ। রেভারেন্ড উইলিয়াম গোল্ডসেক নামক জনৈক ইংরেজ মিশনারি সঙ্কলন করেন A Mussalmani Bengali-English Dictionary| কেন কী কারণে এই ভাষাটা ক্রমে ক্রমে অচল হয়ে পড়ে, তা জানা নেই। তবে ভাষাটার বিশেষ প্রতাপ ছিল। একসময় হিন্দুরাও ভাষাটাকে শ্রদ্ধা করতেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় কবি ভারতচন্দ্রের লেখায়। ভারতচন্দ্র বলেছেনÑ
মানসিংহ পাতশায় হৈল যে বাণী।
উচিত যে আরবী পারসী হিন্দুস্থানী॥
পড়িয়াছি সেই মত বণিবারে পারি।
কিন্তু সেই সকল লোকে বুঝিবারে ভারি॥
না রবে প্রসাদ গুণ না হবে রসাল।
অতএব, কহি ভাষা যবনী মিশাল।।
প্রাচীন পণ্ডিতগণ গিয়াছেন কয়ে।
যে হৌক সে হৌক ভাষা কাব্য রস লয়ে॥’
ভারতচন্দ্র ছিলেন নবাব আলীবর্দীর সময়ের লোক। যাকে তিনি বলছেন, যবনী মিশাল ভাষা। যবনী মিশাল ভাষা, তা আসলে ছিল মুসলমানি বাংলা। হিন্দুরা মুসলমানকে যবন বলতেন। যবন কথাটার আদি অর্থ ছিল ‘গ্রিক’। এখানে লক্ষ করার বিষয়, ভারতচন্দ্র বলছেন, সাহিত্যের লক্ষ্য হলো ভাষা নয়, ভাষার মাধ্যমে রস সৃষ্টি করতে পারা। ভাষা উপায় মাত্র, অভীষ্ট নয়। এ দেশে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে মনে হয়, নবাবী আমলে উদ্ভূত মুসলমানি বাংলাই হতো আসল বাংলা ভাষা। মুসলমানেরা যদিও সাধারণভাবে বাংলা লিখেছেন বাংলা অক্ষরে, কিন্তু অনেক সময় তারা আরবি ফারসি অক্ষরেও বাংলা লিখেছেন। মহাকবি আলাওলের লেখা যেসব পুঁথি পাওয়া গেছে, তা লিখিত হয়েছে আরবি-ফারসি অক্ষরে। অবশ্য তার বাংলায় মুসলমানি বাংলার প্রভাব নেই। সিলেট বিভাগে একসময় বিশেষ ধরনের নাগরি অক্ষরে মুসলমানেরা বাংলা লিখেছেন। একে বলা হতো ফুলবাংলা।
উর্দুকে দাবি করা হয় মুসলমানের ভাষা হিসেবে। কিন্তু উর্দুর জন্ম হয়েছে উত্তর ভারতের ব্রজভাষাকে নির্ভর করে। ব্রজভাষার সাথে প্রচুর আরবি-ফারসি মিশিয়ে সৃষ্টি হয়েছে উর্দু। অন্য দিকে, এর সাথে প্রচুর সংস্কৃত শব্দ মিশিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রভাষা, হিন্দি ভাষা। বাংলাদেশে প্রাচীন বাংলা ভাষার সাথে প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ মিশিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল মুসলমানি বাংলা। এর চল এখন আর নাই। তথাপি যে বাংলা আমরা বলি এবং লিখি তাতে আছে আড়াই হাজারের অধিক আরবি-ফারসি শব্দ। এগুলোকে বাদ দিলে বাংলা ভাষা অচল হয়েই পড়বে।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/192856