২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
ভারতীয় পণ্ডিতের বাংলাদেশ তত্ত্ব
৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শনিবার,
এটা আর মোটেও নতুন তথ্য নয় যে, দেশ ও জাতির জন্য লজ্জাকর হলেও এদেশের কিছু সংবাদপত্র বিশেষ করে ভারতীয়দের লেখা নিবন্ধ ছাপাতে পারলে ধন্য ও কৃতার্থ হয়ে যায়। এই সুযোগে ভারতীয়রাও বাংলাদেশের জনগণকে নিজেদের অভিমত এবং পরামর্শের ‘ট্যাবলেট’ গেলানোর চেষ্টা করেন। ‘প্রবীণ সাংবাদিক ও ঝানু কূটনীতিক’ হিসেবে পরিচিত কুলদিপ নায়ারও তেমন একজন। উপলক্ষ পেলে তো বটেই, সুচিন্তিতভাবে উপলক্ষ সৃষ্টি করে হলেও বিভিন্ন সময়ে তাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে দেখা গেছে।
সে কুলদিপ নায়ারই সম্প্রতি আবারও দৃশ্যপটে এসেছেন। তবে কিছুটা রাখঢাক করে। সুকৌশলে। গত ২৫ জানুয়ারি দেশের একটি ‘প্রথম’ শ্রেণীর দৈনিকে ভারতের জাতির পিতা এবং ‘মহাত্মা’ নামে পরিচিত মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর স্থলে চরকার পেছনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদির ছবি ছাপানোর বিরোধিতা করে লেখা নিবন্ধে ব- শত কিলোমিটার ঘুরে তিনি মুসলমানদের ধোলাই করার কসরত করেছেন। মুসলমান বিরোধী সাম্প্রদায়িক মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি কেবল ব্রিটিশ আমলের বেঙ্গল বা বঙ্গ প্রদেশকে পূর্ব বাংলা এবং এর প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে মুখ্যমন্ত্রী বলেননি, পাশাপাশি অন্যভাবেও মিথ্যাচার করেছেন। যেমন তিনি লিখেছেন, কংগ্রেসের সত্যাগ্রহ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী’ শহীদ সোহরাওয়ার্দী নাকি ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’র ডাক দিয়েছিলেন এবং সরকারের পরোক্ষ সম্মতিতে হিন্দু ও শিখদের নাকি ‘কচুকাটা করা’ হয়েছিল! এর প্রতিশোধ নেয়া হয়েছিল বলেই নাকি কয়েক হাজার মুসলমানও জীবন হারিয়েছিলেন! 
অথচ সত্য হলো, ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট পাকিস্তানের দাবিতে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’র ডাক দিয়েছিল অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ এবং হিন্দু ও শিখদের নয়, গান্ধী-নেহরুর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের পাশাপাশি হিন্দু মহাসভার উস্কানি, সমর্থন ও সহযোগিতায় ‘কচুকাটা করা’ হয়েছিল আসলে মুসলমানদের। তাদের সংখ্যাও কয়েক হাজার মাত্র ছিল না। লাখেরও বেশি মুসলমানকে হত্যা করেছিল হিন্দু ও শিখরা। সে হত্যাকাণ্ডের অভিযান চলেছিল কয়েকদিন ধরে। দাঙ্গার আড়ালে মুসলিম হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনাপ্রবাহই ইতিহাসে ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা ম্যাসাকার’ নামে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীকে সে সময় দাঙ্গা থামানোর এবং মুসলমানদের জীবন বাঁচানোর জন্য রাতদিন পরিশ্রম করতে হয়েছিল। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল সে বিষয়ে জানার জন্য পাঠকরা শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি পড়ে দেখতে পারেন (বিশেষ করে পৃষ্ঠা ৬৩ থেকে ৭১ পর্যন্ত)। উল্লেখ্য, মুসলিম লীগের সক্রিয় কর্মী শেখ মুজিব সে সময় প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর অতি বিশ্বস্তজন হিসেবেও দাঙ্গা ও মুসলিম হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন। 
এবার এই নিবন্ধে কুলদীপ নায়ারকে টেনে আনার কারণ সম্পর্কে বলা যাক। অগেই বলেছি, উপলক্ষ তৈরি করে হলেও তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়ে থাকেন। জনগণকে নিজের অভিমত ও পরামর্শের ‘ট্যাবলেট’ গেলানোর চেষ্টাও করেন। বছর দুই আগের কথাই বলা যাক। দেশে তখন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ২০ দলীয় জোটের আহ্বানে অবরোধ চলছিল। সারা দেশ অচল হয়ে পড়েছিল। এতেই মাথা একেবারে খারাপ হয়ে গিয়েছিল বলে ‘তর’ সয়নি মিস্টার নায়ারের। লাফিয়ে দৃশ্যপটে হাজির হয়েছিলেন তিনি। ১৯ জানুয়ারি ঢাকার একটি দৈনিকে ‘নিজেকেই দায়ী করতে পারেন খালেদা’ শিরোনামে লেখা এক নিবন্ধে যথারীতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন তিনি। নানা কথার মারপ্যাঁচে এমন কিছু বক্তব্যও মিস্টার নায়ার হাজির করেছিলেন, যেগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অস্তিত্বের সম্পর্ক রয়েছে। যেমন তিনি লিখেছিলেন, বাংলাদেশ নাকি ‘হাজার হাজার মানুষের রক্তের বিনিময়ে’ স্বাধীনতা অর্জন করেছে! খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি হিসাবে যেখানে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন বলা হয় সেখানে মিস্টার নায়ার ‘হাজার হাজার’ আবিষ্কার করেছিলেন! ওই নিবন্ধে কুলদিপ নায়ারের অন্য তিনটি মন্তব্যও উল্লেখ করা দরকার- এক. ‘প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ এখনো স্বাধীন হয়নি’; দুই. বাংলাদেশীরা নাকি ‘কর্কশ ও যুক্তিহীনভাবে’ নিজেদের শাসন করতে ভালোবাসে এবং তিন. স্বাধীনতাযুদ্ধে সহযোগিতা করেছিল বলে বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা ও সরকারের ব্যাপারে নয়াদিল্লী ‘একটা ভূমিকা রাখতে পারে’। 
ওপরে উল্লেখিত মন্তব্য তিনটির ব্যাখ্যা করলে দেখা যাবে, মিস্টার নায়ার বাংলাদেশকে এখনো ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ মনে করেন না। শুধু তা-ই নয়, সরকার গঠন এবং ক্ষমতার পালাবদলের মতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করার জন্যও ভারতকে উস্কানি দিয়েছিলেন এই ‘ঝানু’ কূটনীতিক। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের সামনে নাকি একটি পথই খোলা রয়েছে- তার ভাষায়, ‘দেশ (জনগণ) পরিষ্কার দুই ভাগে বিভক্ত হবে এবং রাজনৈতিক শত্রুতায় জড়িয়ে পড়বে।’ অমন অবস্থার ‘পরিণত পর্যায়েই’ ভারতকে ‘একটা ভূমিকা’ পালন করার তাগিদ দিয়েছিলেন মিস্টার নায়ার। দ্বিতীয় একটি কারণেরও উল্লেখ করেছিলেন তিনি। সেটা পাকিস্তানের কল্পিত ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ সম্পর্কে। পাকিস্তান নাকি জামায়াতে ইসলামীর মাধ্যমে বাংলাদেশে ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে’ এবং বিএনপি নাকি ‘সব জেনেই’ জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে! মিস্টার নায়ার লিখেছিলেন, ‘খালেদা জিয়া পণ করেছেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ভবিষ্যতেও জোট বাঁধবেন।’ 
এভাবেই একের পর এক প্রসঙ্গ ধরে ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়েছিলেন মিস্টার কুলদিপ নায়ার। বিএনপির মতো ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত প্রধান একটি দল কার সঙ্গে জোট বাঁধবে এবং কোন কৌশলে রাজনীতি করবে সেসব বিষয়ে কোনো ভিনদেশীর নিশ্চয়ই মতামত দেয়ার অধিকার থাকতে পারে না। কিন্তু ভারতীয় সাংবাদিক-কূটনীতিক বলে কথা! নিজের উদ্দেশ্যের প্রকাশ ঘটাতেও দ্বিধা করেননি মিস্টার নায়ার। সে উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা। তিনি জানতেন, বিএনপি যদি জামায়াতে ইসলামীর ‘সঙ্গ’ ত্যাগ না করে এবং দল দুটি যদি জোটবদ্ধ থাকে তাহলে মিস্টার নায়ারের প্রিয় দল ও নেত্রীর সমুহ বিপদের, এমনকি পতনেরও অশংকা রয়েছে। এজন্যই তিনি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই কথা বলেছিলেন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন তিনি বর্তমান সরকারের বৈধতা এবং বেগম খালেদা জিয়ার কথিত সহযোগিতা সম্পর্কে। আগের বছর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের উল্লেখ করে মূলকথায় মিস্টার নায়ার লিখেছিলেন, ওই নির্বাচন নাকি ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ হয়েছিল এবং এতে আওয়ামী লীগ নাকি ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ পেয়েছিলেন! এ পর্যন্ত এসেও থেমে পড়েননি এই ভারতীয় কূটনীতিক। লিখেছিলেন, বেগম খালেদা জিয়ার দাবি ও যুক্তি নাকি ‘হালে পানি পায়নি’ এবং নির্বাচন বয়কট করার মধ্য দিয়ে বিএনপির নেত্রীই আওয়ামী শক্তিশালী রূপকল্পকে ‘বৈধতা’ দিয়েছেন! আরো কিছু মন্তব্য ও অভিমতও প্রকাশ করেছিলেন মিস্টার নায়ার। এসবের মধ্যে একটি মন্তব্য উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি লিখেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা যে রাজনীতিতে পটু তা নতুন নয় (!)।’ আর ‘পটু’ বলেই তিনি বিএনপির নেত্রীকে অবরুদ্ধ করেছেন যাতে তার পক্ষে এমন কোনো বিশেষ জায়গায় যাওয়া সম্ভব না হয় যেখানে গিয়ে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ডাক দিতে পারতেন। 
এভাবেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়েছিলেন কুলদিপ নায়ার। বলা দরকার, অতীতের বিভিন্ন সময়েও তিনি নাক তো গলিয়েছেনই, উপদেশও দিয়েছেন গাঁয়ে না মানা মোড়লের স্টাইলে। মিস্টার নায়ারকে বেশি তৎপর দেখা গেছে সেনাবাহিনীর ব্যাপারে। যেমন ২০১২ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ১৯৭৫ সালে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নাকি রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎখাত চেষ্টার ব্যাপারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে অবহিত করেছিল। কিন্তু সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয়রা নিজেরাই ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকায় শেখ মুজিবকে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। এ ধরনের লেখালেখির ধারাবাহিকতায় পিলখানা হত্যাকাণ্ডকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহেও কম লেখেননি মিস্টার নায়ার। কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, ‘ঝানু কূটনীতিক’ হলেও এমন কিছু তথ্যও তিনি নিজের অজান্তে ফাঁস করে দিয়েছিলেন, যেগুলো পিলখানা হত্যাকা-ে ভারতের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল। ২০১২ সালে বাংলাদেশের একটি প্রশ্নসাপেক্ষ প্রচেষ্টাকেও বিষয়বস্তু বানিয়েছিলেন কুলদিপ নায়ার। বলেছিলেন, কথিত ওই ব্যর্থ প্রচেষ্টা নাকি দিল্লীূর জন্য একটি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে এসেছিল। এর মধ্যে মিস্টার নায়ার দেখেছিলেন নতুন পর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার সুযোগ। তার পরামর্শ ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপারে জনগণের ‘মোহভঙ্গ’ ঘটলেও দিল্লীর উচিত তাদের জানিয়ে দেয়া, আওয়ামী লীগ সরকারকে রক্ষার জন্য ভারত ‘যে কোনো সীমা পর্যন্ত’ পদক্ষেপ নেবে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সবকিছু করবে। 
অন্য একটি তথ্যেরও উল্লেখ করা দরকার। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের উপস্থিতিতে ঢাকায় এক স্মারক বক্তৃতায় এবং পরদিন একটি দৈনিকে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কারণে দু’ দেশের মধ্যকার সম্পর্ক ‘ঐতিহাসিক’। এ সম্পর্ক ‘আরো গভীর’ হয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। স্বাধীনতার পর দু’দেশের সরকার ‘যৌথ অংশিদারিত্বে’ বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠেছিল, ঠিক কোন ধরনের ‘ঐতিহাসিক’ তথ্যের ভিত্তিতে ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথা বলেছেন কুলদিপ নায়ার? প্রশ্নের কারণ, দিল্লীর শাসকদের ভাষা হিন্দি, যার সঙ্গে হিন্দুদের কিছুটা থাকলেও মুসলমানদের দূরতম সম্পর্ক নেই। কখনো ছিলও না। তাছাড়া প্রায় ৯১ শতাংশ মুসলমানের এই দেশ ‘পূর্ব পাকিস্তান’ থাকাকালেও বাংলা ভাষার জন্য উর্দুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা বানিয়ে ছেড়েছে। মুসলমান হয়েও এদেশের মানুষ ভারতীয় ও পাকিস্তানী মুসলমানদের ভাষা হিসেবে আদৃত উর্দুকে যেখানে প্রত্যাখ্যান করেছেন সেখানে কুলদিপ নায়ারদের হিন্দুয়ানী ভাষা হিন্দির সঙ্গে একাত্মতা বোধ করতে পারেন কিভাবে? ইতিহাসের কোন অংশে কথাটা পেয়েছেন তিনি? মিস্টার নায়ার সম্ভবত ভারতের রাজ্য পশ্চিম বঙ্গকে মাথায় রেখে ‘একই’ ভাষার কথা বলেছিলেন, হিন্দুদের সঙ্গে বাঙালি মুসলমানদের মিলিয়ে ফেলেছিলেন। 
এক্ষেত্রেও ইতিহাস কিন্তু কুলদিপ নায়ারকে সমর্থন করে না। কারণ, এক সময় ‘একই’ ভারতের অংশ থাকলেও বাংলাদেশ ভারত থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই বাংলাদেশ দিল্লীর আধিপত্য মেনে নেয়নি। ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও তাই প্রশ্ন ওঠে না। কুলদিপ নায়ার নিশ্চয়ই জানেন, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ‘বঙ্গ’ নামক প্রদেশের অংশ বাংলাদেশের ভারত ভেঙে বেরিয়ে আসার প্রধান কারণটিও ‘ঐতিহাসিক’। ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে মূল ভারতের সঙ্গে সব সময়ই মুসলিম প্রধান এ অঞ্চলের দ্বন্দ্ব ছিল। আর এ দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ ছিল হিন্দুদের শোষণ-পীড়ন। শিক্ষা, ব্যবসা ও চাকরিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলমানরা ছিলেন নির্যাতিত, উপেক্ষিত ও পশ্চাদপদ অবস্থায়। 
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ছিল সে অবস্থারই পরিণতি। পরবর্তীকালে ‘পশ্চিম পাকিস্তান’কেন্দ্রিক শাসক-শোষক ও জেনারেলদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করেও বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরই পরিচয় দিয়েছেন। নিজেরা মুসলমান হলেও ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ পাকিস্তানের সঙ্গে ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে বিলীন হয়ে যাননি।
অর্থাৎ ‘ঐতিহাসিক’ কারণেই নিরংকুশভাবে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। এখানে কুলদিপ নায়ারের জন্য ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে পাড়া মাতানোর কোনো সুযোগ নেই। এ অবস্থায় পরিবর্তন ঘটতে পারতো স্বাধীনতার পর। কারণ ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য করেছিল। কিন্তু আস্থা তৈরির দুর্লভ সে সুযোগটিকেও ভারতই হাতছাড়া করেছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বিপুল ঘাটতির মধ্যে রাখা, অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে নিষ্ঠুরভাবে বঞ্চিত করা, ভূমি ও সমুদ্রের সীমানা নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি ও তা জিইয়ে রাখা এবং সীমান্তে হত্যা পর্যন্ত এমন কোনো বিষয়ের উল্লেখ করা যাবে না, যেখানে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে শত্রুতাপূর্ণ ব্যবহার না করে চলেছে। এজন্যই ভারতের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের মনোভাবও বন্ধুত্বপূর্ণ হতে পারেনি। কিন্তু কুলদিপ নায়ারের চোখে এসবের কিছুই ধরা পড়েনি। তিনি শুধু ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ভাষণ দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করার অশুভ চেষ্টা চালিয়েছেন। বলেছেন, শেখ মুজিবের পর যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা নাকি ‘স্বভাবতই’ ভারতের বিপক্ষে ছিলেন! তাদের মধ্যে ‘পাকিস্তানপন্থী’ মানসিকতার লোকজনও নাকি বেশি ছিলেন- যারা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক পছন্দ করতেন না! এ এক বিচিত্র ‘আবিষ্কার’ই বটে! মিস্টার নায়ার আরো বলেছিলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর এখন নাকি ‘সময় বদলেছে’! শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর ‘সময়’ কেন বদলায়নি, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন মিস্টার নায়ার। বলেছিলেন, শেখ হাসিনা সেবার বহুদিন স্থবির হয়ে থাকা সম্পর্কে ‘গতি’ আনলেও ‘ভারতবিরোধী প্রচারণা’ ও দু’ দেশের মধ্যে ‘দেয়ালের’ কারণে ‘দূরত্ব’ থেকেই গিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, বেগম খালেদা জিয়ার সময় (২০০১-০৬) দু’ দেশের সম্পর্কে নাকি আবারও ‘ছেদ’ পড়েছিল! কিন্তু ‘এখন’ দু’ দেশের সম্পর্ক আবারও ‘ভালো’ হয়েছে এবং এতে মিস্টার নায়ার ‘খুবই খুশি’। নিজের ‘স্বপ্নের’ কথাও শুনিয়েছিলেন কুলদিপ নায়ার। বলেছিলেন, তিনি ‘স্বপ্ন’ দেখেন, ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ অদূর ভবিষ্যতে ‘একই’ মুদ্রা ব্যবহার করবে, ‘একই’ বাজার থেকে ‘একই’ পণ্য কিনবে! এ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য দু’দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব বাড়ানোর জন্যও নসিহত করেছিলেন তিনি। 
আশংকার কারণ হলো, নানা কথার মারপ্যাঁচের মধ্য দিয়ে মিস্টার নায়ার সেবার একটি মেসেজও দিয়েছিলেন। সে মেসেজের মূলকথা হলো, ভারত বিরোধিতার অবসান না ঘটলে বাংলাদেশের জনগণকে ‘চরম মূল্য’ দিতে হবে। কথাটার মধ্য দিয়ে তিনি আসলে সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপারে জনগণের ‘মোহভঙ্গ’ ঘটলেও শেখ হাসিনাকে রক্ষার জন্য দিল্লী ‘যে কোনো সীমা পর্যন্ত’ পদক্ষেপ নেবে। তিনি শুধু এটুকু বলতেই বাকি  রেখেছিলেন, ভারতের কথামতো কাজ না করলে দেশটি তার সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেবে। বিশ্ব জানবে, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ‘মহান উদ্দেশ্য’ নিয়ে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশকে ‘সাহায্য’ করার জন্য ঢুকে পড়তে ‘বাধ্য’ হয়েছে! এভাবেই বাংলাদেশের ব্যাপারে নিজের ‘মাথাব্যথার’ প্রকাশ করেছিলেন কুলদিপ নায়ার। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে অবনতি ঘটানোর পেছনে ভারতেরই যে প্রধান ভূমিকা রয়েছে সে ব্যাপারে সামান্য উল্লেখ পর্যন্ত করেননি তিনি। তার ‘মাথাব্যথা’ শুধু বাংলাদেশের ভারত বিরোধীদের কারণে। কিন্তু তিনি জানাননি, কেন ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশীদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাবের বিকাশ ঘটেছে। তিনি শুধু ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মধুর সংগীত শুনিয়েছিলেন। নিজের ‘স্বপ্নের’ আড়ালে ‘একই’ মুদ্রা, বাজার ও পণ্য ব্যবহারের নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। 
বলার অপেক্ষা রাখে না, কুলদিপ নায়ারের কোনো নিবন্ধের বক্তব্যই সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের পক্ষে আসেনি। জনগণের ‘মোহভঙ্গ’ ঘটলেও শেখ হাসিনাকে রক্ষার জন্য দিল্লীর ‘যে কোনো সীমা পর্যন্ত’ পদক্ষেপ নেয়া সম্পর্কিত বক্তব্যটুকু অবশ্যই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। 
অন্য একটি কথাও পরিষ্কার করেছেন মিস্টার নায়ার। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, কংগ্রেসের স্থলে বিজেপি এবং এরও পর অন্য কোনো দল বা জোট ক্ষমতায় এলেও ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না।
http://www.dailysangram.com/post/270400-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%80%E0%A7%9F-%E0%A6%AA%E0%A6%A3%E0%A7%8D%E0%A6%A1%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6-%E0%A6%A4%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AC