১৯ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
টিপাইমুখ ড্যাম প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছে ভারত? টিপাইমুখ এলাকার মানচিত্র
৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার,
টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। ড্যাম নির্মাণের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র পায়নি সংশ্লিষ্ট নির্মাণ কর্তৃপক্ষ। তা ছাড়া মনিপুরে এ ড্যামের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আন্দোলনের কারণে ড্যাম নির্মাণ কর্তৃপক্ষ গণশুনানি আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছে। গণশুনানিতে মনিপুরের জনগণ ড্যাম নির্মাণের বিরুদ্ধে তাদের স্পষ্ট অবস্থানের কথা জানিয়ে দেয়। টিপাইমুখ বহুমুখী পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে এ পর্যন্ত পাঁচবার গণশুনানি হয়েছে এবং প্রতিবারই মনিপুরবাসী ড্যাম নির্মাণের বিরুদ্ধে তাদের মত প্রকাশ করেছে। ফলে শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশের জন্য মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা সৃষ্টিকারী বহুল আলোচিত টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণ প্রকল্প। 
মনিপুরভিত্তিক দ্য সিটেজেন কনসার্ন ফর ড্যামস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিসিডিডি) নেতা ডোমিনিক হুমি হাশুংয়ের একটি সাক্ষাৎকার সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে দ্য থার্ডপোল এবং দ্য ওয়াইর ওয়েবসাইটে। সেখানে টিপাইমুখ ড্যাম বিষয়ে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। 
ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যে ড্যামের বিরুদ্ধে সচেতনতার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে সিসিডিডি। বরাক ও অন্যান্য নদীতে লকটাক, টিপাইমুখ, মাপিথেলের মতো বৃহৎ পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রভাব বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির অবদান হিসেবে গত বছর নভেম্বরে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া রিভারস উইকে ‘ভাগীরথ প্রয়াস সম্মান’ পুরস্কার পায় সিসিডিডি। 
প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে হুমি হাশুং জানান, টিপাইমুখ প্রকল্পটি ছিল ১৫ শ’ মেগাওয়াট বিদু্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্প। ১৯৮০ সালে প্রথম এ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। তখন বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর শুধু ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। এ ড্যাম প্রকল্প বন্ধ করা না গেলে বিশাল এলাকাজুড়ে বনভূমি, মাছের আধার এবং জীবন জীবিকা ব্যবস্থা বিপন্ন হতো। সুতরাং শুরু থেকেই আমরা এ ড্যামের পরিণতি সম্পর্কে জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ শুরু করলাম এবং জনসাধারণকে আন্দোলনের জন্য ঐক্যবদ্ধ করলাম। আমাদের এ আন্দোলন সরকারের ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। ফলে ড্যাম প্রকল্প ছাড়পত্র পেতে ব্যর্থ হয় এবং নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়। 
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিশ্বের অন্যতম জীববৈচিত্র্যপূর্ণ মনিপুর রাজ্য মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থিত। টিপাইমুখ ড্যাম নির্মিত হলে সে অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির কমপক্ষে ৮০ লাখ গাছ এবং ৪০ লাখ বাঁশঝাড় পানিতে স্থায়ীভাবে তলিয়ে যেত বলে সাক্ষাৎকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। 
টিপাইমুখ ড্যাম প্রকল্প বন্ধ করা গেলেও মাপিথেল ড্যাম বন্ধ করতে না পারা বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হুমি হাশুং বলেন, টিপাইমুখ ড্যামের ক্ষেত্রে জনগণ সচেতন ছিল। ড্যামের পরিণতি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করার ফলে তাদের মধ্যে আবেগ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলনকে একটি সফল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু মাপিথেল ড্যামের ক্ষেত্রে জনসাধারণ ছিল অনবহিত। ফলে তারা ১৯৯৩ সালে সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করে। 
তিনি বলেন, টিপাইমুখ ড্যাম প্রকল্প প্রাথমিক অবস্থায় থাকতেই আমরা এর প্রভাব সম্পর্কে প্রচারণা শুরু করি। ড্যামের কারণে জীবন জীবিকা, সংস্কৃতি, ভিটামাটি কিভাবে বিপন্ন হতে পারে এবং এর ভয়াবহ পরিণতির চিত্র তুলে ধরায় জনসাধারণ খুব সহজেই এসব বিষয় গ্রহণ করল এবং প্রভাবিত করা গেল তাদের। আমরা মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে এসব বিষয়ে অবহিত করলাম তাদের। ফলে ড্যামের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠল। প্রতিবাদ বিক্ষোভে মানুষ বিপুলভাবে অংশ নিলো। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষকে ড্যাম নির্মাণ বিষয়ে গণশুনানির মুখোমুখি হতে হয়। এ শুনানিতে অধিকাংশ মানুষ ড্যামের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেন। 
থার্ডপোলের প্রতিবেদনে বলা হয় প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর পাহাড়ি মনিপুর রাজ্য এখন ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারখানা। একের পর এক ড্যাম নির্মিত হচ্ছে সেখানে। ফলে বিপন্ন হচ্ছে নদী, পরিবেশ, স্থানীয় অর্থনীতি এবং জীবন জীবিকার ব্যবস্থা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো স্থানীয় অধিবাসীদের বাধা আপত্তি উপেক্ষা করে নির্মিত হচ্ছে এসব ড্যাম। দেয়ার ইজ নো হার্ভেস্ট, হাউ উইল উই সেলিব্রেট শিরোনামে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন ভিন্ন ধারার অনলাইনের লেখক জুহি চৌধুরী। 
থার্ডপোলের সাক্ষাৎকারে টিপাইমুখ ড্যাম প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া বিষয়ে মনিপুরবাসীর আন্দোলনের অবদানকে তুলে ধরা হয়েছে। তবে গত প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশে এ ড্যামের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন সংগ্রম চলছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের দিকে ভারত ড্যাম নির্মাণের কাজ শুরুর ঘোষণা দেয়ায় এবং পরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কর্তৃক বারবার ড্যাম নির্মাণের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক বছর পর্যন্ত তীব্র আন্দোলন চলে এ দেশে। টিপাইমুখ ড্যামবিরোধী লাগাতার মিছিল মিটিং সমাবেশ লংমার্চ প্রভৃতি কর্মসূচিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাকা সিলেটসহ দেশের প্রায় সব বড় বড় শহর। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও বারবার তখন বলা হয় বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কিছু ভারত করবে না বলে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। 
সর্বশেষ গত গত রোববার বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এক প্রশ্নের জবাবে জানান, ভারত থেকে পাঠানো একটি চিঠিতে বলা হয়েছে ভারত টিপাইমুখ ড্যামের আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে।
২০১১ সালের ২২ অক্টোবর টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় শক্তিমন্ত্রী, মনিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এনএইসপিসি, এসজেভিএনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর হয় দিল্লিতে। 
টিপাইমুখ ড্যাম প্রকল্পের বিরুদ্ধে মনিপুর রাজ্যে দীর্ঘ দিন ধরে প্রতিবাদ আন্দোলন চললেও ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমে তা কখনো গুরুত্ব পায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে থার্ডপোলের প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশে টিপাইমুখ ড্যামের প্রভাব 
টিপাইমুখ বহুমুখী পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প বিষয়ে ভারতেরই পরিচালিত সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বিরাট এলাকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে, তা অবধারিত। এ ছাড়া ব্যাপক এলাকাজুড়ে সমৃদ্ধ নিবিড় বণভূমি ধ্বংস হওয়া ছাড়াও নানা পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সুপারিশ করা হয়েছে ওই এলাকার মানুষের বিদু্যুৎ সমস্যা সমাধান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য। 
টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হলে ভারতের মনিপুর ও মিজোরাম রাজ্যের ৩০৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। দু’টি রাজ্যের তিনটি জেলার ১৪৫টি গ্রামের ছয় হাজারেরও বেশি লোকজনকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। তাদের সব ফল ফসল এবং জীবিকার অন্যান্য মাধ্যম সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হবে। এ ছাড়া বাঁধ এলাকায় ভূমিকম্প হলে বাঁধ ভেঙে ভারত এবং বাংলাদেশের বিশাল এলাকাজুড়ে ভয়াবহ মানিবক এবং পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। 
টিপাইমুখ প্রকল্প সম্পর্কে ভারত সরকার ২০০৯ সালের দিকে তিনটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার এ সমীক্ষা প্রতিবেদনে এসব তথ্যসহ আরো অনেক বিষয় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী সংস্থা নর্থ ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশন লিমিটেড (নিপকো, ভারতের শক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা) তাদের ওয়েবসাইটে তিনটি শিরোনামে সম্পাদিত এ সমীক্ষা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এর পরিবেশগত প্রভাব কি হতে পারে সেজন্য ‘এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ নামে একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া ‘এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট প্লান’ এবং বাঁধ ভেঙে গেলে দুর্যোগ মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে ‘ড্যাম ব্রেক এনালাইসিস অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্লান’ নামে আরো দু’টি সমীক্ষা পরিচালান করা হয়েছে। শেষের সমীক্ষাটি করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশন। 
বরাক নদী ভারতের নাগাল্যান্ড রাজ্যে প্রবাহিত হয়ে মনিপুর ও মিজোরাম রাজ্য হয়ে দক্ষিণে দীর্ঘ পথপরিক্রমার পর মিজোরাম থেকে আবার সোজা উল্টো দিকে অর্থাৎ উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়েছে দীর্ঘ পাহাড়শ্রেণীর কারণে। উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে আসামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সিলেটে প্রবেশ করেছে। সিলেটের অমলশিদে বরাক নদী দুইভাবে ভাগ হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা নাম ধারণ করে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সিলেট থেকে মাত্র ৬০ মাইল দূরে টিপাইমুখ নামক স্থানে বরাক নদীর ওপর নির্মিত হওয়ার কথা ছিল টিপাইমুখ ড্যাম। 
ভারতের সমীক্ষা প্রতিবেদনে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান সম্পর্কে বলা হয়েছে বরাক এবং বরাক নদীর শাখা টুইভাই নদী যেখানে মিলিত হয়েছে সেখান থেকে ৫০০ মিটার ভাটিতে এ বাঁধের স্থান চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বাঁধের ডান দিকে মনিপুর এবং বাম দিকে পড়েছে মিজোরাম রাজ্য। ১৬২ মিটার উঁচু এ বাঁধের ফলে ১২ হাজার ৭৫৮ বর্গকিলোমিটার অববাহিকা এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর বিশাল অংশ পড়েছে বাংলাদেশের মধ্যে। কিন্তু সমীক্ষা চালানো হয়েছে শুধু ভারতীয় অংশের মনিপুর ও মিজোরাম রাজ্যে। 
সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাঁধ অববাহিকা এলাকায় চারটি উপজাতি বাস করে যারা এ প্রকল্পের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরা হলোÑ নাগা, কুকি, হামারস ও মিজো। অববাহিকা এলাকায় ৯১৫টি গ্রামে ছয় লাখ ৩০ হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। প্রতিবেদনে তামেংলং এবং চুরাচাঁদপুর এ দু’টি জেলায় জলাবদ্ধতা এবং অনেকের কৃষি ও জীবনব্যবস্থা বিপন্ন হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ দু’টি জেলায় দুই লাখ ৪০ হাজার অধিবাসী রয়েছে (২০০১)। প্রায় ছয় হাজার লোককে অন্যত্র স্থানান্তর এবং আরো কয়েক হাজারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তামেংলং ও চুরাচাঁদপুর জেলার ১২টি গ্রাম সম্পূর্ণরূপে পানির নিচে তালিয়ে যাবে। ৯১টি গ্রামের চার হাজার ৭১৬ জন মালিকের ভিটেমাটি, ফল, ফসল, জমিজমা এবং খেতখামার বিপন্ন হবে জলাবদ্ধতার কারণে। এ ছাড়া জলাধার নির্মাণের জন্য আইজাল জেলার ১৭৪টি গ্রামের মধ্যে ৪২টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তামেংলং জেলা চারটি ট্রাইবাল জোনে বিভক্তÑ এর মধ্যে তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চুরাচাঁদপুর জেলা ছয়টি উপজাতীয় ব্লকে বিভক্ত এবং তার মধ্যে দু’টি ব্লক ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 
সমীক্ষা প্রতিবেদনে বরাক নদী সম্পর্কে বলা হয়েছে এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দ্বিতীয় প্রধান নদী ব্যবস্থা। নাগাল্যান্ড থেকে বরাক নদী উৎপত্তি হয়ে টিপাইমুখ হয়ে আসামের কাছাড় এবং করিমগঞ্জ থেকে দু’টি শাখায় বিভক্ত হয়ে সুরমা এবং কুশিয়ারা নাম ধারণ করে সিলেট অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বরাকের শাখা টুইভাই থেকে টিপাই শব্দের উৎপত্তি এবং এ স্থানে টুইভাইর সাথে আবার বরাক নদী মিলিত হওয়ার কারণে এ স্থানের নাম হয়েছে টিপাইমুখ। টিপাইমুখ পড়েছে চুরাচাঁদপুর জেলায়। বরাক নদীতে ১৩৬ প্রজাতির মাছ রয়েছে। প্রকল্প অববাহিকায় রয়েছে ৪০ প্রজাতির মাছ। 
এ দিকে বাংলাদেশের একটি সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত সমীক্ষায় বলা হয়েছে টিপাইমুখ ড্যাম নির্মিত হলে ভবিষ্যতে সিলেটের ২৬ শতাংশ এবং মৌলভীবাজার জেলার ১১ শতাংশ জলাভূমি শুকিয়ে যাবে। এ ছাড়া বারদাল, দামনির হাওর পুরোপরি এবং হাকালুকি ও কাওয়ারদিঘি হাওরের ২৫ ভাগ এলাকা শুকিয়ে যাবে। হাওরের অন্যান্য যে অংশে পানি থাকবে তাতেও পানির তেমন গভীরতা থাকবে না। 
বাংলাদেশ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) পরিচালিত একটি সমীক্ষা প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। 
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সিলেটের অমলশীদে যেখানে বরাক নদী সুরমা এবং কুশিয়ারা নামে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে সেখানে পানিপ্রবাহ বর্ষাকালে ১.৮ মিটার কমে যাবে। কুশিয়ারা নদীতে গড়ে পানিপ্রবাহ কমে যাবে ১ মিটার। অন্য দিকে শুকনো মওসুমে অমলশীদে পানি প্রবাহ ১.৪৮ মিটার বাড়বে। শুকনো মওসুমে জানুয়ারি মাসে এ পানিপ্রবাহ সর্বোচ্চ ২.০৯ মিটার বাড়তে পারে। ফলে সুরমা কুশিয়ার পানিতাত্ত্বিক ব্যবস্থা ধ্বংস হবে এবং এর সাথে ধ্বংস হবে সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা নদী অববাহিকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। এ ছাড়া বাঁধের ফলে বরাক-সুরমা-কুশিয়ারা নদীর তলদেশ কোথাও কোথাও ৯০ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত পলি জমে ভরাট হয়ে যাবে। বন্ধ হয়ে যাবে অনেক শাখা নদীর মুখ। বাঁধের নি¤œ অববাহিকায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত নদীভাঙন মারাত্মক আকার বৃদ্ধি পাবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে টিপাইমুখ ড্যামের ফলে সবচেয়ে বিরূপ প্রভাব পড়বে কুশিয়ারা নদীর ওপর। শুরুতে প্রভাব খুব একটা বোঝা যাবে না কিন্তু ধীরে ধীরে কুশিয়ারা নদী-সঞ্জাত ৭১ শতাংশ জলাভূমি শুকিয়ে যাবে। নদীর ৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত নি¤œ অববাহিকায় এখন যেখানে প্রতি বছর বর্ষাকালে দুকূল প্লাবিত হয় সেখানে আর পানি পৌঁছবে না। এ ছাড়া বর্ষা মওসুমে সুরমা-কুশিয়ারার উজানে ৭১ শতাংশ অববাহিকা বর্ষাকালে কখনো আর বন্যার পানিতে প্লাবিত হবে না। বিপন্ন হবে বিখ্যাত হাকালুকি হাওর।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/192710