২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
ভয়ঙ্কর ফাঁদ মোবাইল নম্বর কোনিং: প্রতারকচক্রের ৯ সদস্য উত্তরা থেকে গ্রেফতার; ডিসি ইউএনও চেয়ারম্যান কেউই রেহাই পাননি
৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার,
কর্মকর্তাদের মোবাইল নম্বর কোনিংয়ের মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আটক ৯ জন : নয়া দিগন্ত
ঝিনাইগাতি উপজেলা চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেনের মোবাইলে হঠাৎ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ফোন। চেয়ারম্যানকে বলা হয় কথা অনুযায়ী কাজ করতে। আর সেই ফোনে সরকারি প্রকল্পের কথা বলে বিকাশের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয় ৭০ হাজার টাকা। ঘটনাটি গত বছর ১২ ডিসেম্বরের। পরে খোঁজ নিয়েই উপজেলা চেয়ারম্যান বুঝতে পারেন তিনি কোনো চক্রের ফাঁদে পড়েছেন। ফলে এ ঘটনার দুই দিন পর ঝিনাইগাতি থানায় একটি জিডি করেন। যার জিডি নম্বর ৫১২। 
একই বছরের ৬ অক্টোবর বি-বাড়ীয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানের মোবাইলে ওই জেলার ডিসির মোবাইল নম্বর থেকে একটি ফোন আসে। ফোনের কণ্ঠটিও ডিসির। সেই ফোনে ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলে দু’টি বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয় ৫০ হাজার টাকা। টাকা পাঠানোর পর আবার টাকা চাওয়া হলে মোবাইল নম্বরটি যাচাই করে উপজেলা চেয়ারম্যান বুঝতে পারেন তিনি প্রতারক চক্রের ফাঁদে পা দিয়েছেন। তাৎক্ষণিক বিষয়টি তিনি জেলা ডিসিকে জানান এবং ১৯ নভেম্বর আশুগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন। যার নম্বর ১২। 
এভাবেই দেশের বিভিন্ন জেলার ডিসি, মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক, ইউএনওসহ বিভিন্ন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মোবাইল নম্বর কোনিং বা স্পুফিং করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সঙ্ঘবদ্ধ একটি চক্র। ‘ইয়েস কার্ড অ্যাপস’-এর মাধ্যমে চক্রটি মোবাইল নম্বর ‘স্পুফিং’ করে নিজেরা বড় সরকারি কর্মকর্তা সেজে প্রতারণা করত। তারা কর্মকর্তার কণ্ঠও জালিয়াতি করত। আর এ চক্রের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন উপজেলা চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। মোবাইল নম্বর কোনিং বা স্পুফিং হচ্ছে (সফটওয়্যারের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তির মোবাইল নম্বর অবিকল নকল করে অন্য নম্বরে ফোন করা যায়)। একই সাথে মোবাইল গ্রাহকের কণ্ঠও জালিয়াতি করা যায়। কোনিং করে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সঙ্ঘবদ্ধ এ প্রতারক চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। তারা গত কয়েক দিনে অর্ধ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
রাজধানীর উত্তরা থেকে গত বুধবার রাতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে র্যাব-৪-এর একটি দল। তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন সেট, বিপুলসংখ্যক সিম, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, অর্থ, সিম কোনিংয়ে জন্য ব্যবহৃত সফটওয়্যার ও অ্যাপস জব্দ করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেনÑ আশরাফুল ইসলাম ওরফে আপেল (২০), মাহমুদুল হাসান (১৯), রাকিবুল ইসলাম (২০), মহিদুল ইসলাম ওরফে মিলন (২০), আবু কাউছার ওরফে সাবু (১৯), নাজমুল হাসান (১৯), আমানুউল্লাহ আমান (২৮), সাগর হোসাইন ওরফে সাগর (২৬), বিল্লাল হোসেন ওরফে বিল্লাল (২১)। র্যাব জানায়, তাদের কাছ থেকে ২২টি মোবাইল ফোন, ৫৩টি সিমকার্ড, দু’টি ল্যাপটপ, চারটি সিপিইউ, পাঁচটি মনিটর, একটি মডেম ও ১৭ হাজার ২৫ টাকা জব্দ করা হয়। 
প্রতারক চক্রটি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোবাইল নম্বর কোনিং করত। সেই নম্বর থেকে চাকরি, সুবিধা পাইয়ে দেয়াসহ নানা প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন লোককে ফোন করত। এভাবে এই চক্রটি অনেকের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিত বলে জানান র্যাব-৪-এর অধিনায়ক লুৎফুল কবীর।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কাওরান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৪-এর অধিনায়ক লুৎফুল কবীর বলেন, কল স্পুফিং-এর মাধ্যমে বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছাড়াও চক্রটি মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত নম্বর ‘স্পুফিং’ করে অধিদফতরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে থেকে বেশ কিছু টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। এ ঘটনায় গত ৫ জানুয়ারি রাজধানীর রমনা থানায় একটি জিডি করা হয়। এ ছাড়াও অধিদফতরের উপপরিচালক র্যাব সদর দফতর বরাবর একটি আবেদন করেন। এমন আরো অনেক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে র্যাব-৪ অপরাধীদের ধরতে কার্যক্রম শুরু করে। পরে বুধবার রাতে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর থেকে প্রতারক চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। 
র্যাব-৪-এর প্রধান জানান, মোবাইল নম্বর কল স্পুফিং করা প্রতারক চক্রের নতুন কৌশল। এই কৌশলের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) বিভিন্ন সরকারি দফতরের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ নম্বর অ্যাপসের মাধ্যমে কল স্পুফিং করা হতো। এভাবে চাকরি পাইয়ে দেয়ার কথা বলে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলে জানান তিনি। 
র্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত প্রতারক চক্রটি জানায়, তারা ‘ইয়েস কার্ড অ্যাপস’-এর মাধ্যমে মোবাইল নম্বর স্পুফিং করে নিজেরা ইউএনও, ডিসি পরিচয়ে গম, চাল এবং অন্যান্য কাজের জন্য বরাদ্দের কথা বলে বিভিন্ন ইউপি চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন জনের কাছ থেকে বিকাশ নম্বরে টাকা হাতিয়ে নিত। তারা দীর্ঘ দিন ধরে ভুয়া নামে মোবাইল সিম রেজিস্ট্রেশন করে এ অপকর্ম করে আসছে। এ অ্যাপসটি বহির্বিশ্বে প্রচলিত। ‘আইটেল মোবাইল ডিলার’ সফটওয়্যারটির রূপান্তরিত সংস্করণ। এ ধরনের সফটওয়্যারগুলোর সার্ভার বিদেশে নানা প্রতিষ্ঠানের হয়ে থাকে। কল করলে কলটি সেই সার্ভার হয়ে বাংলাদেশের গেটওয়ে দিয়ে টার্গেট ব্যক্তির মোবাইলে আসে। যার কারণে যে নম্বরে কলটি আসে, সেটিতে রেকর্ড থাকলেও যার নম্বর ব্যবহার করা হয় সেটিতে কোনো রেকর্ড থাকে না। কারণ এই স্পুফিং কলে কোনো অপারেটরের টাওয়ার ব্যবহার হয় না। প্রতারিত ব্যক্তি যদি সে নম্বরে কল ব্যাক করেন তাহলে কলটি প্রকৃত ব্যবহারকারীর কাছেই যাবে এবং তখনই কেবল প্রতারণার বিষয়টি বোঝা যাবে। 
প্রতারক চক্রটি জানায়, এ সফটওয়্যারগুলোর একটি অংশ তাদের মোবাইলে ইনস্টল করা থাকে এবং আরেক অংশ যেটি ‘বিলিং ম্যানেজার’ নামে পরিচিত, কম্পিউটারে ইনস্টল করা থাকে। যে নম্বর ব্যবহার করে প্রতারণা করা হবে তার জন্য ডলারের বিনিময়ে এ বিলিং ম্যানেজারের মাধ্যমে একটি টঝঊজ ওউ ্ চঅঝঝডঙজউ নিতে হয় এবং মিনিট কিনতে হয়। ক্রয়কৃত মিনিটগুলো দিয়ে মোবাইলের সফটওয়্যারটির মাধ্যমে টার্গেট ব্যক্তির মোবাইলে কল করা হয়। প্রতারণায় ব্যবহৃত এসব অ্যাপসের নিয়ন্ত্রণকারী সার্ভার বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হওয়ায় এবং প্রতারকদের চিহ্নিত করার জন্য সরাসরি কোনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি না থাকায় এ অপরাধীদের গ্রেফতার করা কিছুটা কষ্টকর ও সময়সাপেক্ষ বলে জানায় র্যাব।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/192706