২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
মিটফোর্ডে সেবা পেতে পদে পদে ভোগান্তি: স্বাস্থ্যচিত্র শেষ
৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার,
চিকিৎসার জন্য মিটফোর্ড হাসপাতালের ওপর লাখো মানুষের নির্ভরতা। রাজধানীর পুরান ঢাকা এবং পার্শ্ববর্তী কেরানীগঞ্জের মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান এটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষেরও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করছে দেশের সবচেয়ে পুরনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি। অথচ এই হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগটি রোগীসেবায় কোনো কাজে আসছে না। গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত কোনো রোগী
 
ক্যাজুয়ালটি বিভাগে অস্ত্রোপচারের জন্য গেলে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানো হয়। 
 
অভিযোগ পাওয়া গেছে, অস্ত্রোপচারের জন্য রোগীদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি বিকল থাকায় কম মূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সুবিধা পাচ্ছে না রোগীরা। আছে অনিয়ম-দুর্নীতি এবং দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যও। হাসপাতালের সর্বত্রই ময়লা-আবর্জনা। তবে সেবা পেতে রোগীর ভোগান্তি সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। একাধিক রোগী ও রোগীদের স্বজন সমকালকে জানিয়েছেন, মিটফোর্ড হাসপাতালে সেবা পেতে পদে পদে তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। 
 
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে এ হাসপাতালে ১৫ শয্যার ক্যাজুয়ালটি বিভাগটি চালু করা হয়। আঘাতপ্রাপ্ত ও দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগীদের অস্ত্রোপচারের জন্য একটি অপারেশন থিয়েটারও স্থাপন করা হয়। প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন সংকটের কারণে অপারেশন থিয়েটারটি এ পর্যন্ত চালু করা সম্ভব হয়নি। অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মাইনউদ্দিন আহমেদকে ক্যাজুয়ালটি বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মেডিকেল অফিসার ডা. শাকির আহমেদ আবাসিক সার্জনের দায়িত্ব পালন করছেন। অধ্যাপক, কনসালট্যান্ট ও আবাসিক সার্জনের পদ শূন্য পড়ে আছে। মোট চারজন মেডিকেল অফিসার ওই পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন। অস্ত্রোপচারের জন্য রোগীকে অজ্ঞান করা প্রয়োজন। কিন্তু অ্যানেসথেসিয়া বিভাগে কোনো চিকিৎসক না থাকায় রোগীর অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা, গুলি ও বোমার আঘাতে গুরুতর আহতদের এ হাসপাতালে নেওয়া হলেও তারা সেবা পায় না। 
 
দায়িত্বপ্রাপ্ত আবাসিক সার্জন ডা. শাকির আহমেদ ক্যাজুয়ালটি বিভাগের সংকটের কথা স্বীকার করেন। তিনি সমকালকে বলেন, আহত রোগীরা পুরোপুরি সেবা পায় না_ এ বিষয়টি সঠিক নয়। কোনো রোগী ক্যাজুয়ালটি বিভাগে এলে আমরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে অন্যত্র রেফার করি। অ্যানেসথেসিস্ট ও সার্জারির চিকিৎসক না থাকায় জটিল অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয় না। তাই রোগীদের রেফার করতে বাধ্য হই।
 
ক্যাজুয়ালটি বিভাগের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ডা. মাইনউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, ২০১৫ সালের মে মাসে তিনি মিটফোর্ড হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে যোগদান করেন। তার যোগদানের আগেই ক্যাজুয়ালটি বিভাগে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক বিদেশে চলে যান। পরে সার্জারি বিভাগের একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিছু দিন পর তিনি দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করলে ২০১৬ সালের শেষ দিকে তাকে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়। কিন্তু ক্যাজুয়ালটি বিভাগ থেকে তার কাছে রোগী সম্পর্কিত কোনো তথ্য দেওয়া হয় না। নিজে উদ্যোগী হয়ে ক্যাজুয়ালটি বিভাগে রোগী চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চাইলেও তাকে অন্যরা সহযোগিতা করছেন না। এ কারণে তিনি ওই বিভাগের বিষয়ে এখন আর খোঁজখবর রাখেন না বলে জানান। 
 
অধ্যাপক ডা. মাইনউদ্দিন আরও বলেন, দেশের সবচেয়ে পুরনো হাসপাতালটিতে ক্যাজুয়ালটি বিভাগ চালু হোক_ ব্যক্তিগতভাবে এটি তার চাওয়া। সরকার চাইলে বিভাগটি চালু করা কঠিন কিছু নয়। এ বিভাগটি চালু হলে অনেক মানুষ সেবা পাবে বলে মনে করেন তিনি।
 
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও জরুরি বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ক্যাজুয়ালটি বিভাগটি পুরোপুরি চালু করা যাচ্ছে না। জরুরি বিভাগ থেকে আহত রোগীদের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে না পাঠিয়ে অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণীর দালাল চক্রের সঙ্গে জরুরি বিভাগের কর্মচারীদের সিন্ডিকেট রয়েছে। কমিশনের বিনিময়ে জরুরি বিভাগ থেকে রোগী ভাগিয়ে তারা প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকে নিয়ে যায়। 
 
পদে পদে ভোগান্তি :চলতি সপ্তাহে অন্তত তিন দিন সরেজমিন পরিদর্শন করে হাসপাতালের আউটডোরে রোগী ভোগান্তির অবর্ণনীয় চিত্র পাওয়া গেছে। সকাল সাড়ে ৮টায় আউটডোর চালু হয়। তার আগের সকাল থেকে টিকিট সংগ্রহের জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন রোগীরা। টিকিট সংগ্রহের পর আরেকটি কাউন্টারের সামনে লাইন ধরে রোগীদের দাঁড়াতে হয়। রোগী কোন বিভাগের চিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা নেবেন তা ওই কাউন্টার নির্ধারণ করে দেয়। এরপর নির্দিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকের কক্ষের সামনে গিয়ে আবারও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এই তিন কাউন্টারে নূ্যনতম তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর মেলে চিকিৎসককে দেখানোর সুযোগ। চিকিৎসক রোগী দেখার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেন। ততক্ষণে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ল্যাব ও টাকা জমা দেওয়ার কাউন্টার বন্ধ হয়ে যায়। একই রোগীকে পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য আবার পরদিন হাসপাতালে এসে টাকা জমা দেওয়ার জন্য কাউন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়াতে হয়। টাকা জমা শেষে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নির্ধারিত ল্যাবের সামনে গিয়ে আবারও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। ওই পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার জন্য একদিন আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন দিন অপেক্ষা করতে হয়। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর চিকিৎসক দেখানোর জন্য আবারও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। চিকিৎসক দেখানোর পর মেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপত্র অথবা ভর্তির সুযোগ। এ প্রক্রিয়ায় একজন রোগী চিকিৎসার আওতায় আসতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লেগে যায়। কয়েকজন চিকিৎসক বলেছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ওই নিয়মের কারণে রোগীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। রোগী ভোগান্তি কমাতে আউটডোর ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন করতে হবে।
 
এ ছাড়া হাসপাতালের সার্জারি, অর্থোপেডিক, ইএনটি, ইউরোলজি, পেডিয়াট্রিক সার্জারি ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে অস্ত্রোপচারের জন্য রোগীদের ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। অপারেশন থিয়েটার সংকটের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর চিকিৎসকরা। 
 
কয়েকটি বিভাগের শয্যা সংকটও মারাত্মক আকার ধারণ করছে। মেডিসিন বিভাগের ভেতরে রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের মাত্র দুটি শয্যা রয়েছে। গ্যাস্ট্রো এন্টারোলজি বিভাগে মাত্র চারটি শয্যা রয়েছে। তবে এ বিভাগের চিকিৎসক রয়েছেন আটজন। অনকোলজি বিভাগে আটজন চিকিৎসক থাকলেও কোনো যন্ত্রপাতি না থাকায় তারা রোগীর সেবায় কাজে আসছেন না। 
 
ঝুঁকিতে ওষুধ ও কর্মীরা :হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগটির অবস্থান। ওই বিভাগের সামনে লেখা আছে, সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। অথচ ওই বিভাগের মধ্যেই স্থাপন করা হয়েছে মেডিসিন স্টোর। চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট মিলে ১৮ জন কর্মী ওই স্টোরে কাজ করেন। ওই স্টোরে থাকা ওষুধ রোগীদের সেবনের জন্য সরবরাহ করা হয়। তবে মেডিসিন স্টোরের দায়িত্বে থাকা সব কর্মী ঝুঁকির কথা জানালেও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তারা জানান, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার বিষয়ে পরিচালকের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
 
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা সমকালকে বলেন, রেডিওলজি বিভাগের মধ্যে মেডিসিন স্টোর থাকতে পারে না। রেডিয়েশনের কারণে ওষুধের গুণাগুণ নষ্ট হতে পারে। এমনকি ওই ওষুধ সেবন করে মানুষ সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। একইভাবে সার্বক্ষণিক অবস্থানকারী ব্যক্তিরাও রেডিয়েশনের শিকার হয়ে জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। 
 
অনিয়ম-দুর্নীতি :হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে দর্শনার্থীদের প্রবেশের জন্য ২০ টাকা করে নেওয়া হয়। জরুরি বিভাগের টিকিট কাউন্টার থেকে ২০ টাকা দিয়ে রোগীরা ওই দর্শনার্থী পাস সংগ্রহ করেন। ২০০৭ সাল থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই নিয়ম চালু করে। প্রতি মাসে দর্শনার্থীদের কাছ থেকে গড়ে ৪২ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়। এই হিসাব অনুযায়ী গত বছর এই খাত থেকে ৫০ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। সংগৃহীত সে টাকার কোনো হিসাব নেই। চক্ষু বিভাগে নয় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ল্যাসিক মেশিন কেনা হয়েছে। ওই মেশিন দিয়ে সর্বোচ্চ ১০০ রোগীর অস্ত্রোপচার করার পর সেটি বিকল হয়ে পড়েছে। একইভাবে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে ইউরোলজি বিভাগের জন্য ক্রয় করা মেশিনটিও ক্রয়ের কয়েক মাস পর বিকল হয়ে পড়ে। কার্ডিওলজি বিভাগের ইটিটি, হোল্ডার মনিটর মেশিন নষ্ট। হাসপাতালের ১০ শয্যার আইসিইউর মধ্যে একটি ছাড়া সবগুলো বিকল হয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে ক্রয় করা এসব যন্ত্রপাতি ছিল নিম্নমানের। এ কারণে চালু করার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই সেগুলো বিকল হয়ে পড়েছে। 
 
সার্বিক বিষয় জানতে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ব্রায়ান বঙ্কিম হালদারকে ফোন করা হয়। তিনি সমকালকে বলেন, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো মিটফোর্ড হাসপাতালেও কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে সেসব সমস্যা সমাধানের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।
 
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সরকারি হাসপাতালে সেবার মান বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। অন্যান্য হাসপাতালের মতো মিটফোর্ডেও নতুন যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছে। কোনো যন্ত্রপাতি বিকল হলে তা সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার নির্দেশনা দেওয়া আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে জিরো টলারেন্স গ্রহণ করা হবে। দুুর্নীতি করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এ ছাড়া হাসপাতালে যেসব সংকট রয়েছে তা সমাধানের আশ্বাস দেন মন্ত্রী।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/02/03/267515#sthash.V94vM8uO.dpuf