২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
নন-ক্যাডার নিয়োগে চরম বৈষম্য
২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার,
রবিউল ইসলাম পারভেজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করে ২০১৪ সালে ৩৪তম বিসিএসে অবতীর্ণ হয়ে উত্তীর্ণও হন। পদ না থাকায় তিনি চাকরি পাননি। তার মতো চাকরি পাননি অথচ বিসিএস উত্তীর্ণ এমন প্রার্থীদের পরবর্তী সময়ে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সুপারিশ করে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এতেও পারভেজের ভাগ্যের শিকে ছেড়েনি। এর পর পিএসসি গত বছরের ১০ আগস্ট দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৩৪তম বিসিএসের উত্তীর্ণদের সুপারিশ করে। এবার ভাগ্য পারভেজের প্রতি কিছুটা সদয় হয়। তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য পিএসসির সুপারিশ পান। তবে তিনি নির্ধারিত বেতন-স্কেলে (জাতীয় বেতন-স্কেলের দশম গ্রেড, ১৬ হাজার টাকার স্কেল) বেতন পাবেন না জেনে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এর দুই ধাপ নিচে ১১ হাজার ২০০ টাকার স্কেলে তাকে দেওয়া হবে বেতন। রবিউল ইসলাম পারভেজের মতোই ভাগ্য বিড়ম্বিত এখন শত শত প্রার্থী। তারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন। ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়া এ প্রার্থীরা সংখ্যায় মোট ৮৯৮ জন।
 
একই বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়া প্রার্থীদের মধ্য থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের চাকরিতে দশম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকার স্কেলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কেবল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের \'প্রধান
 
শিক্ষক\' পদে পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্তদের বেতন-স্কেলের দুই ধাপ নিচে অর্থাৎ দ্বাদশ গ্রেডে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
 
\'কেন এই বৈষম্য\'_এর নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারাই বেতন পান ১৬ হাজার টাকার স্কেলে। তারা স্কুলগুলোর দেখভাল ও তদারককারী কর্মকর্তা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক অতিরিক্ত সচিব সমকালের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, প্রধান শিক্ষকদের বেতন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের সমান দেওয়া হলে সারাদেশের শিক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। এতে তাদেরও বেতন বাড়ানোর প্রশ্ন উঠবে। এ ছাড়া বর্তমান ৬৪ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা ১১ হাজার ২০০ টাকার স্কেলে বেতন পান। বিসিএসে উত্তীর্ণ ৮৯৮ জনকে ১৬ হাজার টাকার স্কেলে নিয়োগ দিতে গেলে পুরো ৬৪ হাজার প্রধান শিক্ষককেই একই স্কেলে বেতন-ভাতা দিতে হবে। এতে রাতারাতি সরকারের বিপুল ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে এ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব বাজেটেও ঘাটতি পড়বে।
 
গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বর্তমানে সারাদেশে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। বিসিএসে উত্তীর্ণদের এ পদে নিয়োগ দেওয়া হলে ৮৯৮টি বিদ্যালয়ে যোগ্য প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাবে। এতে তারা খুশিই হয়েছিলেন। এখন বেতন-ভাতা নিয়ে জটিল সংকট তৈরি হয়ে গেল।
 
বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক সমকালকে বলেন, তারা নির্দিষ্ট চাহিদার ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করেছেন। বেতন-ভাতা নিয়ে তাদের কোনো কিছু করার নেই। এ ব্যাপারে নিয়োগকারী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেই আলাপ-আলোচনা করে সমাধান করতে হবে।
 
উল্লেখ্য, গত ৩১তম বিসিএস থেকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও যারা ক্যাডার পাননি, তাদের মধ্য থেকে প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ করছে পিএসসি। বিসিএসে উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে (যারা ক্যাডার পাননি) দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগে ২০১৪ সালের ১৬ জুন নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন করে সরকার। প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ শেষ করার পর দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
 
বিসিএসের চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও যারা ক্যাডার পাননি তাদের মধ্য থেকে যারা প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ পেতে চান, তাদের আলাদাভাবে কমিশনে আবেদন করতে হচ্ছে।
 
পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ সমকালকে বলেন, \'বিসিএসে উত্তীর্ণদের নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ দেওয়ার সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে একমত নই। তবে দেশের চাকরির বাজারের যে আকাল, তাতে বেকারত্ব না বাড়িয়ে যোগ্য এই প্রার্থীদের আবেদনের ভিত্তিতে প্রথম শ্রেণির পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে তাদের আবেদনের ভিত্তিতে দ্বিতীয় শ্রেণির পদেও নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখানেও আবার বেতন-স্কেল কমিয়ে দেওয়ার যৌক্তিকতা থাকতে পারে বলে মনে করি না।\'
 
প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের সুপারিশ পাওয়া একদল প্রার্থী সম্প্রতি সমকাল কার্যালয়ে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে কামরুল ইসলাম রাশেদ বলেন, পিএসসির সুপারিশে একই মেধা ও যোগ্যতা নিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে আসা প্রার্থীদের বেতন দু\'রকম হওয়া কোনোভাবেই সমীচীন হবে না। সাংবিধানিকভাবেও এ বৈষম্য করা অবৈধ।
 
তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মোহাম্মদ আসিফ-উজ-জামান সমকালকে বলেন, বিদ্যমান নিয়মে প্রধান শিক্ষকরা যে গ্রেডে নিয়োগ পান, তারাও সেভাবেই নিয়োগ পাবেন। এখানে তাদের কিছু করার নেই। কারণ সারাদেশের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা ১২তম গ্রেডেই যোগদান করেছেন এবং ওই গ্রেডেই বেতন-ভাতা পাচ্ছেন।
 
মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তার এ ব্যাখ্যায় খুশি হতে পারেননি সুপারিশপ্রাপ্তরা। তাদের যুক্তি, আগের শিক্ষকরা পিএসসির পরীক্ষায় ফেস করে নিয়োগ পাননি। তা ছাড়া পদটি দ্বিতীয় শ্রেণির হওয়ার কারণেই পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ হচ্ছে। তাহলে কেন আগের মতো তৃতীয় শ্রেণির গ্রেডে নিয়োগ দেওয়া হবে। 
 
সূত্র জানায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পদটি ২০১৪ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করেছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু তখন মন্ত্রণালয় কৌশলে প্রধান শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ করে ১১ (প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত) ও ১২তম গ্রেডে (প্রশিক্ষণবিহীন)। ওই সময় যুক্তি দেখানো হয়, সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা কর্মকর্তা পদটি বর্তমানে দশম গ্রেডের। তারা মূলত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে থাকেন। প্রধান শিক্ষকদের পদ সম-গ্রেডের হলে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে এখন বিসিএসে উত্তীর্ণদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম বাস্তবায়ন করতে চাইছে মন্ত্রণালয়। সুপারিশপ্রাপ্তদের প্রশ্ন, যদি অন্য মন্ত্রণালয়ের অধীনদের দশম গ্রেডে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে তাদের কেন এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হবে। এতে অন্যদের চেয়ে তাদের বেতন-স্কেল কম হবে চার হাজার ৭০০ টাকা। সামাজিকভাবেও তারা অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে থাকবেন। এ রকম নজির সৃষ্টি হলে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাইবেন না।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/02/02/267300#sthash.vtoaOz8i.dpuf