২৩ নভেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
শুধু সরকারি বিনিয়োগে জিডিপি কতটা বাড়বে
২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার,
বছরে আট শতাংশ হারে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া কি খুব কঠিন কাজ? সরকারের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ বলছেন- আগামী অর্থ বছরশেষে প্রবৃদ্ধি আট শতাংশে উন্নীত হবে। একথা শোনার পরই প্রশ্নটি সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচিত হচ্ছে। সূত্রগুলো বলছে, সরকারি ব্যয়ের বর্তমান মান নিয়ে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। তবে গুণগত ব্যয় নিশ্চিত করা এবং বাস্তবায়ন করা গেলে প্রবৃদ্ধির হার আরো বেশিও হতে পারে।
 
বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে গেছে। বিনিয়োগ পরিস্থিতি রয়ে গেছে তার আগের জায়গায়। অন্য অনেক খাতেও প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ হচ্ছে না। সাত শতাংশের উপরে প্রবৃদ্ধির বড় ভরসা এখন সরকারি ব্যয়ের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যেখানে সরকারি ব্যয়ের মান ও বাস্তবায়ন দুটোই প্রশ্নসাপেক্ষ। অর্থশাস্ত্র অনুযায়ী, সরকারি বিনিয়োগ বাড়লে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ার কথা; কিন্তু আমাদের দেশে সেটাও হচ্ছে না। এর বড় কারণ হলো— সরকারি বিনিয়োগ যে হারে বাড়ছে সে হারে ব্যবসায়ের পরিবেশ সহজ হচ্ছে না।
 
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নেও আগের মতোই ধীরগতি চলছে। প্রতি বছর টাকার অংকে ব্যয় বাড়লেও বাস্তবায়ন হার পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। অর্থ বছরের অর্ধেক সময় পার হয়ে গেলেও ডিসেম্বর পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২৭ দশমিক ২০ ভাগ। প্রতিবছর শেষার্ধে বড় ব্যয়ের কারণে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। এবছরও সাত দশমিক দুই শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
 
পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল বলেছেন, প্রবৃদ্ধির এই হার সাড়ে সাত শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে; কিন্তু অর্থনীতির সূচকগুলো যে হারে এগুচ্ছে তাতে বড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করা চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন  বিশ্লেষকরা। তারপরেও অর্জন সম্ভব হতো যদি গুণগত ব্যয় তথা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।
 
চলতি অর্থ বছরের ছয় মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো ব্যয় করেছে মোট ৩৩ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থ বছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ২৩ হাজার কোটি টাকা। টাকার অংকে বাড়লেও এডিপি বাস্তবায়ন হারে খুব একটা উন্নতি হয়নি। এর আগের বছর একই সময়ে এডিপি ব্যয় হয়েছিলো ২৪ শতাংশ।
 
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কম থাকায় সরকারের বাজেটে ভর্তুকি নিয়ে আপাতত চিন্তা করতে হচ্ছে না। উল্টো তেলের দামে মুনাফা করছে সরকার। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সরকারের নিট ঋণ মাত্র দুই হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। এসময় সরকারকে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করতে হয়নি। বরং উল্টো তিন হাজার ৪৭ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছে।
 
প্রবৃদ্ধির বড় নিয়ামক হলো বেসরকারি বিনিয়োগ; কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ায় এই খাতেও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। চলতি অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। মুদ্রানীতিতে ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। বিগত অর্থ বছর ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এবছর এটি কমে গেছে।
 
প্রবৃদ্ধির আরেকটি বড় উপাদন হলো রফতানি আয়। এবার এটি অনেক ধীর হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ৪ দশমিক ১২ শতাংশ বেশি। আমদানি ব্যয় হয়েছে ১১ হাজার ১০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ২৭ শতাংশ বেশি।
 
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ছিল ৩ হাজার ২৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ৩১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে ৮ দশমিক ৪ মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। রিজার্ভ বাড়লেও রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন এর কারণ। এজন্য বিকল্প শ্রম বাজার খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
 
অর্থনীতিতে মৃদু মূল্যস্ফীতি কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি সহায়ক হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম সহনীয় থাকায় দেশের বাজারে খাদ্যপণ্যে মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে। খাদ্যে মূল্যস্ফীতিও সাড়ে চার ভাগে নেমে এসেছে। এটি স্বাভাবিক হলেও খাদ্য বহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়েছে সাত শতাংশ যা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার নিয়ে শঙ্কা অমূলক নয় বলেও দাবি করেছেন কেউ কেউ। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রবৃদ্ধির হার সাত শতাংশের নিচে থাকবে বলেই পূর্বাভাস দিয়েছে। রাজস্ব আদায়ও প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না। এ অবস্থায় আট শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বাজেট বাস্তবায়নে গুণগত দিকে নজর দেয়া জরুরি।
 
বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ব্যবসা সহজীকরণে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এ ঘোষণায় বিদ্যুত্ সংযোগ পেতে আগে যেমন ৪০৪ দিন লাগত, সেখানে ২৮ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণ অনুমোদনে আগে ২৮৭ দিন লাগে, তা ৬০ দিনে নামিয়ে আনা এবং ব্যবসা শুরুর সময় সাড়ে ১৯ দিন থেকে সাত দিনে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলাম বলেন, দেশি-বিদেশি সবার জন্য সমান প্লেয়িং ফিল্ড দিতে পারলে বিনিয়োগ আসবেই। এ জন্য কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
http://www.ittefaq.com.bd/print-edition/first-page/2017/02/02/173232.html