২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
প্রতিবেদনের ওপর আদেশ ৭ ফেব্রুয়ারি: সাঁওতাল পল্লীতে আগুন দিয়েছে পুলিশ
১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন লাগানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যকে দায়ী করে দেয়া বিচারিক প্রতিবেদন নিয়ে ৭ ফেব্রুয়ারি আদেশ দেবেন হাইকোর্ট।
প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর বিচারপতি ওবায়দুল হাসান এবং বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল এ দিন ধার্য করেন।
আদালতে গতকাল রাষ্ট্রপক্ষে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু।
তিনি বলেন, আদালত ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সব পক্ষকে এ প্রতিবেদন সরবরাহ করতে হাইকোর্টের পেপারবুক শাখাকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে ৭ ফেব্রুয়ারি আদেশের দিন ধার্য করেছেন হাইকোর্ট। 
আর এর আগে হাইকোর্টের নির্দেশে গাইবান্ধার মুখ্য বিচারিক হাকিম মো: শহিদুল্লাহর তদন্ত প্রতিবেদন ২৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে জমা হয়েছে বলে জানান ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু।
তিনি বলেন, ৬৫ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদনটির সাথে সাপোর্টিং কাগজপত্র রয়েছে ১০০১ পৃষ্ঠার। গত রোববার এটি রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে জমা দেয়ার পর সোমবার বিচারিক হাকিম মো: শহিদুল্লাহ আমাকে ফোনে তা জানিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রতিবেদনের মতামত অংশে বলা হয়েছে, সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন লাগানোর জন্য স্থানীয় কিছু ব্যক্তি এবং ঘটনার সময়ে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য দায়ী। তবে ঘটনায় জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহনীর সদস্যদের কারো নাম এ তদন্ত প্রতিবেদনে আসেনি। 
ঘটনা, তদন্ত কার্যক্রম ও তদন্ত প্রতিবেদনে যা বলা হয় 
সাঁওতালদের ঘরে পুলিশের আগুন দেয়ার একটি ভিডিও নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র আলোচনা শুরু হলে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের হাইকোর্ট বেঞ্চ গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর এ তদন্তের আদেশ দেন।
উচ্ছেদ অভিযানে ঘরবাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনায় কারা জড়িত এবং সেখানে পুলিশের কোনো সদস্য জড়িত কি নাÑ তা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল গাইবান্ধার মুখ্য বিচারিক হাকিমকে।
ওই আদেশের পর গত ২৭ ডিসেম্বর গাইবান্ধার মুখ্য বিচারিক হাকিম মো: শহিদুল্লøাহ সাঁওতাল অধ্যুষিত মাদারপুর ও জয়পুরপাড়া গ্রামে যান এবং সব কিছু ঘুরে দেখে ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতাল ও বাঙালি পরিবারগুলোর সাথে কথা বলেন।
আগুনে পোড়া ঘরের কিছু আলামতও সংগ্রহ করা হয়। সে সময় তার সাথে ছিলেন গাইবান্ধার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম ময়নুল হাসান ইউসুফ।
মুখ্য বিচারিক হাকিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে দিন দুই পুলিশ সদস্য ও এক ডিবি সদস্য যখন আগুন দিচ্ছিলেন, আরো কিছু পুলিশ সদস্য কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন যারা আগুন লাগানোয় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেননি তারা তা নেভানোর চেষ্টা করেননি।
আর যারা আগুন দিচ্ছিলেন তাদের মাথায় হেলমেট থাকায় এবং অনেক দূর থেকে ঘটনাটি ভিডিও করায় ওই পুলিশ সদস্যদের চেহারা শনাক্ত করতে পারেনি তদন্ত কমিটি।
মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, ওই দিন ঘটনাস্থলে এলাকায় যারা দায়িত্বরত ছিলেন তাদের তালিকা পুলিশ সুপারের কাছে কমিটির পক্ষ থেকে চাওয়া হয়েছিল। ওই ঘটনায় আরেকটি তদন্ত যেহেতু কাজ করছিল, ওই তালিকা সেখানে সরবরাহের কারণে এখানে তা করতে পারেনি।
১৯৬২ সালে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ সাঁওতাল ও বাঙালিদের ১৮টি গ্রামের ১ হাজার ৮৪০ দশমিক ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করে আখ চাষের জন্য সাহেবগঞ্জ ইক্ষুখামার গড়ে তুলেছিল। ওই জমি ইজারা দিয়ে ধান ও তামাক চাষ করে অধিগ্রহণের চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ তুলে তার দখল ফিরে পেতে আন্দোলনে নামে সাঁওতালরা। 
পরে সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মে বিরোধপূর্ণ চিনিকলের জন্য অধিগ্রহণ করা জমিতে কয়েক শ’ ঘর তুলে বসবাস শুরু করে তারা। গত ৬ নভেম্বর চিনিকল কর্তৃপক্ষ জমি উদ্ধার করতে গেলে সংঘর্ষ বাঁধে।
সংঘর্ষের সময় সাঁওতালদের বাড়িঘরে লুটপাট হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ গুলি চালায়। ওই ঘটনায় নিহত হন তিন সাঁওতাল। আহত হন অনেকে।
সংঘর্ষের পর গোবিন্দগঞ্জ থানার এসআই কল্যাণ চক্রবর্তী ৩৮ জনের নাম উল্লেøখ করে সাড়ে ৩০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় চার সাঁওতালকে গ্রেফতারের পর তারা জামিনে মুক্তি পান।
অন্য দিকে হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুট ও উচ্ছেদের ঘটনায় মুয়ালীপাড়া গ্রামের সমেস মরমুর ছেলে স্বপন মুরমু ১৬ নভেম্বর অজ্ঞাতনামা ৬০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন; ওই মামলায় ২১ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
দশ দিন পর ২৬ নভেম্বর সাঁওতালদের পক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত টমাস হেমব্রম বাদি হয়ে ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে ৫০০-৬০০ জনের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ দাখিল করেন। এ ছাড়া হাইকোর্টে দুইটি রিট আবেদন করা হয়।
ঘটনার প্রায় এক মাস পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসা একটি ভিডিওর ভিত্তিতে সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
ওই ভিডিওতে দেখা যায়, সাঁওতাল পল্লøীর ভেতরে পুলিশ সদস্যরা গুলি ছুড়ছেন। কয়েক পুলিশ সদস্য একটি ঘরে লাথি মারছেন এবং পরে এক পুলিশ সদস্য ওই ঘরে আগুন দেন। পুলিশের সাথে সাধারণ পোশাকে থাকা আরেকজন আগুন অন্য ঘরে ছড়িয়ে দিতেও সহায়তা করেন।
ভিডিওর একটি অংশে আরো কয়েকটি ঘরে আগুন দিতে দেখা যায় পুলিশ সদস্যদের। তাদের মাথায় ছিল হেলমেট, একজনের পোশাকের পিঠে ডিবি, আরেকজনের পুলিশ লেখা ছিল। এ প্রেক্ষাপটে এক রিট আবেদনকারীর সম্পূরক আবেদনে হাইকোর্ট বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। 
সাঁওতালদের জানমাল রক্ষা, নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ দিতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে গত বছরের ১৬ নভেম্বর আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) ও ব্রতী সমাজ কল্যাণ সংস্থার পক্ষ থেকে একটি রিট করা হয়। 
অন্য দিকে হামলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় কমিশন চেয়ে গত বছরের ২১ নভেম্বর দ্বিতীয় রিটটি আবেদন করেন আহত দ্বিজেন টুডোর স্ত্রী অলিভিয়া হেমভ্রম ও গণেশ মুরমর স্ত্রী রুমিলা কিসকুর পক্ষে ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়–য়া।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/192141