১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
সার্চ কমিটি ফার্স কমিটি না হোক
১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
|| ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী || একটি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছেন। ছয় সদস্যবিশিষ্ট এই সার্চ কমিটির প্রধান করা হয়েছে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে। নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য ২০১২ সালে যে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তারও প্রধান ছিলেন এই বিচারপতি মাহমুদ হোসেনই। সেই সার্চ কমিটির সুপারিশে (?) কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদের মতো একজন মেরুদ-হীন আত্মমর্যাদাহীন ন্যায়-নীতিহীন ব্যক্তিকে প্রধান নির্বাচন কমিশন করা হয়েছিল। আরো যাদের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করা হয়েছিল তাদের সকলের স্বভাব চরিত্রও ছিল একই রকম। সেই কমিশনের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন লোকও ছিলেন না। এবারও সার্চ কমিটি গঠনের জন্য বিচারপতি মাহমুদ হোসেনকে নিয়োগের ফলে সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠছে যে, এই কমিশনও কি তবে শেখ রকিবউদ্দিনের মতো বশংবদ আর একটি নির্বাচন কমিশনের সুপারিশ করবে? সেই আশাই কি সরকার বিচারপতি মাহমুদ হোসেনকে এবারও সার্চ কমিটির প্রধান নিয়োগ করেছেন? 
এতে আমাদের খানিকটা হোঁচট খেতেই হবে। প্রথমত এর আগে এই বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত সার্চ কমিটি যে রকিবউদ্দিন কমিশন উপহার দিয়েছিল, তাকেই কেন বেছে নেয়া হলো। দ্বিতীয়ত কাজী রকিবউদ্দিনের কমিশন যে পারফরমেন্স দেখিয়েছে তা থেকে বিচারপতি মাহমুদ হোসেন শিক্ষা নিতে পারতেন। তিনি এই দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করতে পারতেন। এই কমিটি যদি বিচারপতি কাজী রকিবউদ্দিনের মতো একটি উপহার দেয়, তাহলে তার দায় আদালতের উপরও পড়তে পারে। এরকম প্রশ্ন জনমনে উঠতে পারে যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিচারপতিরা ভুল করছেন।
তাছাড়া নবগঠিত সার্চ কমিটি অধিকাংশ সদস্যই রাজনৈতিক ও আওয়ামী সমর্থক। শুধুমাত্র অধ্যাপক মনজুরুল ইসলামকে বাদ দিলে অন্য সকলেই ভবিষ্যতে সরকারের কাছ থেকে কিছু না কিছু পাবার আশা করতে পারেন। আর সে কারণেই জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে যে, এই সার্চ কমিটি কি একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপযোগী কমিটি উপহার দিতে পারবে? এই কমিশনের প্রধান কাজ হলো নানারূপ পর্যালোচনা করে দশ কার্য দিবসের মধ্যে ১০ জন ব্যক্তির নাম চূড়ান্ত করে রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেয়ার কথা। কিন্তু কমিটির অন্য সদস্যদের নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। বিএনপির প্রস্তাব ছিল সার্চ কমিটি হবে ৫ সদস্যের। আহ্বায়ক হবেন অবসরপ্রাপ্ত এবং কর্মক্ষম সাবেক বিচারপতি। অন্য সদস্যরা হবেন আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, সরকারের অবসরপ্রাপ্ত একজন সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বা দলনিরপেক্ষ সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন বিশিষ্ট নাগরিক এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় দল নিরপেক্ষ একজন নারী। কিন্তু সে রকমটি হয়নি। সে রকম হতেই হবে এমন কোনো কথাও নেই। কিন্তু যাদের নিয়ে কমিটি করা হয়েছে তার মধ্যে একমাত্র সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছাড়া অন্য সবাই এখনও সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত। যাদের ভবিষ্যতে কিছু পাবার আশা আছে। অধ্যাপক মনজুরুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক, তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যও। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে তিনি নীল দল করলেও কখনই উচ্চকণ্ঠ নন। কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য হিসেবে রয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য শিরীন আখতার। ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে তিনি আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের সঙ্গে রয়েছেন। তার বাবা মরহুম আবছার কামাল চৌধুরী কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এই কমিটিতে আরও রয়েছেন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ সাদিক। মহাহিসাব রক্ষক ও পরিদর্শক জেনারেল মাসুদ আহমেদ। আছেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান আইনজীবী থাকাকালে আওয়ামী ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার ছোট ভাই এখনও প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব পদে কর্মরত আছেন। তাছাড়া মোহাম্মদ সাদিক এর আগে রকিব কমিশনে সচিবের দায়িত্ব পালন করেন এবং রকিব কমিশনের সকল নষ্ট কাজের বৈধতা দেন। সে কারণেই অবসর গ্রহণের পর পুরস্কার হিসাবে ড. মুহাম্মদ সাদিককে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। অন্য দুজন সরকারি কর্মকর্তার সামনেও ভবিষ্যৎ পড়ে রয়েছে। যাতে এরা লোভী না হন, কিছু পাবার আশা না করেন, সে কারণেই বিএনপি অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিয়ে এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। 
তবে একথা স্বীকার করতে হবে যে, সার্চ কমিটি শুরুটা খারাপ দেখাচ্ছে না। তারা প্রথম দফায় ১২ জন বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে কমিশন গঠন নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। শুধু মাত্র ড. এ টি এম সামসুল হক ছাড়া এই ১২ জন বিশিষ্ট নাগরিকদের সম্পর্কে তেমন একটা বিতর্ক নেই। এরা সমাজের বিবেক বলেই পরিচিত। এর মধ্যে ঊনিশ-বিশ। আছে কিন্তু সেটুকু গ্রহণযোগ্য। এই ১২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেছেন, দলনিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে যেন ইসি গঠন করা হয়। অতীতে কোনো রাজনৈতিক দল বা পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন কারো নাম যেন প্রস্তাব করা না হয়। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনের যোগ্য নন, এমন কারো নামও যেন প্রস্তাব না করা হয়। এই প্রস্তাবনা বা পরামর্শ যথার্থ। আগে রকিব কমিশন নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। তাদের ব্যক্তিত্বহীনতার কারণেই বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থাই ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাাঁড়িয়েছে। 
তবে এই সার্চ কমিটি কেবল রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশই করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি সে সুপারিশ রাখবেন কি রাখবেন না, সে এখতিয়ার তার রয়েছে। সুতরাং এ আলাপ-আলোচনা শেষে সার্চ কমিটি যদি ঘোষণা করতে পারে যে, তারা কাদের নাম সুপারিশ করেছে, তাহলে ভালো হতো। আমাদের ধারণা নেই সার্চ কমিটি সেই ঘোষণা দিতে পারবেন কিনা। সে ক্ষেত্রে একটা বিষয় পরিষ্কার হতো যে, সার্চ কমিটি শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্য করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে একটি কার্যকর দক্ষ ও মেরুদ-সম্পন্ন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্যে এই কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু কমিটি যদি নাম প্রকাশ করতে না পারে তাহলে ধূম্রজাল থেকেই যাবে। মনে হবে এটি ফার্স কমিটিই ছিল। আমরা আশা করি সার্চ কমিটি প্রকাশ্যে তাদের প্রস্তাবিত নামগুলো ঘোষণা করবে। 
এ ক্ষেত্রে আরও একটি বিপদ রয়েছে সার্চ কমিটির নাম প্রস্তাব করলেই রাষ্ট্রপতি তাদের মধ্য থেকে ৫ জনকে নিয়োগ দিতে পারবেন এমনও মনে করার কারণ নেই। কারণ প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেয়া ছাড়া আর সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমরা আগেও দেখেছি যে, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। অন্য সকল আলোচনা কেবল মাত্র বাত কে বাত। 
এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে যে পঞ্চদশ সংশোধনী জারি করা হয়, তাতে নানা আলাপ-আলোচনা হয়েছিল। সে সব আলাপ-আলোচনায় আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা যেমন তোফায়েল আহমেদ, মো. নাসিম, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রমুখ বলেছিলেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা সঙ্গত হবে না। এগুলো নথিভুক্ত রয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল প্রধানমন্ত্রী যেহেতু চাইছেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হবে সুতরাং অন্যসব শীর্ষ নেতার মন্তব্য বা মনোভাব একেবারেই মূল্যহীন হয়ে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া হয়। রাজনৈতিক সঙ্কটের শুরু সেখান থেকেই। 
আমরা আশা করি, নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য যে সার্চ কমিটি করা হয়েছে, তাদের মতামত বা সুপারিশ যেন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। তাতে কোন এক ব্যক্তির খেয়াল-খুশির প্রতিফলন ঘটানো সহজ হবে না। যদিও তা অসম্ভব নয়। আমরা আশা করি, এই কমিটির বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়ে দেশে একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃস্থাপনের জন্য কাজ করবে। 
এর পরেও কথা থাকে। সুষ্ঠু একটি নির্বাচনের জন্য প্রশাসনকে অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে। কিন্তু সরকার প্রশাসনকে এমনভাবে সাজিয়েছে ও দলীয়করণ এমন চরম মাত্রায় নিয়ে গেছে যে, প্রশাসনে নিরপেক্ষ থাকা বেশ কঠিন কাজ। ফলে সরকার যদি না চায়, তাহলে একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। সে ক্ষেত্রেও দরকার একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন যে তার উপর প্রদত্ত সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে প্রশাসনকে বশীভূত রাখতে পারে। সেটি সুষ্ঠু নির্বাচন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের মূল কথা। এর ব্যতিক্রম হলে সার্চ কমিটি সত্যি সত্যিই ফার্স কমিটিতে পরিণত হবে।
http://www.dailysangram.com/post/269973-%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9A-%E0%A6%95%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%AB%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B8-%E0%A6%95%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%B9%E0%A7%8B%E0%A6%95