২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
বাড়িওয়ালার পেরেশানি ভাড়াটিয়ার মাথায় হাত: ঢাকায় হোল্ডিং ট্যাক্স
৩১ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার,
রাজধানীতে হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অর্থবাণিজ্য চলছে। হোল্ডিং ট্যাক্স কমিয়ে নির্ধারণ করার আশ্বাসে বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে এ অর্থ নিচ্ছেন সিটি করপোরেশনের কর কর্মকর্তারা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা বেশি ট্যাক্স ধরে বাড়ির মালিকদের বাধ্য করছেন তাদের সাথে চুক্তিতে যেতে। তবে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন প্রথম দিকে কিছু অভিযোগ এলেও এখন আর কেউ এ ধরনের অভিযোগ করছেন না। 
এ দিকে হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর প্রেক্ষিতে বাড়ি ভাড়াও বাড়িয়ে দিয়েছেন ভবন মালিকেরা। পক্ষান্তরে, বাড়ির মালিকেরা বলছেন সঠিক ট্যাক্স ধরা হলে আমাদের দিতে কোনো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু কর কর্মকর্তারা অহেতুক বিরাট অঙ্কের ট্যাক্সের ভয় দেখায়। ফলে তাদের ম্যানেজ করতে আমাদের টাকা দিতে হয়। ফলে ভাড়া বৃদ্ধি না করে কোনো উপায় থাকে না। একজন বাড়ির মালিক বলেন, যে টাকা খরচ করে বাড়ি বানিয়েছি তা ব্যাংকে রেখে দিলে ভাড়ার কয়েক গুণ বেশি মুনাফা হতো। হোল্ডিং ট্যাক্স ছাড়াও উৎসে আয়কর কর্তন, মাত্রাতিরিক্ত হারে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের বিল মালিকদের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই লাইনম্যানকে উপরি টাকা দিতে হচ্ছে। 
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা যায়, গত ২ অক্টোবর থেকে ডিএসসিসির ১ ও ২ নম্বর অঞ্চলে হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অঞ্চল-১ এর অধীনে রয়েছে পর্যায়ক্রমে ১৫ থেকে ২১ নম্বর ওয়ার্ড পর্যন্ত। ধানমন্ডি, কাকরাইল, সেগুনবাগিচা, মগবাজারসহ আশপাশের এলাকা এ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। অঞ্চল-২ এর অধীনে আছে ১ থেকে ৬ ও ৮ থেকে ১৩ নম্বর ওয়ার্ড পর্যন্ত। মতিঝিল, ফকিরাপুল, খিলগাঁও, বাসাবোসহ আশপাশের এলাকা এ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এসব এলাকার বাড়ির মালিকদের মধ্যে ফরম দিয়ে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ডিএসসিসির কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি চার মাসমেয়াদি এ কার্যক্রম শেষ হবে। আনুষঙ্গিক কাজ শেষে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে চূড়ান্তভাবে ট্যাক্স নির্ধারণ করে বাড়ির মালিকদের জানানো হবে। তবে কারো যদি নিধারিত ট্যাক্স নিয়ে আপত্তি থাকে তাহলে তিনি রিভিউ করতে পারবেন। তার পর দুই দফা শুনানি শেষে ট্যাক্স নির্ধারণ করা হবে। হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়াতে আঞ্চলিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি আরো ২৯ জনকে নিয়োগ দিয়েছে ডিএসসিসি।
একইভাবে উত্তর সিটি করপোরেশনের দু’টি অঞ্চলেও ট্যাক্স বাড়ানোর কার্যক্রম চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে উত্তরা এলাকায় (জোন-১) প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে চলছে গুলশান এলাকায় (জোন-৩) ট্যাক্স বাড়ানোর কার্যক্রম। এ জন্য বাড়ি বাড়ি ফরম পাঠানো হচ্ছে। আগামী দুই মাস চলবে এ কার্যক্রম। 
দক্ষিণ সিটির কর্মকর্তারা জানান, সিটি করপোরেশন আইন (ট্যাক্স) ১৯৮৬ অনুসারে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় বাড়ি ভাড়া কী পরিমাণ তার ওপর ভিত্তি করে ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়। এ জন্য সব এলাকায় একই হারে ট্যাক্স নির্ধারণ করা হচ্ছে না। বর্গফুট অনুসারেও হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারিত হয় না। 
তবে উত্তর সিটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাড়ি ভাড়ার পাশাপাশি এলাকার ভিন্নতা ও আয়তন অনুসারে ট্যাক্স নির্ধারণ করা হচ্ছে। এ জন্য কোনো এলাকার ট্যাক্স কী পরিমাণ হারে হবে তা জানিয়ে জোন অফিসগুলোতে প্রকাশ্যে বড় বড় সাইন বোর্ড টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডিএনসিসির ওয়েবসাইটেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে। 
এ দিকে ট্যাক্স বাড়ানোর কার্যক্রমকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক অর্থবাণিজ্যে নেমেছেন সিটি করপোরেশনের কর কর্মকর্তারা। তারা হোল্ডিং ট্যাক্স কমিয়ে নির্ধারণ করার আশ্বাসে বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। 
বাসাবো এলাকার পাঁচতলাবিশিষ্ট এক বাড়ি মালিক নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, এক-দেড় বছর আগে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করে সিটি করপোরেশন। তখন সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতে ৬০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। এখন আবার নতুন করে ট্যাক্স নির্ধারণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ফরম পূরণ করে তথ্য নিয়ে গেছে। এবার আবার ৩০ হাজার টাকা দিয়েছি যাতে ট্যাক্স কমিয়ে দেয়। আর ট্যাক্স বাড়ানোর কারণে তিনি জানুয়ারি মাস থেকে ভাড়াটিয়াদের ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, একবার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ায় আবার হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ায়। এ জন্য ম্যানেজ করতে অনেক টাকা দিতে হয়। বাড়ি ভাড়া না বাড়িয়ে উপায় নেই।
উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের এক বাসিন্দা বলেন, আগের চেয়ে অনেক গুণ বেশি ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে। আমি আপত্তি করায় সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা অফিসে যেতে বলে। সেখানে গেলে কর্মকর্তারা বলেন কিছু টাকা দিলে তারা কমিয়ে দিতে পারবেন। অবশেষে উপায় না থাকায় দাবি অনুযায়ী টাকা দিয়ে কিছু কমিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। 
ডিএসসিসির অঞ্চল-২ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আবু নঈম নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রথম দিকে আমরা কিছু অভিযোগ পেয়েছিলাম, কিন্তু দেড় মাস ধরে আর কোনো অভিযোগ পাচ্ছি না। প্রথম দিকে অভিযোগ পাওয়ার পর অ্যাসেসরদের বারবার সতর্ক করে দেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। 
ডিএসসিসির উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সাইদুর রহমান খান নয়া দিগন্তকে বলেন, বাসা ভাড়ার ওপর ভিত্তি করে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করা হচ্ছে। একেক এলাকার বাসা ভাড়া ভিন্নতা থাকায় ট্যাক্সের হারেরও ভিন্নতা রয়েছে। তবে সব এলাকার বাসা ভাড়া জেনে আমরা একটি নির্দিষ্ট রেট নির্ধারণ করে দিয়েছি। এর থেকে কম রাখার কোনো সুযোগ নেই। এ জন্য কেউ টাকা দিলেও ওই নির্দিষ্ট হারের নিচে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা নির্ধারণ করতে পারবেন না। ফলে বাড়িওয়ালা তাদের টাকা দেবেন কেন? তিনি এ ব্যাপারে নগরবাসীকে আরো সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। 
ডিএনসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রবীন্দ্র শ্রী বারোই নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রতিটি এলাকায় আমরা ওই এলাকার হোল্ডিং ট্যাক্সের রেট টাঙিয়ে দিয়েছি। এ ছাড়া জান অফিসে বড় সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে। কেউ নিজ বাসায় বসবাস করলে তিনি এমনিতেই ৪০ শতাংশ কম দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। লোন থাকলেও একটি সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রে এ-সংক্রান্ত কমিটি ১৫ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারেন। আপিল করলে ২৫ শতাংশ পর্যন্তও কমার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া স্বচ্ছতার জন্য রিভিউ কমিটির প্রধান করা হয়েছে ভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলরকে। ফলে মানুষ কেন অতিরিক্ত টাকা দিতে যাবেন। এ জন্য নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে। 
এ দিকে হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর কারণে বাড়ি ভাড়াও বাড়িয়ে দিচ্ছেন ভবন মালিকেরা। আরিফুর রহমান নামে খিলগাঁও এলাকার এক ভাড়াটিয়া অভিযোগ করেন, ট্যাক্স এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারণই হয়নি। এর মধ্যে বাড়ি ভাড়া এক হাজার টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন বাড়িওয়ালা। কর কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতে টাকা দিতে হয়েছে অজুহাত তুলে তিনি এ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে ডিএসসিসির কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, কেউ বাসা ভাড়া বাড়ালে ওই রেট অনুসারে নতুন করে আবার ট্যাক্স নির্ধারণ করা হবে। এ জন্য ভাড়াটিয়ারা স্বপ্রণোদিত হয়ে আমাদের তথ্য দিলে উপকার পাবেন।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/191886