২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ব্যাপ্তি: সুশাসন
৩১ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার,
|| ইকতেদার আহমেদ ||
৩১ জানুয়ারি ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০০
 
 
আমাদের দেশে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর অবধি রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা বহাল থাকলেও তার পর থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা অনুসৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকালেও সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থার উল্লেখ ছিল। এ ধরনের সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান বিধায় রাষ্ট্রের সব নির্বাহী ক্ষমতা তার ওপর ন্যস্ত। এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও তার পদটি আলঙ্কারিক। তিনি রাষ্ট্র্রপ্রধানরূপে রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করে থাকেন এবং তার ক্ষমতার ব্যাপ্তি সংবিধান মতে নির্ধারিত।
সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতিকে বলা হয় রাষ্ট্রের অভিভাবক। তিনি জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রতীক। রাষ্ট্রপতি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন বিধায় আসলে সরকারপ্রধান কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একজন সংসদ সদস্যকে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ দেয়া হলে এবং নিয়োগ-পরবর্তী তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রপতিরূপে তার কার্যভার গ্রহণের দিন সংসদে তার আসন শূন্য হয়ে যায়। তা ছাড়া, রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব পালনকালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার জন্য যোগ্য নন। একজন দলীয় ব্যক্তি বা সমর্থক রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী তার দলীয় পরিচয় না থাকলেও ’৯১ পরবর্তী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় সরকারের আমলে দেখা গেছে, দলীয় প্রধানের আনুকূল্যে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত ব্যক্তি জনপ্রত্যাশার প্রতিফলনে যখনই নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হয়েছেন, তখনই তার দলীয় প্রধানের বিরাগভাজন হওয়ার কারণে পদ হারানোর অথবা দল কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়ে অবমাননাকরভাবে জীবনযাপনের উপক্রম হয়েছে। 
সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি একজন সাংবিধানিক পদধারী হিসেবে শপথের অধীন। রাষ্ট্রপতিকে শপথগ্রহণ করাকালে অপরাপর বিষয়ের পাশাপাশি বলতে হয়, তিনি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করবেন। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পঠিত এ শপথবাক্যটির অর্থ হলোÑ সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে যতটুকুু ক্ষমতা দেয়া আছে, এর বাইরে রাষ্ট্রপতির পক্ষে কোনো ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ নেই। 
প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি উভয়ই সাংবিধানিক পদধারী। সংবিধান পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন, এ বিষয়টি স্পষ্টরূপে উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়ে উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে একক ক্ষমতা দেয়া হলেও সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বা অন্য কোনো সময়ে যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যদের আস্থাভাজন তাকে ব্যতীত অপর কাউকে রাষ্ট্রপতির পক্ষে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেয়ার সুযোগ অনুপস্থিত। একইভাবে, প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে যদিও সংবিধানে আলাদাভাবে কোনো যোগ্যতার বিষয় উল্লিখিত হয়নি, কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে অনুসৃত প্রথা অনুযায়ী দেখা গেছে, সচরাচর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারককে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। সুতরাং প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি যদি স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে অন্যথা করতে চান, সে ক্ষেত্রে জনমনে তার গ্রহণযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। ইতঃপূর্বে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে যতবারই জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের মাধ্যমে অতিক্রান্তের ঘটনা পরিলক্ষিত হয়েছে, প্রতিবারই যে তা প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষায় কার্যকর হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই সম্যক অবহিত। 
অপরাপর সাংবিধানিক পদধারীর মধ্যে মন্ত্রিসভার সব সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারগণ, মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের সভাপতি ও সদস্যরা এবং অ্যাটর্নি জেনারেল রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও উপরিউক্ত প্রতিটি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের আবশ্যকতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতিরেকে এ ধরনের কোনো নিয়োগ সম্পন্ন করা হলে তা বেআইনি, কর্তৃত্ববিহীন, অকার্যকর ও অসাংবিধানিকরূপে গণ্য হবে। এ ধরনের নিয়োগ একজন রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার পরিপন্থী বিধায় একজন রাষ্ট্রপতির পক্ষে কখনো তার স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে এ ধরনের নিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। 
সাংবিধানিক পদধারী সংসদ সদস্যগণ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত, আবার সংসদের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী দলের যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোটে নির্বাচিত হন। সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় এ দু’টি সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কোনো ভূমিকা নেই। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয়ে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হলেও আমাদের দেশের ক্ষেত্রে বিগত দু’দশকের অধিক সময় ধরে পরিলক্ষিত অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, উভয় নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান হিসেবে যিনি সরকারপ্রধান তার আকাক্সক্ষাই মুখ্য। অপরাপর সব সাংবিধানিক পদধারীর নিয়োগকার্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সমাধা করা হয়। 
আমাদের দেশে অতীতে কখনো কোনো রাষ্ট্রপতি তার স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন সাংবিধানিক কোনো পদে নিয়োগ দেননি। বর্তমানে কর্মরত একাদশ নির্বাচন কমিশনের মেয়াদকাল ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণ হলে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন অত্যাবশ্যক হয়ে দেখা দেবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী হাঙ্গেরি থেকে প্রত্যাবর্তন করে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্নোত্তরকালে বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনে নিয়োগদান করবেন। এখন প্রশ্ন, সে নিয়োগ রাষ্ট্রপতি তার নিজ ইচ্ছায় করবেন, নাকি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করবেন? এর সহজ-সরল উত্তরÑ এ ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজ ইচ্ছা প্রয়োগ সংবিধান অনুমোদন করে না এবং রাষ্ট্রপতি যেকোনো ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক অর্থাৎ সার্চ কমিটি বা সার্চ কমিটি ব্যতিরেকে যেভাবেই নিয়োগকার্য সম্পন্ন করুন না কেন, এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। এমনকি প্রধানমন্ত্রী স্বপ্রণোদিত হয়ে যেকোনো সাংবিধানিক নিয়োগের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতিকে তার স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে তা সম্পন্ন করার অনুরোধ করলেও রাষ্ট্রপতির পক্ষে সে অনুরোধ অনুযায়ী কার্য সম্পন্ন করা সংবিধান অনুমোদন করে না বিধায় এভাবে ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ নেই। 
উপরিউক্ত নিয়োগবিষয়ক ক্ষমতা ছাড়াও কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির রয়েছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতিরেকে রাষ্ট্রপতি ক্ষমাসংক্রান্ত অধিকার এককভাবে প্রয়োগ করতে পারেন না। 
আইন প্রণয়ন-পরবর্তী রাষ্ট্রপতির সম্মতি এবং অধ্যাদেশ ও জরুরি অবস্থা জারি করার বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেয়া হলেও রাষ্ট্রপতি তার এসব ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করে থাকেন। উল্লিখিত তিনটি বিষয়ের কোনোটির ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার একক ক্ষমতা প্রয়োগে ভিন্নতর অবস্থান গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রপতির কাছে বিষয়ভিত্তিক সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে যখন কোনো বিষয়ে তার সম্মতি বা অনুমোদনের জন্য নথি প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তখন ওই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রস্তুতকৃত সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির বরাবর প্রেরণ করা হয়। সচরাচর দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপের ওপর প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর প্রদানের মাধ্যমে তাদের সম্মতি বা অনুমোদন ব্যক্ত করেন। যেকোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপের ওপর যখন প্রধানমন্ত্রী তার স্বাক্ষর প্রদান করেন, সেটি সারসংক্ষেপ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শরূপে গণ্য হয়। আমাদের সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর অনুরূপ পরামর্শের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির ভিন্নতা প্রদর্শনের কোনো অবকাশ নেই। 
সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির পদটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পদ হিসেবে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রতীক বিধায় এ পদটিকে সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য কোনো বিষয়ে আদৌ প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরামর্শ দান করেছেন কি না এবং করে থাকলে কী পরামর্শ দান করেছেন, সে সম্পর্কে কোনো আদালত কর্তৃক কোনো ধরনের প্রশ্নের তদন্ত বারিত করা হয়েছে। এর দ্বারা যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলোÑ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ প্রদানের বিষয়টি একান্ত গোপনীয় এবং তা যেকোনো আদালতের এখতিয়ার বহির্র্ভূত। 
রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ লাভের জন্য একজন ব্যক্তির অপরাপর যোগ্যতার পাশাপাশি একজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকা অত্যাবশ্যক। একজন ব্যক্তিকে কোনো উপযুক্ত আদালত অপ্রকৃতস্থ হিসেবে ঘোষণা করলে তিনি সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য যোগ্য নন। সুতরাং এ বিষয়টি থেকে অনুধাবন করা যায়, একজন সংসদ সদস্যের জন্য স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া যেমন অত্যাবশ্যক, একজন রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রেও তা সমভাবে প্রযোজ্য। একজন স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি স্বীয় কার্য সমাধার ক্ষেত্রে তার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় নিয়ে বুদ্ধি-বিবেক দ্বারা তাড়িত হয়ে থাকেন। অতএব, রাষ্ট্রপতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে বা তাকে ভুল বুঝিয়ে কোনো কাজ সমাধা করা হয়েছে, এমন দাবি করা হলে তা একজন ব্যক্তির রাষ্ট্রপতি পদে আসীন থাকার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। 
সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী যেমন সরকারের শীর্ষ নির্বাহী, অনুরূপ আমাদের দেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত হওয়া অবস্থায় রাষ্ট্রপতি সরকারের শীর্ষ নির্বাহী ছিলেন। সে সময় প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি এবং অপর সব সাংবিধানিক পদে নিয়োগদানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কারো পরামর্শ গ্রহণের আবশ্যকতা ছিল না। এসব নিয়োগ রাষ্ট্রপতি তার স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে সম্পন্ন করতেন, যদিও প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন কি না, সে বিষয়টি বিবেচনাপূর্বক তার নিয়োগ কার্যটি সম্পন্ন করতে হতো। 
বর্তমানে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে, একাদিক্রম বা একাদিক্রম ব্যতীত দু’মেয়াদের অধিক রাষ্ট্রপতি পদে কোনো ব্যক্তি অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না। তবে দেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় পরিচালিত হওয়াকালীন সংবিধানে এ ধরনের কোনো বিধান ছিল না। প্রধানমন্ত্রী বিষয়ে এ ধরনের কোনো সীমাবদ্ধতা অতীতেও ছিল না, বর্তমানেও নেই। রাষ্ট্রপতি বিষয়ে বর্তমানে যেমন উল্লেখ রয়েছেÑ তার উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে বহাল থাকবেন, অনুরূপ বিধান রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা বহাল থাকাকালেও কার্যকর ছিল। বর্তমান সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় উল্লেখ রয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে বহাল থাকবেন, যদিও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থায় থাকাকালীন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো বিধান ছিল না। 
সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ীÑ সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের দায়ে সংসদীয় অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি অপসারণযোগ্য বিধায়, পদে বহাল থাকাকালে তাকে সদাসর্বদায়ই সচেষ্ট থাকতে হয় যেন কখনো তাকে এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে অবমাননাকরভাবে বিদায় নিতে না হয়। বর্তমান সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে সংসদীয় অভিশংসন ব্যবস্থার উল্লেখ না থাকলেও তিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারালে তার পদ শূন্য হওয়ার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। উল্লেখ্য, সংসদীয় অভিশংসনের ক্ষেত্রে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের আবশ্যকতা রয়েছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে, তিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারালেই তার পদ শূন্য হয়ে যায়। 
শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যরে কারণেও রাষ্ট্রপতি তার পদ থেকে অপসারণযোগ্য। এ ক্ষেত্রেও সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনের প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো বিধান নেই। 
’৯১ পরবর্তী সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন থেকে অদ্যাবধি এ পদ্ধতির অধীন সরকার পরিচালনাকালে আমাদের দেশের বড় দু’টি দল সরকার পরিচালনার সুযোগ লাভ করেছে। উভয় দল সরকার পরিচালনাকালে দেখা গেছে, দলীয় ও সরকারপ্রধান একই ব্যক্তি। 
সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হলেও রাষ্ট্র ও সরকারের সব নির্বাহী ক্ষমতা শেষোক্তের ওপর ন্যস্ত থাকায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধানরূপে সবার শ্রদ্ধার্ঘ এবং সে শ্রদ্ধার ওপর ভর করে তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকতে পারেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি দল অথবা সরকারপ্রধানের আস্থাভাজন। 
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান ও
রাজনীতি বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/191752