১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
জনমত ও আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ-আহ্বান উপেক্ষা
৩০ জানুয়ারি ২০১৭, সোমবার,
‘রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিবাদে যারা জড়ো হয়েছিলেন, তাদের পরনে কি বর্ম ছিল? হাতে অস্ত্র ছিল? তাহলে তাদের ঠেকাতে শাহবাগে পানিকামান আনা হলো কেন? টিয়ারশেল ছুড়তে হলো, রাবার বুলেট। কিন্তু কেন?’- এই প্রশ্ন সুন্দরবন সংলগ্ন রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতাকারী মিজানুর রহমানের। শনিবার তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, মারধর করলেও তাকে আন্দোলন থেকে সরানো যাবে না। তিনি আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত থাকবেন। 
গত বৃহস্পতিবার তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ডাকা অর্ধদিবস হরতাল পালনের সময় পুলিশ এই মিজানুর রহমানকে মাটিতে ফেলে বেদম মারপিট করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিনি এখন তার পূর্ব জুরাইনের বাসায় ফিরেছেন। পেশায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান মনের টানে আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন বলে জানান।
মিজানুর রহমান বলেন, ব্যক্তি পুলিশের ওপর আমার ক্ষোভ ছিল না। আমি রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে শুধু স্যান্ডেল প্রদর্শন করেছি। আমার কথা হলো পুলিশ আমাদের মতো নিরস্ত্র, সাধারণ মানুষকে ঠেকাতে বর্ম, হেলমেট সব পরে এসেছে। পানিকামানও এনেছে। আমি বিভিন্ন আন্দোলনে আগেও অংশ নিয়েছি। কিন্তু এমন একটা আন্দোলনে এই মাত্রায় টিয়ার শেল ছুড়তে কখনো দেখিনি। কিন্তু কেন?
ওই দিনকার ঘটনা বর্ণনা করে মিজান বলেন, সেদিন সকালে আন্দোলনে যোগ দিতেন তিনি ও সমমনা কয়েকজন জুরাইন থেকে শাহবাগে পৌঁছান। তিনি পৌঁছেই দেখেন পুলিশ টিয়ার শেল ছুড়ছে। পানিকামান দেখে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তিনি পানিকামানের দিকে ইট ছুড়ে মারেন। হরতাল শেষ হওয়ার ঘণ্টা খানিক আগে আন্দোলনকারী একজন পুলিশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিছুদিন আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় ওই আন্দোলনকারীর হাত ভেঙে তিন টুকরো হয়ে যায়। সে অবস্থাতেই তিনি আন্দোলনে অংশ নেন। পুলিশ যখন তাকে মারতে শুরু করে তখন তিনি আর থেমে থাকতে পারেননি।
মিজান বলেন, আমি তখন পানিকামানের ওপর উঠে সেটির সামনে থাকা লোহার খাঁচাটি ঝাঁকাতে থাকি। পুলিশ এসে আমাকে টেনে হিচড়ে ওখান থেকে নামায়। তারপর লাথি মারতে শুরু করে। এক সময় ছেঁচড়ে আমাকে থানার ভেতরও নিয়ে যাওয়া হয়। আমাকে মাটিতে ফেলে যখন পেটায় তখন শুধু আমি বুট দেখতে পেয়েছি। আর কিছু না।
মারধরের কারণে ষাটোর্ধ্ব মিজানের পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে এই আশঙ্কায় পরে পুলিশের একজন কর্মকর্তা দুজন কনস্টেবল দিয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকেরা তার এক্স-রে করেন ও ব্যথানাশক ইনজেকশন দেন। তিনি এখন একটু ভালো বোধ করছেন বলে জানান।
পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা দিয়েছে কিনা- এ প্রশ্নের জবাবে মিজান বলেন, তিনি এ ব্যাপারে কিছু জানেন না। থানায় সাদা কাগজে তার থেকে স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে। মারপিটের সময় চশমাটা হারিয়ে ফেলায় কিছু দেখতে পাননি।
ওই দিন রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে পূর্বঘোষিত শান্তিপূর্ণ হরতাল কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে শুধু মিজানুর রহমানই নন, পুলিশের অতর্কিত হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তারসহ অর্ধশতাধিক হরতাল সমর্থনকারী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেন হরতাল ডাকা সংগঠন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েরর অর্থনীতি বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, কিছু ব্যক্তি নিজেদের মুনাফার জন্য দেশ ও জনগণের ক্ষতি জেনেও সুন্দরবনের কাছে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দু নির্মাণে কাজ চালিয়ে যাবে সেটা মেনে নেয়া যায় না। হরতাল শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সরকার ভয়ভীতি দেখানোর জন্য সকালে শাহাবাগে দফায় দফায় পুলিশ দিয়ে হামলা চালিয়েছে। টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেছে হরতাল সমর্থকদের ওপর। বৈজ্ঞানিক তথ্য, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে বাংলাদেশের জলবায়ু হুমকির মুখে পড়বে এমন কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থাকলে সরকার জনগণের দাবি মেনে নিত।
সমালোচকরা বলছেন, সরকারের অতিমাত্রায় ভারতপ্রীতির মাশুল দিতে হচ্ছে জাতিকে। ক্ষমতাসীনদের পাশে থাকার ঋণ শোধ করছে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে। ইতিমধ্যে সড়ক, নৌ ও আকাশ পথে ভারতকে ট্রানজিট দিয়েছে সরকার। এখন ভারত তাদের মজুদে থাকা নি¤œমানের কয়লা বিক্রিসহ বেশ কিছু স্বার্থ হাসিলের নীলনকশা হিসেবে রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে ব্যবহার করছে। অথচ রামপালের এই ১৩২০ মেগাওয়াটসম্পন্ন কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি কৃষি ও পরিবেশের ক্ষতির আশংকায় ২০০৮ সালে ভারত সরকার বাতিল করে দেয়। এরইমধ্যে রামপালের নির্মাণ করা হয়েছে প্রকল্পের মূল অফিস, আবাসিক ভবন, হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থাপনা। শীঘ্রই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল স্থাপনা নির্মাণ কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের খারাপ অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে প্রকল্প শুরুর গোড়ার দিক থেকেই প্রতিবাদ করছে বিশেষজ্ঞমহল। বাম ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও পরিবশকর্মীদের সংগঠন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি গত সাত বছর ধরে নির্মিতব্য রামপাল প্রকল্প নিয়ে কথা বলছে। পরে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বিশিষ্টজনদের একাংশ ‘সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি’ নামে এক প্লাটফর্মের মাধ্যমেও রামপাল প্রকল্পের ক্ষতির দিকটি নিয়ে জনমত গঠনে কাজ করতে থাকে। এর বাইরে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস মুভমেন্ট, গ্রিন ভয়েস, সেভ দ্য সুন্দরবন, বাগেরহাট ডেভেলপমেন্ট কমিশন, রামপাল কৃষি জমি রক্ষা কমিটি, নেচার ক্যাম্পেইন বাংলাদেশসহ অন্যান্য সামাজিক সংগঠন এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতা করে আসছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বাসদ ও সিপিবিসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠগুলোও থেমে নেই। বিবৃতি, সভা-সমাবেশ, লংমার্চ ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে অব্যাহতভাবে। অথচ বাংলাদেশ সরকার ভারতের স্বার্থরক্ষা ও সন্তুষ্টি লাভের জন্য উক্ত প্রকল্প বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে। সরকার এমনকি সুন্দরবনকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ ঘোষণাকারী জাতিসংঘের অধিসংস্থা ‘ইউনেস্কো’র রামপাল প্রকল্প পুনর্বিবেচনার আহ্বানকেও পাত্তা দিচ্ছে না। রামপাল প্রকল্পের বিরুদ্ধে ভারতেও পরিবেশবাদীরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।
রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে সরকারের একাংশও দ্বিধায় রয়েছেন। পরিবেশ মন্ত্রণালয় এ প্রকল্পের ব্যাপারে সতর্ক অবস্থান নেয়। গতবছর ৯ জুন সংসদে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জানান, রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদফতর থেকে এখনো পরিবেশ ছাড়পত্র দেয়া হয়নি। জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য এ কে এম মাইদুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী আরো জানান, রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে যথোপযুক্ত শর্তারোপ করে এ প্রকল্পের অনুকূলে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) প্রতিবেদন অনুমোদন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত মিটিগেশন মেজার্স যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনের ক্ষতি হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
অবশ্য সরকারের পরিবেশ সমীক্ষাতেই স্বীকার করা হয়েছে, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ চলাচল করার ফলে- ১) কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ থেকে কয়লা, তেল, ময়লা আবর্জনা, জাহাজের দূষিত পানি সহ বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নিঃসৃত হয়ে নদী-খাল-মাটি সহ গোটা সুন্দরবন দূষিত করে ফেলবে; ২) সুন্দরবনের ভেতরে আকরাম পয়েন্টে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা উঠানো নামানোর সময় পানি-বায়ু দূষণ ঘটবে; ৩) চলাচলকারী জাহাজের ঢেউয়ে দুইপাশের তীরের ভূমি ক্ষয় হবে; ৪) কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ ও কয়লা লোড-আনলোড করার যন্ত্রপাতি থেকে দিনরাত ব্যাপক শব্দ দূষণ হবে; ৫) রাতে জাহাজ চলের সময় জাহাজের সার্চ লাইটের আলো নিশাচর প্রাণীসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল সুন্দরবনের পশু-পাখির জীবনচক্রের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে ইত্যাদি।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রকল্প কর্মকর্তাদের সুরে সুর মিলিয়ে অব্যাহতভাবে দাবি করছেন, রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না। এমনকি তিনি রামপালবিরোধীদেরও কঠোর সমালোচনা করে থাকেন। গত শনিবার চট্টগ্রামে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) ৫৭ তম জাতীয় কনভেনশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যেখানে তৈরি হবে, সেই জায়গায় না গিয়েই রামপালবিরোধীরা এর ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বলছেন। রামপালের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনে নয়, রামপালে স্থাপন করা হবে।
এদিন প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবনের বাইরের সীমানা থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে এবং ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে নির্মিত হচ্ছে, তাই সুন্দরবনের ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই। তিনি বলেন, যেখানে তার সরকার দেশের জনগণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে, সেখানে অল্পসংখ্যক মানুষ ঢাকায় বসে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধিতা করছেন এবং দেশের বাইরেও এর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন। 
‘মাইলফলক’ মনে করছে সরকার : গত বছর ১২ জুলাই রাতে ঢাকার অন্যতম পাঁচতারা হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও-এ ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেডের (বিএইচইএল) সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল)। এর মাধ্যমে রামপালে মৈত্রী সুপার থারমাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই চুক্তিকে বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশ-ভারত সহযোগিতার ‘মাইলফলক’ হিসেবে বিবেচনা করে সরকার। আগামী ২০১৯ সালের মধ্যে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন শুরুর আশা করা হচ্ছে।
বিআইএফপিসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক উজ্জ্বল কান্তি ভট্টাচার্য ও বিএইচইএল’র মহাব্যবস্থাপক প্রেম পাল যাদব চুক্তিতে সই করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, ভারতের বিদ্যুৎ সচিব প্রদীপ কুমার পূজারি, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
ওই অনুষ্ঠানে তৌফিক-ই-ইলাহি চৌধুরী বলেন, “রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের বা পরিবেশের জন্য হুমকি হবে না। সরকার ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মিলে সেরকম ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
 দেশী বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার আপত্তি ও উদ্বেগ : সুন্দরবনের পাশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিপদ নিশ্চিত জেনেই রামসার ও ইউনেস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারকে একাধিক বার চিঠি দিয়েছে। সুন্দরবনের পাশে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউনেস্কো সরকারকে প্রথম চিঠি দেয় ২০১৩ সালের ২২ মে। ওই বছর ১৫ অক্টোবর সরকারের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) রিপোর্ট ইউনেস্কোর হাতে পৌঁছে। একই বছরের ১২ ডিসেম্বর ইউনেস্কো ইআইএ রিপোর্টের ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা উল্লেখ করে সরকারকে চিঠি পাঠায়। সরকারের মতামত ইউনেস্কোর কাছে পৌঁছাতে লাগে ২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল। এর মধ্যে ইউনেস্কো সুন্দরবনের পাশে একই স্থানে আরেকটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (ওরিয়ন গ্রুপের ৫৬৫ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র) পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। ইউনেস্কো এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ২০১৪ সালের ১১ এপ্রিল সরকারকে আবার চিঠি দেয়। ইউনেস্কোর ৩৮ ও ৩৯ তম অধিবেশনে সুন্দরবনের পাশে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল এবং অন্যান্য দূষণকারী কারখানার ব্যপারে তাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
নিয়ম অনুসারে, কোন একটি স্থানকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করেই ইউনেস্কোর কাজ শেষ হয় না, তারা সাইটগুলো নিয়মিত মনিটরিং করে, সরকারের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট চায় এবং সেই অনুযায়ী তাদের অনুরোধ সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের কাছে পাঠায়। তারপরও সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এবং ফলাফলস্বরূপ কোন বিশ্ব ঐতিহ্য বিপদাপন্ন মনে হলে তারা সেটাকে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দেয়।সরকার যেভাবে রামপাল ও ওরিয়নের বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে আগাচ্ছে, তাতে অচিরেই হয়তো সুন্দরবনকে আমরা বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় দেখতে পাব।
জলাভূমি সংরক্ষণ বিষয়ক রামসার কনভেনশনের সচিবালয় থেকে ২০১১ সালের ২২ জুন বাংলাদেশের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় বরাবর প্রেরিত চিঠিতে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আনা কয়লা সুন্দরবনের ভেতরে আকরাম পয়েন্টে লোড-আনলোড করা বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
রামসারের চিঠি পাওয়ার পর পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে মতামতের জন্য বন অধিদফতর, বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য বিভাগের কাছে চিঠি প্রদান করা হয়। এর মধ্যে খাদ্য বিভাগ ও শিল্প মন্ত্রণালয় কোন মতামত প্রদান থেকে বিরত থাকে। বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পের পক্ষে সাফাই গাওয়া হয়, মূল প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে গোঁজামিল দেয়ার চেষ্টা করা হয়। 
তবে অন্যান্য দফতর যেমন- বন অধিদফতর, পরিবেশ অধিদফতর এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুন্দরবনের ক্ষতি করে রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ব্যাপারে তীব্র আপত্তি প্রকাশ করা হয়। ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টম্বর পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় বরাবর চিঠি দিয়ে জানায়, “বন সংরক্ষক, খুলন অঞ্চল সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। সুন্দরবন রামসার সাইট তথা বিশ্ব ঐতিহ্য বিধায় কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের বিষয়টি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে পুনর্বিবেচনা করার জন্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হলো।”
পরিবেশ অধিদফতর তার ২০১১ সালের ২১ জুলাইয়ের চিঠিতে প্রথমে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বলে উল্লেখ করলেও যেহেতু এর সাথে পরিবেশের বিষয়যুক্ত আছে সেজন্য মতামত প্রকাশ করে বলে: “পরিবেশ অধিদফতর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য বিশেষত সুন্দরবন রামসার সাইটের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের উপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে উদ্বিগ্ন।”
 এছাড়া সুন্দরবনের জন্য বিপদজনক রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসি থেকে নরওয়ে সরকারের গ্লোবাল পেনশন ফান্ড বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়। এ প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তিন ফরাসি ব্যাংকও। আর্থিক খাত অনুসরণ করে এমন কয়েকটি সংগঠনের জোট- ব্যাংক ট্রাক, একুয়েটর প্রিন্সিপলসের (আর্থিক খাতে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পরিকাঠামো) অধীনে ২০১৫ সালে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়, রামপাল প্রকল্পের ডিজাইন, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে মারাত্মক ঘাটতি প্রকাশ পেয়েছে বিশ্লেষণীতে। এ ছাড়া প্রকল্পটি একুয়েটর প্রিন্সিপলসের ন্যূনতম সামাজিক ও পরিবেশগত মানদণ্ড ও ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশনের পারফরম্যান্স স্ট্যান্ডার্ডসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
এদিকে বৃটেনের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক খবরে বলা হয়েছে, পরিবেশবিদদের আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। দিল্লীভিত্তিক সেন্টার ফর সায়েন্স এন্ড এনভারনমেন্ট-এর গ্রিন প্রজেক্ট রেটিং ভারতের সকল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত রেটিং প্রকাশ করে। সর্বসমক্ষে প্রাপ্য ও প্রাথমিক কিছু তথ্য দিয়ে ওই রেটিং প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এরপরও উঠে এসেছে মোটামুটি উদ্বেগজনক একটি চিত্র। ভারতে এনটিপিসি ২৫টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করে। আরও নয়টি যৌথ প্রকল্পও পরিচালিত হয় এনটিপিসি’র হাতে। রেটিং অনুযায়ী, পরিবেশ মানদণ্ডে ছয়টি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সর্বনিম্ন অবস্থায় রয়েছে। সর্বোচ্চ রেটিং যেখানে নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০ শতাংশ। সেখানে ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর স্কোর ছিল মাত্র ১৬-২৮ শতাংশ।
উন্নয়ন হতে হবে জনস্বার্থে : ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, শুধু সরকারি সমীক্ষার ওপর ভর করে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে, যা সুন্দরবন ও এই দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে আমরা মনে করি। তার মতে, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সংগঠনের মাধ্যমে এ বিষয়ে সমীক্ষা পরিচালনা করতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ভুক্তভোগীদের মতামত আমলে না নেয়ার অভিযোগ করে তিনি বলেন, আমরা উন্নয়ন বিরোধী নয়। তবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনগণের স্বার্থ মাথায় নিয়েই উন্নয়ন করতে হবে।
এ বিষয়ে অধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবন ও এই দেশের অনিবার্য ক্ষতি ডেকে আনবে। অথচ সে বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে সরকার মুখে উন্নয়নের কথা বলছে। তার মতে, সরকার যদি দেশ ও জনগণের উন্নয়ন চায়, তাহলে অবশ্যই রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সরিয়ে নিতে হবে।
http://www.dailysangram.com/post/269670-%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A6%AE%E0%A6%A4-%E0%A6%93-%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%AE%E0%A6%B9%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%89%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%97-%E0%A6%86%E0%A6%B9%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%89%E0%A6%AA%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE