২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
মুদ্রানীতির প্রভাব মনে করছেন বিশ্লেষকরা: পুঁজিবাজারে বড় দরপতন; সাড়ে তিন বছরের রেকর্ড অতিক্রম
৩০ জানুয়ারি ২০১৭, সোমবার,
দরপতনে বিগত সাড়ে তিন বছরের রেকর্ড অতিক্রম করল দেশের পুঁজিবাজার। গতকাল দিনভর ব্যাপক দরপতনের পর দেশের দুই পুঁজিবাজারই এ রেকর্ড পার করে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকটি এ দিন ১১৭ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট হারায়। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারের সার্বিক মূল্যসূচক হারায় ৪১৯ দশমিক ২৩ পয়েন্ট। ২০১৩ সালের জুলাই মাসের পর পুঁজিবাজারে এক দিনে আর এত বড় দরপতন ঘটেনি। সর্বশেষ ওই বছরের ২৩ জুলাই ডিএসই সাধারণ সূচক ১২৫ দশমিক ১৭ পয়েন্ট হারায়। 
অর্থবছরের শেষ অর্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণার দিনই এমন পতন ঘটল পুঁজিবাজারে। বাজার সংশ্লিষ্টরা এই দর পতনের পিছনে মুদ্রানীতির প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন। লেনদেন শুরু হওয়ার পর থেকে টাকা বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে এ বাজারের শেয়ারদরের এ পতন ঘটে। লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও ফান্ডের বেশির ভাগ দর হারানোর পাশাপাশি কমেছে লেনদেনও। দিন শেষে উভয় বাজারে ৮৪ শতাংশের বেশি কোম্পানি দর হারায়। 
প্রতিবারের মতো এবারো বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থবছরের আগামী ছয় মাসের মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। আগের ছয় মাসের চেয়ে এ মুদ্রানীতিতে খুব বেশি পরিবর্তন না হলেও মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় আলোচনায় উঠে আসে পুঁজিবাজারের চলমান পরিস্থিতি। এ সময় ২০১০ সালের প্রসঙ্গ তুলে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নজরদারি বৃদ্ধির ঘোষণা দেন। বেলা ১১টায় মুদ্রানীতি ঘোষণা শুরু হলে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে গভর্নরের এ ঘোষণা প্রকাশ পায়। বেলা সোয়া ১১টার দিকে বাজারে তৈরি হয় প্রচণ্ড বিক্রয়চাপ। একে একে দর হারাতে থাকে লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলো। 
বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করেন, মুদ্রানীতিতে তেমন একটা পরিবর্তন না ঘটলেও পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক প্রবণতা ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে ছিল। এর আগে ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না থাকায় লাগামহীনভাবে বেড়ে যায় বাজার। একপর্যায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে চরম বিপর্যয় নেমে আসে পুঁজিবাজারে। তাই পুঁজিবাজারে যাতে এ ধরনের নতুন কোনো বিপর্যয় না ঘটে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নানাভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নজরদারি চালায়। গতকালও বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর এ ধরনের নজরদারির কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু এর মানে এ নয় যে, এত দ্রুত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিনিয়োগসীমা পার করে ফেলেছে। কারণ প্রতিনিয়তই বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ নজরদারি চলছে। 
তারা মনে করেন, দীর্ঘ দিন ধরে টানা দরপতনের পর পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা আনার স্বার্থে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ নিয়ে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়। সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মূলধনকে বিনিয়োগ হিসাবের বাইরে রাখা ছিল এর একটি। এতে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের পুঁজিবাজারে নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় এটাও ভূমিকা রাখে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক নজরদারি বলতে কী বোঝাচ্ছে, তা না বুঝেই বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। গতকালের বাজার আচরণ তারই প্রমাণ। তারা বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলার পরামর্শ দেন। 
রোববার মুদ্রানীতি ঘোষণা হবে, এ খবরে গত বৃহস্পতিবার থেকে বাজার কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়ে। ওই দিন বাজারগুলোতে লেনদেন ও সূচক দুইই কমে যায়। গতকাল সকালেও এ ধারাবাহিকতা রক্ষা করে পুঁজিবাজারগুলো। লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে দুই পুঁজিবাজার। ঢাকা শেয়ারবাজারে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৪৬১৮ দশমিক ৬৫ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করে বেলা ১১টায় নেমে আসে ৫৫৯৮ পয়েন্টে। এ যাত্রায় সাময়িকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করলেও বেলা সোয়া ১১টায় বিক্রয়চাপ আরো তীব্র হয়ে ওঠে। বেলা ২টা পর্যন্ত এ চাপ অব্যাহত থাকলেও পরে সূচকটি নেমে আসে। ১২৬ পয়েন্টের বেশি হারিয়ে ডিএসই সূচক নেমে আসে ৫৪৯২ পয়েন্টে, ষে কয়েক মিনিটে হারানো সূচকের কিছুটা ফিরে পায় বাজারটি। দিন শেষে ১১৭ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট হারিয়ে ৫৫০০ পয়েন্টে স্থির হয় ডিএসই সূচক। 
গতকাল দুই বাজারে বেশির ভাগ খাতেই মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানির সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। বেশ কয়েকটি খাতেই শতভাগ কোম্পানি দর হারায়। এ দিন সবচেয়ে বেশি দরপতনের শিকার হয় ব্যাংক, বীমা, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মিউুচয়াল ফান্ড। এ চারটি খাতে দর হারায় ৯০ শতাংশের বেশি কোম্পানি। ঢাকায় লেনদেন হওয়া ৩২৭টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৭৫টি দর হারায়। বিপরীতে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে মাত্র ৪৭টির। অপরিবর্তিত ছিল পাঁচটির দর। অপর দিকে চট্টগ্রামে লেনদেন হওয়া ২৬৩টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৪২টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে ২১৭টি দর হারায়। অপরিবর্তিত ছিল চারটির দাম। 
চরম এ দরপতনের মধ্যেও গতকাল দুই পুঁজিবাজারের লেনদেনে শীর্ষস্থানটি দখলে রাখে বেক্সিমকো লিমিটেড। ঢাকায় ৫৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকায় কোম্পানিটির এক কোটি ৭৭ লাখ চার হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। ৪০ কোটি টাকা লেনদেন করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল এসিআই লিমিটেড। ডিএসসির লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানির মধ্যে আরো ছিল যথাক্রমে ইসলামী ব্যাংক, আরএসআরএম স্টিলস, একমি ল্যাবরেটরিজ, লঙ্কা বাংলা ফিন্যান্স, যমুনা অয়েল, আরএকে সিরামিকস, সাইফ পাওয়ারটেক ও ন্যাশনাল ব্যাংক।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/191579