১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
টিআর-কাবিখা কর্মসূচি: সোলার প্যানেলের নামে বড় দুর্নীতির আয়োজন; এমপিদের এখতিয়ার খর্ব করার অভিযোগ ; নতুন নীতিমালা বিতর্কিত ; পর্দার আড়ালে কমিশন বাণিজ্যের শংকা
৩০ জানুয়ারি ২০১৭, সোমবার,
সরকারের টিআর (টেস্ট রিলিফ)-কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) কর্মসূচি থেকে সোলার দুর্নীতির ভূত পিছু ছাড়ছে না। এমনতিইে টিআর-কাবিখার প্রকল্প নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ আকাশছোঁয়া। তার ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে এ সংক্রান্ত প্রতিটি প্রকল্পের অর্ধেক অর্থ সোলার প্যানেলসহ কয়েক ধরনের কাজে বাধ্যতামূলক খরচ করার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। অথচ দেশের অনেক স্থানে এর প্রয়োজনই নেই। যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে সেখানে সোলার খাতে অর্থ বরাদ্দ অনেকটা হাস্যকরও বটে। এ কর্মসূচির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট অনেকে যুগান্তরকে এমন ক্ষোভ-অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন।
তাদের আশংকা, বাস্তবিক অর্থে সোলার প্যানেল স্থাপনের নামে টিআর-কাবিখা কর্মসূচির অর্ধেক টাকার বড় অংশ বেহাত হয়ে যাবে। অর্থাৎ শত শত কোটি টাকা লুটপাট হবে।
এক হিসাবে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছর এ কর্মসূচিতে যে পরিমাণ চাল বরাদ্দ দেয়া আছে তা টাকার অংকে ২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। যার ৫০ ভাগ তথা ১ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা সোলার প্যানেলসহ সর্বজনীন জরুরি নয় এমন কাজে খরচ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তারা মনে করেন, টিআর ও কাবিখা কর্মসূচিতে এটি বহাল থাকলে দুর্নীতি আরও বাড়বে। কেউ কেউ বলছেন, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধের অজুহাতে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত নীতিমালা যেভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে তাতে এ সেক্টরের দুর্নীতিবাজরা আরও উৎসাহিত হয়েছে।
এদিকে এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করে দেশের বিভিন্ন সংসদীয় আসনের এমপিরা নতুন নীতিমালার কঠোর সমালোচনা করেন। যুগান্তরকে বেশ কয়েকজন এমপি বলেন, সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দফতর থেকে এক শ্রেণীর আমলা যেভাবে নীতিমালা সংশোধন করেছেন সেখানে প্রকারান্তরে এমপিদের খাটো করা হয়েছে। অতীতে এমপিরা এসব প্রকল্প যেভাবে প্রণয়ন ও মনিটরিং করতে পারতেন এখন আর সেভাবে পারবেন না। তাই অবিলম্বে তারা টিআর-কাবিখা কর্মসূচি থেকে সোলার প্যানেলসহ অপ্রয়োজনীয় শর্তগুলো বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ এমনও অভিযোগ করেন, নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সোলার প্যানেল সরবরাহ করার শর্ত জুড়ে দেয়ায় পর্দার আড়ালে কমিশন বাণিজ্যের দুর্নীতি আরও প্রসারিত করবে।
জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মো. শাহ কামাল রোববার যুগান্তরকে বলেন, টিআর-কাবিখা কর্মসূচিতে সোলার প্যানেল ও বায়োগ্যাসসহ এ ধরনের সামগ্রী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে। তারাই এসব সামগ্রীর মান যাচাই-বাছাইসহ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডকে (ইডকল) দায়িত্ব দিয়েছে। মন্ত্রণালয় শুধু এ সংক্রান্ত বরাদ্দ ছাড় করে থাকে। তিনি দাবি করে বলেন, ‘এ বিষয়ে মাঠপর্যায় থেকে সম্প্রতি আমরা ভালো রিপোর্ট পাচ্ছি। এখানে অনিয়ম ও দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির উপদেষ্টা স্থানীয় এমপি। তিনিই এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখভাল করেন।’ কাজেই দুর্নীতি করার সুযোগ নেই। মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয় নাকচ করে সচিব বলেন, কোথাও অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে টিআর কর্মসূচিতে বরাদ্দ আছে দেড় লাখ টন চাল ও আড়াই লাখ টন গম। যার বাজারমূল্যে এক হাজার ২৮১ কোটি ৩২ লাখ ৭ হাজার টাকা। কাবিখা কর্মসূচিতে বরাদ্দ দুই লাখ ১৫ হাজার টন চাল ও দুই লাখ ২০ হাজার টন গম। টাকার অংকে এ বরাদ্দের মূল্য ১ হাজার ৪৩৫ কোটি ৪৭ লাখ ৩২ হাজার ৬০০ টাকা। দুই খাতের বরাদ্দের মূল্য প্রায় ২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। যার পুরোটাই দুস্থ মানুষের পাওয়ার কথা। কিন্তু এর অর্ধেক টাকা অর্থাৎ ১ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকাই খরচ করতে হবে সোলার সামগ্রী খাতে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সোলার কোম্পানিগুলোর বড় ধরনের আন্ডারহ্যান্ড ডিলিং রয়েছে। এ দুই কর্মসূচির অর্থ সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ এবং উপজেলা পরিষদের নামে সাধারণ বরাদ্দ দেয়া হয়। বিশেষ বরাদ্দ বণ্টনের ক্ষমতা শুধু মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের। এজন্য আলাদা কোনো নিয়মনীতি নেই। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ বরাদ্দের আদেশ মন্ত্রণালয়ের বারান্দাতেই কেনাবেচা হয়। এটি পাওয়ার জন্য মন্ত্রী-এমপি আবেদন করেন। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠন ও ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের প্যাডে সরকারদলীয় প্রভাবশালী লোকজন আবেদন করে থাকেন। আর মন্ত্রণালয়ও তা যাচাই-বাছাই ছাড়াই দলীয় বিবেচনাসহ গোপনে কেনাবেচায় ভাগ বসিয়ে ভুয়া প্রকল্পের বিপরীতে সরাসরি বরাদ্দ দেয়। এভাবে দীর্ঘদিন থেকে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে হরিলুট চলছে টিআর-কাবিখা কর্মসূচির টাকা। পকেট ভারি হচ্ছে অধিদফতরের শীর্ষ ব্যক্তিসহ সংশ্লিষ্টদের। অনেক ক্ষেত্রে যারাই রক্ষক, তারাই ভক্ষক। তাই বেশিরভাগ অভিযোগের তদন্ত হয় না। কোনোটির হলেও তা প্রমাণিত হয়নি বলে রিপোর্ট দিয়ে দেয়া হয়। তবে যেসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করেছে সে ক্ষেত্রে ৯০ ভাগ প্রমাণিত হয়েছে।
এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) রিয়াজ আহমেদ জানিয়েছেন, বর্তমানে টিআর-কাবিখা কর্মসূচিতে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে না। তবে নিুমানের সোলার সামগ্রীর বিষয়টি স্বীকার করে বৃহস্পতিবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, মানসম্মত সোলার সামগ্রী সরবরাহ করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইডকলকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। গত বছর সময় স্বল্পতার কারণে তারা পর্যাপ্ত পরিমাণ সামগ্রী সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে অন্য কোম্পানির সামগ্রী নিতে হয়েছে। গত বছর এ ধরনের বেশ কিছু অভিযোগ পেয়েছি। এসব অভিযোগ পাওয়ার পর ইডকলের সঙ্গে বৈঠক করে বাজার যাচাই করে মূল্য ৩০ শতাংশ কমানো হয়েছে। চলতি বছর এ ধরনের সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতি দেখভাল করতে ইউএনওর নেতৃত্বে উপজেলা তদারকি কমিটিকে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অধিদফতরের দুর্নীতির বিষয় অস্বীকার করে রিয়াজ আহমেদ বলেন, একটি পদে থাকলে এ ধরনের অপবাদ শুনতে হয়। সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। তবে কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
টিআর ও কাবিখা নিয়ে সমালোচনা অনেক দিনের। মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এর সমালোচনা করেছেন। গত বছরের ২৪ জুলাই পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ভবনে বাংলাদেশ সামিটের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে একজন সিনিয়র মন্ত্রী বলেছিলেন, টিআর-কাবিখার ৮০ শতাংশই চুরি হচ্ছে, যা স্থানীয় এমপিদের পকেটে যায়।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, স্থানীয় উন্নয়নের নামে টিআর ও কাবিখা প্রকল্পের টাকা এবং চাল-গম সরকারি দলের নেতাকর্মীদের ভাগবাটোয়ারা করে নেয়া নতুন বিষয় নয়। এসব টাকা উঠেছে দলের একশ্রেণীর নেতাকর্মী ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পকেটে। তারাই এসবের সুবিধাভোগী। দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ যা পায়, তা কর্মসূচির খুবই কম অংশ।
এদিকে সোলার প্যানেল নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে দেশজুড়ে হাজার হাজার উদাহরণ রয়েছে। এক্ষেত্রে শুধু চট্টগ্রাম জেলার একটি উদাহরণ তুলে ধরলে প্রকৃত চিত্র জানা যাবে। দেখা গেছে, এ জেলার বেশিরভাগ এলাকায় কাগজে-কলমে সোলার প্যানেল প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার হদিস মেলেনি। আবার কোথাও কোথাও প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে নিুমানের সোলার প্যানেল বসানোর মাধ্যমে। চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলার প্রায় সবক’টিতেই সোলার প্যানেল প্রকল্প নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় মসজিদ-মন্দিরে সোলার প্যানেল স্থাপনের বিপরীতে টাকা উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে তা না বসিয়েই পুরো টাকা মেরে দেয়া হয়েছে। দোহাজারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বেগ অভিযোগ করেন, তার ইউনিয়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদ-মন্দিরে স্থাপন করা প্রায় সবক’টি সোলার প্যানেলই অকেজো। নিম্নমানের তার, কম ভোল্টেজের বাল্ব স্থাপন করায় সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়েছে।
 
http://www.jugantor.com/first-page/2017/01/30/97369/%E0%A6%B8%E0%A7%8B%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A7%9C-%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%86%E0%A7%9F%E0%A7%8B%E0%A6%9C%E0%A6%A8