১৯ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
স্ক্যানিং ছাড়াই খালাস হচ্ছে ৬০ শতাংশ আমদানি পণ্য: কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজশে স্ক্যানার পদ্ধতি অচল। এ সুযোগে খালাস হচ্ছে হাজার কোটি টাকার অবৈধ পণ্য চালান
৩০ জানুয়ারি ২০১৭, সোমবার,
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি পণ্যের প্রায় ৬০ শতাংশই স্ক্যানিং ছাড়া খালাস হচ্ছে। এতে বিশাল অংকের রাজস্ব ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগে অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তাদের হাত করে খালাস করা হচ্ছে উচ্চ শুল্কের পণ্য। এক পণ্যের ঘোষণায় আসছে আরেক পণ্য। কাস্টমস কর্মকর্তারা সব জেনেও যেন চোখ বন্ধ করে থাকেন। স্ক্যানার স্বল্পতার অজুহাতে বর্তমানে কাস্টম হাউসে স্ক্যানার বাণিজ্য এখন জমজমাট। অথচ আমদানি-রফতানি পণ্যের চালান শতভাগ স্ক্যানিংয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে বিদ্যমান ৪টি স্ক্যানারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। বর্তমানে জোড়াতালি দিয়ে এসব মেয়াদ উত্তীর্ণ স্ক্যানার দিয়েই পণ্য চালান পরীক্ষা করা হচ্ছে। নতুন একটি মোবাইল স্ক্যানার আমদানি করা হলেও বিভিন্ন জটিলতায় গত কয়েক মাসেও তা চালু করা সম্ভব হয়নি। আর এ সুযোগে সংঘবদ্ধ চক্র কাস্টমস কর্মকর্তাদের পকেটে পুরে অবৈধ পণ্য আমদানিতে সক্রিয় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেছেন, কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই স্ক্যানার পদ্ধতি প্রায় অচল করে রাখা হয়। এ সুযোগে খালাস হচ্ছে হাজার কোটি টাকার অবৈধ পণ্য চালান।
 
 
একাধিক আমদানিকারক স্বীকার করেছেন, স্ক্যানারের সঠিক কার্যকারিতার অভাবকে পুঁজি করে চট্টগ্রাম বন্দরকে নিরাপদ রুটে পরিণত করেছে চোরাকারবারিরা। প্রতিবছর স্ক্যানিংয়ের বাইরেই থাকছে অধিকাংশ কনটেইনার, যা ঝুঁকিপূর্ণ। রফতানি পণ্যের শতভাগ এবং সিংহভাগ আমদানি পণ্য থেকে যাচ্ছে স্ক্যানিং আওতার বাইরে। কোনো পণ্যই শতভাগ পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। স্ক্যানারের অভাবে বন্দরের ১২টি গেটের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৮টি। এতে বন্দরে চাপ বাড়ছে, সুযোগ নিচ্ছে অসাধু আমদানি ও রফতানিকারকরা। এ কারণে বন্দরে পণ্যের দীর্ঘ জট লেগে যায়। হয়রানির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
 
এদিকে এনবিআরের পক্ষ থেকেও আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে- যে কোনো সময় স্ক্যানিং সিস্টেম অকেজো হয়ে যেতে পারে। গত ২৮ ডিসেম্বর অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে অনুষ্ঠিত এডিপি পর্যালোচনা সভায় স্ক্যানারের বিষয়টি উঠে আসে। এ সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (শুল্ক ও নীতি) ও অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড কর্মসূচি পরিচালক ফরিদ উদ্দিন বলেন, সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের ৪টি স্ক্যানারের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়োজিত ফার্মের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলোর আয়ু শেষ হওয়ার পরও কেন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ফার্মের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে হবে তা বোধগম্য নয়। দ্রুত এসব স্ক্যানারের স্থলে নতুন স্ক্যানার স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, অন্যথায় যে কোনো সময় স্ক্যানিং সিস্টেম অকেজো হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া একই সভায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) স্ক্যানার সংগ্রহে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানান, চলমান একটি প্রকল্পের আওতায় ৪টি মোবাইল কনটেইনার স্ক্যানার সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে দেয়া হয়েছে। আরও নতুন ৯টি স্ক্যানারের জন্য একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে রাজস্ব বাজেটের আওতায় কনটেইনার স্ক্যানার সংগ্রহের জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। ফলে সমন্বয় ও প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ না করে প্রকল্প গ্রহণ করায় সময়ক্ষেপণ হচ্ছে।
 
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম কাস্টমসের অধীন বন্দরের বিভিন্ন গেটে বসানো স্ক্যানার মেশিন ৪-৫ ঘণ্টা কাজ করার পর গরম হয়ে যায়। ফলে এগুলো বন্ধ রাখতে হয়। এতে স্টেকহোল্ডাররা হয়রানি ও বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এগুলো দিয়ে কনটেইনার স্ক্যানিং করলেও অনেক সময়ই ভেতরের দ্রব্যটির স্বচ্ছ ইমেজ পাওয়া যায় না। কেবল মেটাল ও নন-মেটালের মধ্যে পার্থক্য অস্বচ্ছভাবে দেখা যায়। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে অনেক অত্যাধুনিক স্ক্যানার ব্যবহার করা হয়। গাড়িতে থাকা ওই আধুনিক স্ক্যানার কনটেইনারের পাশ দিয়ে গেলে ওই কনটেইনারের মধ্যে থাকা মালামালের স্বচ্ছ ইমেজ পাওয়া যায়। ওই ধরনের স্ক্যানার স্থাপন কাস্টমসের জন্য অতি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ধরনের অত্যাধুনিক স্ক্যানার না থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার কনটেইনারের মধ্যে কোনো অবৈধ ও ক্ষতিকর পদার্থ থাকলে তা খুঁজে বের করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া প্রতিদিন শিল্পের কাঁচামাল, দুধসহ পাউডারজাতীয় বিভিন্ন পণ্য, রাসায়নিক এবং ভোজ্যতেলসহ তরল রাসায়নিক চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস হচ্ছে। কোনো কোনো পণ্য সরাসরি কনটেইনারসহ আমদানিকারকের শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ইয়ার্ডে চলে যায়। অত্যাধুনিক স্ক্যানার না থাকার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অসাধু আমদানিকারক ও অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তারা। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তাদের স্ক্যানিং ‘ইমেজ রিডিং’ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান নেই। যার ফলে বেসরকারি অপারেটরদের দ্বারা প্রাপ্ত নির্দেশে তারা প্রভাবিত হয়ে কাজ করেন। অপরদিকে যেখানে কনটেইনারসহ মালামাল ডেলিভারি হয়, সেখানে কাস্টমসের অডিট ইনভেস্টিগেশন এবং রিসার্চ (এইআর) টিম ঠিকমতো কাজ করে না।
 
সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর এক আইনে আমদানি-রফতানি পণ্য স্ক্যানিং ছাড়া খালাস না করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। ওই সময় এক অফিস আদেশের মাধ্যমে চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন প্রকল্পের আওতায় বন্দরে চারটি কনটেইনার স্ক্যানারও স্থাপন করা হয়। বন্দরের ১২টি গেটের চারটিতে স্ক্যানার বসানো হয়। এসব স্ক্যানার দিয়ে আমদানি-রফতানি পণ্যের মাত্র ৪৫ শতাংশ স্ক্যানিং করা সম্ভব হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে স্ক্যানিংয়ের দায়িত্বে রয়েছে সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান এসজিএস। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের পাঁচ মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানিতে ৯ লাখ ২ হাজার ৪৭০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৮৯টি কনটেইনার স্ক্যানিং হয়েছে। আর স্ক্যানিং ছাড়া বের হয়ে গেছে পণ্যভর্তি ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৭৮১টি বা ৫৫ শতাংশ কনটেইনার। শুরু থেকে এ পর্যন্ত স্ক্যান করা কনটেইনারের মধ্যে ৭ হাজার ৪৪৮টিতে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আনার পাশাপাশি বিস্ফোরক দ্রব্য, মাদক ও আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য আনার প্রমাণও মিলেছে। কনটেইনারে বিস্ফোরকদ্রব্য, মাদক ও আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য আনার প্রমাণ পাওয়ায় মামলা দায়ের করে কাস্টমস।
 
কাস্টমস সূত্র আরও জানায়, আমদানি খোলা পণ্যের ১৯ থেকে ২০ ভাগ পণ্যেও কায়িক পরীক্ষা করা হয়। এ ছাড়া শিল্পপণ্য আমদানি বা খোলা যন্ত্রপাতিও স্ক্যানিং করা হয় না। আনস্টাফিং পণ্যও স্ক্যানিংয়ের বাইরে থাকে। বর্তমানে কিছু রফতানি পণ্য এবং অর্ধেক আমদানি পণ্য স্ক্যানিং হচ্ছে। তাও পুরোপুরি বা শতভাগ নয়। স্ক্যানিং মেশিনের অভাব এখন খুবই প্রকট। সব কনটেইনার স্ক্যানিং মেশিনে দিয়ে পরীক্ষা করা যাচ্ছে না শুধু স্ক্যানিং মেশিন সংকটের কারণে। যেসব কনটেইনার সন্দেহ হয়, শুধু সেই কনটেইনারই স্ক্যানিং করা হচ্ছে। গত বছর একটি অত্যাধুনিক মুভেবল স্ক্যানিং মেশিন পাওয়া গেলেও গত সাত মাসে এটি চালু করা যায়নি।
 
চট্টগ্রাম কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার (জেটি) গিয়াস কামাল রোববার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, ‘যে হারে আমদানি-রফতানি বেড়েছে স্ক্যানিং মেশিনের অপ্রতুলতার কারণে সব ধরনের পণ্যভর্তি কনটেইনার স্ক্যানিং করা যাচ্ছে না। সব পণ্য কিংবা কনটেইনার স্ক্যানিংয়ের বাইরে থাকা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও আমরা সন্দেহের ভিত্তিতে কনটেইনার আটক করে স্ক্যানিং করি। বেশ কয়েকটি চালান আটক করেছি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজন বন্দরের ১২টি গেটে ১২টি স্ক্যানিং মেশিন। কিন্তু আছে চারটি। এসব অনেক পুরনো। চালু আছে কিন্তু ঠিকভাবে কাজ করছে না। একটি অত্যাধুনিক মুভেবল স্ক্যানিং মেশিন বন্দরের এনসিটি-৩ গেটে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু কিছু যন্ত্রপাতি না থাকায় এটি চালু করা যায়নি। খুব শিগগির এটি চালু হবে। চলতি অর্থবছরের শেষের দিকে আরও দুটি স্ক্যানিং মেশিন সংযুক্ত হওয়া প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। এই কর্মকর্তা বলেন, ‘স্ক্যানার সংকটের কারণে কোনো কোনো কাস্টমস কর্মকর্তা বা অসাধু আমদানিকারক সুযোগ নিচ্ছে না তা বলা যাবে না। এ সুযোগে অবৈধ পণ্যভর্তি অনেক কনটেইনার বন্দর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে এটা ঠিক।’
 
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহসভাপতি ও পোর্ট ইউজার্স ফোরামের নেতা এএম মাহবুব চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘স্ক্যানিং মেশিনের অপর্যাপ্ততায় কনটেইনার পরীক্ষা করা যাচ্ছে না সময়মতো। এতে বন্দরের ভেতরে যেমন কনটেইনার-জট লাগছে তেমনি প্রাইভেট আইসিডিগুলোতেও একই অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে।’ তিনি বলেন, এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি একদিকে মন্থর হচ্ছে অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা হচ্ছেন হয়রানির শিকার। এ অবস্থায় শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের জন্য দীর্ঘ ৫ মাস এবং স্থাপন করার জন্য আরও ৭ মাস সময় বন্দরে কাস্টমসের একটি স্ক্যানার অলসভাবে ফেলে রাখা অনাকাক্সিক্ষত, দুর্ভাগ্যজনক।’
http://www.jugantor.com/first-page/2017/01/30/97373/%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%82-%E0%A6%9B%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A6%BE%E0%A6%87-%E0%A6%96%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B8-%E0%A6%B9%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A7%AC%E0%A7%A6-%E0%A6%B6%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B6-%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF-%E0%A6%AA%E0%A6%A3%E0%A7%8D%E0%A6%AF