১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
নেই কোনো জানালা: দেখা অদেখা
৩০ জানুয়ারি ২০১৭, সোমবার,
|| সালাহউদ্দিন বাবর ||
 
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কখনোই স্বাভাবিক ছিল না, এখনো নেই। মুখোমুখি বসা তো দূরের কথা, সব সময়ই কথাবার্তায় ও বক্তৃতা বিবৃতিতে পরস্পর আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার যেন তাদের জন্য স্বাভাবিক বিষয়। জাতীয় কোনো দুর্যোগ মুহূর্তে বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কট মোকাবেলায় দলগুলোর মধ্যে কথা বলার রেওয়াজ নেই। কথা বলার নেই কোনো ‘জানালা’। অথচ জাতীয় দুর্যোগকালে রাজনৈতিক দলগুলো যদি পরস্পর মতবিনিময় করতে পারে, তবে সমস্যা মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হতে পারে। আর সে ক্ষেত্রে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে সঙ্কট মোকাবেলায় এক প্লাটফর্মে সমবেত হতে পারে। সঙ্কটকালে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তাদের পক্ষে পরিস্থিতি মোকাবেলা সহজ হয়। সংলাপ বা আলোচনা নিয়ে দেশের প্রধান দুই দলের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সব সময়ই সংলাপের কথা বলে আসছে। রাজনৈতিক বিষয়ে সংলাপের জন্য বিএনপি বহুবার ক্ষমতাসীনদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অথচ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংলাপ অনুষ্ঠানের আহ্বান সব সময় সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। সংলাপ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অনীহার কারণ পরিষ্কার নয়। 
পারস্পরিক সংলাপ সমঝোতা অতীব প্রয়োজনীয় বিষয় হলেও এ সংস্কৃতি আমাদের দেশে সৃষ্টি হয়নি। তাই কোনো বিষয়েই এখন আলোচনা, মতবিনিময় কিছুই হয় না। এতে বহু মৌলিক ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলো বিভক্ত। এই অনৈক্য শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়; সাধারণ জনগণসহ বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী এমনকি সাংবাদিকদের মধ্যেও বিভেদ বা মতপার্থক্য বিস্তর। এটা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়। যে কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতে বা বিতর্ক হতে পারে; কিন্তু তারও একটা মাত্রা থাকবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। পরস্পর বাক্যবিনিময়, একে অন্যের সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান পর্যন্ত বন্ধ থাকে। সহনশীলতা কিংবা সহিষ্ণুতা মোটেও বজায় থাকে না।
সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের এই অসুস্থতা সবাই উপলব্ধি করে। কিন্তু এর প্রতিকার করতে কেউ এগিয়ে আসেন না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে এই বিভেদের বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সামাজিক রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে বিভাজন বিভেদের দেয়াল উঁচু হচ্ছে। অথচ সম্পর্কের সেতুগুলো উঁচু হচ্ছে না। এর পরিণতি আমাদের কারো জন্য ভালো নয়।’ গত ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি আরো বলেন, প্রেস ক্লাব, চিকিৎসক, আইনজীবী থেকে শুরু করে সর্বত্র সংশয় অবিশ্বাস ও বিভাজনের দেয়াল উঠে গেছে। এর পরিণতি ভালো নয়। বিভেদ দূর করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অন্ধকার দিয়ে অন্ধকার প্রতিহত করা যায় না। অন্ধকার দূর করতে চাই আলো। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রীর এই বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঙ্গনে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার যথাযথ প্রতিফলন। জনাব ওবায়দুল কাদের দেশের অন্যতম বৃহৎ দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী। দু’দিক থেকে ক্ষমতাবান বলে তিনি অনেক কিছুই করার ক্ষমতা রাখেন। জনাব কাদের মাঝে মধ্যেই এমন গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে থাকেন। কিন্তু তার বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় না। আরো উল্লেখ করা যেতে পারে, তার বক্তব্যে সকাল-সন্ধ্যায় বৈপরীত্য লক্ষ করা যায় অনেক সময়ে। এতে তার বক্তব্যের গুরুত্ব হারিয়ে যায়। 
২০ জানুয়ারি সকালে তিনি যে ইতিবাচক বক্তব্য রেখেছেন, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু ওই দিন অর্থাৎ ২০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় তিনি অন্যরকম বক্তব্য রেখেছেন ময়মনসিংহে। ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজ মাঠে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মরহুম মাহবুবুল হক শাকিলের স্মরণে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেছেন, বিএনপি হচ্ছে নালিশ পার্টি। বি-তে বিএনপি, এন-তে নালিশ, পি-তে পার্টি। এরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়। তারা সন্ত্রাস ও নাশকতা করে ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপির মরা গাঙে আর জোয়ার আসবে না।
সেতুমন্ত্রী যে সুসম্পর্কের কথা বলেছেন সকালে, ঠিক তার বিপরীত বক্তব্য দিয়েছেন সন্ধ্যায়। এমন বক্তব্য অবশ্যই দুই দলের সম্পর্ক স্বাভাবিক ও ইতিবাচক করতে কোনো সহায়ক ভূমিকা রাখবে না। দেশের বড় দুই দলের সম্পর্ক যদি স্বাভাবিক হতো তবে গোটা রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিবেশ অনেক সহজ এবং স্বাভাবিক হতো। তা দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়ক হতো। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবনে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ত। এসব ক্ষেত্রে শান্তিশৃঙ্খলা এলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি আসত। সেতুমন্ত্রীর ওই বক্তব্য দেয়ার পর বিতর্ক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে, এমন নয়। আবার নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘বিএনপি নতুন নতুন আবদার নিয়ে আসছে। এটা তাদের মামাবাড়ির আবদার। বেগম খালেদা জিয়াকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, আপনি যে আজিজ মার্কা ইসি গঠন করেছিলেন, সেই আজিজ কি বিএনপির লোক ছিল না? আপনি যাকে প্রধান উপদেষ্টা করতে চেয়েছিলেন, সেই সাবেক বিচারপতি কে এম হাসানকে সার্চ কমিটিতে রাখার জন্য নাম প্রস্তাব করেছেন। সেই হাসান সাহেব বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।’ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর জবাবে বলেছেন, ‘সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে সার্চ কমিটিতে রাখার জন্য বিএনপি প্রস্তাব দিয়েছে বলে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সর্বৈব মিথ্যা।’ এ বিতর্ক এখানেই শেষ নয়, তা আরো অগ্রসর হয়েছে। আমরা সে বিষয়ে আর না গিয়ে এতটুকু বলব, এমন বক্তব্য আসলে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ করে দুই প্রধান দলের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে। সেতুমন্ত্রীর সম্পর্কের দেয়াল তার নিজের বক্তব্যেই আরো উঁচু হবে।
২০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যে বক্তব্য দিয়েছেন সেখানে কিছু অমূলক কথা রয়েছে। তা নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, দলটি (বিএনপি) ‘গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়’। এ বিষয়টির দিকে যদি গভীর দৃষ্টিপাত করা যায়, এ সম্পর্কিত তথ্যাদি তুলে ধরা হলে জনাব ওবায়দুল কাদেরের অভিযোগ সত্য বলে প্রতীয়মান হবে না। প্রথমেই উল্লেখ করা যেতে পারে একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসার কথা। ১৯৭৫-এ আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সব দল নিষিদ্ধ করে, প্রায় সব সংবাদপত্র বন্ধ করে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। গণতন্ত্রের জন্য এই পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত ক্ষতিকর। তখন মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়েছিল। এই অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আওয়ামী লীগ কখনো সামান্য দুঃখ প্রকাশ করেনি। শুধু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্ষতি হয়েছিল চতুর্থ সংশোধনীতে, তা নয়; তথাকথিত সমাজতন্ত্র কায়েমের নামে দেশের সব শিল্পকারখানা জাতীয়করণ করে দলীয় লোকদের সেখানে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এসব প্রশাসক শিল্প প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। এতে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। চতুর্দিকে এক মারাত্মক অরাজকতা দেখা দেয়। পরে দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ বাকশাল ব্যবস্থাকে যথাযথ পদক্ষেপ ছিল বলে উল্লেখ করেছে। বিএনপিকে তিরস্কার করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায় থেকে সব স্তরের একই সুরের প্রতিধ্বনি লক্ষ করা যায়। 
আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পরবর্তী, ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। তারা ক্ষমতায় এসে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী এনে বাকশাল ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে দেন। পুনরায় বহুদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েমসহ জনগণকে তাদের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হয়। দেশে পুনরায় অবাধে সংবাদপত্র, তথা বহুমতের পত্রপত্রিকা প্রকাশের সুযোগ করে দেয়া হয়। এটাকে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা না বলে গণতন্ত্রের পরিপন্থী কাজ বলা যাবে কি? এই সত্যকে লুকিয়ে রেখে ভিন্ন কথা বলা কি সমীচীন?
’৯১ সালে সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় আসে। সে সময় দেশে প্রতিষ্ঠিত ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসনব্যবস্থা। আর এ ব্যবস্থা কায়েম করেছিল আওয়ামী লীগই চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে।
স্বাধীনতার পর দেশে সংসদীয় ব্যবস্থা বহাল করা হয়। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছিল। পরে বিএনপিও এই ব্যবস্থা বহাল রেখেছিল। ’৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অধিকতর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলে দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা কায়েমের দাবি ওঠে। বিএনপি এ ব্যাপারে নীরব ছিল। কিন্তু জাতীয় পার্টিও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারপদ্ধতির ওপর আস্থা জ্ঞাপন করেছিল। অপর দিকে, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী সংসদীয় সরকারব্যবস্থার প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়ে এ জন্য দাবি তোলে। বিএনপি তখন প্রধান দুই বিরোধী দলের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধানের সংশোধনী নিয়ে আসে। সংসদে তা যথারীতি দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে গৃহীত হয়। গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা জানিয়ে বিএনপি এই ব্যবস্থা নিয়েছিল। একে অবশ্যই গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতি দলটির সমর্থন হিসেবে ধরতে হবে। 
গণতন্ত্রের প্রতি বিএনপির যে শ্রদ্ধা ও সমর্থন রয়েছে তার আরো প্রমাণ রয়েছে। নির্বাচনকালে দলীয় সরকারের পরিবর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য পুনরায় আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী দাবি তোলে এবং এ জন্য সংসদে ও সংসদের বাইরে আন্দোলন গড়ে তোলে। বিএনপি প্রথম পর্যায়ে এই দাবির বিরোধিতা করেছিল। এই দাবি পূরণ না হলে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ব্যাহত হবে এবং জনমতের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া হবেÑ এই বিবেচনায় বিএনপি বিরাট রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে ’৯৬ সালে একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করে পুনরায় ক্ষমতায় আসে। এর পরই সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে সংযোজন করেছিল। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নিজেই তত্ত্বাবধায়কের যে বিধান করেছিল, তারাই ক্ষমতায় গিয়ে সেই বিধান বাতিল করার ব্যাপারে ভূমিকা রাখে। এখন আর সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান নেই। 
এর আগে ১৯৮২ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ বিএনপিকে অবৈধ পন্থায় ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে, নিজে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসেন। গণতন্ত্রের যে শুভযাত্রা দেশে শুরু হয়েছিল, জেনারেল এরশাদ তাকে বাধাগ্রস্ত করেন এবং সামরিক শাসন জারি করে সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থাকে ব্যাহত করেছিলেন। বিএনপি এই অবৈধ শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যায়। এ জন্য বিএনপিকে দুর্বল করতে দলটিকে ভাঙা হয়েছিল। ১৯৯০-তে এরশাদ সরকারের পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত বিএনপি গণতান্ত্রিক আন্দোলন জারি রাখে। এরশাদ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালেই দু’দফা সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগসহ বহু দল এসব নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু বিএনপি এসব কোনো নির্বাচনেই অংশ নেয়নি। তারা এরশাদ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়াটা অবৈধভাবে তার ক্ষমতা নেয়ার উদ্যোগকে বৈধতা দেয়ার শামিল বলে বিবেচনা করেছিল।
এ ছাড়াও অন্যান্য গণতান্ত্রিক ইস্যুতে বিএনপি সোচ্চার থেকেছে। তখন একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবিতে সব মহল ঐক্যবদ্ধ। একেও গণতান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। সাম্প্রতিককালে দেশে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য রাজনৈতিক মহল, পেশাজীবীরা এবং সুশীলসমাজ দাবি জানিয়ে আসছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের যেসব নির্বাচন হয়েছে, তার একটিও অবাধ নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে গোটা নির্বাচনব্যবস্থা তথা গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। সাধারণ জনগণ ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেনি, ভোট চুরি হয়ে গেছে। গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। বিএনপি এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ছিল এবং রয়েছে।
দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামে বিএনপিকে অতীতে এবং এখনও বহু নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিনের সরকারের আমলে বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে যেতে হয়েছে। নানা জুলুম নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে বিএনপিকে। এখন পর্যন্ত বিএনপি চরম বৈষম্যের শিকার। ক্ষমতাসীনেরা এবং তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলো যথারীতি সভা সমাবেশ মিছিল করছে। কিন্তু বিএনপি তাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মসূচিও পালন করার অনুমতি পাচ্ছে না। এক দিকে অনুমতি দেয়া হচ্ছে না, অপর দিকে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে, তারা রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকে না। বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শত শত মামলা জেল জুলুম ইত্যাদি চালানো হচ্ছে। 
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শুধু দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিই নন, দেশেরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তার অবস্থান ও ক্ষমতা দুই-ই স্বীকৃত। তার যে কোনো বক্তব্যতাই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ২০ জানুয়ারি সকালে ঢাকায় যা বলেছেন তা তাৎপর্যপূর্ণ ও অর্থবোধক এবং গভীর উপলব্ধি থেকে বলেছেন। জাতি আশা করে, তার একই দিন ময়মনসিংহের দেয়া বক্তব্যের চেয়ে সকালের কথা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে এটা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিবেশকে উন্নত করবে। আওয়ামী লীগও তারই চর্চা করবে। স্বাধীনতার ৪৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, এটা কম সময় নয়। এখন দেশের উন্নয়ন ও তার পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু ছোটখাটো বিষয় নিয়ে বিতর্কের অবসান হতে হবে। এমন একটা অবস্থা সৃষ্টির ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের দায়িত্ব বেশি। তাদের কাজের জবাবদিহি চাইবে, বিচার বিশ্লেষণ করবে তাদের প্রতিপক্ষ। ভুলত্রুটি নিয়ে বিতর্ক হবে। প্রতিপক্ষের দায়িত্ব হলো, দেশের জনগণের স্বার্থে, তথা রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রার জন্য তারা সরকারের সমালোচনা করবে। ক্ষমতাসীনদের সহিষ্ণুতা থাকতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনা দায়িত্বে যারা যাবেন, তাদের অবশ্যই দেশের মানুষের পছন্দের ব্যক্তি হতে হবে। আর এই পছন্দ করার পদ্ধতি তথা নির্বাচনব্যবস্থা অবাধ ও সুষ্ঠু হতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় জনগণ দিতে পারে না। ক্ষমতাসীনেরা দেশের জন্য কাজ করছেন, এটা স্বীকৃত। এখন তাদের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের পছন্দ করার পদ্ধতিটা স্বচ্ছ অবাধ নিরপেক্ষ করা। ক্ষমতায় যারা যাবেন, তাদের ক্ষমতারোহণ নিয়ে যেন কোনো বিতর্ক না থাকে।
একই সাথে এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে, দেশে এখন নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ, তা নিয়ে অস্থিরতা ও প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি দল ও তার প্রতিপক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য বিস্তর। সরকারি দলের কাছ থেকে বিরোধী দল উপযুক্ত আচরণ পাচ্ছে না। এ আলোচনায় আগে উল্লেখ করা হয়েছে যে এক্ষেত্রে বৈষম্য, নির্যাতন চলছে। এখন এর স্থায়ীভাবে অবসান হওয়া উচিত।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/191451