২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
নগরবাসী অতিষ্ঠ: ওষুধে মশা মরে না ফগারে অজ্ঞান হয়; নগরবাসী অতিষ্ঠ : ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নিষ্ফল চেষ্টা ডিসিসির
২৯ জানুয়ারি ২০১৭, রবিবার,
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কোটি কোটি টাকার ওষুধ ছিটিয়েও মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বরং রাজধানীতে বেড়েই চলেছে মশার উপদ্রব। দিনে রাতে সমানতালে চলছে মশার যন্ত্রণা। মশা নিয়ন্ত্রণে উত্তর সিটি করপোরেশনের মাসব্যাপী ক্রাশ প্রোগ্রাম চলছে। দক্ষিণ সিটিও সম্প্রতি সপ্তাহব্যাপী বিশেষ অভিযান চালিয়েছে। তবু মশা থেকে নিস্তারের কোনো লক্ষণ নেই। মশার কামড়ে ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াসহ মশাবাহিত নানা রোগ। দুই সিটি করপোরেশন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও মশার উপদ্রব অব্যাহত থাকায় ুব্ধ রাজধানীবাসী। অনেকেই সন্দেহের আঙুল তুলে বলছেন, ধোঁয়ার কোনো হিসাব নেই। তাই ওষুধের নামে কী পরিমাণ ধোঁয়া ছিটানো হচ্ছে তা বোঝার কোনো উপায় নেই। এগুলো ওষুধ না পানি, সাধারণের পক্ষে তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। তবে কারো কারো অভিমত, মাঠপর্যায়ের মশকনিধন কর্মীরা সঠিকভাবে ওষুধ ছিটাচ্ছেন কি না তা নিয়মিত তদারকির কথা থাকলেও পাড়ামহল্লায় তাদের সাথে আর কাউকে দেখা যায় না কখনোই। অভিযোগ আছে, সিটি করপোরেশনের ওষুধে মশা মরে না। ফগার মেশিনের বিকট শব্দ ও ধোঁয়ায় মশারা দিশা হারালেও, সম্বিত ফিরে পেয়ে আবার উড়াল দেয়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) সূত্রে জানা যায়, গত বছর মশক নিধনে তাদের ১৪ কোটি টাকা বাজেট ধার্য থাকলেও ব্যয় হয় ১১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এ বছর বাজেট প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়েছে ডিএনসিসি। ওষুধ, কচুরিপানা পরিষ্কারসহ আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা বাজেট রাখা হয়েছে। 
দুই সিটিতে মশা নিধনে কার্যক্রমে কোনো ঘাটতি নেই বলা হলেও মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলছে না রাজধানীবাসীর। ক্র্যাশ প্রোগ্রামও তাদের শান্তি দিতে পারেনি। উল্টো দিনে-রাতে সব সময় মশার অত্যাচার চলছেই। মশারি না টাঙিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন না নগরবাসী। 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুরো রাজধানীতেই মশার ভয়াবহ উপদ্রব চলছে। এর মধ্যে বনশ্রী, খিলগাঁও, মতিঝিল, মিরপুর, ধোলাইখাল, মীরহাজিরবাগ, যাত্রাবাড়ী, ধলপুর, শ্যামপুর, কামরঙ্গীরচর, সূত্রাপুর, মোহাম্মদপুর, মগবাজার, ফকিরেরপুল, মানিকনগর, বাসাবো, কমলাপুর, মুগদা, সায়েদাবাদ, রামপুরা, বাড্ডা, মহাখালী, কুড়িল, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার এলাকায় মশার উপদ্রব বেশি। এ ছাড়া নগরীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, ধানমন্ডিতেও বেড়েছে মশার ভয়াবহ উপদ্রব। অভিজাত এলাকাগুলোর বেশির ভাগ ফ্যাটবাড়িতেই জানালা-দরজায় মাসকিউটো নেট লাগানো আছে। কিন্তু তাতেও রেহাই নেই। নিচতলা থেকে শুরু করে বিশতলা পর্যন্ত সর্বত্রই মশার সমান উপদ্রব।
হামিদুর রহমান নামে বনশ্রীর এক বাসিন্দা বলেন, রাত-দিন সব সময়ই মশা থাকে। সন্ধ্যায় দরজা-জানালা বন্ধ করে দিতে হয়, না হলে মশার যন্ত্রণায় টেকা যায় না। রাতে মশারি ছাড়া ঘুমানোর উপায় থাকে না। অনেক সময় মশারির মধ্যেও মশা ঢুকে পড়ে। 
খিলগাঁও তালতলার বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, রাজধানীতে এত বড় বড় মশা, দেখলেও ভয় করে। শুনেছি সিটি করপোরেশন থেকে ওষুধ ছিটানো হয়, কিন্তু আমার চোখে কখনো পড়েনি। ওষুধ তারা আদৌ ছিটান, নাকি অন্যত্র বিক্রি করে দেন তা বোধগম্য নয়। 
উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের গৃহবধূ অনিকা ইসলাম বলেন, বাসার জানালায় মাসকিউটো নেট রয়েছে। এর মধ্যেও মশা চলে আসে। সারা দিনই মশার যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। রাতে মশারি ছাড়া ঘুমানোর কথা চিন্তাও করা যায় না। ছেলেমেয়েদের পড়ার সময় বাজার থেকে কিনে আনা ওষুধ স্প্রে করতে হয়। একই সেক্টরের ৩ নম্বর রোডের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, মশক নিধনকর্মীদের কাছে ওষুধের একটি বোতল থাকে। কেউ যদি তাদের ২০০ টাকা ধরিয়ে দেয়, তাহলে সেই বোতল থেকে ওষুধ ঢেলে ফগিং করেন। তা না হলে দায়সারা ধোঁয়া ছিটিয়ে যান। এই সেক্টরেরই একজন বাসিন্দা জানান, গতকালই ফগার মেশিনে ধোঁয়া ছড়িয়েছে ডিএনসিসির কর্মীরা। কিছুক্ষণ পরই মশাদের ওড়াউড়ি শুরু হয়ে যায়। এতে বোঝা যায়, বিকট শব্দে মশারা হয়তো জ্ঞান হারিয়েছিল। সম্বিত ফিরে পেয়ে উড়তে শুরু করেছে।
মহাখালীর বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, বাসায় থাকলে সব সময় হাতের কাছে ইলেকট্রিক ব্যাট রাখতে হয়। আর আমার অফিস ফার্মগেটে, সেখানেও মাঝে মধ্যেই ওষুধ স্প্রে করতে হয়। না হলে টেকা যায় না। 
ডিএনসিসির বক্তব্য : ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা: এস এম এম সালেহ ভূঁইয়া নয়া দিগন্তকে জানান, বর্তমানে ৯৫ হাজার লিটার অ্যাডালটিসাইড ওষুধ মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া লার্ভিসাইড ওষুধও আছে যথেষ্ট। এ বছর দুই হাজার দুই শ’ বিঘা জলাশয়ের কচুরিপানার পাশাপাশি ড্রেনও পরিষ্কার করা হয়েছে। এখন মশার বংশবিস্তারের সময় হওয়ায় ৮ জানুয়ারি থেকে বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম চালানো হচ্ছে। জানুয়ারি মাসজুড়ে এ কার্যক্রম চলবে। 
তিনি বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই। কিন্তু বর্তমানে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া থাকায় এবং কিছু এলাকার ড্রেন পরিষ্কার না থাকায় মশার উৎপাদন ঠেকানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে বস্তি এলাকায় ড্রেন পরিষ্কার করলে আবার ভর্তি করে ফেলে। এ ছাড়া ঢাকার আশপাশের এলাকা যেমনÑ বসুন্ধরা, এয়ারপোর্টের পাশের এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতার বাইরে, এসব এলাকা থেকেও মশা সিটির মধ্যে চলে আসছে। মশা প্রায় ১১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে পারে বলে জানান তিনি। 
সালেহ ভূঁইয়া বলেন, ওষুধ ঠিকমতো ছিটানো হচ্ছে কি না তা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হয়। আমাদের মাঠ সুপারভাইজারদের পাশাপাশি ওয়ার্ড কাউন্সিলররাও বিষয়টি তদারকি করেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা যায়, গত বছর সাড়ে ১২ কোটি টাকা বাজেট ধার্য করলেও ব্যয় হয় ৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এ বছর বাজেট রাখা হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। 
ডিএসসিসির প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা সাখাওয়াৎ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে এ বছর তিন লাখ লিটার অ্যাডালটিসাইড ও চার হাজার লিটার লার্ভিসাইড ওষুধ কেনার টার্গেট নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ লিটার অ্যাডালটিসাইড কেনা হয়েছে। বাকি দুই লাখ লিটার পর্যায়ক্রমে কেনা হবে। লার্ভিসাইড চার হাজার লিটার কেনা হয়েছে। 
তিনি আরো জানান, গত বছরের মজুদ কিছুসহ এ বছরের সাত মাসে এক লাখ ১০ হাজার অ্যাডালটিসাইড লিটার ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে হাতে ২০-৩০ হাজার লিটার অ্যাডালটিসাইড রয়েছে। লার্ভিসাইড ব্যবহার করা হয়েছে এক হাজার লিটার। মজুদ আছে আরো তিন হাজার লিটার। 
সাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, ১৫ জানুয়ারি থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত দক্ষিণ সিটি এলাকায় বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো হয়। শিগগিরই ফের বিশেষ অভিযান চালানো হবে। এ ছাড়া নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/191292