২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
লিটন হত্যা নিয়ে যত কথা: চলতে ফিরতে দেখা
২৯ জানুয়ারি ২০১৭, রবিবার,
|| ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী ||
২৯ জানুয়ারি ২০১৭,রবিবার, ০০:০০
 
গাইবান্ধা-১ আসনের আওয়ামী লীগ এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের হত্যাকাণ্ড নিয়ে গত ২৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশ বাহিনীর এক সম্মেলনে তীব্র উষ্মা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেল গাইবান্ধায়। আমাদের এক সংসদ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। এমপির বাসায় পাহারারত পুলিশ তুলে নেয়া হয়েছিল। কেন পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়া হলো? তার বিরুদ্ধে একটা অপবাদ দিয়ে লাইসেন্স করা অস্ত্র তার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হলো। মনে হলো, একেবারে পরিকল্পিতভাবে ছেলেটাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে কোন পত্রিকায় কী লিখল, সেটা সঠিক খবর কি না, না জেনেই কেন এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হলো, যার জন্য একজন সংসদ সদস্যকে জীবন দিতে হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। সেখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধিকে এভাবে মৃত্যু বরণ করতে হবেÑ এটা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি এলাকায় এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ছোটখাটো ঘটনা ঘটলেই দেখি হাউকাউ শুরু হয়ে যায়। একজন সংসদ সদস্যকে হত্যা করার পর কোনো মানবাধিকার সংগঠন বা কেউ এ ব্যাপারে শব্দ করল না। বাংলাদেশ একটা অদ্ভুত দেশ। তিনি বলেন, যারা পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে হত্যা করল, মসজিদে আগুন দিলো, মানুষ পোড়াল, তাদের বিরুদ্ধে এদের অত বেশি সোচ্চার হতে দেখি না। এটাও ষড়যন্ত্রের অংশ।
এ বক্তব্য মুদ্রার একটা পিঠ মাত্র। অন্য পিঠ আরো ভয়ঙ্কর। সন্দেহ নেই, যেকোনো হত্যাকাণ্ডই নিন্দনীয়। তা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিই হোন কিংবা হোন অতি দরিদ্র সাধারণ মানুষ। নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নূর হোসেনও জনপ্রতিনিধি ছিলেন। তাই বলে এটা আশা করা যায় না যে, কোনো মানবাধিকার সংগঠন নূর হোসেনের মুক্তির জন্য ‘হাউকাউ’ শুরু করে দেবে। সে অপরাধী। তার পক্ষে কেন দাঁড়াতে যাবে মানবাধিকার সংগঠন? তবে এমপি লিটনের ঘটনা ভিন্ন।
গত ২২ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের কয়েকজন এমপি এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যমের কঠোর সমালোচনা করেছেন। নিহত এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের ওপর শোক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাকালে তারা বলেন, ‘লিটন যে শিশু সৌরভকে গুলি করেছিল, সে ব্যাপারে মিডিয়া সত্য কথা লেখেনি। বরং কঠোর সমালোচনাও করা হয়েছিল এ কারণেই।’ ২০১৫ সালের ২ অক্টোবর ভোর ৫টায় এমপি লিটন শহর থেকে তার গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পথে ১০ বছরের শিশু সৌরভের দু’পায়ে গুলি করে চলে যান। এ নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক ক্ষোভ, সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। দেশের সব সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে এ ঘটনার ওপর বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এসব রিপোর্টে প্রমাণিত হয় যে, লিটনই শিশু সৌরভকে গুলি করে গুরুতর আহত করেছেন। আর রিপোর্টের সূত্র হিসেবে গণমাধ্যম লিটনের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। আহত সৌরভের পিতা সাজু মিয়া এমপি লিটনের বিরুদ্ধে তার ছেলেকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার দায়ে একটি মামলাও দায়ের করেন।
জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যরা ভিন্ন এক কাহিনী উপস্থাপন করেছেন। তারা দাবি করেন, এমপি লিটনকে হত্যার জন্য দুষ্কৃতকারীরা রাস্তায় ওঁৎ পেতে ছিল। আত্মরক্ষার্থে তিনি হাওয়ায় গুলি ছোড়েন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এমপি লিটন শিশু সৌরভকে গুলি করেননি। তবে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানার তদন্তেও দেখা যায়, সৌরভ এমপির গুলিতেই আহত হয়। পুলিশের তদন্তে এটা প্রমাণিত হয় যে, এমপি লিটনকে হত্যা করার জন্য কেউ ওঁৎ পেতে ছিল না। ব্যাপক তদন্তের পর পুলিশ গাইবান্ধা আদালতে এমপি লিটনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা ও মারাত্মক অস্ত্রের সাহায্যে আহত করার জন্য পেনাল কোডের ৩০৭ ও ৩২৪ ধারায় চার্জশিট দাখিল করেছে। চার্জশিটে বলা হয় যে, ওই দুই ধারায় মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হয়েছে। এটি গত পয়লা এপ্রিল অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে দাখিল করা হয়েছে। তাতে আবেদন করা হয় যে, ওপেন কোর্টে এই এমপির বিচার করা হোক।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে চার্জশিটে বলা হয়, ‘২ অক্টোবর ২০১৫ সালে আহত সৌরভ মিয়া ১০ বছরের বালক, গাইবান্ধার গোলাপচরণ গ্রামে তার চাচার সঙ্গে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিল। এমপি লিটন তার পাজেরো জিপে বাড়িতে ফিরছিলেন। তিনি সৌরভকে দেখতে পেয়ে তাকে কাছে ডাকেন। কিন্তু সৌরভ কাছে যেতে অস্বীকার করে। এতে অভিযুক্ত মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন রাগান্বিত হন এবং সৌরভকে হত্যার জন্য তার পিস্তল থেকে গুলি চালান। গুলি সৌরভের দু’পায়ে লেগে সে গুরুতর আহত হয়।’ চার্জশিটে আরো বলা হয়, ‘প্রত্যক্ষদর্শীরা সৌরভকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তদন্তকালে আটক ওই পিস্তলের ব্যালিস্টিক রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই পিস্তল থেকেই গুলি করা হয়েছিল।’ এ নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হলে সরকারও লিটনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। ঘটনার পর লিটন পলাতক থাকেন। আর পুলিশ তাকে খুঁজতে থাকে।
লিটন ১২ অক্টোবর হাইকোর্টে দু’টি আগাম জামিনের আবেদন করেন। কিন্তু দু’টি আবেদনই হাইকোর্ট নামঞ্জুর করে দেন। হাইকোর্ট তাকে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে গাইবান্ধার নি¤œ আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলেন। তাতে একটা সংশয় হয় যে, ওই তারিখের মধ্যে লিটনকে গ্রেফতার করা যাবে কি না। এই পরিস্থিতিতে হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস আপিল বিভাগে আবেদন করে। আপিল বিভাগের চেম্বার জজ বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন। ফলে লিটনকে গ্রেফতারে আর কোনো বাধা থাকেনি। ১৪ অক্টোবর রাতে গোয়েন্দা বিভাগ ঢাকার উত্তরার একটি বাসা থেকে লিটনকে গ্রেফতার করে। একই রাতে গোয়েন্দাদের একটি দল লিটনকে নিয়ে গিয়ে গাইবান্ধা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
পরদিন লিটনকে গাইবান্ধার একটি আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে তার জামিনের আবেদন নাকচ করে তাকে জেলে পাঠানো হয়। গত বছর ৮ নভেম্বর সংসদ অধিবেশনে যোগদানের জন্য তাকে অন্তবর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করা হয়। পরে তিনি স্থায়ী জামিন পান। তাকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য তিনি আদালতে একটি আবেদন পেশ করেন। সে আবেদনের কোনো মীমাংসা হয়নি। তার বিরুদ্ধে আনীত হত্যাচেষ্টা মামলার শুনানি হওয়ার কথা ছিল এ বছরের ৫ জানুয়ারি। কিন্তু ৩১ ডিসেম্বর তিনি নিহত হওয়ায় সে মামলা আর অগ্রসর হয়নি। সুতরাং সরকারের তরফ থেকে মিডিয়ার বিরুদ্ধে যে ভুল রিপোর্টিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে, তা ধোপে টেকে না। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো এই যে, এর আগে এ ঘটনায় কখনো কারো ‘ওঁৎ পেতে থাকা’র (অ্যামবুশ) কথা বলা হয়নি। তেমনি বলা হয়নি আত্মরক্ষার্থে (সেল্ফ ডিফেন্স) গুলি চালিয়েছেনÑ এমন কথাও। এমন কথা স্থানীয় পুলিশ বলেনি, আওয়ামী লীগের সদস্যরাও বলেননি। এমনকি লিটন নিজেও বলেননি। সে দিক থেকে বাংলাদেশকে আজব দেশ বলা যায়।
এ ঘটনার আরো একটি দিক রয়েছে। লিটনের হত্যাকাণ্ডের পর তার স্ত্রী-শ্যালক, যারা ওই বাড়িতেই ছিলেন, তারা একেবারে চুপ করে গেছেন। শুরু থেকেই কথা বলছেন তার বোনেরা। তাদের মনে অনেক প্রশ্ন। গত বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় সংবাদ সম্মেলন করেন তার বড় বোন আফরোজা বারী। বক্তব্যে অনেক প্রশ্ন রাখেন তিনি।
গাইবান্ধা প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আফরোজা বারী লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘আমার ভাইকে হত্যার ২৫ দিন অতিবাহিত হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের পেছনের কুশীলব ধরাছোঁয়ার বাইরে। তদন্তের উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। আমাদের ধারণা, পরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনি দিয়ে এই হতাকাণ্ড সংঘটিত করা হয়। এর পেছনের মদদদাতা, পৃষ্ঠপোষক, পরিকল্পনাকারী, অর্থের জোগানদাতারা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, দল বা কোনো আদর্শিক অপশক্তি হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘নিজ বাড়িতে মানুষ সবচেয়ে নিরাপদ। অথচ খুনিরা এই নিরাপদ জায়গাকে বেছে নিয়েছে খুনের জন্য। এই বাড়ি খুনিদের জন্য বিবেচিত হলো কেন? কিভাবে খুনিরা পরিচয় না দিয়েই বৈঠকখানায় ঢুকে গেল? লিটনের অতন্দ্র প্রহরী জার্মান শেফার্ড কুকুর দুটো ওই সময় কোথায় ছিল? হানাদাররা পাঁচটি গুলি করার পরও কেন কেউ লিটনের কাছে এলো না? কেন লিটন গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কাউকে কাছে না পেয়ে বাড়ির ভেতরে আঙিনার দিকে দৌড় দিলো? তার ঘনিষ্ঠ দলীয় পরীক্ষিত সহযোদ্ধারা কেউই তার পাশে ছিল না কেন? তারা কি দূরে সরে গিয়েছিল? আমার ভাই গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর এক ঘণ্টা জীবিত ছিল, তখন কেন খুনিদের পরিচয়ের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উঠল না, তখন লিটন সচেতন ও সজ্ঞানে ছিল।’ লিটনের বোন বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে কিছু ঘটনাক্রম আমাদের বিচলিত করছে। এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের আশ্বস্ত করবে।’
তদন্তের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করা হোক। আমার ভাইকে আমরা আর ফেরত পাবো না। খুনিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করালেই তার আত্মা শান্তি পাবে। কিন্তু তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় আমরা হতাশ।’ এক প্রশ্নের জবাবে আফরোজা বারী বলেন, ‘মামলাটি সিআইডি পুলিশের কাছে দেবো কি না, সে বিষয়ে কিছু ভাবিনি। তবে মামলাসহ সার্বিক বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী পর্যবেক্ষণ করছেন, এ বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা উপনির্বাচন নিয়ে ভাবছি না। আমরা চাই, দ্রুত খুনিরা ধরা পড়ুক। তাদের শাস্তি হোক।’ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলামের ছোট বোন ও মামলার বাদি ফাহমিদা বুলবুল, চাচাতো ভাই তৌফিকুর রহমান, ফুফাতো ভাই আনিছুর রহমান, ভাগনি মেহের নিগার ও চাচাতো বোন শিউলি আক্তার।
এসব প্রশ্নের জবাব আমাদের কাছে নেই। আর তাই মিডিয়াকে দোষারোপ করার কোনো মানে হয় না। 
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/191167