২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে বাংলাদেশ
২৮ জানুয়ারি ২০১৭, শনিবার,
গত বুধবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ শাখা (টিআইবি) দুর্নীতির বিশ্বজনীন ধারণা সূচক-২০১৬ সংক্রান্ত যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ, রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী ২০১৫-এর তুনায় বাংলাদেশ দুই ধাপ উন্নীত হয়েছে। আগের বছর বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩তম স্থানে। এবার সেখানে অবস্থান হয়েছে ১৫তম স্থানে। এর অর্থ, বাংলাদেশে দুর্নীতি কমেছে। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, ১৫তম স্থানটি কিন্তু ওপর বা এক নম্বর থেকে নয় বরং একেবারে নিচের দিক থেকে। সে হিসাবে ১৭৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৫তম। 
 
কথা শুধু এটুকুই নয়। অবস্থান নির্ধারণের জন্য ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যে মানদণ্ড অনুসরণ করে স্কোর বা অর্জন তার ভিত্তি। এই স্কোরের শুরু ১০০ থেকে। উদাহরণ দেয়ার এবং প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরার জন্য ডেনমার্ক ও নিউজিল্যাণ্ডের স্কোর সম্পর্কে বলা যায়। দুটি দেশই ১০০-এর মধ্যে ৯১ স্কোর করে এ বছর যৌথভাবে শীর্ষ অবস্থান অর্জন করেছে। অর্থাৎ দেশ  দুটিতে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা অন্য দেশগুলোর তুলনায় কম। অন্যদিকে ডেনমার্ক ও নিউজিল্যাণ্ডের তুলনায় বাংলাদেশের অর্জন ও অবস্থান কিন্তু নৈরাশ্যজনক। কারণ, ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশ স্কোর করেছে মাত্র ২৬। প্রতিবেশি ও এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৫ স্কোর করেছে ভুটান। অন্যদিকে ভারত ও শ্রীলংকা করেছে যথাক্রমে ৪০ এবং ৩৬। মালদ্বীপের স্কোরও ৩৬। সে তুলনায় বাংলাদেশের অর্জন মোটেও উল্লেখযোগ্য নয়। লজ্জিত হওয়ার মতো অন্য এক খবর হলো, দক্ষিণ এশিয়ার  দেশগুলোর মধ্যে স্কোরের দিক থেকে বাংলাদেশ একমাত্র আফগানিস্তানের চাইতে এগিয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় একটি তথ্যও উল্লেখ করা দরকার। সে তথ্যটি হলো, ট্রান্সúারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল সূচকের বৈশ্বিক গড় স্কোর হিসেবে ৪৩-কে নির্ধারণ করেছে। এর অর্থ, ৪৩ বা তার চাইতে বেশি স্কোর করলেই কোনো দেশকে দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার পথে সাফল্যের সঙ্গে অগ্রসরমান বলা যাবে। মাত্র ২৬ স্কোর করায় সেদিক থেকেও বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
 
বলার অপেক্ষা রাখে না, সার্বিক সূচকে দুই ধাপ উন্নতি করলেও দুর্নীতির দুর্নাম ও ব্যাপকতা কমিয়ে আনার ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে কোনো সফলতাই অর্জন করতে পারেনি। বরং রাষ্ট্রের যে ক্ষেত্রগুলোকে দুর্নীতির মূল ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয় সে সবের কোনো একটিতেও দুর্নীতি কমার লক্ষণ পরিষ্কার হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন এখনো ‘দন্তহীন বাঘ’ই হয়ে রয়েছে। বড় কথা, কমিশন সরকারের সেবাদাসের ভূমিকা পালনের অভিযোগ খ-ন করার মতো কোনো কাজ করতে বা দেখাতে পারেনি। টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক ঘোষণার বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়টিকে প্রাধান্যে এনে বলা হয়েছে, মূলত সদিচ্ছার অভাবের কারণে বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিগ্রস্তদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়নি। অভিযুক্ত কাউকে শাস্তিও দেয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্রিয়তা, দৃঢ়তা ও কার্যকরতার ঘাটতির কথাও বলেছে টিআইবি। সংস্থাটি একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক আধিপত্যের মাধ্যমে দলীয়করণ করে ফেলার অভিযোগ তুলেছে। বলেছে, সরকারি ক্রয়সহ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার, ভূমি বনাঞ্চল, নদী ও জলাশয় দখল, সরকারি খাতের নিয়োগে দলীয়করণ এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির নিয়ন্ত্রণহীন বিকাশ ঘটেছে। সেবা খাতে দুর্নীতি ও হয়রানি মানুষের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। অবৈধ বিপুল অর্থের পাচারও বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লজ্জার মুখে ফেলেছে। বড় কথা, এ বিষয়ে ক্ষমতাসীনরা নিজেরাই নিজেদের ঘোষিত অবস্থান থেকে বারবার সরে গেছেন। যার ফলে অর্থ পাচারের কোনো একটি ঘটনারও বিচার হয়নি। শাস্তিও পায়নি জড়িতদের কেউ। কালো টাকাকে বৈধতা দেয়ার এবং কালো টাকার মালিকদের পুরষ্কৃত করার ব্যাপারেও বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে।
 
ওপরে সংক্ষেপে উল্লেখিত কোনো বিষয়ই যে গর্ব করার মতো নয় সে কথা সম্ভবত বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত টিআইবির এ রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে তৎপর হয়ে ওঠা। বলা দরকার, রিপোর্ট প্রকাশনা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদকে কার্যকর করার পাশাপাশি প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পেশাদারি উৎকর্ষ বৃদ্ধির জন্যও তাগিদ দেয়া হয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি তো যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে এসেছেই। টিআইবি বলেছে, সমালোচনা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা কেবল জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ক্ষতিকারক নয়, এর ফলে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিকাশও বাধাহীন হয়। এজন্যই দুর্নীতিবিরোধী সমালোচনা সহ্য করা এবং গণমাধ্যমের গঠনমূলক পরামর্শের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া সরকারের কর্তব্য। আমরাও মনে করি, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি গণমাধ্যমকে যদি স্বাধীনভাবে সমালোচনা করার সুযোগ ও অধিকার দেয়া হয় তাহলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধ সহজে সম্ভব হবে। বলা বাহুল্য, এসব বিষয়ে সরকারকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে।
https://goo.gl/4410H5