১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
ঐতিহ্যের নিচে আতঙ্কের দিন: হেরিটেজ ভবনগুলো সংরক্ষণের জন্য নীতিমালা প্রয়োজন
২৬ জানুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার,
ঐতিহ্য সংরক্ষণের কারণে করা যাচ্ছে না সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ কাজ। তাই বাসিন্দারা বাধ্য হচ্ছেন আতঙ্কের মধ্যে দিনযাপনে। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার থেকে তোলা কাজল হাজরা
 
 
পুরান ঢাকার হেমেন্দ্র দাস লেনের বাসিন্দা খুরশিদ আলম। প্রায় দেড়শ\' বছর আগে এক হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে তার দাদা প্রাচীন এ বাড়িটি কিনেছিলেন। বংশপরম্পরায় বর্তমানে তিন ভাইয়ের সঙ্গে এ বাড়িতেই বসবাস করছেন খুরশিদ। বাড়ির নিচতলায় রয়েছে তার ওষুধের দোকান। তবে প্রাচীন স্থাপত্যরীতিতে তৈরি এ বাড়ির ভেতরের দেয়াল থেকে খসে পড়েছে পলেস্তারা। পলেস্তারা খসে পড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকলে হতো; কিন্তু বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ধসে পড়তে পারে দোতলা বাড়িটি। 
 
একই লেনের আরেক বাসিন্দা শ্যামল সরকার। আয়তনে খুবই ছোট দুটি কক্ষে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে ভাড়া থাকেন তিনি। দুই রুমের একটিতে ছোট একটি 
 
খাট ও একটি টেবিল ছাড়া বেশি কিছু রাখার 
 
জায়গাও নেই। স্বল্প ভাড়ায় বসবাস ও ব্যবসা করার সুবিধার্থে হিমেল ফ্যাশন টেইলার্সের স্বত্বাধিকারী শ্যামল সরকার এখানে থাকছেন। সূত্রাপুর থানার হেমেন্দ্র দাস রোডের ১/১/ক নম্বর বাড়িতে শ্যামলের পরিবার ছাড়াও আটটি পরিবার ভাড়ায় আছে। এ বাড়ির মালিক এস এম জহিরুল ইসলাম নিজ বাড়ি ছেড়ে বিক্রমপুরে থাকেন পরিবার নিয়ে। শ্যামল বলেন, ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে বেশিরভাগ পুরনো ভবনের মালিকই এখানে বসবাস করেন না। তিনি জানান, এই লেনেই তিনটি বাড়ির মালিক ঢাকা-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত মিজানুর রহমান খান দীপুর পরিবার-পরিজন। যথেষ্ট বিত্তবান হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের বাড়িগুলো সংস্কার করতে পারছেন না তারা। 
 
ঐতিহ্যের নিচে আতঙ্কের দিনযাপনে বাধ্য হওয়া মানুষগুলো চান প্রয়োজনে সরকার তাদের জমিজমা নিয়ে অন্য কোথাও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুক। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) 
 
ও ঢাকা সিটি 
 
করপোরেশনের (ডিসিসি-অবিভক্ত) পৃথক দুটি তালিকা এবং সংস্থা দুটির সমন্বয়হীনতার কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার অনেক বাসিন্দা। ২০০৪ সালে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে ভবন ধসে ১৭ জনের মৃত্যু হলে ঢাকা সিটি করপোরেশন কারিগরি জরিপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত ও তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। প্রথমে ১১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পাইলট প্রকল্প হিসেবে এই কারিগরি জরিপের কাজ শুরু করা হয়। করপোরেশনের কারিগরি জরিপের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে কিছু ভবন এবং ঐতিহ্যবাহী নয়, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ এমন কিছু ভবনেরও তালিকা করা হয়। এই পাইলট প্রকল্পে শুধু শাঁখারীবাজারেই ঐতিহ্যবাহী ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত হয় ৯৫টি ভবন। বীরেন বোস স্ট্রিটে ঐতিহ্যবাহী নয়, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ এমন ভবন শনাক্ত হয় ১৮টি। পরে ২০০৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এক গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা :২০০৮-এর ৬১ বিধি অনুযায়ী রাজধানীর মহাপরিকল্পনাভুক্ত এলাকার ঐতিহাসিক, নান্দনিক, বৈজ্ঞানিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় দিকের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে পুরান ঢাকার একটি বড় এলাকাকে ঐতিহ্যবাহী ভবন-স্থাপনার দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে। একই সঙ্গে হেরিটেজ ঘোষিত এলাকা হিসেবে রাজউক ঋষিকেশ রোড, রেবতীমোহন দাস রোড, বি কে দাস রোড, ফরাশগঞ্জ রোড, শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, পনিতলা, প্যারিদাস রোড ও হেমন্ত দাস রোডের নাম তালিকাভুক্ত করে। গেজেট আকারে তালিকাভুক্ত এসব এলাকার মধ্যবর্তী বসতবাড়ি, ইমারত, রাস্তা, গলি ও উন্মুক্ত চত্বরও হেরিটেজ হিসেবে গণ্য হয়।
 
ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা :২০০৮-এর ৬১ বিধির বেশ কয়েকটি উপবিধির মাধ্যমে এসব সংরক্ষিত ভবন, স্থাপনা ও এলাকার সংস্কার এবং ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিধিমালা ৬১ বিধির (চ) উপবিধিতে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ব্যতীত তালিকাভুক্ত ইমারতের কোনো প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন বা ধ্বংসসাধন করা যাবে না। (ছ) উপবিধিতে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত ইমারতের যে কোনো প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন বা ধ্বংসসাধনের জন্য নগর উন্নয়ন কমিটির লিখিত অনুমতির প্রয়োজন হবে। (জ) উপবিধিতে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে তালিকাভুক্ত ইমারতের পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন বা ধ্বংসসাধনের আবেদনের সম্পূর্ণ বা আংশিক অনুমতি দিতে বা সম্পূর্ণ বাতিল করতে পারবে; কর্তৃপক্ষ অনুমতিদানের সময় যে কোনো যুক্তিসঙ্গত শর্ত আরোপ করতে পারবে। (ঝ) উপবিধিতে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের প্রদান করা অনুমতি তিন বছরের জন্য বৈধ থাকবে। (ঞ) উপবিধিতে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত তালিকাভুক্ত ইমারতের কোনো প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন বা ধ্বংসসাধন করে, তা হলে কর্তৃপক্ষ উক্তরূপ ইমারতের মালিক বা দখলদারকে কাজ বন্ধ করার নির্দেশ প্রদান করবে। (ট) উপবিধিতে, কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে কোনো তালিকাভুক্ত ইমারতের যথাযথ তত্ত্বাবধান হচ্ছে না, তাহলে কর্তৃপক্ষ এমন ইমারত বাধ্যতামূলক অধিগ্রহণ করতে পারবে। (ঠ) উপবিধিতে, কর্তৃপক্ষ জরুরি মনে করলে তালিকাভুক্ত ইমারত সংরক্ষণের জন্য যে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। (ঢ) বিধিমালাতে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ সময়ে সময়ে সংরক্ষণ এলাকাসমূহের সংরক্ষণ এবং উন্নয়নের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবে। (ণ) উপবিধিতে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত ইমারত অথবা সংরক্ষণ এলাকা অথবা ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) নির্দেশিত বিশেষ মনোনীত এলাকার ২৫০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে যে কোনো উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এই অংশের উলি্লখিত নিয়মাবলির অন্তর্ভুক্ত হবে। (থ) উপবিধিতে বলা হয়েছে, অনুচ্ছেদ (ণ) এ উলি্লখিত এলাকাসমূহে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, বিশেষ প্রকল্প ছাড়পত্র অথবা ইমারত নির্মাণ অনুমোদনের জন্য যে কোনো আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট কমিটির উপদেশ গ্রহণ করবে, কমিটি প্রয়োজন মনে করলে এমন কাজের জন্য বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে কমিটি গঠন করতে পারবে। 
 
ঐতিহ্যবাহী এই ভবনগুলো সংরক্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসা আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম বলেন, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর বেশিরভাগই ব্যক্তিমালিকানাধীন হওয়ায় সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য সব ভবন যে ঝুঁকিপূর্ণ এমন নয়। ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও প্রাচীন রীতিতে নির্মিত ভবনগুলো সংরক্ষণে বাধ্য হওয়ায় একটি বাড়ির মালিক তার ভবনটি ভেঙে বহুতল নির্মাণ করতে পারলে যে আর্থিক মুনাফা পেতে পারতেন তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে আমরা জানি ঢাকা মহানগরীর যে কোনো প্লটে ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউকের যে বিধিমালা রয়েছে তাতে ওই জমিতে সর্বোচ্চ যে পরিমাণ ফ্লোর এরিয়া নির্মাণ করা যায় তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে, যা কি-না ওই জমির আয়তন ও সামনের রাস্তার প্রশস্ততার ওপর নির্ভর করে। এই বিধিটি এফএআর বা ফ্লোর এরিয়া রেশিও নামে পরিচিত। তিনি আরও বলেন, তালিকাভুক্ত হেরিটেজ এলাকার সব ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে পলেস্তারা পড়েও মানুষ আহত হন বা ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই সরকারকে হেরিটেজ সংরক্ষণের পাশাপাশি মানুষের জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান ও সম্পদের মূল্য প্রাপ্তিতে ওইসব ভবনের মালিকদের অন্যান্য দেশের মতো টিডিআর (ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইট) হস্তান্তরযোগ্য উন্নয়ন অধিকার দিতে হবে। টিডিআর- বিষয়টি ব্যাখ্যা করে আরবান স্টাডি গ্রুপের এই প্রধান নির্বাহী বলেন, টিডিআরের মাধ্যমে স্থাপনার মালিক তার যে প্রাপ্য এফএআর, তা তিনি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলোর বাইরে নির্মিতব্য কোনো ভবনের মালিক বা ডেভেলপারের কাছে বিক্রয় করতে পারেন। এ রীতিটি পাশের দেশ ভারতেও অনুসৃত হয়েছে। স্থাপনার মালিককে টিডিআর নিশ্চিত করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের জন্য টিডিআর ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো পুরান ঢাকার বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইমারত ও মহল্লার সংরক্ষণের জন্য সরকারকে কোনো বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হবে না। ফলে সংশ্লিষ্ট তিন পক্ষই, ভবনের মালিক, ডেভেলপার ও সরকারের লাভ হবে।
 
হেরিটেজ ভবন সংরক্ষণ ও ভবনগুলোর মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে রাজউকের বোর্ড সদস্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) মো. আসমাউল হোসেন বলেন, এখনও এ নিয়ে তেমন কোনো আইন হয়নি। তবে পুনর্বাসনের মাধ্যমে ওই ভবনগুলোর বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে এ সমস্যার একটা সমাধান হতে পারে। আবার তাদের ভবনগুলো না ভেঙে ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমেও একটা ব্যবস্থা করা যায়। এ ক্ষেত্রে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে গঠিত \'নগর উন্নয়ন কমিটি\'ই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। 
 
ভবন সংস্কারে বাসিন্দাদের আবেদনের বিষয়টি নিয়ে রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ পরিচালক ড. মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, \'হেরিটেজ ভবন ভাঙা বা এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দায়িত্ব। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে তালিকা তৈরির কাজ চলছে। কোনো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ভাঙা বা নতুন করে নির্মাণের ক্ষেত্রে আমরা কোনো অনুমতি দিচ্ছি না। তবে সংস্কারের জন্য আগে কয়েকটি আবেদন জমা পড়লেও এখন আর পড়ছে না। আবেদন পড়লেই তা যাচাইয়ের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
 
অবশ্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দেশের ৪৫৫টি হেরিটেজ এলাকা সংরক্ষণের কাজ করছে। রাজধানীর হেরিটেজ এলাকা নিয়ে রাজউক গেজেট প্রকাশ করেছে। গেজেট অনুসারে ওইসব এলাকার বা স্থাপনার সংস্কার বা ভেঙে ফেলার অনুমোদন রাজউকই দিতে পারে। এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কোনো ভূমিকা নেই।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/01/26/265672#sthash.7zL908Qh.dpuf