১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
কৃষি ও পরিবেশগত বিবেচনায় খোদ ভারতে ২০০৮ সালে বাতিল হয়েছিল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প!
২৫ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) তার নিজ দেশেই ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। ২০১০ সালের ৮ অক্টোবর দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’ খবর প্রকাশ করে “মধ্যপ্রদেশে এনটিপিসি’র কয়লাভিত্তিক প্রকল্প বাতিল” শিরোনামে। ওই খবরে জানানো হয়, কৃষি ও পরিবেশগত সমস্যা হবে, সে কারণেই ভারত সরকার এনটিপিসির প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। ২০০৭ সালে রাজীব গান্ধী ন্যশনাল পার্ক থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার পরিকল্পনা করে। জনগণের বিরোধিতার কারণে ২০০৮ সালে এই প্রকল্প বাতিল করতে বাধ্য হয় ভারত সরকার। ঐ বনাঞ্চলটি ছিল সুন্দরবন বাংলাদেশ অংশের মাত্র ১০ ভাগের ১ ভাগ। 
জনস্বার্থে যে প্রকল্প ভারতে প্রত্যাখ্যাত হলো, সেই তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পই বাংলাদেশে বাস্তবায়নে তোড়জোড় চলছে। খোদ বাংলাদেশ সরকারের অতিআগ্রহ এ প্রকল্পের যৌক্তিক সকল বিতর্ক-বিরোধিতাকে অজ্ঞাতকারণে উপেক্ষা করছে। পরিবেশকর্মী-গবেষক থেকে শুরু করে এমনকি ইউনেস্কোর উদ্বেগ-উৎকন্ঠাও আমলে নিচ্ছে না নীতিনির্ধারনীমহল। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রীয় এক সফরে ভারতে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেখানে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সঞ্চালনের একটি প্রস্তাবনা ছিল। ওই প্রস্তাবনার ভিত্তিতেই ২০১২ সালে বাংলাদেশের অধীন ইউেেনস্কো ঘোষিত ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ সুন্দরবনের নিকটবর্তী রামপালের দুটি ৬৬০ ইউনিট মিলে মোট ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে (পিডিবি)-এর সঙ্গে ভারতের এনটিপিসি’র চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল ঢাকায় ভারতের সঙ্গে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারসাম্যহীন এ চুক্তিতে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশগত বিষয়গুলো একেবারেই উপেক্ষিত হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্র মতে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংরক্ষিত বনভূমি ও বসতির ১৫ থেকে ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের অনুমোদন দেয়া হয় না। সরকারের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) রিপোর্ট অনুসারে প্রস্তাবিত রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিমি দূরে, যা সরকার নির্ধারিত সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) থেকে ৪ কি.মি. দূরে বলে নিরাপদ হিসেবে দাবি করা হয়েছে।
অথচ ভারতের প্রচলিত সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী এমন স্থানে এ ধরনের প্রকল্প অনুমোদনযোগ্য নয়। প্রতিবেশী দেশটির ‘ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশান অ্যাক্ট ১৯৭২’ অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কি.মি. ব্যসার্ধের মধ্যে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ স্থাপন করা যায় না। ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত পরিবেশ সমীক্ষা বা ইআইএ গাইড লাইন ম্যনুয়াল ২০১০ অনুযায়ী কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৫ কি.মি.-এর মধ্যে কোন বাঘ, হাতি সংরক্ষন অঞ্চল, বন্য প্রাণীর অভয়ারন্য কিংবা অন্যকোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা চলবে না। এছাড়া ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ‘তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত গাইডলাইন ১৯৮৭’ অনুসারেও কোন সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিমি-এর মধ্যে কোনো কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ স্থাপন করা যায় না। 
অসম চুক্তির খেসারত দিতে হবে জাতিকে : রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২০১ কোটি ডলার। এর ৭০ শতাংশ ব্যাংক ঋণ নেয়া হবে (৭০ ভাগ ঋণের সুদ টানা এবং ঋণ পরিশোধ করার দায়িত্ব যৌথ কোম্পানির কিন্তু জামিনদার বাংলাদেশের)। ১৫ শতাংশ অর্থ দেবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং বাকি ১৫ শতাংশ দেবে ভারতের এনটিপিসি। ওই প্রকল্পের জন্য পুরো জমি, অবকাঠামোগত বিভিন্ন কিছু, সব সরবরাহ করবে বাংলাদেশ। অথচ শেষ বিচারে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির পরিচালনার দায়িত্ব চলে যাবে ভারতের হাতে! মাত্র ১৫ শতাংশ বিনিয়োগ করে তারা হয়ে যাবে হর্তাকর্তা! তাছাড়া এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনতে হবে পিডিবিকে! আর যে নিট লাভ হবে, তার অর্ধেক নিয়ে নেবে ভারত! চুক্তি অনুযায়ী কয়লা আমদানির দায়িত্ব এবং ক্ষয়ক্ষতির দায়ও বাংলাদেশের! এমন অসম চুক্তির মানে কী, তা জানতে চায় দেশপ্রেমিক জনতাসহ বোদ্ধা মহল। 
এদিকে, দেশীয় কোম্পানি ওরিয়ন গ্রুপের সঙ্গে ২০১১ সালের ২০ ডিসেম্বর পিডিবির ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৫২২ মেগাওয়াটের একটি হবে মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায়। এছাড়া খুলনার লবণচরা ও চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ২৮৩ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে। সেখানে বলা আছে মাওয়া থেকে কিনবে ৪ টাকা প্রতি ইউনিট। আর লবনচরা ও আনোয়ারার কেন্দ্র থেকে কিনবে ৩ টাকা ৮০ পয়সা করে। কিন্তু রামপালের কেন্দ্র থেকে কিনতে হবে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা করে! কারণ এনটিপিসি ও পিডিবি ইতিমধ্যেই প্রতি টন ১৪৫ ডলার করে কয়লা আমদানি চূড়ান্ত করে ফেলেছে। 
দেশীয় অতি উৎসাহী মহলের কাণ্ড : নিয়মানুযায়ী ‘এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ), রিপোর্ট পাওয়ার পরেই কোনো প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা যায়। কিন্তু পিডিবি পরিবেশ অধিদফতর থেকে ইআইএ রিপোর্ট পাওয়ার আগেই রামপালে প্রায় ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে, এর বেশির ভাগই কৃষি জমি। অথচ উক্ত প্রকল্পের জন্য জমি প্রয়োজন সর্বোচ্চ ৭০০ একর। রামপালে প্রতিদিন কয়লা পুড়বে ১৩ হাজার টনেরও বেশি। গবেষণার তথ্যানুসারে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এক মে.ও.র জন্য প্রয়োজন দশমিক ৪২ একর জমি। এ হিসাবে রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াটের জন্য প্রয়োজন ৫৫৫ একর জমি। এর সঙ্গে এমজিআর ও কুলিং টাওয়ারের জায়গা হিসাব করলে জমি প্রয়োজন সর্বোচ্চ ৭০০ একর। অথচ প্রয়োজনের দ্বিগুণেরও বেশি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড (বছরে ৫১ হাজার ৮৩০ টন) এবং ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড (বছরে ৩১ হাজার ২৫ টন) নির্গত হবে। এই বিশাল পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব তখনকার চেয়ে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেবে। ফলে ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে সুন্দরবনের প্রাণ ও পরিবেশ। ইআইএ রিপোর্টে এই জায়গাটাতে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে বলে মনে করছেন রামপাল প্রকল্প বিরোধী গবেষক কল্লোল মোস্তফা। তিনি বলেন, নিয়মানুযায়ী সুন্দরবনের জন্য ‘পরিবেশগত স্পর্শকাতর’ মানদণ্ড উল্লেখ করার কথা। অথচ ইআইএ রিপোর্টে সুন্দরবনের জন্য ‘আবাসিক ও গ্রাম’ এলাকার মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে। সুন্দরবন কবে থেকে ‘আবাসিক ও গ্রাম এলাকা’ হলো? 
শংকিত পরিবেশ বিজ্ঞানীরা : বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড.আবদুস সাত্তার এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড.আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিবেশবিদদের একটি দল প্রস্তাবিত রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির ওপর পৃথকভাবে গবেষণা করে। তারা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে ন্যূনতম ২৩ ধরনের ক্ষয়ক্ষতির হিসেব তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের শংকার জায়গাগুলো হচ্ছে- সুন্দরবনের স্বাভাবিক চরিত্র নষ্ট হবে, শুরু হবে অবাধে গাছ কাটা, লাগানো হবে বনে আগুন, ধরা পড়বে বাঘ-হরিণ-কুমির। কয়লা পোড়া সালফার-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন-মনো-অক্সাইড, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন প্রভৃতি সুন্দরবনের জৈবিক পরিবেশ ও বায়ুমন্ডলকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। ঐ এলাকার কৃষিপণ্য খেলে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়বে অ্যাজমা, ফুসফুসবাহিত নানা রোগ, এমনকি ক্যন্সারের সম্ভাবনাও থাকবে। বায়ু ও শব্দ দূষণ অনিবার্য। বাড়বে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত কমতে পারে ও এসিড বৃষ্টি হতে পারে। ভু-পৃষ্ঠের পরিবর্তন অত্যাদিক মাত্রায় হতে পারে। সুন্দরবন ও তার সন্নিহিত গ্রাম অঞ্চলে প্রাণী ও উদ্ভিদ সম্পদের মারাত্মক হ্রাস ঘটবে। এছাড়া জীব বৈচিত্র হ্রাস ও ধ্বংস হবে এবং বন্যপ্রাণী বিনাশ ও পালিত মৎস্য সম্পদের প্রভূত ক্ষতি হতে পারে।
ড.আবদুস সাত্তার বলেন, এ সকল কারণে আবাসিক এলাকা কৃষিজমি এবং বনাঞ্চলের আশেপাশে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার অনুমতি প্রদান করা হয় না।
ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীও একইভাবে বলেন, অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় সামাজিক-প্রাকৃতিক পরিবেশ বিবেচনায়, কোনভাবেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য রামপাল সাইটকে সমর্থন করা যায় না।
http://www.dailysangram.com/post/268910-%E0%A6%95%E0%A7%83%E0%A6%B7%E0%A6%BF-%E0%A6%93-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%97%E0%A6%A4-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%9A%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%96%E0%A7%8B%E0%A6%A6-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A7%A8%E0%A7%A6%E0%A7%A6%E0%A7%AE-%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B2-%E0%A6%B9%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%9B%E0%A6%BF%E0%A6%B2-%E0%A6%95%E0%A7%9F%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A7%8E-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA