১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
এক ফারমার্সেই নতুন আট ব্যাংকের সমান খেলাপি ঋণ
২৫ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
নতুন ৯টি ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করে ২০১৩ সালের মাঝামাঝি। এসব ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে ফারমার্স ব্যাংক। কার্যক্রম শুরুর চার বছর না পেরোতেই ব্যাংকটিতে ২৭৭ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। একই সময়ে কাজ শুরু করা অন্য আট ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণ রয়েছে ২৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক ফারমার্স ব্যাংকে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে তা অন্য আট ব্যাংকের প্রায় সমান। বিশ্লেষকরা বলছেন, খেলাপি ঋণের পাহাড় জমেছে ফারমার্স ব্যাংকে। যাচাই না করে ঋণ বিতরণ, অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ সৃষ্টি, তথ্য গোপন করে খেলাপি গ্রাহককে ঋণ দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ব্যাংকটির পরিস্থিতি খুবই খারাপ। ভালো চলছে না ফারমার্স ব্যাংক।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফারমার্স ব্যাংক মোট তিন হাজার ৮২৮ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ২৭৭ কোটি ২ লাখ টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ এখন খেলাপি। অথচ ২০১৫ সাল শেষে ব্যাংকটির দুই হাজার ৫৪০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ছিল মাত্র ৯ কোটি ৬ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্য আট ব্যাংকের ২১ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ২৮৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা এসব ব্যাংকের মোট ঋণের ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ৮ ব্যাংকের ১৬ হাজার ৯৭ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ছিল মাত্র ৩০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা ছিল মোট ঋণের শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশ।
 
ফারমার্স ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার বেসরকারি খাতের ৩৯টি ব্যাংকের গড় খেলাপি ঋণের তুলনায়ও বেশি।
 
গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট ৪ লাখ ৬৯ হাজার ২৫ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। আশির দশকে কাজ শুরু করা কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায়ও ফারমার্স ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার অনেক বেশি। ১৯৮২ সালে কাজ শুরু করা এবি ব্যাংকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। এর মাত্র ৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ খেলাপি। ১৯৮৩ সালে কাজ শুরু করা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণের ৫ দশমিক ২১ শতাংশ খেলাপি। আর ইউসিবির ১৯ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি রয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।
 
২০১২ সালের মার্চ মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মতিপত্র পায় ফারমার্স ব্যাংক। ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু হয়েছে পরের বছরের জুনে। ব্যাংকটির মূল উদ্যোক্তা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমানে সরকারি হিসাব-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীর। প্রথম বছর থেকেই এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান তিনি। বর্তমানে ৫২টি শাখা। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত কৃষি খাতে ব্যাংকটির ঋণ স্থিতি রয়েছে ৮৬ কোটি টাকা।
 
জানতে চাইলে ফারমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম শামীম সমকালকে বলেন, নিয়মিত ঋণ তিন মাস বা ছয় মাস কিস্তি না দিলেই তা খেলাপি হয়ে পড়ে। কিছুদিনের মাথায় আবার কিস্তি পরিশোধ করলে তা নিয়মিত হয়ে যায়। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়া-কমার বিষয়টি ব্যাংক খাতের জন্য একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। ফারমার্স ব্যাংকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কিছুটা বেড়েছিল। তবে সেখান থেকে ১০০ কোটি টাকার বেশি আদায় হওয়ায় ডিসেম্বরে তা কমে এসেছে বলে তিনি দাবি করেন।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, নতুন প্রডাক্ট নিয়ে আসা এবং নতুন এলাকায় ব্যাংকিং সেবা প্রসারের জন্য এসব ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তবে অনেক ক্ষেত্রে সঠিক উদ্দেশ্যের বাইরে এসে অন্য ব্যাংকের মতো গতানুগতিক ধারায় পরিচালিত হচ্ছে এসব ব্যাংক। কিছু ব্যাংক যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করে ঋণ বিতরণ করেছে। যে ব্যাংক যত অনিয়ম করেছে ওই ব্যাংকের পরিস্থিতি তত খারাপ হচ্ছে। সার্বিক বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও জোরদার করার পরামর্শ দেন তিনি।
 
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ফারমার্স ব্যাংকের ওপর একাধিক বিশেষ পরিদর্শন পরিচালিত হয়। এসব পরিদর্শনে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণে অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। বেশি অনিয়ম ধরা পড়ে ব্যাংকটির মতিঝিল ও গুলশান শাখার ঋণে। পরিদর্শনে পাওয়া তথ্যের আলোকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ফারমার্স ব্যাংককে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে জরিমানা পরিশোধ না করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার বিরুদ্ধে আদালতে যায় ফারমার্স ব্যাংক। এর আগে ব্যাংকটির নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান থেকে মাহবুবুল আলম চিশতীকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশনার বিরুদ্ধেও আদালতে যায় ব্যাংকটি। এরপর গত বছরের ১৩ জানুয়ারি ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
 
অনিয়মের কিছু চিত্র :বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসা উল্লেখযোগ্য অনিয়মের মধ্যে রয়েছে_ বিভিন্ন শাখা থেকে শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট ছয় সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ৩৮ কোটি টাকার ঋণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ না দেখিয়ে প্রধান কার্যালয়ের \'অন্যান্য বিনিয়োগ\' হিসেবে দেখানো। আবার মতিঝিল শাখা থেকে তথ্য গোপন করে জনতা ব্যাংকের খেলাপি প্রতিষ্ঠান মেসার্স অ্যাপোলো মাল্টি পারপাস এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজকে ঋণ দেওয়া হয় ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আদুরী হাউজিং নামের আরেক খেলাপি প্রতিষ্ঠানের নামে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা দেয় এই শাখা। আলমগীর হোসেন নামে এক ব্যক্তির মালিকানা দেখিয়ে অনামিকা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট কোম্পানি ও অনামিকা এন্টারপ্রাইজ নামে অস্তিত্বহীন দুই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকার ঋণ। আবার মেসার্স রনক এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. রেজাউল করিমের নামে প্রধান কার্যালয় ৫ কোটি টাকার এলটিআর অনুমোদন করে। প্রয়োজনীয় জামানত ও অনুমোদন ছাড়াই শাখা থেকে দেওয়া হয়েছে ১৩ কোটি টাকা।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে আরও উঠে আসে, নির্বাহী কমিটির অনুমোদনে মতিঝিল শাখা থেকে জামানতি সম্পত্তির দাম বেশি দেখিয়ে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান সিয়াম এন্টারপ্রাইজের নামে ৭ কোটি ৮৫ লাখ, স্কাই লিমিট এন্টারপ্রাইজের নামে ১ কোটি ৫৩ লাখ, পারুল কনস্ট্রাশনের নামে ২ কোটি ৪৮ লাখ, আলিম স্টিলের অনুকূলে ৩ কোটি ১৩ লাখ, রুট ইন্টারন্যাশনালের নামে ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। একইভাবে এইচএম এন্টারপ্রাইজের নামে ৪ কোটি ৩০ লাখ, লেদার ফেয়ারের নামে ২ কোটি ৮৪ লাখ, এলাইট টেকনোলজির নামে ১ কোটি ৬০ লাখ ও সেঞ্চুরি ভিউ ইন্টারন্যাশনালের নামে ২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এ ছাড়া যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই দ্রুততার সঙ্গে লাকী টিম্বার ইন্ডাস্ট্রিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণসীমা ৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮ কোটি টাকা করা হয়।
 
গুলশান শাখায় পরিচালিত অন্য এক পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই না করে সাইফ পাওয়ারটেককে দেওয়া হয়েছে ৩৯ কোটি টাকা। এই শাখার আরেক গ্রাহক সিঅ্যান্ডবি করপোরেশনের নামে সৃষ্ট ১৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকাও উদ্দেশ্যবহির্ভূত অন্য খাতে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের খুলনা শাখার গ্রাহক মেসার্স ইউনাইটেড ব্রিকস ও ফুলতলা ফিলিং স্টেশন নামের দুই প্রতিষ্ঠানের ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা অধিগ্রহণসহ ৮ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। এসব ঘটনা ব্যাংকের ঋণ শৃঙ্খলার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল।
 
নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসার পর থেকেই নানা কারণে \'ফারমার্স ব্যাংক\' নামটি আলোচিত। অনুমতি পাওয়ার আগেই ব্যাংকের নামে রাজধানীর গুলশানে \'প্রস্তাবিত ফারমার্স ব্যাংক\' নামে বিশাল একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে বেআইনিভাবে অফিস খুলে বসেন এর উদ্যোক্তারা। ২০১২ সালের মে মাসে ব্যাংকটি তফসিলভুক্ত হলেও অফিস নেয় ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে। ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান মো. আতাহার উদ্দিনের ছেলে আজমত রহমানের জায়গায় নেওয়া অফিসের ভাড়া বাবদ ব্যাংক থেকে প্রায় ২ কোটি টাকা পরিশোধও করা হয়। এ ঘটনায় ব্যাংকের প্রথম এমডি চৌধুরী মোস্তাক আহমেদকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/01/25/265453#sthash.FBwbxbQT.dpuf