১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
পুঁজিবাজার লাগামহীন: বিপর্যয়ের আশঙ্কা ; নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ
২৪ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার,
কোনো বাধা মানছে না পুঁজিবাজার। প্রতিদিনই লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচক। ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ কর্মদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচক বেড়েছে ৬৩১ পয়েন্ট, যা ডিএসই সূচকের ১২ শতাংশের বেশি। গত বছরের শেষ কর্মদিবসে ডিএসই সূচকের অবস্থান ছিল ৫ হাজার ৩৬ পয়েন্টে। গতকাল সোমবার ডিএসইর প্রধান সূচকটি ১০০ পয়েন্টের বেশি বেড়ে এক পর্যায়ে ৫ হাজার ৭০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করে। দিন শেষে ৫ হাজার ৬৬৭ পয়েন্টে স্থির হয় সূচকটি। এ দিন ডিএসই’র লেনদেন পৌঁছে যায় ২ হাজার ১৮০ কোটি টাকা, যা ২০১০ সালের পর ডিএসই’র সর্বোচ্চ লেনদেন। 
বাজার বিশ্লেøষকরা মনে করছেন, এবারো নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষের লাগামহীন বক্তব্যই বাজার উসকে দিচ্ছে। তারা বিএসইসির চেয়ারম্যান ও ডিএসই’র প্রধান নির্বাহীর সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যকে এ জন্য দায়ী মনে করছেন। তাদের মতে, যেভাবে পুঁজিবাজারে লাগামহীনভাবে সূচক বাড়ছে তা ২০১০ সালকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আর এভাবে সূচকের টানা উল্লম্ফন আবার বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে পুঁজিবাজারকে। সময় থাকতে সতর্ক না হলে আবারো চরম মূল্য দিতে হতে পারে লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে; যেমনটি ঘটেছিল ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে। ২০১০ সালেও এ ধরনের লাগামহীন ছিল বাজার সূচক। দিনের পর দিন সূচক বাড়লেও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষের নির্লিপ্ততা ফাঁপিয়ে তুলে পুঁজিবাজারকে। বিভাগীয় ও জেলাপর্যায়ে রোড-শো ও একের পর ব্রোকার হাউজের শাখা খুলে সে সময় উসকে দেয়া হয়েছিল বাজারকে। আর সে সময় হঠাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ বাজারে ধস নামায়। এর পরের ইতিহাস সবারই জানা। বিপুল লোকসানের শিকার হন লাখ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারী। তাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছিল ঢাকা চট্টগ্রামের বাতাস। লোকসানের শিকার হয়ে এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মাহুতি দেন বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারী। পরে প্রধানমন্ত্রীকেও এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
এ সময় মাসের পর মাস মতিঝিলজুড়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু পতন থামেনি পুঁজিবাজারের। সাময়িকভাবে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও আস্থা ফেরেনি বিনিয়োগকারীদের। ২০১১ থেকে ১৫ সাল পর্যন্ত এভাবেই কাটে ছয় বছর। শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই নন, বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়নি দেশের ব্যাংকিং খাতও। বছরের পর বছর লোকসানের ঘানি টানতে হয় এ খাতটিকে। পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় দু’টি খাত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ লোকসানের কারণে বাজারে দর হারাতে থাকলে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের বোঝা আরো ভারী হতে থাকে। 
২০১১ সালে সরকার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করলে সবার প্রত্যাশা ছিল স্বাভাবিক হয়ে উঠবে বাজার। কিন্তু তা হয়নি, বরং আস্থাহীনতা আরো বাড়তে থাকে। যেখানে ২০১০ সালে ডিএসই’র লেনদেন ছিল ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, সেখানে ২০১৩ সালে এ লেনদেন নেমে আসে ১০০ কোটিতে। পরে বাজার নিয়ে বিএসইসি ও ডিএসইর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে ধরনা দেন। সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনে আরো শিথিল করতে বাংলাদেশ ব্যাংকেও চলে দৌড়ঝাঁপ। শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে সরকারের ইচ্ছায় বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুটা নমনীয় হলে বিগত ছয় বছরের মধ্যে প্রথম ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারে। 
এ দিকে পুঁজিবাজারে চলমান আচরণকে কিভাবে দেখছেন এ প্রশ্নের উত্তরে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. মীর্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজার বাড়ছে ভালো কথা কিন্তু এভাবে প্রতিদিন ১ থেকে দেড় শতাংশের ওপরে সূচক বাড়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেখতে হবে কোনো কারসাজি হচ্ছে কি না। তা ছাড়া ইনসাইডার ট্রেডিং ও সার্কুলার ট্রেডিংয়ের মতো ঘটনা এ সময় খুব বেশি ঘটে। এ ব্যাপারে কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। কারণ বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার দায়িত্ব বিএসইসি ও ডিএসই’র। 
তবে তিনি মনে করেন, সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে বিনিয়োগকারীকে। নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থের বিনিয়োগে তাদের ভূমিকাই প্রধান। তাই কোন শেয়ারে বিনিয়োগ করছেন তা তাদের মাথায় রাখতে হবে। তা না হলে আবারো ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। 
বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আখতার হোসেন সান্নামাত মনে করেন, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমার মতো খাতÑ যেগুলো বছরের পর বছর দরপতনের শিকার ছিল গত কিছু দিনের মধ্যে এসব কোম্পানির ১০০ শতাংশের বেশি মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। সাম্প্রতিক পুঁজিবাজার সূচকের উল্লম্ফনে এ তিনটি খাতের শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধিই বেশি দায়ী। কিন্তু এর বাইরেও কিছু শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে, যা অস্বীকার করার জো নেই। এ অবস্থায় বিএসইসি’র বাজার মনিটরিং আবারো বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/189952