১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
বিনিয়োগ প্রায় তলানিতে বাড়েনি বাণিজ্য: মতবিরোধসম্পন্ন ৩ আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটে বাংলাদেশ
২৪ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার,
বিশ্বের সবচেয়ে মতবিরোধসম্পন্ন তিন আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটের শরিক বাংলাদেশ। জোটগুলো হল : দক্ষিণ এশিয়াভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্য জোট- সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (সাফটা), দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট- বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল, টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক) ও এশিয়া প্যান প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর জোট- এশিয়া প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (আপটা)। এ তিন বাণিজ্য জোটের সদস্য দেশ ২১টি। বিশ্ববাণিজ্যের ২০ শতাংশের মতো বাণিজ্য হয় এদের মাধ্যমে। বাংলাদেশ এই আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটে অন্যতম সক্রিয় সদস্য হওয়া সত্ত্বেও এ দেশে আশানুরূপ হারে বাড়েনি সদস্য দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। মাত্র দু-একটির নামমাত্র অংশগ্রহণ ছাড়া বাকি সবার বাংলাদেশে বিনিয়োগ প্রায় শূন্যের কোঠায়। আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রত্যাশিত উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারেনি এসব জোটের কোনো সদস্য দেশ। ফলে পর্যটন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সেবা খাত, কৃষি উন্নয়ন, মৎস্যসম্পদ, পোশাক ও চামড়া শিল্পসহ সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারছে না।
 
 
জানা গেছে, আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সব ক’টি জোটেরই মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এসব জোটের যাত্রা শুরুর পর এখন পর্যন্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য বাড়েনি খুব একটা। এক হিসাবে দেখা গেছে, এদের মধ্যে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সাফটার অবদান মোট বাণিজ্যের ৭ শতাংশেরও কম। আপটা ও বিমসটেকের যৌথ বাণিজ্যের পরিমাণও ১৫ শতাংশের বেশি নয়। অথচ একক জোটেই ইইউর সদস্য সংখ্যা ২৭টি সত্ত্বেও স্বার্থের প্রশ্নে মতবিরোধ নেই বললেই চলে। বরং ঐক্য ও সমঝোতায় একক মুদ্রাব্যবস্থায় বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য চলছে এ দেশগুলোর। ফলে এদের বাণিজ্য অবদান ৫৫ শতাংশের মতো। অপরদিকে আসিয়ান ও নাফটার সদস্যদের বাণিজ্য অবস্থান ২১ শতাংশ।
 
অথচ লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে এ তিন জোট অভিন্ন উদ্দেশ্যে আত্মপ্রকাশ করলেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা কেড়ে নিচ্ছে বেড়ে ওঠা মতবিরোধ। একটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেই ঝুলে থাকতে হয় বছরের পর বছর। বাণিজ্য বিশ্লেষকরা দাবি করছেন, জোট তিনটির বাণিজ্য আরও বড় হতে পারত। কিন্তু চরম মতবিরোধসম্পন্ন আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থা ও অবিশ্বাস প্রকট। এ কারণে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত-নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ত্রিদেশীয় ট্রানজিটের পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো স্বরূপে জানান দিতে পারছে না। একইভাবে অবিশ্বাস থেকেই এখন পর্যন্ত বহুল আলোচিত বিসিআইএম ইকোনমিক করিডোর নির্মাণের বাস্তবতা ধরা দেয়নি। এখানে অবিশ্বাসের দেয়াল হয়ে আছে মিয়ানমার। ভারত ও চীনের মধ্যেও স্নায়ুযুদ্ধ। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের বিরোধ বিশ্বজুড়েই ওপেন সিক্রেট। অথচ বাণিজ্য জোট তিনটির সদস্যরা বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে নিজেরা যেমন লাভবান হতে পারে, তেমনি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্যে ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেও বাংলাদেশ অনেক আগেই এশিয়ার অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হতে পারত।
 
আপটা : এশিয়া প্যান প্যাসিফিক অঞ্চলের আন্তঃবাণিজ্যে অন্যতম সদস্য বাংলাদেশ। প্রেফারেন্সিয়াল বাণিজ্য চুক্তির (ব্যাংকক এগ্রিমেন্ট) মধ্য দিয়ে আপটার যাত্রা শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে সংশোধনী আনা হয়। এখন পর্যন্ত আপটা মিনিস্টেরিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে শুল্ক সুবিধার ক্ষেত্রে চারটি নেগোসিয়েশন হয়েছে। সর্বশেষ চতুর্থ রাউন্ড নেগোসিয়েশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আপটার সদস্য দেশ ৬ থেকে বাড়িয়ে ৭-এ উন্নীত করা হয়। দেশগুলো হল : বাংলাদেশ, ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, লাওস ও শ্রীলংকা। এর নতুন সদস্য মঙ্গোলিয়া। বর্তমানে সদস্য দেশগুলোর শুল্ক সুবিধাপ্রাপ্ত পণ্য সংখ্যা ৪ হাজার ৬৪৮ থেকে ১০ হাজার ৬৭৭টিতে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে।
 
এ প্রসঙ্গে আপটা চতুর্থ মিনিস্টেরিয়াল কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ আশা প্রকাশ করে বলেছেন, এর ফলে আপটাভুক্ত দেশগুলোয় বাণিজ্য সহযোগিতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও এসডিজি অর্জনে সহায়ক হবে। শুল্ক ও বাজার সুবিধা বাংলাদেশের রফতানি বাজার সম্প্রসারণ ও আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধির ফলে এশিয়া-প্যাসিফিক ট্রেড এগ্রিমেন্ট- আপটাভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্যও অনেক বাড়বে। এ লক্ষ্যে আপটার ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তার মতে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে পণ্য বাণিজ্যে শুল্ক সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি সেবা খাত, বিনিয়োগ ও ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন বিষয়ে ২০০৯ সালে স্বাক্ষরিত ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সদস্য দেশগুলোকে দ্রুত কার্যকরের বিকল্প নেই।
 
এদিকে বাণিজ্য জোটের প্রদেয় সুবিধা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই বাণিজ্য জোট থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার যে বিশাল তালিকা করা হয়েছে, তার বেশিরভাগেরই সক্ষমতা নেই বাংলাদেশের। ফলে টাকার অংকে কতটা সুবিধা পাওয়া যাবে সেটি অনেকটাই দৃশ্যমান। এর নেপথ্য কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন, সদস্যভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য খুবই কম।
 
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, আপটার চতুর্থ রাউন্ড নেগোসিয়েশনের আওতায় বাংলাদেশ ৫৯৮টি পণ্যে ১০ থেকে ৭০ শতাংশ এবং এলডিসিভুক্ত দেশের জন্য আরও ৪টি পণ্যে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ ছাড় দেবে। চীন ২ হাজার ১৯১টি পণ্যে ৫ থেকে ১০০ শতাংশ এবং এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর জন্য আরও ১৮১টি পণ্যে শূন্য থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক সুবিধা দেবে। ভারত ৩ হাজার ৩৩৪টি পণ্যে ৫ থেকে ১০০ শতাংশ এবং এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর জন্য ১৪ থেকে ১০০ শতাংশ ছাড় দেবে। অন্যান্য সদস্য দেশও আনুপাতিক হারে শুল্ক সুবিধা দিচ্ছে।
 
বিমসটেক : বিমসটেকের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগর উপকূলের দেশগুলোর মধ্যে কানেকটিভিটি, ব্যবসা-বাণিজ্য সুবিধা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি। এ ছাড়া দুই অঞ্চলের মধ্যে পর্যটন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন, মৎস্যসম্পদ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পোশাক ও চামড়া শিল্পসহ আরও অনেক ক্ষেত্র সম্প্রসারণ ছিল বিমসটেকের মূল উদ্দেশ্য।
 
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- দুই দশক আগে বাণিজ্যিক এ জোটের যাত্রা শুরু হলেও এখন পর্যন্ত বিমসটেককে খুব একটা কার্যকর হতে দেখা যায়নি। দেশের সাড়ে তিন কোটি ব্যবসায়ীর মধ্যে হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন এই সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। এসব দেশের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনা সম্ভব হয়নি।
 
সাফটা : দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অভিন্ন বাজার গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ২০০৩ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত তৎকালীন ৭টি দেশের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য ব্যবস্থা চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর ২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি সাফটা চুক্তি কাগজে-কলমে কার্যকর হয়। সে বছরই ১ জুলাই শুল্ক-কাঠামো কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তবরূপ লাভ করে সাফটা। কিন্তু এ চুক্তি কার্যকর হলেও কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি। বিশ্বে যত আঞ্চলিক সংগঠন রয়েছে, এর মধ্যে সার্ক অঞ্চলে আন্তঃবাণিজ্য সবচেয়ে কম। গত প্রায় তিন দশকে সার্কের বাণিজ্য মাত্র ৭ শতাংশ।
 
রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী যুগান্তরকে বলেন, সাফটায় বড় অন্তরায় আঞ্চলিক বাণিজ্যের দীর্ঘ স্পর্শকাতর পণ্য তালিকা। সাফটায় ভারত হল সবচেয়ে বড় দেশ। তার সঙ্গে বাংলাদেশ ছাড়া অধিকাংশ দেশের মধ্যে রয়েছে অবাধ বাণিজ্য চুক্তি। সাফটা চুক্তির আওতায় প্রত্যেক সদস্য দেশেরই একটি করে স্পর্শকাতর পণ্য তালিকা রয়েছে। এ তালিকার পণ্য সংশ্লিষ্ট দেশে রফতানি করা যাবে না- এটা হল বিধিবদ্ধ নিয়ম।
 
বাংলাদেশের এ তালিকায় রয়েছে ১ হাজার ২৫৪টি পণ্য। একইভাবে ভারতের ৮৬৫টি, শ্রীলংকার তালিকায় ১ হাজার ৭৯টি, পাকিস্তানের ১ হাজার ১৯১টি, আফগানিস্তানের ১ হাজার ৭২টি, মালদ্বীপের ৬৭১টি ও ভুটানের ১৫৭টি পণ্য। বাংলাদেশ ও নেপাল তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য তাদের স্পর্শকাতর তালিকায় রেখেছে।
http://www.jugantor.com/last-page/2017/01/24/95743/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%8B%E0%A6%97-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%A4%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A6%BF-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A3%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%AF