২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা
২৪ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার,
অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। সমাজের উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত পর্যন্ত সারাদেশের চিত্র একই। অপরাধচক্রে জড়িত অথবা মাদকাসক্ত কিশোরদের নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। তুচ্ছ ঘটনায় এরা জড়িয়ে পড়ছে বড় ধরনের বিবাদে। কখনও কখনও ঘটছে খুনের মতো নৃশংস ঘটনাও। চলতি বছরের শুরু থেকে গত তিন সপ্তাহে বেশ কয়েকজন  কিশোর একে অপরের হামলার শিকার হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। শুধু নিজেদের মধ্যে হানাহানি নয়, রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় কিশোর অপরাধীদের উৎপাতও বেড়েছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মা-বাবার উদাসীনতা, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব, অর্থনৈতিক দৈন্যদশা, বেকারত্ব, মাদকের সহজলভ্যতা, ইন্টারনেট ও ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের প্রভাবসহ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কারণেও কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. কাজী সাইফুদ্দীন বলেন, আমাদের সমাজে সামাজিক বিশৃঙ্খলা অনেক বেড়ে গেছে। আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নকে যতটা গুরুত্ব দেই, সামাজিক উন্নয়নকে ততোটাই অবহেলা করি। একটা পদ্মা সেতু হলে  প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বাড়লে সামাজিক উন্নয়নে প্রবৃদ্ধির হার আরও বেশি হতে পারেÑ এটা আমরা কেউ মনে করি না। মনোবিজ্ঞানের এই শিক্ষক মনে করেন, আদর্শলিপি মুখস্থ করে আদর্শ শেখা যায় না। আদর্শ হলো আচরণের প্রাকটিস। এই প্রাকটিসের দায়িত্ব পিতা-মাতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ তথা রাষ্ট্রের।  
গত ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে খুন হয় ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির (১৪)। পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারে ওই খুনের সাথে উঠতি বয়সী সন্ত্রাসীরা জড়িত। ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানা এলাকার বর্ণমালা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে নবম শ্রেণির ছাত্র সাব্বিরের হামলায় তিন কিশোর আহত হয়। ওই স্কুলের সামনের এক মার্কেটে সাব্বির প্রথমে তার তিন বন্ধু রিয়াদুল, মেহেদী ও আহাদের উপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করে। এতে তিনজনই আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। পুলিশ সাব্বিরকে আটক করে। ৪ ডিসেম্বর রাতে লালবাগে রবিন নামে এক কিশোরের ছুরিকাঘাতে আবু সালেহ রাব্বী নামে এক যুবক খুন হন। ২৯ নভেম্বর কামরাঙ্গীরচরে দুই কিশোরের হাতে খুন হয় আলিফ নামে এক কিশোর।  রাজধানীসহ সারা দেশেই এরকম ঘটনা ঘটেই চলেছে। ডিএমপির কয়েকটি থানার ওসি জানান, প্রতিদিন থানায় কিশোরদের নিয়ে দু-একটা দেনদরবার  থাকেই। এর মধ্যে নিজেদের মধ্যে মারামারি, মোবাইল ছিনতাই, টাকা ধার নিয়ে না দেয়া, মাদক বিক্রি ও ব্যবসা, অভিভাবকদেরকে হুমকি-ধমকিসহ আরও বিভিন্ন বিষয় থাকে। এসব দেনদরবার করতে গিয়ে পুলিশের অনেক সময় ব্যয় হওয়ার পাশাপাশি মামলা হওয়া না হওয়ার ঝামেলাও পোহাতে হয়। ঢাকা পূর্ব জোনের এক থানার ওসি বলেন, কিশোরদের বিরুদ্ধে মামলা নেয়াও ঝামেলা। তাদের জন্য পৃথক থাকা, খাওয়াসহ আদালতে পাঠানো পর্যন্ত নানা ঝক্কি-ঝামেলা থাকে। এজন্য পুলিশ মামলা পর্যন্ত যেতে চায় না। তবে গুরুতর অপরাধ প্রবণতার ক্ষেত্রে পুলিশের ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে নগরীর  প্রতিটি এলাকায় উঠতি বয়সীদের বহুমাত্রিক গ্রুপ গড়ে উঠেছে। কোনো গ্রুপ মাদকাসক্ত, কোনো গ্রুপ মোবাইল ছিনতাই করে, কোনো গ্রুপ বাড়াটে হিসাবে খাটে। কেউ কেউ আবার সারাদিনই আড্ডা দেয়। মিরপুরের বাসিন্দা পরিবহন ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান বাবু বলেন, এখন কোথাও কিছু ঘটালেই উঠতি বয়সীদের জটলা দেখা যায়। এদের কথাবার্তা শুনলে মনে হয় বড় ধরনের সন্ত্রাসী। নতুন মুখের এসব কিশোর কোন এলাকায় থাকে তা কেউ বলতে পারে না। এরা কথায় কথায় হট্টগোল, মারামারি, অস্ত্র প্রদর্শন করে প্রাণনাশের হুমকি দিতেও দ্বিধা করে না। এক সাথে দলবেঁধে এসে হট্টগোল করে আবার নিমিষেই উধাও হয়ে যায়। একজন ওসি এসব সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে এদের সম্পর্কে জানতে চাইলে সঠিক তথ্য কেউই দিতে পারেন না। শুধু ধারণাশ্রিত তথ্যের উপর নির্ভর করে পুলিশকে এগুতে হয়। শ্যামপুর এলাকার এক ভুক্তভোগী বাড়িওয়ালা বলেন, ইদানিং জায়গা জমি নিয়ে কোনো বিরোধ বাধলেই ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসাবে নতুন মুখে কিছু কিশোর ও যুবকদের দেখা যায়। এরা এতোটাই বেয়াদব ও নিষ্ঠুর যে, মানুষকে মানুষ মনে করে না। এদের সাথে কথা বলারও উপায় থাকে না। তার আগেই চড়-থাপ্পড় দিয়ে বসে। এরা কোমড়ে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিতেও দ্বিধা করে না। 
ভুক্তভোগীদের মতে, ঢাকাসহ সারা দেশের অপরাধ জগতে এখন নতুন মুখের অপরাধীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এক সময় রাজধানীতে পিচ্চি হান্নান, সুব্রত বাইন, কালা জাহাঙ্গীর, পিচ্চি হেলাল, আরমান, জিসান, কিলার আব্বাস, আলাউদ্দিন, মোল্লা মাসুদ, বিকাশ, প্রকাশ, ল্যাংরা মাসুদ, টোকাই সাগর, সুইডেন আসলাম, জোসেফ, ডাকাত শহীদ, কচির মতো সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য ছিল। তাদের নাম শুনলে সাধারণ মানুষ আঁতকে উঠতো। এরা চাঁদা দাবি করার পর কেউ টাকা দেননি এমন ঘটনা একেবারে বিরল। এখন এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জায়গা অনেকটা দখল করে নিয়েছে উঠতি বয়সী বা কিশোর সন্ত্রাসীরা। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ২০১০ সালে পুলিশ এলাকাভিত্তিক ১ হাজার ১০০ কিশোর সন্ত্রাসীর একটি তালিকা তৈরি করেছিল। ওই তালিকার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও তরুণ বখাটে। ওই তালিকা অনুযায়ী ওয়ারী অঞ্চলে ১৪৪, মিরপুরে ১০৬, মতিঝিলে ৭৫, রমনায় ৫১, লালবাগে ৩৬, তেজগাঁওয়ে ৪৬, গুলশানে ৪৮ এবং উত্তরা অঞ্চলে ১০ কিশোর অপরাধী রয়েছে। যারা এরই মধ্যে কিশোর থেকে যুবকে পরিণত হয়েছে। তবে বর্তমানে এ সংখ্যা জানা নেই সংশ্লিষ্টদের। বরং অপরাধীর তালিকায় নতুন নতুন কিশোর প্রবেশ করেছে বলে মনে করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, গত ১০ বছরে রাজধানীর আলোচিত হত্যাকা-ের বেশিরভাগই কিশোর অপরাধীদের হাতে ঘটেছে। এর মধ্যে জুরাইনে আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ উল্লাহ হত্যা, আগারগাঁওয়ে আওয়ামী লীগ নেতা ফজলুল হক হত্যা, কদমতলীর বাবু, জনি ও হাসান, পুলিশ কর্মকর্তা ফজলুল হক, মগবাজারের ট্রিপল মার্ডার, ভাসানটেকে নাসির হত্যা এবং মিরপুরে ইমন হত্যাসহ বেশকিছু চাঞ্চল্যকর খুনে কিশোর অপরাধীদের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। আর এসব ঘটনায় জড়িত কিশোর কিলারদের বয়স ১৬ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। অন্যদিকে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, গত ৫ বছরে রাজধানীর আলোচিত অন্তত ১৫টি হত্যাকা-ের সঙ্গে কিশোর অপরাধীদের সম্পৃক্তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মাঝে-মধ্যেই ছিনতাইয়ের ঘটনায় কিশোর সন্ত্রাসী গ্রেফতার হচ্ছে। এদের মধ্যে উচ্চবিত্ত পরিবারের অনেক সন্তানও রয়েছে। নেশার টাকা জোগাড় করতেই এসব কিশোর অপরাধে জড়াচ্ছে বলে জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁর মতে, সমাজের উচ্চবিত্ত পরিবারের অনেক কিশোর সঙ্গদোষে অথবা অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে এমন সব অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। উচ্চবিত্তের বখে যাওয়া সন্তানদের অনেকে গভীর রাতে মদ্যপ অবস্থায় দামি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। উচ্চঃস্বরে মিউজিক বাজিয়ে  রেসিং কার নিয়ে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে নগরবাসীর মনে তৈরি করছে এক ধরনের আতংক। একইভাবে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের সন্তানরা পা বাড়াচ্ছে অন্ধকার জগতে। তাদের অনেকে মাদকাসক্তও হয়ে পড়ছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে ছিনতাইয়ের মতো অপারাধেও জড়াচ্ছে তারা। এমনকি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জড়িয়ে পড়ছে নৃশংস খুনাখুনিতে। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, মা-বাবার উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে এসব কিশোর বিপথে চলে যাচ্ছে। এজন্য তারা অর্থনৈতিক দৈন্যদশাকেও অনেকটা দায়ী করে বলেন, একজন বাবার যখন সংসার চালানোর মতো সামর্থ্য থাকে না তখন তিনি ছেলেমেয়েদের প্রতি উদাসীন হবেন এটাই স্বাভাবিক। মনোবিজ্ঞানী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. কাজী সাইফুদ্দীন বলেন, শিশুরা কিছু বোঝে না, তারা কিছু জানে না এরকম কখনওই ভাবা উচিত নয়। আসলে তারা সবই বোঝে, কিন্তু প্রকাশ করে না। এজন্য ছোটবেলা থেকে তাদের প্রতি যতœশীল হওয়া উচিত। তাদেরকে মৌলিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া উচিত। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. এএসএম আমানউল্লাহ বলেন, আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। তা না হলে এখন যা চলছে ভবিষ্যতে অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে। তিনি বলেন, সামাজিক অবক্ষয়ের জন্য ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসকে দায়ী করার আগে এগুলোর ব্যবহারের জন্য যে শিক্ষা সেটা আমরা নতুন প্রজন্মকে দিয়েছি কিনা সেটা ভাবা দরকার। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে এগুলো ব্যবহার করতে হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা কতটুকু এবং কীভাবে সেটা ঠিক করার দায়িত্ব সমাজ এবং রাষ্ট্রের। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহমেদের মতে, বাবা-মায়ের অসচেতনতা এবং সময় না দেয়ার কারণেই শিশু-কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। শিশু-কিশোরদের হাতে দামি মোবাইল সেট দেয়ায় তারা প্রযুক্তি থেকে ভালো শিক্ষার পরিবর্তে খারাপ শিক্ষা নিচ্ছে। বিভিন্ন পর্নো সাইডে প্রবেশসহ সারা বিশ্ব জানতে গিয়ে নিজের অজান্তেই অন্ধকার জগতে পা বাড়াচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমনোলজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, বাবা-মায়ের সঠিক নির্দেশনা পেলে একটি শিশু ছোট থেকেই ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সমস্যা থাকলে তার প্রভাব শিশুর ওপর পড়তে বাধ্য।
https://www.dailyinqilab.com/article/60380/%E0%A6%89%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%A8-%E0%A6%85%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%BE