২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
ফুটপাথ দখলে নতুন আয়োজন: নেয়া হচ্ছে অ্যাডভান্স
২৩ জানুয়ারি ২০১৭, সোমবার,
ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে হকার উচ্ছেদের পর আবার তা দখল হয়ে যাচ্ছে। বায়তুল মোকাররম এলাকার ছবি : নূর হোসেন পিপুল
‘লাইনম্যান বলেছেÑ কোনো সমস্য নেই, আবার বসাবে। তবে তার জন্য আরো টাকা দিতে হবে’Ñ কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর মতিঝিল এলাকার হকার আবদুস সোবহান। ১৫ হাজার টাকা অগ্রিম ও মাসে তিন হাজার টাকা ভাড়ায় একটি টঙ দোকান নিয়েছিলেন তিনি। এই টাকা তো দিতে হয়েছে লাইনম্যানকে। এর বাইরেও প্রতিদিন ৫০ টাকা করে দিতে হতো। এসব দিয়েও যা আয় হতো তা দিয়ে চলত সংসার। হকার উচ্ছেদ করায় এখন মাথায় হাত। তবে আবদুস সোবহান এখনো আশাবাদী। লাইনম্যান বলেছেন, পরিস্থিতি শান্ত হলেই আবারো তাকে ফুটপাথে বসিয়ে দেয়া হবে। শুধু আবদুস সোবহান নন, রাজধানীর লাখ লাখ হকার এখন লাইনম্যানের ওপর ভরসা করে আছেন। বিনিময়ে লাইনম্যান ও চাঁদাবাজদের আবারো নতুন করে টাকা দিতে হবে।
রাজধানীর ফুটপাথ এখন অনেকটাই হকারমুক্ত। সম্প্রতি এসব ফুটপাথে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। তবে এই উচ্ছেদের পরে আবারো কোনো কোনো এলাকার ফুটপাথ এরই মধ্যে দখল হয়ে গেছে। যেগুলো এখনো দখলমুক্ত রয়েছে সেগুলো দখলের জন্য ব্যাপক আয়োজন চলছে। নেয়া হচ্ছে অ্যাডভান্স। বিশেষ করে রাজধানীর গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম, জিপিও, ক্রীড়া ভবন, দৈনিক বাংলা, স্টেডিয়াম, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, কাপ্তান বাজার, দিলকুশা, মতিঝিল, ফকিরেরপুল, টিকাটুলি, সদরঘাট, বঙ্গবাজার, নীলক্ষেত, নিউ মার্কেট, ঢাকা কলেজ, গাউছিয়া, যাত্রাবাড়ী, পোস্তগোলা, জুরাইন, শাহবাগ, মালিবাগ-মৌচাক, ফার্মগেট, মহাখালী, মিরপুর ১০ নম্বর, গাবতলীসহ রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকার কিছু কিছু অংশে আবারো স্বল্পসংখ্যক হকার বসেছে এরই মধ্যে। চাঁদাবাজ ও লাইনম্যানরাই তাদের বসিয়েছে বলে হকার সূত্র জানান।
উচ্ছেদের পর স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতেও আবার হকার বসেছে। বঙ্গভবনের পাশে দিলকুশাজুড়ে আবারো হকার বসেছে। একই অবস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সোনালী ব্যাংকের সামনেও। একাধিক হকার জানান, অনেকেই ফুটপাথে পাকা স্থাপনায় বসে ব্যবসায় করতেন। লাইনম্যান, চাঁদাবাজ ও স্থানীয় মাস্তানরা তাদের বসিয়েছিল। বিনিময়ে তারা অগ্রিম টাকা নেয়। কোনো কোনো দোকানের জন্য এক-দেড় লাখ টাকা অগ্রিম নিয়েছে এমন ঘটনাও রয়েছে। উচ্ছেদের তালিকায় ওই পাকা স্থাপনাও রয়েছে। কিন্তু হকাররা যে অগ্রিম দিয়েছে তা ফেরত দেয়নি চাঁদাবাজরা। এখন আবারো চাঁদাবাজরা টাকা দাবি করছে ওই সব স্থানে বসানোর জন্য। 
বাংলাদেশ হকার ফেডারেশনের সভাপতি আবুল কাশেম বলেছেন, ফুটপাথ নিয়ন্ত্রণ করে লাইনম্যানরা। লাইনম্যান নামক চাঁদাবাজরাই হকার ব সায়। একজন হকার বসাতে পারলেই লাইনম্যানের দিনে ৫০-১০০ টাকা উপার্জন। হকার নেতা আবুল কাশেম বলেন, রাস্তার হকার উচ্ছেদ করুক তাতে কোনো আপত্তি নেই। আবার অনেকে টঙ দোকান বসিয়েছে রাস্তার ওপর, অনেকে চৌকি বসিয়ে তাঁবু টাঙিয়ে ব্যবসায় করছে, এগুলো ঠিক নয়। তবে হকারদের পুনর্বাসনের দাবি করেন আবুল কাশেম। তিনি বলেন, চাঁদাবাজদের পুঁজি হচ্ছে এই নিরীহ হকাররা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হকারদের নিয়ন্ত্রণ করছে লাইনম্যান নামধারী চাঁদাবাজরা। আর লাইনম্যানদের নিয়ন্ত্রণ করছে কিছু অসৎ পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। এ কারণেই রাস্তা ও ফুটপাথ থেকে হকার উচ্ছেদের উদ্যোগ ভেস্তে যেতে পারে বলে অনেকের ধারণা। 
হকার সূত্র জানায়, রাজধানীর পল্টন এলাকার ফুটপাথের লাইনম্যানদের সর্দার হচ্ছে বাবুল। ক্যাশিয়ার হলো দুলাল ও আমিন। পল্টনের বঙ্গবন্ধু এভিনিউর হামদর্দের সামনে চাঁদা আদায় করছে সাবেক সরদার সালাম। সুন্দরবন স্কোয়ার মার্কেটের উত্তর পাশে জজ মিয়া ও ভোলা, ঢাকা ট্রেড সেন্টারের সামনে বিমল বাবু, আল মনসুরের পূর্বপাশে খোরশেদ ওরফে বড় মিয়া, শহীদ ও তার ভাই হাসান, রেলওয়ে মার্কেটের পশ্চিম পাশে সুলতান, লিপু, রমনা ভবনের পশ্চিম ও উত্তর পাশে মনির ও তৌহিদ, রাজধানী হোটেল ও সিঙ্গারের সামনে শ্রী বাবুল, রব, আহাদ পুলিশ বক্সের উত্তর পাশে লম্বা হারুন, পশ্চিম পাশে কানা সিরাজ, কাপ্তান বাজার এলাকায় জয়নাল, ভাষানী স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশে আবদুল আলী, বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটে আবদুল কাদের ও খলিল, পশ্চিম পাশে কোটন, স্বর্ণ মার্কেটের সামনে চাটগাইয়া হারুন ও জাহাঙ্গির, উত্তর পাশে সাজু, জিপিওর দক্ষিণ পাশে দাড়িওয়ালা সালাম, বাসসের সামনে আবুল হাশেম কবির, ক্রীড়া ভবনের সামনে নুরু, হাউজ বিল্ডিংয়ের সামনে দুলাল, আলম, বঙ্গবন্ধু এভিনিউর বেল্টের গলিতে কালা নবি, পূর্ণিমার সামনে আক্তার ও জাহাঙ্গির, মতিঝিল এলাকায় ৩০টি ফুটের নিয়ন্ত্রণ নাসির ওরফে ফেন্সি নাসির বাহিনীর হাতে বলে হকাররা জানান। এই এলাকার সর্দার হলো আজাদ, ক্যাশিয়ার কালা কাশেম। আলিকোর সামনে চাঁদা আদায় করছে সাদেক, সোনালী ব্যাংকের সামনে মকবুল, রূপালী ব্যাংকের সামনে তাজু ও তার ছেলে, সেনা কল্যাণের সামনে গাঞ্জুটি হারুন, ফারুক, বলাকার সামনে নুরুল ইসলাম নুরু, আইডিয়ালের সামনে সাইফুল, মোল্লা নাসির শাহজাহান ও মোহর আলী। কোতোয়ালি এলাকায় সর্দার হলো কন্ডু। ওয়াইজঘাট এলাকায় চাঁদা নিচ্ছে নুরু মোল্লা, পাখি ও কালু, কোর্টকাচারী এলাকায় সফিক, নয়াবাজারে মন্টু, কালু, সফি ও আজম। সূত্রাপুর এলাকার কাপ্তান বাজারে সেকেন্দার, হাই, সাজু ও বিষু। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এলাকার সর্দার হচ্ছে সোনামিয়া। অন্যান্যের মধ্যে আছে তোরাব আলী, জুলমাত, আবুল কালাম ও মান্নান। কদমতলী ও শ্যামপুর এলাকায় সর্দার হচ্ছে সিরাজ তালুকদার। এ ছাড়া অন্যান্যের মধ্যে রয়েছে নুরুল ইসলাম, তার ছেলে বাবু, হালিম, জাহাঙ্গির, ফটিক, রহমান সরদার, ফারুক ও রহিম। শাহবাগ এলাকার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দুই গেটে রফিক। এই এলাকায় অন্যান্য এলাকায় চাঁদা আদায় করছে সোহেল, হেদায়েত, ফজর আলী, কামাল, সোহেল, ওবায়েদ, হানিফ, বাবুল ওরফে গাইরা, দেলু ও শাজাহান। হকাররা অভিযোগ করেন, এক দিকে হকার উচ্ছেদ হচ্ছে; অন্য দিকে পোয়াবারো হচ্ছে লাইনম্যান ও চাঁদাবাজদের।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/189694