১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
বইমেলা ও নোংরা রাজনীতি
২৩ জানুয়ারি ২০১৭, সোমবার,
আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য মাসব্যাপী বইমেলা সামনে রেখে ছাপাখানা ও প্রকাশনা জগতে এখন চরম ব্যস্ততা। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রামে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন বই নিয়ে হরেক রকম মেলায় উপস্থিত হবেন লেখক ও প্রকাশকগণ। জ্ঞান ও সৃজনশীলতার বিকাশে নতুন নতুন গ্রন্থ প্রকাশ অবশ্যই জরুরি কাজ। কিন্তু কথা হলো, মান ও গুণের দিক থেকে শুদ্ধ, নির্ভুল ও উন্নত প্রকাশনা উপস্থাপন করা সম্ভব না হলে কাজের চেয়ে অকাজই বেশি হবে; উপকারের চেয়ে অপকারই হবে। পাশাপাশি বইমেলাকে কেন্দ্র করে নোংরা রাজনীতি ও পক্ষপাতের প্রকাশ পেলে জ্ঞানচর্চা ও মুক্ত প্রকাশনার কণ্ঠ রোধ হবে। ধর্ম, দর্শন, মূল্যবোধের জাগরণে যদি বই ও বইমেলা ইতিবাচক প্রণোদনা দিতে না পারে, তবে নিছক মেলার নামে হাট-বাজার, হট্টগোলে কার্যকরী কিছুই হবে না। অতএব, বইমেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ ক্ষুদ্রতার বাইরে এসে পুরো আয়োজনটি সম্পন্ন করবেন বলেই সকলে প্রত্যাশা করেন।
এ কথা সবারই জানা যে, প্রকাশনায় শৃঙ্খলা, সম্পাদনা ও সূক্ষè দৃষ্টি দেওয়া না হলে অসংখ্য ভুল হতে পারে এবং এর ফলে জ্ঞান বিকাশের বদলে অজ্ঞতারই বৃদ্ধি হওয়ার আশঙ্কা। পাঠ্যপুস্তকের ক্ষেত্রে সম্প্রতি আমরা একটি বিতর্ক দেখেছি। বিভিন্ন কবিতা ও বক্তব্য ভুল-ত্রুটিতে সয়লাব হয়েছে। শেখার বদলে শিক্ষার্থীরা বরং বিভ্রান্তই হয়েছে। একটি অর্বাচীন গোষ্ঠী শিক্ষাক্ষেত্র থেকে ধর্ম ও নৈতিকতাকে উচ্ছেদ করতে চাচ্ছে। তারা সাংস্কৃতিক শুদ্ধতাকে বিনষ্ট করতে উৎসাহী। বোরখা বা ওড়নাতেও তাদের আপত্তি। এহেন মারাত্মক পরিস্থিতি মোটেই কাম্য নয়। তথাপি জাতীয় চেতনা ও আদর্শের বিরুদ্ধে তৎপর গোষ্ঠীকে বইমেলায় সব সময়ই আগ্রাসী ভূমিকায় দেখা যায়। যা বইমেলা সার্বজনীনতাকে ক্ষুদ্রতায় পর্যবসিত করে।
এ কথা ঠিক যে, কম্পিউটার হাতের কাছে সুলভ হওয়ায় ছাপার কাজ অনেক সহজ ও অনায়াস হয়ে গেছে। প্রেস ও কাগজ আজকাল দুর্লভ নয়। ফলে অতি অল্প সময়ে এবং অতি সহজেই যে কেউ বই প্রকাশ করতে পারছে। নানা রঙের ও বাহারী ডিজাইনের বই-পুস্তক প্রকাশ করা এখন চোখের নিমিষেই সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সঠিক বই বের হচ্ছে কি, যা জ্ঞান, ধর্ম, নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে পুষ্ট করবে?
আরো প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকাশিত বইগুলোর গুণ ও মান কি যথার্থ হচ্ছে? ভাষা, বানান, তথ্য, উপাত্ত, শব্দ গঠন ইত্যাদি ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যা সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়। বিরাট বিরাট ভুল বইগুলোর পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকে। তথ্য, উপাত্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনেক সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। শোনা কথা, কান-কথা, গাল-গল্প লিখে দেন অনেকেই। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সঠিক তথ্যটি উপস্থাপনের কষ্ট স্বীকার করতে অনেকেই রাজি হন না। গবেষকের শ্রম কবুল করার মতো স্থিরচিত্ত লেখকের সংখ্যা এখন আসলেই কম।
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সারা বছর নয়, ফেব্রুয়ারি এবং বইমেলা এলেই লেখকদের মধ্যে প্লাবন জাগে। সারা বছর ধীরে ধীরে বইটিকে এগিয়ে নেওয়ার কাজে না গিয়ে রাতারাতি বই প্রকাশের মচ্ছবে শত শত ভুল থাকছে। অনেকেই নিজে টাকা দিয়ে বই করেন। যা ইচ্ছা, তা-ই ছাপান। প্রতিটি কাজে যেমন অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিতে হয়, বই প্রকাশের ক্ষেত্রে তেমনটি নিতে দেখা যায় না। 
প্রকাশকগণও এক ধরনের উদাসীনতায় কাজ সারেন। একটি ভালো, নির্ভুল ও নিখুঁত বই প্রকাশের পেছনে যে একজন সম্পাদক, সংশোধক ইত্যাদির প্রয়োজন হয়, সেটা মনেই করা হয় না। এর ফলে হাজার হাজার বই প্রকাশ হয় বটে, কিন্তু হাতে নেওয়ার বা সংরক্ষণ করার মতো বই উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় পাওয়া যায় না। অনেক বোদ্ধা পাঠকই এমন অভিযোগ করে থাকেন যে, ভালো বই পাই না। কথাটি সর্বাংশে মিথ্যা নয়।
প্রকাশকগণ অবশ্যই ভালো ও উন্নত মানের বই উপহার দেওয়ার নেপথ্য কারিকর। একটি ভালো প্রকাশনা সংস্থা প্রকৃত লেখককে খুঁজে বের করবে; সময় নিয়ে একটি ভালো বই বের করবে, এমনটিই কাম্য। প্রকাশক বইটিতে স্বয়ং সম্পূর্ণ, নির্ভুল, মানসম্পন্নভাবে প্রকাশ করতে অনেক উদ্যোগ নেবেন। কারেকশন, প্রুফ, সম্পাদনার ব্যবস্থা করবেন। নীতিগতভাবে এমনটি করার কথা থাকলেও বাস্তবে সেটা হচ্ছে না। কয়জন আন্তরিক প্রকাশক আমাদের চারপাশে আছেন, সেটাও এক বিরাট প্রশ্ন। অনেকেই পাঠ্যপুস্তক প্রকাশে ব্যস্ত। অনেকেই দায়সারাভাবে বই করেন। বইকে একটি শিল্পসম্মত পণ্যে পরিণত করার ইচ্ছা ও মানসিকতা সকলের নেই। জ্ঞান ও সৃজনশীলতার বিকাশে প্রকাশকদেরকেই ভূমিকা নিতে হয়। মননশীল বইকে সামনে আনতে হয় তাদেরকেই। এ সত্যটি বিস্মৃত হলে বিরাট বড় ভুল করা হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা ও মননশীলতা বিকাশে প্রকাশনা শিল্পের ভূমিকা অগ্রগণ্য। বাংলা একাডেমিসহ সরকার-সমর্থিত ও অনুদানপুষ্ট কতিপয় প্রতিষ্ঠান পুরো কাজ করতে পারছে না। অবশ্যই বেসরকারি পর্যায়ের নানা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকেও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রায়-সকল প্রকাশনা সংস্থাই ঢাকাকেন্দ্রিক। তারা নানা সুবিধাও পাচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিচ্ছে। সরকারের নানা বিভাগে বই বিক্রি ও সরবরাহ করতে পারছে। এতে একটি ভারসাম্যহীন অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। শুধু ঢাকাকে কেন্দ্র করে প্রকাশনার সকল কিছু আবর্তিত হলে পাঠক ও লেখকরা বঞ্চিত হবে। ঢাকার বাইরেও যে বিশাল বাংলাদেশ রয়েছে, সেখানে বিপুল পাঠক, লেখক আছেন, তাদেরকে পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় আনা হচ্ছে না।
ঢাকার পরেই একমাত্র চট্টগ্রামেই কিছু প্রকাশনা সংস্থা প্রচণ্ড পরিশ্রম ও সংগ্রাম করে টিকে আছে। তাদের বই মানে ও গুণে সেরা হলেও বাজার পাচ্ছে না। কারণ সরকার বিভিন্ন পাবলিক লাইব্রেরিতে বই প্রদানের জন্য বই কেনে ঢাকা থেকেই। চট্টগ্রামেও যে ভালো বই রয়েছে, সেটা দেখার ফুসরত তাদের নেই। পাশাপাশি একটি মহল বাজারে ভারতীয় বাংলা বই সরবরাহ করছে বন্যার মতো। ভারতীয় বই দিয়ে বাংলাদেশের বইয়ের বাজার সঙ্কুচিত করা হচ্ছে।
বইমেলাকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে কেবল বইয়ের বিপণন করলেই চলবে না; প্রকাশনা শিল্পকেও বিকশিত করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে শক্ত অবস্থানে গিয়ে কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারেন। আমাদের জানা মতে, চট্টগ্রামের হাতেগোনা কয়েকটি উন্নত মানের প্রকাশনা সংস্থা রয়েছে, যারা স্থানয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, নৃতত্ত্ব, সংস্কৃতি নিয়ে গভীর গবেষণায় লিপ্ত। আঞ্চলিক ইতিহাস-ঐতিহ্যচর্চাও যে জাতীয় ইতিহাসের বিকাশে কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারে, এ সত্যটি তারা উপলব্ধি করেন। এজন্য স্থানীয় লেখক-গবেষকদের নিয়ে চট্টগ্রামে প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর সঠিক বিপণন ও প্রমোশন হওয়া দরকার। বইমেলার সঙ্গে জড়িত প্রকাশন ও অন্যান্যরা এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
একটি জাতির মানসিক ও জ্ঞানগত বিকাশের জন্য গ্রন্থ অবশ্যই একটি জরুরি উপাদান। যতই ডিজিটাল ও ভার্চুয়াল জগৎ প্রসারিত হোক না কেন, ছাপার অক্ষরের বই কখনোই আবেদন ও কার্যকারিতা হারাবে না। বই চিরায়ত সৌন্দর্যে মানুষকে জ্ঞান বিতরণ করতেই থাকবে। অমর একুশের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিমাখা বইমেলায় বইকে আরো সুন্দর, নির্ভুল, মানসম্পন্ন করার প্রত্যয় সকলের মধ্যে ঘোষিত হবে বলেই আশা করি। পাশাপাশি চট্টগ্রামের প্রকাশনাকে বিকশিত ও মজবুত করার একটি সমন্বিত আশাবাদও উচ্চারিত হবে বলেও প্রত্যাশা করি। চট্টগ্রামের বইমেলাকে কেন্দ্র করে লেখক, প্রকাশক, পাঠকের একটি প্রাণময় সম্প্রীতি ও মৈত্রী রচিত হয়ে বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চার ধারাকেই পুষ্ট করবে বলে আশা রাখি। 
পাশাপাশি গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে দলগত বা রাজনৈতিক পক্ষপাত যেন না আসে। পবিত্র কোরআন, হাদিস, ধর্মতত্ত্ব, নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও আদর্শিক প্রকাশনার প্রাধান্য বাড়াতে হবে। জাতি গঠনের জন্য ধর্ম, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বিকল্প নেই। ধর্মহীন প্রকাশনা অবশ্যই রোধ করতে হবে। ধর্মীয় বই দেখলেই মৌলবাদী বা জঙ্গিবাদী সাহিত্য বলার বালখিল্যতাও পরিত্যাগ করতে হবে। ধর্মীয় প্রকাশনালয়কে কালো তালিকাভুক্ত করা বা স্টল বরাদ্দে অসহযোগিতা করার বিষয়টি জ্ঞানচর্চার জন্য হবে আত্মঘাতী। ফলে বইমেলাকে জ্ঞান ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্র করাই কাম্য। দলীয় সংকীর্ণতা প্রদর্শনের মেলা বানানো ঠিক নয়। এই সত্যটি বুকে হাত দিয়ে সততার সঙ্গে উপলব্ধি করার জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানাই। তবেই বইমেলা ও গ্রন্থ প্রকাশ সার্থক হবে।
http://www.dailysangram.com/post/268667-%E0%A6%AC%E0%A6%87%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%93-%E0%A6%A8%E0%A7%8B%E0%A6%82%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%A4%E0%A6%BF