১৯ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
ভয়ংকর হয়ে উঠছে কিশোর অপরাধীরা
২২ জানুয়ারি ২০১৭, রবিবার,
দিনে দিনে ভয়ংকর হয়ে উঠছে ‘বখে যাওয়া কিশোর অপরাধীরা’। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওরা প্রতিপক্ষের ওপর ওরা হামলে পড়ছে। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে বীরদর্পে এলাকায় প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে। পাড়া-মহল্লায় গ্রুপ বেঁধে চলাফেরা করে ওরা। গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডায় লিপ্ত থাকে। স্কুল-কলেজের মেয়েদের দেখলেই নানাভাবে হয়রানি করে। তাদের বিরুদ্ধে এলাকার লোকজন কোনো প্রতিবাদ করতে পারে না। এলাকাবাসীর অভিযোগ, থানা পুলিশের বিশেষ নজরদারি না থাকায় তারা আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
বখে যাওয়া কিশোর অপরাধীরা ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। তারা হত্যাকাণ্ড, অপহরণ ছিনতাই থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। টাকা পেলে যে কাউকে হত্যা করতে দ্বিধা করে না। তারা স্কুল ব্যাগের পাশাপাশি জুতার মধ্যে করে অস্ত্র বহন করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে বিক্রি করছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য আছে।
এদিকে কিশোর অপরাধীদের অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় থানার ওসিদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। গতকাল রবিবার এসংক্রান্ত একটি আদেশ পুলিশের কাছে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, কিশোর অপরাধীদের প্রতিরোধ করতে থানা পুলিশকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে। যারা পাড়া-মহল্লায় অপরাধ কর্মকাণ্ড করে তাদের তালিকা করা হচ্ছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে জানান, কিশোরসহ নানা অপরাধী ধরতে র্যাবের প্রতিটি ব্যাটালিয়ন কাজ করছে। এরই মধ্যে কিছু কিশোর অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৬ জানুয়ারি উত্তরায় কিশোর গ্রুপের হাতে প্রতিপক্ষ গ্রুপের সদস্য ও স্কুল ছাত্র আদনান কবির নিহত হয়েছে। এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করতে থানা পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করে। তারা তথ্য পেয়েছে, উত্তরায় ডিসকো বয়েজ, নাইন স্টার গ্রুপ, ভাইপার গ্রুপ, রেড অ্যালার্ট, রেড অ্যালার্ট বয়েজ গ্রুপ, এইচ স্টার গ্রুপ ও এইট স্টার গ্রুপ সক্রিয়। তাদের মধ্যে নাইমুর রহমান অনিকের নেতৃত্বে ডিসকো গ্রুপ, তালাচাবি রাজুর নেতৃত্বে নাইন স্টার গ্রুপ ব্যাপক সক্রিয়। গত ৩ জানুয়ারি রাতে উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান বাহাউদ্দিন বাবুলের ভাতিজা দীপু সিকদারকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এ ঘটনার সঙ্গেও ডিসকো বয়েজ গ্রুপ এবং নাইন স্টার গ্রুপ জড়িত। গত মাসে উত্তরার ৯/এ নম্বর রোডে ব্যাডমিন্টন খেলার সময় ডিসকো গ্রুপের ছোটন খান ও সাকিব নাইন স্টার গ্রুপের তালাচাবি রাজুর ওপর হামলা চালিয়ে আহত করে। ওই ঘটনায় পুলিশ সাবেক জেলা জজের ছেলে নাফিস মোহাম্মদ আলম নামের এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করে। পরে মোহাম্মদ আলম মুক্তি পায়। তুরাগ থেকে উত্তরা আবাসিক এলাকা, ফায়দাবাদ, খিলক্ষেত ও আশকোনা এলাকার উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত ঘরের কিশোররা এই দুটি গ্রুপে কাজ করে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মেহরাব, সাদাফ জাকির, নাফিস মোহাম্মদ আলম ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মেহরাব স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। উত্তরার মতো ধানমণ্ডি, গুলশান, বারিধারা, মিরপুরসহ ঢাকার আনাচকানাচে কিশোর অপরাধীরা সক্রিয় আছে। তারা পাড়া-মহল্লায় গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডাবাজির পাশাপাশি নেশা করে থাকে। স্কুল ফাঁকি দেওয়া, ইভ টিজিং এদের নিয়মিত কাজ। প্রাইভেট কার বা মোটরসাইকেলে জোরে হর্ন বাজিয়ে আনন্দ-ফুর্তি করে থাকে। চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের পাশাপাশি এখন আধিপত্য বিস্তার নিয়ে খুনোখুনিতে মেতে থাকে এসব বখাটে হয়ে যাওয়া কিশোর অপরাধী।
সূত্র জানায়, একটি চক্র কিশোর অপরাধীদের ব্যবহার করে ফায়দা লুটছে। অস্ত্রের জোগানদাতাও নির্ধারণ করে ওই চক্র। সন্ত্রাসী কার্যকলাপের পাশাপাশি তারা মাদক ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা তাদের ব্যবহার করে ফায়দা লুটছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে ওরা ব্যবসায়ী, ফুটপাত ও হকারদের কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে। ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে কিশোর অপরাধী  পিয়াস গ্রুপের সদস্যরা প্রতিপক্ষ মিরাজ গ্রুপের মাহিদুল ইসলাম ইমনকে ছুরিকাঘাতে খুন করে। চাঁদাবাজির ঘটনাকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এলাকার আধিপত্য ও চাঁদা আদায় করা নিয়ে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর কদমতলীতে বর্ণমালা আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র রিয়াদুল, মেহেদি হাসান ও আহাদকে ছুরি মেরে আহত করা হয়। ওই বছরের ২৯ নভেম্বর কামরাঙ্গীরচরে দুই কিশোরের হাতে খুন হয় আলিফ নামের এক কিশোর। ৪ ডিসেম্বর রাতে লালবাগে রবিন নামের এক কিশোরের ছুরিকাঘাতে আবু সালেহ রাব্বী নামের আরেক কিশোর খুন হয়।
ডিএমপির এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকায় কিশোর অপরাধীদের মধ্যে বেশির ভাগই ধনাঢ্য পরিবারের সদস্য। তারা পরিবার থেকে বখে গিয়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। মাঝেমধ্যে তাদের ধরা হলে তদবির করে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। যার ফলে আমরা তাদের কাছেও অনেকটা অসহায়। তার পরও তাদের বিরুদ্ধে আমরা নজরদারি বৃদ্ধি করেছি। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশ পাওয়া গেছে। এলাকাভিত্তিক তালিকা করে ডিএমপির পাশাপাশি পুলিশ সদর দপ্তরকে অবহিত করা হবে। একই কথা বলেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, কিশোর অপরাধীদের তত্পরতা বেড়ে যাওয়ায় গতকাল সারা দেশে পুলিশ সুপার ও থানার ওসিদের কাছে বিশেষ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। তালিকা করে ওই সব কিশোর অপরাধীকে ধরা হবেই।   
http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2017/01/22/454797