১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
প্রাথমিকের ৩৩ লাখ পাঠ্যবই এখনও দেশে আসেনি: দেশীয় প্রতিষ্ঠান দিয়ে ছাপানোর দাবি
২২ জানুয়ারি ২০১৭, রবিবার,
জানুয়ারি মাস প্রায় শেষ। অথচ এখনও ছাপা হয়ে দেশে পেঁৗছেনি প্রাথমিক স্তরের ৩৩ লাখ পাঠ্যবই। ভারতের মুম্বাইয়ের মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান \'শীর্ষাসাই\' সময়মতো পাঠ্যবই ছেপে সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। চলতি শিক্ষাবর্ষে ৫৯ লাখ পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে মাত্র ২৬ লাখ বই সরবরাহ করেছে তারা। তাও পাঠ্যপুস্তক দিবসের পরে। ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব বই সরবরাহ করার কথা থাকলেও এখনও পারেনি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী অঞ্চলের ১৯টি উপজেলার শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর। এসব এলাকার শিক্ষার্থীরা এখনও পুরো সেট বই হাতে পায়নি। একটি বা দুটি বই নিয়ে ক্লাস শুরু করতে হয়েছে তাদের। দেশীয় মুদ্রাকররা বলছেন, মুদ্রণশিল্পে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও কেবল বিশ্বব্যাংকের শর্ত মানতে প্রাথমিকের বই ছাপাতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে হচ্ছে। অথচ পুরো বইয়ের মুদ্রণ ব্যয়ের মাত্র ৮ শতাংশ অর্থ দেয় তারা। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও বলছেন, বই মুদ্রণের কাজটি পুরোপুরি দেশে করা গেলে তাদের পক্ষে মনিটর করা আরও সহজ হতো।
 
 
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) থেকে জানা গেছে, চলতি বছর প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের ৯৮ লটের মধ্যে ১৬ লটে এক কোটি ৮০ লাখ বই ছাপার কাজ পায় ভারতীয় তিনটি প্রতিষ্ঠান। বাকি বই দেশে ছাপা হয়। বর্তমানে ভারতে আটকে রয়েছে ৩৩ লাখ বই। ফলে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে বই উৎসবের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। সময়মতো বই না পাওয়ায় ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কম বলে জানান শিক্ষকরা। একাধিক সূত্র জানায়, পাঠ্যবই সংকট কাটাতে বাফার স্টক (আপৎকালীন মজুদ) থেকে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী বই পাঠালেও চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় বই সংকট দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় চলছে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এনসিটিবিতে। এ কারণে বই উৎসবের পরপরই তড়িঘড়ি করে ভারত সফর করেছেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র সাহা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগের একাধিক প্রাথমিক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, অধিকাংশ উপজেলায় এখনও বাংলা, ইংরেজি ও অঙ্ক বই পাঠানো হয়নি। প্রতিদিন বই নিতে বিভিন্ন স্কুল থেকে শিক্ষকরা তাদের কাছে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।
 
 
চলতি শিক্ষাবর্ষে চার কোটি ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৯২৯ শিক্ষার্থীর জন্য প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বিতরণের জন্য মোট ৩৬ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার ২৪৫টি বই ছাপানোর টেন্ডার করে এনসিটিবি। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই ছাপিয়েছেন দেশীয় মুদ্রাকররা। প্রাথমিক স্তরের ১১ কোটি ৫৫ লাখ ২৬ হাজার ৯৫২টি বই ছাপানো হয়েছে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে, দেশে-বিদেশে। দেশের পাশাপাশি এবার ভারত ও চীনে প্রাথমিক স্তরের বই ছাপানো হয়েছে।
 
 
অনুসন্ধান করে দেখা যায়, ভারতের শীর্ষাসাই বিজনেস নামের প্রতিষ্ঠানটি মুম্বাই ও পুনেতে বই ছাপার কাজ করে, যা প্রাথমিকের মোট বইয়ের প্রায় ৪ শতাংশ। দরপত্র অনুযায়ী ডিসেম্বরের মধ্যে এসব বই পেঁৗছানোর কথা থাকলেও বেশিরভাগ বইই তারা দিতে পারেনি।
 
 
জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা সমকালকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ এসে পেঁৗছেছে। পাঠ্যবইগুলো এখন খালাস হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে স্কুলে পেঁৗছে যাবে। তিনি এ ব্যাপারে উৎপাদন নিয়ন্ত্রক আবদুল মজিদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। আবদুল মজিদকে এনসিটিবিতে পাওয়া যায়নি। ফোনেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
 
 
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান সমকালকে বলেন, বন্দরে জাহাজ থাকার তথ্যটি সঠিক নয়। এনসিটিবির কর্মকর্তারা না চাইলেও চেয়ারম্যান নিজ আগ্রহে শীর্ষাসাইকে মুদ্রণ কাজ দিয়েছেন। অথচ প্রতিষ্ঠানটির এ দেশীয় প্রতিনিধি এর আগেও বই ছাপার কাজ নিয়ে যথাসময়ে সরবরাহে ব্যর্থ হয়েছেন। এর আগে সময়মতো বই না আসার কারণ হিসেবে এনসিটিবি চেয়ারম্যান চট্টগ্রাম বন্দরে সাইক্লোনের কথা বলেছেন। অথচ গত দুই মাসে চট্টগ্রামে কোনো সাইক্লোন হয়নি। তিনি আরও বলেন, ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও তারা কেন সময়মতো বই দিতে পারল না এটা খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি দাবি করেন, ৩০ উপজেলার শিশুরা বছরের প্রথম দিন বই উৎসব করতে পারেনি। তারা চান, দেশের মুদ্রণকাজ দেশেই রাখা হোক।
 
 
এ নিয়ে ব্রাইট প্রিন্টার্সের স্বত্বাধিকারী এস এম মোহসীন সমকালকে বলেন, দেশের মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান শিল্পে বর্তমানে ৫০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। সরকার যে পরিমাণ বই ছাপে, তা এ শিল্পের জন্য মাস তিনেকের কাজ। তাই দাতাদের ৮ শতাংশ টাকার জন্য দেশের বাইরে বই ছাপতে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না।
 
 
বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি রাব্বানী জব্বার সমকালকে বলেন, সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন যে কোনো পরিমাণের বই ছাপানোর সক্ষমতা বাংলাদেশ এখন অর্জন করেছে। ২০১৬ সালের ৩৪ কোটি পাঠ্যবইই বাংলাদেশে ছাপা হয়েছে। এ ছাড়া এ দেশে ছাপা হলে সরকারের পক্ষে মনিটর করাও খুব সহজ। বিদেশে বই ছাপানোর কোনো যুক্তিই আসলে থাকতে পারে না।
 
 
প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই দেখভালকারী কর্মকর্তা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সলিমউল্লাহ সমকালকে বলেন, পাঠ্যবই দেশে ছাপা হলেই বেশি ভালো হতো। আমাদের মনিটরিংয়ের ঝক্কি কমে যেত। শিক্ষার্থীরাও সময়মতো বই পেত।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/01/22/264778#sthash.R2eTgobC.dpuf