২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
চাঁদা চেয়েই নতুন বাড়িতে তালা
২২ জানুয়ারি ২০১৭, রবিবার,
কোটি টাকা দিয়ে স্বপ্নের বাড়ি বানিয়েছেন; কিন্তু \'ভাইয়ের\' অনুমতি ছাড়া সেই বাড়িতে কেউ ঢুকতে পারবেন না। ভাইয়ের চাহিদা মেটানোর পরই মিলবে বাড়িতে ঢোকার অনুমতি। কথার \'অবাধ্য\' হলেই চারদিক থেকে আসবে বিপদ। চাঁদা চেয়েই বাড়িতে দেওয়া হবে তালা; না দিলে পড়বে বোমা, বৃষ্টির মতো গুলি। ভাইয়ের \'সুনজর\' ছাড়া কোনো ভাড়াটে বাসাও বদল করতে পারবেন না! গল্পটা চলচ্চিত্রের মতো হলেও ভুক্তভোগীদের কাছে এটাই বাস্তবতা। তাদের কাছে আতঙ্কের নাম \'আমির ভাই\'। প্রকৃত নাম আমির হোসেন ওরফে কাইল্যা আমির। রাজধানীর কদমতলী-শ্যামপুর এলাকার বড় অংশজুড়েই চলছে তার ত্রাসের রাজত্ব। কাইল্যা আমির ও তার সহযোগীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বেশ ক\'জন এলাকা ছেড়েছেন। ভয়ে ভুক্তভোগীদের কেউ পুলিশের কাছে মুখ খোলেন না।
 
 
তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমির ও তার সহযোগীদের অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিষয়টি জানে। কেউ অভিযোগ না দিলেও নানা মাধ্যমে পুলিশের কাছে যায় খবর। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও কাইল্যা আমিরের চাঁদাবাজিতে এলাকাবাসীর অতিষ্ঠ থাকার বিষয়টি জানেন। তাকে কেউ কখনও দেখেনি; কোথায় থাকে তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সহযোগীরাই তার ফোন তুলে দেয় বাড়ি মালিকের কানে; শুধু শোনা যায় তার দাবির কথা। রাস্তায় টু-লেট দেখলেই আমিরের সহযোগীরা ঠিকানামতো গিয়ে খালি বাসা বা ফ্লাটে তালা ঝুলিয়ে দেন। খালি বাসায় তালা দিয়ে টাকা আদায় আমিরের নিয়মিত বাণিজ্য। সমকালের অনুসন্ধানে গত এক বছরে এ ধরনের ৫০টি ঘটনা পাওয়া গেছে। আর তিন বছরে চাঁদা চেয়ে ১৫টি নতুন বাড়িতে তালা দেওয়া হয়েছে। কদমতলী ও শ্যামপুরবাসীর প্রশ্ন- ঢাকার একটি অংশে সন্ত্রাসের রাজত্ব চালালেও পুলিশ কেন কাইল্যা আমিরকে ধরছে না। পুলিশ বলছে, তাকে ধরতে একাধিক অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু আত্মগোপনে থাকায় গ্রেফতার করা যায়নি।
 
 
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কদমতলী-শ্যামপুর থানা এলাকার নামা শ্যামপুর, মুরাদপুর, জুরাইন, খোরশেদ আলী সরদার রোড, আলমবাগ, আলীবহর, ঢাকা ম্যাচ, মিষ্টি দোকান এলাকা, ১ নম্বর সড়ক, কালা মিয়া সরদার রোড, বাগানবাড়ি এলাকা, দারোগাবাড়ি রোড, মাজার রোড ও নবারুণ গলি এলাকায় কাইল্যা আমির ও তার সহযোগীরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়।
 
 
ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আমির ভারতে অবস্থান করছে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। কদমতলীর স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, আমির মাঝেমধ্যে দেশে আসে। তখন সে শ্যামপুর ইউনিয়নের সাবেক এক চেয়ারম্যানের আশ্রয়ে কেরানীগঞ্জে থাকে। এ ছাড়া পার্বত্য অঞ্চলে ওই চেয়ারম্যানের বাগানবাড়িতেও কাইল্যা আমির অবস্থান করে।
 
 
কদমতলী ও শ্যামপুর থানা আওয়ামী লীগ নেতা এবং সংরক্ষিত আসনের এমপি সানজিদা খানম সমকালকে বলেন, সন্ত্রাসী কাইল্যা আমিরের চাঁদাবাজির শিকার অনেক বাড়িমালিক বিভিন্ন সময় অভিযোগ জানিয়েছে। আমি তাদের আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। আমির ও তার সহযোগীদের গ্রেফতারের জন্যও আইন-শঙ্খলা বাহিনীকে বলা হয়েছে।
 
 
কদমতলী ও শ্যামপুর এলাকায় আমিরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে স্থানীয় এমপি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, এলাকাবাসীর নিরাপত্তায় সচেষ্ট আছি। শুধু আমির নয়, তার আশ্রয়দাতাদেরও খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে।
 
 
তিন স্তরে চাঁদাবাজি: কয়েকজন বাড়িমালিক ও স্থানীয়রা জানান, তিন স্তরে চলে আমিরের চাঁদাবাজি। প্রথম স্তরে নতুন বাড়ির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মালিকের কাছে তার সহযোগীরা হাজির হয়। ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে ফোন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অপর প্রান্ত থেকে আমির নিজের ভয়াবহ রূপ তুলে ধরে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। বাড়ির মালিককে চিন্তা করারও সময় দেওয়া হয় না। সহযোগীরা বাড়িতে ঝুলিয়ে দেয় সঙ্গে আনা তালা। এর পর চলে দেন-দরবার। চাহিদা মেটানোর পর খোলা হয় সেই তালা। কোনো কোনো বাড়ির সামনে গুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়।
 
 
দ্বিতীয় স্তরে নির্মাণাধীন বাড়িতে চাঁদাবাজি করা হয়। ওই এলাকায় কেউ বাড়ি করতে গেলেই বাড়ির মালিকের কাছে আমিরের নামে ফোন আসে। চাহিদামতো চাঁদা না দিলে বন্ধ করে দেওয়া হয় নির্মাণ কাজ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমিরের সহযোগীরা নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহের কাজ পেলে বিষয়টির মীমাংসা হয়। তৃতীয় স্তরে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটেদের ওপর চলে জুলুম। কোনো বাড়ি থেকে ভাড়াটে গেলেই সেখানে গিয়ে হাজির হয় আমিরের সহযোগীরা। খালি বাসা বা ফ্ল্যাটে তালা লাগিয়ে বাড়িওয়ালার কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। পাশাপাশি নতুন বাসায় যাওয়া ভাড়াটেদের মালভর্তি ট্রাক বা পিকআপ ভ্যান আটকেও চলে চাঁদাবাজি।
 
 
জানা যায়, কিছুদিন আগে কদমতলীর মিষ্টি দোকান এলাকার ওয়াসা পাইপ রোডের চারতলা একটি বাড়িতে ১০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় এক প্রভাবশালীর মধ্যস্থতায় দুই লাখ টাকা দিয়ে রক্ষা পান বাড়ির মালিক। গত বৃহস্পতিবার ওই বাড়িমালিকের সঙ্গে কথা হলে তিনি প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে মধ্যস্থতাকারীর পরিচয় দেওয়া হলে বাড়িমালিক সমকালকে জানান, বাড়ি রক্ষা ও জীবনের মায়া থেকেই তিনি কিছু টাকা দিয়েছেন। পুলিশকে জানাননি কেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, \'পুলিশ তো আর সব সময় রক্ষা করবে না।\' কালা মিয়া সরদার রোডের এক বাড়িমালিক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, পাঁচতলা বাড়ির নির্মাণ শুরুর পর আমার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। পরে আমিরের লোকজনকে নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহের কাজ দিয়ে রক্ষা পেয়েছি। কদমতলীর নূরানী মসজিদ গলির সাবেক এক বাড়িমালিক বলেন, দুই বছর আগে আমি বাড়ি নির্মাণ শেষ করি। এর পর আমির চাঁদার জন্য তালা ঝুলানোর হুমকি দেয়। আমি তা না শুনে স্থানীয়দের নিয়ে বাড়িতে মিলাদের আয়োজন করি। ওই দিনই বাড়ির সামনে বোমাবাজি ও এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করা হয়। এর পর নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে পানির দরে বাড়িটি বিক্রি করে ওই এলাকা ছেড়ে আসি।
 
 
চা \'বয়\' থেকে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী: স্থানীয়রা জানান, নব্বইয়ের দশকে কদমতলী ও জুরাইন এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী মিজানুর রহমান ওরফে মিজানের হাত ধরে অপরাধ জগতে আসে আমির। তখন তার বয়স ছিল ১৩-১৪। শুরুতে সে মিজানের জন্য চা এনে দিত, ফুট-ফরমায়েশ খাটত। দুর্ধর্ষ হওয়ায় আমিরকে দিয়ে মিজান শুরু করে ছিনতাই ও ডাকাতি। ওই সময় তার নির্দেশে কিশোর আমির কয়েকটি খুনও করে। এর পর আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। ১৯৯৭ সালে প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয় মিজান। এর পরই আমির নিজের গ্রুপ তৈরি করে। দিনে দিনে সে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। ২০০১ সালের দিকে একটি মামলায় গ্রেফতার হয়ে আমির কারাগারে যায়। পাঁচ বছর জেল খাটার পর সে জামিনে মুক্ত হয়।
 
 
পুলিশের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সমকালকে জানান, জুরাইনে আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ উল্লাহ ও তার গাড়িচালক হারুন, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রিয়াজ, চাঁদা না পেয়ে বাড়ির দারোয়ানসহ অন্তত ১০টি হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলার আসামি আমির ও তার সহযোগীরা। আমিরের বিরুদ্ধে শ্যামপুর, কদমতলী ও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
 
 
আমিরের সহযোগী কারা:  আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, আমির দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নেই। মোবাইল ফোনেই সে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। এ জন্য তার ১০ জন সহযোগী রয়েছে। বর্তমানে আমিরের সেকেন্ড-ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করছে মনির ওরফে ঘাউড়া মনির। পরের অবস্থানেই রয়েছে টুণ্ডা নবী। বাকি ৮ জন হলো- ফালান, পিচ্চি হেলাল, আরিফ, জুম্মন, আসাদ, সালাউদ্দিন, আইয়ুব ও শামীম। তাদের সহযোগী হিসেবে আরও ২০ জন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, আমিরের সহযোগী আরিফ ও জুম্মনকে তিন বছর আগে গ্রেফতার করা হয়। এর পরই তার গ্রুপের ঘাউড়া মাসুম, চশমা জামাল, সানি ও ফারুক আত্মগোপনে চলে যায়।
 
 
আমির কেন অধরা: পুলিশের ওয়ারী জোনের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বড় কোনো ঘটনার তদন্ত করতে গেলেই আমিরের নাম পাওয়া যায়। এর পরই তাকে আসামি করা হয়। কিন্তু ঘটনার শিকার হয়েও কেউ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে না। তবে আমিরসহ কোনো সন্ত্রাসীকে যাতে কেউ চাঁদা না দেয়, তার জন্য উঠান বৈঠকে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমিরকে ধরার চেষ্টা অব্যাহত আছে।
 
 
কদমতলী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী বলেন, এক সময়ে আমির চাঁদাবাজি করত বলে শুনেছি। আমি থানায় আসার পর তার কোনো অপতৎপরতার খবর পাওয়া যায়নি। থানায় কেউ অভিযোগও করেনি। তবে বিভিন্ন সময়ে তার বেশ কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/01/22/264781#sthash.5HELgTXa.dpuf